প্রায় দেড় বছর ধরে কলকাতা পুরসভার নির্বাচন নিয়ে ঢিলেমি চলছিল। প্রথমত করোনা সংক্রমণের ওঠানামা, তারপর ২০২১ সালের বাংলা বিধানসভা নির্বাচনের কারণেও পুরভোট পিছিয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে আগামী রবিবার পুরবোর্ড গঠনের জন্য সেই ভোট গ্রহণ করা হবে। বিরোধী দলগুলি একুশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে থেকেই একসঙ্গে কলকাতা ও রাজ্যের অন্যসব পুরসভাগুলির বকেয়া নির্বাচন দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছিল। বিধানসভা নির্বাচন মিটতেই বিজেপির দাবি ছিল, কলকাতা পুরসভার ভোট যেন আলাদাভাবে না করা হয়। তারা রাজ্যের সবকটি পুরসভার ভোট একসঙ্গে করার দাবিতে মামলাও করে।
পুরভোট নিয়ে টানাপোড়েন চলতেই থাকে। এরপর আদালত জানায়, কলকাতা পুরসভার নির্বাচনের পরেই দ্রুত রাজ্যের অন্য পুরসভাগুলির ভোট করতে হবে। নির্বাচন ঘোষণার পর আবার বিজেপি কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে ভোটগ্রহণের দাবি তোলে এবং আদালতের দ্বারস্থ হয়। শেষ পর্যন্ত রাজ্য এবং কলকাতা পুলিশের কর্মীদিয়েই ভোট করার সিদ্ধান্ত হয় তবে প্রতিটি বুথে থাকছে সিসি ক্যামেরা।
জনমত সমীক্ষা অনুযায়ী, তৃণমূল পুরসভা নির্বাচনেও অনেক এগিয়ে রয়েছে। পুরভোটের আগে থেকেই আগে বিরোধী গেরুয়া শিবিরের অবস্থা কার্যত বেহাল। অধিকাংশ ওয়ার্ডে তাদের অবস্থা ছন্নছাড়া। দু-একটি ওয়ার্ড বাদ দিলে কংগ্রেস প্রায় অস্তিত্বহীন বলা যায়। অন্যদিকে বামপন্থীদের সংগঠন এখনও বেশ দুর্বল।
বিজেপি যে খানিকটা ব্যাকফুটে তা নেতাদের বক্তব্যেই স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। তাছাড়া রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল হওয়া স্বত্বেও কলকাতা পুরসভার সব আসনে এবার বিজেপির প্রার্থী নেই। দু’টি ওয়ার্ডের বিজেপি প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তারা সর্বত্র সমান ভাবে প্রচার করতেও পারেনি। বিজেপির তালিকাতেও প্রায় নেই কোনও চমক। বিধানসভা নির্বাচনে ব্যর্থতার পর পুরভোটে আর কোনও ‘তারকা’ প্রার্থীর কথা না ভেবে অধিকাংশ ওয়ার্ডেই লড়ছেন পুরনো কর্মীরা।
বিজেপির উত্তর ২৪ পরগনার এক দাপুটে সাংসদ যিনি কলকাতা পুরভোটের বিশেষ দায়িত্বে রয়েছেন, মাসখানেক ধরে তিনি কার্যত নিষ্ক্রিয়। প্রথমত বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বিজেপির দলীয় সংগঠন যেভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে তার ওপর দলের অন্দরে একাধিক শিবিরের কোন্দলে দল চাঙ্গা হওয়ার বদলে পঙ্গু হয়ে পড়েছে।
