সুস্মিতা দেব, লুইজিনহো ফেরেইরো— কংগ্রেসে ভাঙনের তালিকাটা ক্রমেই যে লম্বা হচ্ছে সেটা পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে। জানা যাচ্ছে মেঘালয়ের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মুকুল সাংমা সহ ১৩ জন বিধায়ক কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিতে চলেছেন। ত্রিপুরা, গোয়ার পর তৃণমূল উত্তর-পূর্বের আরও এক রাজ্যে থাবা বসাতে চলেছে। গোয়ার পর এবার মেঘালয়ে কংগ্রেসে ভাঙন। মুকুল সাংমার এই দলবদলে মেঘালয় কংগ্রেসে বড় সংকট নেমে আসবে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। কংগ্রেসের তরফে এই নিয়ে অবশ্য কেউ মুখ খুলতে চায়নি। তবে সাংমা ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, গত কয়েক দিনে শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সাংমার দূরত্ব বেড়েছে। সম্প্রতি তাঁকে উপেক্ষা করে সাংসদ ভিনসেন্ট এইচ পালাকে রাজ্য সভাপতি পদে নিয়োগ করেছে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব। তাতেই ক্ষুব্ধ রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।
জানা গিয়েছে সাংমা গত সপ্তাহে কলকাতায় এসে তৃণমূলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। সেখানে অভিষেক বন্দ্যোপাধায়ও হাজির ছিলেন। ভোট কৌশলী প্রশান্ত কিশোরের সঙ্গে সাংমার যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। কলকাতাতে সাংমার সঙ্গে প্রশান্ত কিশোরের দেখা হয়েছে। অন্যদিকে জানা যাচ্ছে, সুস্মিতা দেবের মেঘালয় সফরকালেই মুকুল সাংমার সঙ্গে কথা হয়। তখনই নাকি সাংমা জানান, মেঘালয়ের স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে কথা বলার পরই তিনি নিজের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবেন। সব ঠিকঠাক চললে সাংমা আজ কালের মধ্যেই কংগ্রেস ত্যাগ করার কথা ঘোষণা করতে পারেন। আর তা যদি ঘটে তাহলে মেঘালয়ে তৃণমূল শক্ত জমি পাবে।
২০১০ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী পদে ছিলেন মুকুল। বর্তমানে তিনি ওই রাজ্যের বিরোধী দলনেতা। বছর তিনেক আগে মেঘালয়ের আর এক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ডি ডি লাংপাং কংগ্রেস ছেড়ে সে রাজ্যের শাসক দল এনপিপি-তে যোগ দিয়েছিলেন। প্রসঙ্গত, ২০০৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে মেঘালয়ের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা লোকসভার প্রাক্তন স্পিকার পূর্ণ অ্যাজিটক সাংমা এনসিপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেন। সে বছর লোকসভা ভোটে তৃণমূলের টিকিটে জিতেছিলেন তিনি। প্রয়াত পূর্ণের ছেলে কনরাড বর্তমানে মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী এবং এনপিপি দলের প্রধান। প্রসঙ্গত, সম্প্রতি ত্রিপুরার সুবল ভৌমিক, অসমের সুস্মিতা দেব-সহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একাধিক কংগ্রেস নেতা তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন।
বিধানসভা ভোটের পরেই উত্তরপূর্বে জমি শক্ত করতে শুরু করে তৃণমূল। প্রথমে ত্রিপুরায় ঘাঁটি শক্ত করতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে ত্রিপুরায় পা রেখেছিলেন। তারপর থেকেই একাধিক বিজেপি নেতা বেসুরো হতে শুরু করেছেন। দফায় দফায় তৃণমূল কংগ্রেস নেতা মন্ত্রীদের ঘনঘন যাতায়াতে বিপ্লব দেবের রাজ্যে পারদ চড়তে থাকে। একাধিক জায়গায় কংগ্রেস এবং বিজেপিতে ভাঙন ধরেছে। তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান বেড়েছে। ত্রিপুরায় পুলিশ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সহ ৫ তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ এবং বিধায়কের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে। ত্রিপুরায় সংগঠন শক্তিশালী করতে উত্তর-পূর্বের কোনও দুঁদে রাজনীতিকের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল তৃণমূল কংগ্রেসের। সেই সূত্র ধরেই অসমে কংগ্রেস নেত্রী সুস্মিতাদেবকে দলে যোগদান করায় তৃণমূল কংগ্রেস। ডেরেক ও’ব্রায়েনের হাত ধরে কলকাতায় এসে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দফতরে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান করেন সুস্মিতা দেব। তারপরেই সুস্মিতা দেবকে রাজ্যসভার সাংসদ নির্বাচিত করে তৃণমূল কংগ্রেস। ত্রিপুরায় সংগঠন শক্তিশালী করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সুস্মিতা দেবের উপর। দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেসের হয়ে অসমে রাজনীতি করার সুবাদে সেখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভাল করে জানেন তিনি। তাই সুস্মিতাকে কাজে লাগাতে চাইছে তৃণমূল কংগ্রেস।
উত্তর পূর্বের রাজ্যগুলিকে টার্গেট করেই গোয়ায় কংগ্রেসে বড় ভাঙন ধরিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। গোয়ার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন। গোয়ার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কংগ্রেসে থাকাকালীন উত্তরপূর্বের রাজ্যগুলিতে কংগ্রেসের সংগঠন নিয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন। কাজেই তাঁর অভিজ্ঞতাকেও কাজে লাগাবে তৃণমূল কংগ্রেস তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তৃণমূল কংগ্রেস একুশের নির্বাচনের পর থেকে সর্বভারতীয় স্তরে নিজেদের নিয়ে যেতে চেষ্টা করছে। ত্রিপুরা, অসম সর্বত্র সংগঠন তৈরি করছে ঘাসফুল শিবির। এই আবহে কয়েকদিন আগের থেকে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন শুরু হয় সাংমার তৃণমূল যোগ নিয়ে। ১৩ জন বিধায়ক একযোগে তৃণমূলে যোগ দিলে মেঘালয়ের প্রধান বিরোধী দলের তকমাও পেয়ে যাবে এরাজ্যের শাসকদলই। সুতরাং ২০২৪ কে সামনে রেখে এভাবেই একের পর এক রাজ্যে নিজেদের অস্বিত্ব প্রকট করতে উদ্যোগী হয়েছে তৃণমূল যাতে সর্বভারতীয় স্তরে ঘাসফুল প্রতিষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য, কয়েকদিন আগে রাজনৈতিক চমক দিয়ে তৃণমূলের যোগ দেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়।