বাংলার পর ভাঙনের সুর বেজে উঠেছে প্রতিবেশী রাজ্যেও। সম্প্রতি ত্রিপুরার বিজেপি সংগঠন নিয়েও শুরু হয়েছে চাপানউতোর। কেবল সংগঠনেই নয়, দলের অন্দরে বিপ্লব দেবের মন্ত্রিত্ব নিয়েও কোন্দল তীব্র আকার ধারণ করেছে।সে রাজ্যে বিজেপির বিধায়করা এখন দু-ভাগে বিভক্ত। ভাগাভগি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন খোদ মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের ডাকা পরিষদীয় দলের বৈঠকে বেশ কয়েকজন বিধায়ক অনুপস্থিত থাকেন।
প্রথম থেকেই ত্রিপুরা বিজেপিতে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। একটি গোষ্ঠী মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের। অন্য গোষ্ঠীটি কংগ্রেস ও তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়া সুদীপ রায়বর্মনের। ত্রিপুরায় সুদীপ রায়বর্মন মুকুল রায় ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত। মুকুল রায় বিজেপি ছেড়ে ফের তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর সুদীপ রায়বর্মনের ঘরওয়াপসি নিয়ে জল্পনা শুরু হয়ে যায়।
ইতিমধ্যে সুদীপ রায়বর্মন বিজেপির সভাপতির সঙ্গে দেখা করেন। এরপর আইপিএফটির প্রতিনিধিরাও দিল্লিমুখী হন। তারপরই ত্রিপুরায় গুঞ্জন শুরু হয়। কিছুদিন ধরেই সুদীপ রায়বর্মন বিজেপিতে বেসুরো বাজছিলেন। মন্ত্রিসভা থেকে সরেও এসেছেন। তাঁর অনুগামী বিধায়করা মন্ত্রিসভায় থাকলেও যে কোনও মুহূর্তে তাঁরা বিপ্লব দেবের সরকার থেকে সরে আসতে পারেন। ফলে সুদীপের নেতৃত্বে ত্রিপুরায় তৃণমূলের সংগঠিত হওয়ার সম্ভাবনা এখন প্রবল হয়ে উঠেছে।
আর এতেই সিঁদুরে মেঘ দেখছে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। কারণ মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের ডাকা পরিষদীয় দলের বৈঠকে সুদীপ রায়বর্মন ছাড়াও যারা অনুপস্থিত ছিলেন তাঁরা নিয়মিত মুকুল রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে খবর। বাংলায় বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর ভাঙনের স্রোত বইছে বিজেপিতে। মুকুল রায় ঘাসফুল শিবিরে ফেরার পর পদ্ম শিবিরের ভাঙন আরও বেগ পেয়েছে। সেই প্রেক্ষিতে পরিষদীয় দলের বৈঠকে একাধিক বিধায়কের অনুপস্থিত থাকা কার্যত ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবকে প্রবল চাপের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে।
ভাঙন আঁচ করেই তা আগেভাগে মেরামত করার চেষ্টায় তড়িঘড়ি বৈঠকে ডেকে বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে ত্রিপুরায় পাঠায়। তারপর দিল্লিতে সুদীপ রায়বর্মনকে তলব করে বৈঠক করেছেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডা। এতদিন সুদীপ রায়বর্মন দেখা করতে গিয়েও নাড্ডার সময় পেতেন না। এবার তাঁকেই জরুরি তলব করে বৈঠকে বসেছেন। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিক্ষুব্ধ সুদীপের ক্ষোভ মেটানোর আশ্বাসও দিয়েছেন।
