শান্তিতে হল না পুরভোট। রবিবার রাজ্যের ১০৮ পুরসভার ভোটে সকাল থেকেই উঠল অভিযোগ। কোথাও বুথ জ্যাম তো কোথাও পুলিশের সামনেই ছাপ্পাভোটের অভিযোগ উঠল। কোথাও ভোটারদের ভোট দিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ, কোথাও আবার বুথের বাইরে প্রার্থীকে ফেলে মারের অভিযোগ। সব মিলিয়ে রবিবাসরীয় ভোটে বাংলার দিকে দিকে ভেসে উঠল অশান্তির একাধিক ছবি।
অন্যদিকে পুরভোট শেষ হতেই প্রায় একই সঙ্গে আরও দুটি বড় খবর জানা গেল। প্রথমটি হল রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড় রাজ্য নির্বাচন কমিশনারকে তলব করলেন। আর অন্যটি হল, সোমবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বাংলা বন্ধের ডাক দিল বিজেপি। স্বভাবতই এই দুটি খবরে আলোড়ন পড়ে গিয়েছে রাজ্যে। কারণ রাজ্য সরকার এই বন্ধ কিছুতেই মানবে না। তাহলে কি ফের একবার উত্তপ্ত হয়ে উঠতে চলেছে বাংলার শহর থেকে জেলা।
এদিকে রবিবারের পুরভোটের আগেই রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল বজবজ, সাঁইথিয়া, সিউড়ি-সহ বেশ কয়েকটি পুরসভা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দখল করে ফেলেছে। অর্থাৎ পুরভোটের ময়দানে তৃণমূল হট ফেভারিট হয়েই যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু তাহলে অশান্তি এড়ানো গেল না কেন। এদিন যেসব জায়গা থেকে ভোট-লুঠ, ছাপ্পাভোট, বোমাবাজি বা মারামারির অভিযোগ এসেছে তার মধ্যে বেশিরভাগ অভিযোগ উঠেছে শাসকদলের কর্মীদের বিরুদ্ধে। আর সেই অভিযোগে সরব হয়েছেন বিরোধীরা।
পুরভোটে রাজ্যের উত্তর থেকে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জায়গা থেকে লাগামহীন সন্ত্রাস, ভোটলুঠের অভিযোগ উঠে এলেও রাজ্যের পুরভোটে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত সার্বিক ভোট পড়েছে ৭৭ শতাংশ। তবে সবচেয়ে বেশি শতাংশ ভোট পড়েছে পূর্ব মেদিনীপুরে, ভোটের হার ৮৪ শতাংশ। আর সবচেয়ে কম ভট পড়েছে দার্জিলিংয়ে। পাহাড়ে ভোট পড়েছে ৫৪ শতাংশ।
রবিবার পুরভোট শেষ হওয়ার পরই ভার্চুয়াল সাংবাদিক বৈঠক করে বাংলা বন্ধের সিদ্ধান্তের কথা জানান বিজেপি মুখপাত্র শমীক ভট্টাচার্য। বৈঠকে বালুরঘাট থেকে রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার, খড়্গপুর থেকে সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি দিলীপ ঘোষ এবং কাঁথি থেকে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী ভার্চুয়াল মাধ্যমে সাংবাদিক বৈঠকে যোগ দেন। ভার্চুয়ালি ভাটপাড়া থেকে ছিলেন দলের সাংসদ অর্জুন সিংহ। সাংবাদিক বৈঠকে বিজেপি দাবি করে, গোটা পুরভোট পর্বে ছাপ্পা ভোট হয়েছে এবং সন্ত্রাস চলেছে। তাই সোমবার বাংলা বন্ধের ডাক। বন্ধ সফল করতে বিজেপি কর্মীদের সকাল থেকে রাস্তায় নামারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। রবিবারের পুরভোট নিয়ে বিজেপির দাবি, ১০৮টি পুরসভাতেই নির্বাচনের নামে প্রহসন হয়েছে।
পুরভোটের দিন বিরোধীরা একাধিক জায়গায় ছাপ্পা ভোট ও সন্ত্রাসের প্রতিবাদে পথে নেমেছিল। বিজেপি হুগলি জেলাশাসকের দফতর ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখায়। বামেরা ভোটে সন্ত্রাসের অভিযোগ তুলে উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতে জেলাশাসকের দফতর ঘেরাও করে। অন্যদিকে, এদিন কলকাতাতেও লালবাজার অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রাজ্য বিজেপি কিন্তু সেই মিছিল শুরুই করতে দেয়নি পুলিশ। ফলে বিজেপি নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের তুমুল ধস্তাধস্তি হয়।
বিরোধিরা পুরভোটে অশান্তির জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শাসকদলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। বিরোধীদের অভিযোগ, পুলিশের মদতেই তৃণমূল কর্মীদের একটি অংশ ভোটের দিন কার্যত সন্ত্রাস চালিয়েছে। কিন্তু বিরোধীদের অভিযোগে কোনও রকম আমল দেয়নি শাসক দল। রাজ্য তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ এদিন সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, কোথাও কোনও জমায়েত বা অশান্তির অভিযোগ আসামাত্র পুলিশ হস্তক্ষেপ করেছে। পুলিশ শুধু ভিড় সরায় নি, প্রয়োজনে গ্রেফতার করেছে। তাঁর মতে এদিন নিরপেক্ষভাবেই শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছে। বিরোধীরা পুরভোটে হার হবে একথা আগেই নিশ্চিত ভাবে জানত তাই তারা এদিন শুরু থেকেই তৃণমূলের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ জানায়।
এদিকে পুরভোটে অশান্তির বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চেয়ে রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড় রাজ্য নির্বাচন কমিশনার সৌরভ দাসকে সোমবার সকাল ১০টার মধ্যে রাজভবনে ডেকে পাঠিয়েছেন। রাজ্যপালের সরকারি টুইটার হ্যান্ডল-এ বলা হয়েছে, পুরভোটে অশান্তি, প্রশাসনের এক তরফা আচরণ এবং রাজ্য নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা নিয়ে যে সব অভিযোগ উঠেছে, মূলত তা নিয়ে আলোচনা করতেই রাজ্য নির্বাচন কমিশনারকে ডেকে পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে বিজেপি সোমবার যে ১২ ঘণ্টার বন্ধের ডাক দিয়েছে তার বিরোধিতা করে দলের রাজনৈতিক অবস্থান জানিয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি পার্থ চট্টোপাধ্যায়। তিনি সাংবাদিক বৈঠকে স্পষ্ট জানিয়েছেন, বিজেপি-র ডাকা বন্ধের বিরোধিতা করা হবে। সোমবার সব কিছু সচল থাকবে। তৃণমূল এই বন্ধের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করে। রাজ্য প্রশাসন সম্পূর্ণ ভাবে সচল থাকবে। কেউ গোলমাল করতে গেলে প্রশাসন কড়া হাতে তার মোকাবিলা করবে। তাহলে কি পুরভোটের পরের দিনও বাংলায় অশান্তি হতে পারে?
তৃণমূল তো অনায়াসেই পুরসভা দখল করবে তাহলে এই অশান্তি কেন? কি বলতে বা করতে চায় তারা…
বিজেপির ডাকা বনধে বাংলার মানুষ সারা দেবে না, তবে বাংলার মানুষ অশান্তি চায় না। কিন্তু পুরভোট ছাপ্পা, লুট, মারামারিতে অশান্ত হল তার
দায় শাসক দলেড়িয়ে যেতে পারে না।