সিপিএম এবারের পুরভোটে একঝাঁক রেড ভলান্টিয়ারকে প্রার্থী করেছে। বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডে বামেরা বিদায়ী কাউন্সিলরদের জনপ্রিয়তায় ভর করে লড়াইতে ফিরতে চাইছে। যদিও সিপিএমের সার্বিক সাংগঠনিক শক্তি এখনও দানা বেঁধে ওঠেনি বরং অনেকটাই তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। যুবশক্তি সেভাবে সামনে না আসায় প্রবীণ নেতৃত্বের ওপর ভরসা করেই দল এগোতে চাইছে। তাই বামেদের প্রার্থীতালিকায় নবীন প্রজন্মের পাশাপাশি রয়েছেন বিদায়ী কাউন্সিলররা।
অন্যদিকে কংগ্রেস একুশের বিধানসভা নির্বাচনে শূন্য হয়ে গেলেও কলকাতা পুরসভার দুটি ওয়ার্ডে প্রবল ভাবে লড়াইতে আছে। কিন্তু বড়বাজার এবং বেলেঘাটার ওই দু’টি পকেটে সক্রিয় আর তার বাইরে কার্যত নিষ্প্রভ হয়ে কংগ্রেস রাজনৈতিক ভাবেও যেমন গুরুত্বহীন তেমনি পুরভোটেও দলগতভাবে তার কোনও ভূমিকা নেই। ফলে, ছোট লালবাড়িতে এবারও তৃণমূল ফিরছে নিশ্চিন্তে।
নিজেদের করা আভ্যন্তরীণ সমীক্ষায় তৃণমূল কলকাতা পুরভোটে নিজেদের বিপুল ভোটে জয়ী হওয়ার দাবি জানিয়েছে। সমীক্ষা অনুযায়ী তৃণমূল কলকাতা পুরসভার ১৪৪টি আসনের মধ্যে ১৩৮টিতেই ঘাসফুল ফুটছে বলে দাবি করছে। সেই সঙ্গে তারামনে করছে পেতে পারে ৮৬ শতাংশ ভোট। তার মানে বিরোধীরা পেতে পারে মাত্র ৬টি ওয়ার্ড।
এবার কলকাতা পুরসভার বিগত কয়েকটিনির্বাচনের ফলাফলের ওপর চোখ রাখা যাক। একনজরে ২০০০ সালের পরিসংখ্যান— মোট আসন: ১৪১। তৃণমূল ও বিজেপি জোটের দখলে: ৬১, বামফ্রন্টের দখলে: ৬০, কংগ্রেস ও সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের দলের জোট: ১৫, নির্দল : ৫
একনজরে ২০০৫ সালের পরিসংখ্যান- মোট আসন: ১৪১। তৃণমূল ও বিজেপি জোটের দখলে: ৪৫, বামফ্রন্টের দখলে: ৭৫, কংগ্রেস ও সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের দলের জোট: ১৯, নির্দল : ৫
একনজরে ২০১০ সালের পরিসংখ্যান- মোট আসন: ১৪৪। তৃণমূলের দখলে: ৯৫, বামফ্রন্টের দখলে: ৩২, বিজেপির দখলে: ৩, কংগ্রেসের দখলে: ১০, নির্দল : ১
একনজরে ২০১৫ সালের পরিসংখ্যান- মোট আসন: ১৪৪। তৃণমূলের দখলে: ১১৪, বামফ্রন্টের দখলে: ১৫, বিজেপির দখলে: ৭, কংগ্রেসের দখলে: ৫, অন্যান্য : ৩
২০১৫ সালে কলকাতা পুরভোটে তৃণমূল বিপুল জয় পেয়েছিল। কিন্তু ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ছন্দপতন হওয়ায় কলকাতার বহু ওয়ার্ডে পিছিয়ে পড়ে তৃণমূল। এমনকী মুখ্যমন্ত্রীর পাড়ার ৭৩ নম্বর ওয়ার্ডে ৫০০ ভোটে পিছিয়ে পড়েছিল তৃণমূল। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে পরিস্থিতি বদলায়। তৃণমূল কলকাতায় স্বমহিমায় ফিরে আসে। এবার পুরভোটে একাধিক ওয়ার্ডে তৃণমূলের প্রার্থী বদল হয়েছে। তাতে আরও আসন বাড়বে বলেই আশা।
কলকাতা পুরভোটে তৃণমূলের একপেশে জয়ের দাবি মানতে নারাজ বিজেপি। তাদের দাবি, ওয়াক ওভার পাবে না তৃণমূল। বিভিন্ন ওয়ার্ডে বিজেপি লড়াই দেবে। কিন্তু সেই লড়াইয়ের ফল কি?