আসল ঘটনা হল; মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের ডাকা পরিষদীয় দলের বৈঠকে ৩৬ জনের মধ্যে গরহাজির ছিলেন ১০ জন বিধায়ক। উল্লেখ্য, এই ১০ বিধায়কই সুদীপ রায়বর্মন শিবিরের। অন্যদিকে তাঁরা প্রত্যেকেই মুকুল-ঘনিষ্ঠও বটে। বোঝাই যাচ্ছে সুদীপ রায়বর্মনকে ঘিরে জল্পনার কারণ কতখানি সঙ্গত। বিপ্লব দেব আসলে বৈঠক ডেকেছিলেন, তাঁর সরকারের প্রতি কতজন বিধায়ক আস্থাশীল তা দেখার জন্য। ওই বৈঠকের পরই বিপ্লব দেব নিজে বুঝতে পারেন যে তাঁর পক্ষে বৈঠকের সার সুখকর নয়। আর সুদীপ রায়বর্মন তো একা নন, তার সঙ্গে রামপ্রসাদ পাল, পরিমল দেববর্মন, আশিস দাস, আশিসকুমার সাহা প্রমুখ প্রায় সবাই মুকুল রায়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছেন। অনুপস্থিত ছিলেন উপমুখ্যমন্ত্রী যিষ্ণু দেববর্মাও। যদিও তিনি আগে থেকেই তাঁর পূর্ব নির্ধারিত অনুষ্ঠান থাকায় তিনি বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারবেন না বলে জানিয়ে গিয়েছিলেন।
তবে ত্রিপুরা বিজেপির একাংশ সরব বিপ্লব দেবের পরিবর্তে তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী করতে। ফলে ঠান্ডা লড়াই চলছেই। একদিকে সুদীপ রায়বর্মন ও তাঁর অনুগামীদের নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন বিপ্লব দেব। কারণ তাঁরা যদি সদলবদলে বিজেপি ছাড়েন, তাতে তাঁর সরকার সমস্যায় পড়তে বাধ্য। সংখ্যার বিচারে পিছিয়ে পড়বে বিজেপি। সংখ্যালঘু হয়ে পড়বেন ত্রিপুরার গেরুয়া সরকার। কেননা ৬০ আসন বিশিষ্ট ত্রিপুরা বিধানসভায় ম্যাজিক ফিগার ৩১। বিজেপির বিধায়ক সংখ্যা তার থেকেও নিচে নেমে যাবে।
প্রসঙ্গত, ত্রিপুরায় ভোটের মুখে মুকুল রায়ের হাতে গড়া তৃণমূল ইউনিটকে ভাঙিয়েই বিজেপি তিন বছর আগে বিজেপি ত্রিপুরাতে বাড়তে শুরু করেছিল। এরপর ত্রিপুরার তৎকালীন শসাকদল সিপিএমের চ্যালেঞ্জার হয়ে ওঠে বিজেপি। আর সেখানেই থেমে থাকেনি বিজেপি।তারাই সিপিএমের ২৫ বছরের সরকারের অবসান ঘটায়। বিজেপির এই উত্থানে সুদীপের রাজনৈতিক কৌশলও অনেকটা কাজ করেছিল। কিন্তু ত্রিপুরায় বিজেপির উত্তরণ সুদীর রায়বর্মনদের হাতে হলেও, অচিরেই তাঁর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের দূরত্ব তৈরি হয়। পরবর্তীতে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরে যেতে বাধ্য হন। এখনো তিনি বিজেপিতেই আছেন তবে বিক্ষুদ্ধ। পাশাপাশি ২৩-এর ভোটের দিকে চেয়ে পৃথক মঞ্চ গড়ার রাজনৈতিক কৌশল তৈরি করছেন। তারই মধ্যে মুকুল রায়ের তৃণমূলে ফেরা জল্পনা বাড়িয়ে দিয়েছে।
মোট কথা সুদীপ রায়বর্মনের অনুগামী ও আইপিএফটি বিধায়কদের ধরে না রাখলে বিজেপির সরকার সমস্যায় পড়ে যাবে। সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে। ফলে পতনের সম্ভাবনা তৈরি হবে মেয়াদ শেষ হওয়ার দু-বছর আগেই।
একদিকে যীষ্ণু দেববর্মাকে মুখ্যমন্ত্রী করার দাবি জোরদার। অন্যদিকে সুদীপ রায়বর্মন। যদি এর কিংয়দংশও সত্যি হয়,
তবে বলতেই হবে বিপ্লব দেবের সর্ষের মধ্যেই ভূত। ঘরে বাইরে এই বিপদ তিনি কী ভাবে সামাল দেবেন এখন সেটাই
দেখার।