সেই ২০২০ সাল থেকে হয়নি পুরনির্বাচন। ওই বছরই ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচন কমিশন পুরভোটের প্রস্তুতি শুরু করেছিল, কিন্তু করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া এবং লকডাউন ঘোষণা হওয়ায় পুরনির্বাচন আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ফলে তখন থেকেই বাকি পড়ে আছে পুরভোট। তবে তখনই পুরভোটের আসন বিন্যাসের কাজ অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল। ফলে সমস্ত পুরসভাতেই প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে পুরভোট না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিজেপি পুরভোট নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলেছে। এমনকি তৃণমূল হেরে যাওয়ার ভয়ে পুরসভাগুলিতে ভোট করাচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেছে বিজেপি।
যদিও পুরভোট নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, আগে রাজ্যের উপ নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশন দিন ঘোষণা করবে তারপর রাজ্য সরকার পুর নির্বাচন নিয়ে ভাববে। ইতিমধ্যে ভবানীপুর সহ রাজ্যের দুই কেন্দ্র সামসেরগঞ্জ এবং জঙ্গিপুরে উপনির্বাচন মিটে ফলাফলও প্রকাশ হয়ে গিয়েছে। আগামী ৩০ অক্টোবর হতে চলেছে শান্তিপুর, খড়দহ, গোসাবা ও দিনহাটার উপনির্বাচন। ভোট ঘোষণার পর থেকে সেখানে ডান-বাম সবাই জোর প্রচারে নেমেছে। তবে মুখ্যমন্ত্রী পুজোর সময় কাউকে ভোটের প্রচার চালাতে সবাইকেই নিষেধ করেছিলেন।
পুরভোট না হওয়া নিয়ে বহু বিতর্ক দানা বেঁধেছিল। সেই বিতর্ক আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। এমনকি প্রশাসক নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। বিরোধীরা অভিযোগ তুলেছিল, যে যেখানে ছিলেন সরকার সেই পদেই প্রশাসক হিসাবে তাকে নিয়োগ করে। সেই বিতর্কও কলকাতা হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। আদালতকে তোপের মুখে পর্যন্ত পড়তে হয়। অন্যদিকে ভবানীপুর উপনির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জয়ী হওয়ার পর জানিয়েছিলেন, এবার পুরভোট দ্রুত করানোর চেষ্টা হবে। যদিও সরকারিভাবে নির্বাচন কমিশন বা রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়নি তবে উৎসবের মরশুম শেষ হলেই যে বাংলায় পুরভোট হবে তার ইঙ্গিত তখনই দিয়েছিলেন রাজ্য প্রশাসন প্রধান।
রাজ্যে চার কেন্দ্রে ৩০ অক্টোবর উপনির্বাচন, ফল প্রকাশ হবে ৩ নভেম্বর। জানা যাচ্ছে তারপরই বাংলায় পুর ভোটের বাদ্যি বেজে উঠবে। তার মানে এ বছরই আরও একটি ভোট উৎসবে মাতবে বাংলা, সেরকমই ইঙ্গিত মিলেছে রাজ্য নির্বাচন কমিশনের তরফে। জানা গিয়েছে ছটপুজোর পরেই পুরভোটের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হবে। হিসেব অনুযায়ী পুরভোট হবে ডিসেম্বরেই। ছটপুজো ১০ নভেম্বর, তারপর যদি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়, তার এক মাস পরেই ভোট। অর্থাৎ ২০২১-এ আরও একটি ভোট-উৎসবের আসর বসতে চলেছে বাংলায়। