কয়েকদিন আগে সাত কেন্দ্রের উপনির্বাচনে একটি আসনও না পেয়ে খড়কুটোর মতো উড়ে গিয়েছে বঙ্গ বিজেপি। কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতে ভোট হয়েছে, তবু ব্যর্থতার দায় স্বীকার না করে বিজেপি শাসকদলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে।এই অবস্থায় খুব শিগগিরই কলকাতা-সহ আরও দুই পুরসভার ভোট হতে চলেছে। রাজ্য ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময় কলকাতা ও হাওড়া পুরসভার ভোট করার তোড়জোড় শুরু করেছে। তার প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গিয়েছে। বাকি পুরসভার ভোটও জানুয়ারিতেই করাতে উদ্যোগী রাজ্য। ইতিমধ্যে তাঁরা নির্বাচন কমিশনের কাছে হাওড়া-কলকাতা ও বিধাননগরের পৌরসভা ভোট আয়োজন করার আবেদন করেছে। খবর অনুযায়ী আগামী ১৯ ডিসেম্বর কলকাতা ও হাওড়ায় পুরনিগমের ভোট করানোর কথা।
অন্যদিকে বঙ্গ গেরুয়া শিবির রাজ্যের সবকটি পুরসভায় একসঙ্গে ভোট করার জোরদার দাবি তুলেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী একান্তই তা যদি সম্ভব না হয় অন্তত একই দিনে গণনা করতে হবে বলে সরব হয়েছে। এমনকী তারা রাজ্য নির্বাচন কমিশনে তদ্বিরও করে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের হাতে দাবি সম্বলিত স্মারকলিপিও তুলে দিয়েছে। রাজ্য বিজেপির সভাপতি সুকান্ত মজুমদার সাংবাদিক বৈঠক করে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, রাজ্যের সবকটি পুরসভার বকেয়া ভোট একসঙ্গে না হলে মামলা করা হবে।
কিন্তু প্রশ্ন, রাজ্যের সবকটি পুরসভায় একসঙ্গে ভোট হলে বিজেপি কতটা ফায়দা তুলতে পারবে? প্রথমত নিরাপত্তার কারণেই একসঙ্গে ভোট করানো সম্ভব নয়। তাছাড়া রাজ্যের প্রায় সমস্ত পুরসভায় ২০১৮ সাল থেকে পুরভোট বকেয়া রয়েছে। প্রতিটি পুরসভা চলছে প্রশাসক দিয়ে। পুরসভাগুলি দীর্ঘকাল যাবত এই পরিস্থিতিতে চলতে থাকার কারণে বহু ক্ষেত্রেই জনস্বার্থ বিঘ্নিত হচ্ছে। মানুষ পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই চটজলদি পুরভোট করানো দরকার। এই অবস্থায় একসঙ্গে রাজ্যের সমস্ত পুরসভায় ভোটের দাবি জানিয়েছে রাজ্য নির্বাচন কমিশনে এবং ভোটের ফলাফল যাতে একই দিনে হয় কলকাতা হাইকোর্টে সেই আবেদনে একটি জনস্বার্থ মামলাও দায়ের করা হয়েছে।
একুশের বিধানসভা ও সাত কেন্দ্রের উপনির্বাচনেরফলাফলের পরও বঙ্গ বিজেপি নেতারা মনে করছেন, এই মুহুর্তে তাদের দলের দুরাবস্থার সুযোগ নিতে চাইছে তৃণমূল। তাই শাসকদল এভাবে পুরসভা ভোট করাতে চাইছে। কিন্তু ভোটে বিপুলভাবে পর্যুদস্ত নেতা-কর্মীদের মনোবল এবং দলে প্রতিনিয়ত ভাঙন ও অন্তর্দন্দে জর্জড়িত ভাঙাচোরা বিজেপি কি পুরভোটবাক্সে কোনও প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবে? প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালে শেষ পৌরনির্বাচনে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের অন্তর্ভূক্ত মোট ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১১৪টিতে জয় পেয়েছিল তৃণমূল। অন্যদিকে বাম দলগুলি ১৫টি, কংগ্রেস ৫টি এবং বিজেপি ৭টি এবং আসন পেয়েছিল। অন্যদিকে রাজ্যের ৯১টি পৌরসভার মধ্যে তৃণমূল দখল করেছিল ৭১টি। এরপর বিগত পাঁচ বছরে, বাংলায় ক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে বলে বিজেপি নেতারা আত্মপ্রচারেই যে মগ্ন থেকেছেন তার নমুনাও দেখেছে বাংলার মানুষ। ২০১৯ সালের লোকসভায় প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের নেতৃত্বে বিজেপি ১৮টি লোকসভা আসন লাভ করেই বাংলা দখলের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। কারন ২০১৪ সালে বিজেপির মাত্র দুটি আসন ছিল। আরও বিস্তারিত ফল অনুযায়ী ২০১৯-এর লোকসভায় কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে বিজেপি ৫১টিতে ভাল ফল করেছিল৷ তাতেই গেরুয়া শিবির এবার রাজ্যে পুরনির্বাচনে বেশ কিছু আসন জয়ের ব্যাপারে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন।
কলকাতা ও হাওড়া এই দুই পুর এলাকাতেই বিজেপি যথেষ্ট দুর্বল। একুশের বিধানসভা ভোটে কলকাতা পুরসভার ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে মাত্র বিজেপি মাত্র ১২টিতে লিড নিয়েছিল। অন্যদিকে হাওড়া পুরসভার ৬৬টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৫৯টিতেই এগিয়ে ছিল তৃণমূল। ২০১৫-র কলকাতা পুরভোটের ফলাফল অনুসারে ১৪২টি ওয়ার্ডের মধ্যে বিজেপি কেবলমাত্র ২২, ২৩ ও ৪২ নং ওয়ার্ড দখল করতে সমর্থ হয়েছিল। একুশের ধাক্কা কাটিয়ে পুরভোটের জন্য তৈরি হচ্ছে বিজেপি কিন্তু ডিসেম্বরের মাঝামাঝি যে পুরভোট হতে চলেছে সেখানেও তৃণমূলের মাটি যেমন শক্ত বিজেপির শক্তি ততটাই দুর্বল। পুরভোটে তৃণমূলের সেই মজবুত ঘাঁটিতে বিজেপি শাসকদলকে ধাক্কা দিতে নানাভাবেই অঙ্ক কষছে। কিন্তু তা যে ধোপে টিকবে না তা বিজেপি সবথেকে ভাল জানে। একটি রাজনৈতিক দলের মনোবল যখন চুরমার হয়ে যায়, প্রতিনিয়ত দলের অন্দরে গোলমাল লেগেই থাকে তখন ভোটে লড়াই করার মতো সাংগঠনিক ক্ষমতা তার থাকে না। আজ বঙ্গ বিজেপি সেই অবস্থা থেকেই পুরভোট কেচিয়ে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে।