বাংলায় আরও একটা নির্বাচনের দামামা বেজে গিয়েছে। এবার পুরসভা নির্বাচন৷ ইতিমধ্যে রাজ্য নির্বাচন কমিশন কলকাতা পুরসভার ভোটের দিন ১৯ ডিসেম্বর ঘোষণা করেছে। ওই দিন ১৪৪ ওয়ার্ডে ভোটগ্রহণ করা হবে৷ ভোটার সংখ্যা ৪০ লক্ষের উপরে৷ মূল লড়াইতে থাকছে তৃণমূল, বিজেপি এবং বামেরা৷
আগামী বুধবার ১ ডিসেম্বর মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন। তার আগে শনিবার দুপুর পর্যন্ত বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব প্রার্থী তালিকা নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো কোনও আলোচনাতেই বসতে পারেননি। এদিকে রাজ্য সরকার নির্বাচন কমিশনকে ১৯ ডিসেম্বর কলকাতা ও হাওড়ার পুরভোটের প্রস্তাব দেওয়ায় তারা সব পুরসভার ভোট একসঙ্গে চেয়েছিল৷ যা নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা চলছে৷ তার মধ্যে রাজ্যপালও রাজ্য নির্বাচন কমিশনারকে রাজভবনে তলব করে সব পুরসভার ভোট একসঙ্গে করার পরামর্শ দেন৷ কমিশন হাওড়া বাদ দিয়ে ১৯ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করেছে।
গত বৃহস্পতিবার রাজ্য নির্বাচন কমিশন ভোটের বিজ্ঞপ্তি জারি করার পর শুক্রবার দুপুরেই বামেরা প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে। রাতে শাসক দল তৃণমূল। কিন্তু রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি শিবিরে কলকাতা পুরভোট নিয়ে এখনও কোনও উত্তাপ নেই।বিজেপি সূত্রে যে খবর মিলছে তাতে দলের কলকাতা উত্তর ও দক্ষিণ সাংগঠনিক নেতাদের প্রার্থী তালিকা তৈরির দায়িতব দেওয়া হয়েছে। তারা সেই তালিকা শনিবারের মধ্যে রাজ্যের কাছে জমা দেবে। রাজ্য নেতৃত্ব সেই তালিকা রবিবার বিবেচনা করবে। তারপর বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিল্লি থেকে কলকাতায় এসে সেই তালিকায় শিলমোহর দিলে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা কথা হবে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে বিজেপি কলকাতা পুরভোটকে সে ভাবে গুরুত্ব দিতে চাইছে না।
একুশের বিধানসভা নির্বাচনের পরে এখন পর্যন্ত বিজেপি দল যে অবস্থায় রয়েছে বাংলার কোনও জায়গাতেই তাদের পক্ষে তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই করা খুব কঠিন কাজ। বাংলায় বিপুলভাবে পরাজয়ের পর বিজেপি কর্মীদের মনোবলও তলানিতে। তারপর পুরভোটে সমস্ত শক্তি নিয়ে লড়াইতে নেমে শক্তির অপচয় ছাড়া আর যে বিশেষ কিছু হবে না সেটা বুঝেই বিজেপি পুরভোট নিয়ে তেমন উৎসাহ দেখাচ্ছে না। একমাত্র যে সব ওয়ার্ডে বিজেপির শক্তি রয়েছে, সেখানেই লড়াইয়ের কথা ভাবছে দল।
প্রার্থী তালিকা ঘোষণা নিয়ে বিজেপির যে কোনও তাড়াহুড়ো নেই বা এক ধরণের ধীরে চলো নীতি নিয়ে চলছে, তার পিছনে একটি কারণ হল গেরুয়া শিবির নিশ্চিতভাবে কলকাতা হাই কোর্টের দিকে আশা নিয়েই তাকিয়ে আছে। মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে রাজ্যের সমস্ত পুরসভারই তা স্বত্বেও নির্বাচন কমিশন কেন শুধুমাত্র কলকাতা এবং হাওড়ায় পুরভোট করানোর কথা বলছে, এই প্রশ্নে বিজেপিআগেই আদালতে হাজির হয়েছে। গত বুধবার সেই মামলার শুনানি শেষে কোনও স্থগিতাদেশ জারি করেনি আদালত। জানিয়েছে, পরবর্তী শুনানি হবে আগামী সোমবার। ইতিমধ্যে কমিশন গত বৃহস্পতিবার ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা করেছে। বিজেপি জানায়, সোমবার আদালত কী বলে, তার জন্য তারা অপেক্ষা করবে।
প্রসঙ্গত, এর আগের পুরভোট অর্থাৎ ২০১৫ সালে বিজেপি জয় পেয়েছিল শুধুমাত্র ৭, ২২, ২৩, ৪২, ৭০ ৮৬, এবং ৮৭ নং ওয়ার্ডে। এর মধ্যে আবার ৭ এবং ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বাপি ঘোষ ও অসীম বসু পরে বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেন। একুশের বিধানসভা ভোটের আগে ১০২ নম্বর ওয়ার্ডের সিপিএম কাউন্সিলর রিঙ্কু নস্কর বিজেপি-তে যোগ দেন। সেই হিসেব অনুযায়ী বিজেপি-র হাতে এখন ছ’টি ওয়ার্ড। সম্প্রতি এক পথ দুর্ঘটনায় ৮৬ নম্বরের কাউন্সিলর তিস্তা বিশ্বাসের মৃত্যু হয়েছে। সেখানে কাকে প্রার্থী করা হবে, তা এখনও ঠিক হয়নি। তবে উল্লেখযোগ্য ভাবে অতীতে পাঁচ বার ২২ ও ২৩ নম্বর ওয়ার্ডে বিজেপি-র টিকিটে করে জিতেছেন যথাক্রমে মীনাদেবী পুরোহিত এবং সুনিতা ঝাওয়ার। গত দুই পুরসভা নির্বাচনে ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে জিতেছেন বিজয় ওঝা। এই ওয়ার্ডগুলিতে যে রিঙ্কু নস্কর, মীনাদেবী, সুনিতা ঝাওয়ার এবং বিজয় ওঝার নামই এখনও পর্যন্ত চূড়ান্ত। বাকি ওয়ার্ডের প্রার্থী তালিকা এখনও চূড়ান্ত হয় নি।
বিধানসভা নির্বাচনে মুখ থুবড় পড়লেও বিজেপি এই পুরভোটে যোগ্য প্রার্থীর অনুসন্ধানে নতুন এক পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। কোনও সুপারিশকে গুরুত্ব না দিয়ে তারা সরাসরি আবেদনপত্র সংগ্রহ করছে। ইতিমধ্যে ২০০-রও কম ওয়ার্ডে ৭০০ আবেদন জমাপড়েছে বলে বিজেপি সূত্রে খবর। এই আবেদনপত্র সরাসরি বিজেপির রাজ্য দফতরের ড্রপ বক্সে জমা পড়ছে। কিন্তু একটা রাজনৈতিক দল যখন ভোটযুদ্ধে এমন রাস্তায় হাঁটে তখন বোঝাই যায় স্রেফ লড়তে হবে বলেই লড়াই।