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে তিনটি পুরসভার ভোটের প্রস্তুতি শুরু হতে চলেছে। রাজ্য নির্বাচন কমিশন ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে অর্থাৎ বড়দিনের আগেই কলকাতা, হাওড়া ও বিধাননগর- এই তিনটি পুরসভার পুরভোট করার কথা ভাবছেন। বিশেষ সূত্রে জানা গিয়েছে, ১২ ও ১৯ ডিসেম্বর তিনটি পুরসভার ভোট হতে পারে। বাকি পুরসভার ভোট হবে এই তিন পুরভোটের পরে।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে পুর প্রশাসকের অধীনে রয়েছে এই তিনটি পুরসভা। ২০২০ সালের মে থেকে রয়েছে কলকাতা পুরসভা, হাওড়া পুরসভা ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে পুর প্রশাসকমণ্ডলীর দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। বিধাননগর পুরসভারও মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে ২০২০ সালের অক্টোবরে। এছাড়াও রাজ্যের প্রায় ১২৮টি পুরসভায় সরকারের নিয়োগ করা পুরপ্রশাসকরা রয়েছেন। উল্লেখ্য, ইতিমধ্যে পুরসভার আসন বিন্যাসের কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে। সেই কাজে বালিকে হাওড়া পুরসভা থেকে আলাদা করে যেমন ফের পৃথক পুরসভার করে দেওয়া হয়েছে। বলা দরকার রাজ্যে পুরসভার তালিকায় যুক্ত হয়েছে নতুন দুটি নাম, জলপাইগুড়ির ময়নাগুড়ি এবং আলিপুরদুয়ারের ফালাকাটা। এর ফলে বাংলায় মোট পুরসভার সংখ্যা ১২৫ থেকে বেড়ে দাড়িয়েছে ১২৭।
অন্যদিকে পুজোর আগে বিভিন্ন পুরসভার সীমানা পুনর্বিন্যাসের কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে। তারপরই পুরসভার তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে উত্তরবঙ্গের দুই শহর ময়নাগুড়ি এবং ফালাকাটা, যা এতদিন পর্যন্ত গ্রামপঞ্চায়েত স্তরে ছিল। রাজ্যের ১২৭টি পুরসভার মধ্যে ১১২টিতেই ভোট বকেয়া রয়েছে। তার মধ্যে ২০১৮ সালে হাওড়া-সহ ১৭টি পুরসভার মেয়াদ শেষ হয়েছে। ২০২০ সালে মেয়াদ শেষ হয়েছে, কলকাতা, বিধাননগর, চন্দননগর, আসানসোল, শিলিগুড়ি-সহ ৯৫টি পুরসভার।এই পুরসভাগুলিতেও ভোট হবে।
এর পাশাপাশি কমিশন ২০২০ সালেই ওয়ার্ড সংরক্ষণের তালিকা প্রকাশ করে দিয়েছিল, তাই প্রার্থী চয়নের ক্ষেত্রে অনেক ওয়ার্ডেই যেমন নতুন মুখের দেখা মিলবে, সেই সঙ্গে বিধানসভা ভোটে ভাল কাজ করা অথচ সংরক্ষণের কোপে পড়া কাউন্সিলরদেরও সঠিক পুর্নবাসন দেওয়া যাবে। কলকাতা, হাওড়া ও বিধাননগরের কাউন্সিলরদের ইতিমধ্যেই খবর পেয়েছেন যে বাংলায় উৎসবের মরসুম শেষ হলেই পুরভোটের বাদ্যি বেজে উঠবে। তাই উৎসবের মরসুমের শেষ লগ্নকে কাজে লাগিয়েই তাঁরা জনসংযোগ বাড়ানোর দিকে মন দিতে শুরু করেছেন।
নির্বাচন কমিশন সূত্রের খবর, সব কিছু ঠিকঠাক চললে আগামী ১৯ ডিসেম্বর, রবিবার কলকাতার ১৪৪টি ও হাওড়ার ৬৬টি ওয়ার্ডে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হবে। পুরভোট করাতে প্রাথমিক ভাবে যে পরিকাঠামো প্রয়োজন তা তৈরির কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গিয়েছে। এবার রাজ্য সরকার পুরভোট করানোর বিষয়ে আলোচনা শুরু করলেই পরবর্তী কাজও শুরু হয়ে যাবে। তবে কমিশনের লক্ষ্য থাকবে করোনা সংক্রমণের হারের দিকেও। পরিস্থিতি মোটামুটি ভাবে স্বাভাবিক থাকলে পুরভোটের ফল প্রকাশ হবে আগামী ২২ ডিসেম্বর। আর ভাইফোঁটার পরই বিজ্ঞপ্তি জারি করতে পারে নবান্ন।