একুশের ভোটে ব্যাপক সাফল্য, তার ওপর সদ্য অনুষ্ঠিত দুই পর্বের উপনির্বাচনে সাতে সাত পেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। এতে যে কেবল জোড়াফুল শিবির বাড়তি অক্সিজেন পেয়েছে তাই নয়, বলাই যায় দিকে দিকে এখন বইছে জোড়াফুলের জোরালো হাওয়া। পুরভোট করানোর উপযুক্ত সময় এটাই। আর সেই মতো ১৯শে ডিসেম্বর কলকাতা ও হাওড়া দুই পুরনিগমের ভোট করাতে চেয়ে রাজ্য নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছে নবান্ন।
কলকাতা ও হাওড়া এই দুই পুর এলাকাতেই বিজেপি যথেষ্ট দুর্বল। একুশের বিধানসভা ভোটে কলকাতা পুরসভার ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে মাত্র বিজেপি মাত্র ১২টিতে লিড নিয়েছিল। অন্যদিকে হাওড়া পুরসভার ৬৬টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৫৯টিতেই এগিয়ে ছিল তৃণমূল। শুধু তাই নয়, গত বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছিল ২১৩টি আসন। সদ্য শেষ হওয়া উপনির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, তৃণমূলের বিধায়ক সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২১৭। ইতিমধ্যে পাঁচজন বিজেপি বিধায়ক দল ছেড়ে যোগ দিয়েছেন তৃণমূলে। ফলে রাজ্যের এই মুহুর্তে শাসক শিবিরে বিধায়ক সংখ্যা ২২২। এ থেকে বোঝাই যায় রাজ্যের মানুষ তৃণমূলের উপরেই কতটা আস্থা রেখেছেন।
প্রসঙ্গত, ভবানীপুর উপনির্বাচনে ‘ঘরের মেয়ে’ মমতার ভোট বাক্সে এলাকার মানুষ উজাড় করা তাদের সমর্থন জানিয়ে দেওয়ার পরও উত্তর ২৪পরগণার খড়দহ, দক্ষিণ ২৪পরগণার গোসাবা, নদিয়ার শান্তিপুর ও কোচবিহারের দিনহাটা উপনির্বাচনে তৃণমূলের বিপুল জয় প্রমাণ করেছে, মমতাই রাজ্যের মানুষের কাছে এই সময় একমাত্র ভরসার জায়গা। বাংলার মানুষের সেই আশা-ভরসায় আস্থা রেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে রেখেই কলকাতা ও হাওড়া পুরভোটে ঝাঁপাচ্ছে তৃণমূল। হাতে সময় বিশেষ নেই, সেটুকুকে পুরোমাত্রায় কাজে লাগিয়ে জোড়াফুল শিবির ইতিমধ্যেই পুরভোটের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। উৎসব পর্ব প্রায় শেষ, ছট মিটলেই পুরোমাত্রায় পুরভোটে প্রচারের কাজ শুরু হয়ে যাবে।
প্রসঙ্গত, গত বছর ৭ মে কলকাতা পুরসভার মেয়াদ শেষ হয়েছে। কোভিড পরিস্থিতি এবং লকডাউনের জেরে ভোট করার সুযোগ না-থাকায় পুরসভার আইনে প্রশাসক নিয়োগের সংস্থান না থাকা স্বত্বেও রাজ্য সরকার এগজিকিউটিভ অর্ডার দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ করে। প্রশাসক বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয় পুরসভার মেয়র ও তৎকালীন পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমকে এবং মেয়র পারিষদের অন্যান্য সদস্যদের প্রশাসক বোর্ডের সদস্য করা হয়। অন্যদিকে হাওড়া পুরনিগমের মেয়াদ শেষ হয় আরও আগে, এখানে অবশ্য আইন অনুযায়ী প্রশাসক বোর্ড তৈরি করা হয়। এছাড়া পর পর দু’বার হাওড়া পুরনিগমের বোর্ড পরিবর্তন করা হয়েছে। এই পুরসভায় ওয়ার্ডের সংখ্যা ৬৬।
উল্লেখ্য, ২০১৫-র কলকাতা পুরভোটের ফলাফল অনুসারে ১৪২টি ওয়ার্ডের মধ্যে বিজেপি কেবলমাত্র ২২, ২৩ ও ৪২ নং ওয়ার্ড দখল করতে সমর্থ হয়েছিল। এরপর একুশের বাংলা বিধানসভা নির্বাচনের আগেই বাংলা প্রায় দখল হয়ে গিয়েছে বলে প্রচার চালিয়েও বিরাট ধাক্কা খায়। সেই ধাক্কা কাটিয়ে ফের পুরভোটের জন্য তৈরি হচ্ছে বিজেপি। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি কলকাতা ও হাওড়ায় যে পুরভোট হতে চলেছে সেখানেও তৃণমূলের মাটি শক্ত। শাসকদলের সেই মজবুত ঘাঁটিতে পুরভোটে বিজেপি পাখির চোখ করতে চাইছে। তৃণমূলকে ধাক্কা দিতে গেরুয়া শিবির যে অঙ্কই কষুক না কেন, উত্তর মেলানো কঠিন। কারণ এই দুই পুরসভাতেই বিজেপির সংগঠন দুর্বল। একুশের ভোটে শোচনীয় পরাজয়, তারপর সাতটি কেন্দ্রের উপনির্বাচনে তৃণমূলের রেকর্ড ভোটে জয়, বিজেপির মনোবল চুরমার করে দিয়েছে। এছাড়া প্রতিনিয়ত দলের অন্দরে গোলমাল লেগেই আছে। ভোটে লড়তে দলকে সাংগঠনিক দিক থেকে যতটা শক্তিশালী হতে হয়। দলের নেতৃত্বের প্রতি কর্মীদের যতটা আস্থা থাকা দরকার তা কি ব্যঙ্গ বিজেপিতে এই মুহুর্তে আছে?
যদিও সংগঠন মজবুত করতে বিজেপি জোর দিয়েছে। পুরভোটে তাঁদের লড়াই জোরদার করতে তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই সঙ্ঘবদ্ধ করতে বিজেপি চেষ্টার কসুর করছে না। কিন্তু বিজেপি দলের নেতৃত্ব এমনকি কর্মীরাও জানেন তাঁরা কলকাতায় তেমন শক্তিশালী নয়।সমগ্রকলকাতা ধরলে বিজেপির সংগঠন উত্তর কলকাতায় তুলনামূলকভাবে একটু শক্তিশালী, কিন্তু দক্ষিণ কলকাতা বা শহরতলিতে বিজেপির সংগঠন কি আদৌ গড়ে উঠেছে। ফলে দলের এই দুর্বল শক্তি নিয়ে বিজেপি যে কলকাতা পুরসভা দখল করার স্বপ্ন দেখছে তা একুশের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের থেকেও করুণ হবে।
কলকাতার মতো হাওড়াতেও বিজেপির সংগঠন মজবুত নয় মোটেও। হাওড়া শহরের দু-একটা ওয়ার্ড ছাড়া বিজেপির শক্তিশালী নেতা বা কর্মী খুজে পাওয়া যাবেনা। কলকাতার মতো হাওড়াতেও বিজেপির ওয়ার্ডগত অবস্থান মোটেও ভালো নয়। হাওড়া পুরসভার ৬৬টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৫৯টি ওয়ার্ডে তৃণমূল এগিয়ে রয়েছে। মাত্র ৭টি ওয়ার্ডে এগিয়ে রয়েছে তারা। এই অবস্থায় তৃণমূলকে কড়া টক্কর দিতে চাইছে বিজেপি। লড়াইয়ের ক্ষেত্র তৈরি করতে চাইছে ২০২১-এর তুলনায় ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে যাতে কলকাতায় ও হাওড়ায় আরও বেশি ওয়ার্ডে লিড দিতে পারে।