‘চিত্ত যেথা ভয় শূণ্য উচ্চ যেথা শীর’ –
কবি বলেছেন ভয় শুন্য চিত্ত অর্থাৎ মন ও সোজা মেরুদন্ডই পারে সমাজকে ভালোভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে। আর এই চারিত্রিক দৃঢ়তার জন্য সব থেকে জরুরি হল সমাজের সব স্তরে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া। সমাজের সব স্তর বিশেষ করে সব থেকে নিচু স্তরের মানুষগুলি যদি শিক্ষিত না হয়, তবে একটা সমাজের সামগ্রিক উন্নতি হবে না। সে জন্যই দরকার এক্কেবারে নিচুতলার কঁচিকাঁচাদের জন্য বিনামূল্যে প্রাথমকি শিক্ষাপ্রদানের সু-ব্যবস্থা।
সনামধন্য ব্রিটিশ দার্শনিক ও সমাজ বিজ্ঞানী বার্টন্ড রাসেল তাঁর বই “On Education”-এ বলছেন “… the educational system we must aim at producing in the future is one which gives to every boy and girl an opportunity for the best that exists”. তবে ভারতের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশে, যেখানে বিশাল জনসংখ্যার একটা বড় অংশই দারিদ্র সীমার নিচে সেখানে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে সব স্তরে পৌঁছে দেওয়াটা কিন্তু বেশ কঠিন কাজ। করোনা মহামারি শিশুর শৈশব কেড়ে নিয়েছে। প্রায় দু’বছর পড়ুয়াদের কাছে শিক্ষালয়ের দরজা ছিল বন্ধ। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থা মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যনার্জীর হাতে লালিত পালিত হয়ে পৌঁছেছে উন্নয়নের শিখরে। আর সেই উন্নয়নের স্রোতে গা ভাসিয়েছে বাংলার রাজধানি কলকাতাও।

এবার একটু অতীতে ফিরে যাওয়া যাক। ১৯৫৩ সাল, ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। ব্রিটিশ বণিকদের কূটচাতুরী বিস্তার করে ভারতের শাসক হয়ে বসে ভারত লুণ্ঠন করে ভারতবাসীকে বুটের তলায় পিষে মারার দিন শেষ হয়েছে। চলে গেছে ব্রিটিশ শাসক।তবে যাবার সময় শেষ কামড় দিয়ে ভারতকে করে গেছে খণ্ডিত-বিখণ্ডিত। ভারতের অধিবাসীকে করেছে ছিণ্ণ-বিচ্ছিন্ন। এত সব দুঃখ-বেদনা থাকলেও মানুষ যেন কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বেঁচেছে। সব কিছুকেই নিজেদের আয়ত্তাধীনে পাওয়ায় ক্ষত মুছে সুন্দর ও উন্নত করে দেশকে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়ে উঠেছেন দেশনেতারা। তাঁদের এই সচেষ্টতা বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল কলকাতা কর্পোরেশনের অবৈতনিক প্রাথমিক স্কুলগুলির মধ্যে — তখনকার দিনের যথেষ্ট সম্ভ্রান্ত ঘরের পর্দানসীনা শিক্ষিত মেয়ে-বউরাও ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন শিক্ষাবিস্তারে। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হয়েছিল কলকাতা কর্পোরেশনের প্রাথমিক অবৈতনিক স্কুলগুলি।
১৯২৩ সাল। দেশজুড়ে ভারতবাসী তখন ব্রিটিশ হটাতে জোর তৎপর, তখনই তাঁরা বিশেষভাবে উপলব্ধি করলেন ‘শিক্ষাই চেতনা’। দেশবাসীর মধ্যে শিক্ষাকে সর্বজনীনভাবে বিস্তার করে না দিতে পারলে আসমুদ্র হিমাচল স্বাধীনতা সংগ্রামের জোয়ারে উত্তাল হয়ে উঠবে না, আর তার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন অন্ততপক্ষে সর্বজনীন প্রাথমিক অবৈতনিক শিক্ষা।

এই ভাবনাই রূপ পেল বাংলার স্বায়ত্ত শাসনের প্রথম মন্ত্রী রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুর আইন প্রণয়নের ফলশ্রুতিতে।
১৯২৪ সালে কলকাতা পুরসভার মেয়র দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, তাঁর অনুগামী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও বন্ধু কে পি চট্টোপাধ্যায় কলকাতা কর্পোরেশনের অবৈতনিক স্কুলের সূচনা করলেন।
প্রথমেই বাংলা মাধ্যম ১৯টি বিদ্যালয় তৈরী হলো, তারপর ১৯৩৪ সালে বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের জন্য মোটামুটিভাবে হিন্দি ও উর্দু বিদ্যালয়ও স্থাপিত হলো।
স্বাধীনতার পর ১৯৫৬ সালে পুর আইন অনুসারে কয়েকটি ওয়ার্ডে অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ঘোষণা করা হয় এবং এই মহানগরীতে প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা পুরসভার আইনগত দায় বলে স্বীকৃত হয়, তারই ঢেউ ক্রমশ এগিয়ে চলে।
আবার ফিরে আসা যাক ১৯৫৩ সালের ও তার সমসাময়িক কলকাতা কর্পোরেশনের স্কুলগুলির কথায়। শুধু পড়াশোনা নয়, নানা হাতের কাজ যেমন সেলাই শিক্ষা, মাটির কাজ — ইত্যাদিও শেখানো হতো স্কুলগুলিতে।

পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার সমগ্র রাজ্যে প্রাথমিক শিক্ষার পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করায় ১৯৮০ সালে পুর আইনে কলকাতা শহরের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার দায়িত্ব পুরসভার পক্ষে আর বাধ্যতামূলক থাকল না। হলো ইচ্ছামূলক, তা সত্ত্বেও পুরসভা নাগরিক পরিষদের অংশ হিসেবে তাদের সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থাপনায় আরও বেশি করে যত্নবান হয়েছে। কলকাতা পুরসভার সঙ্গে তিনটি পুরসভা — গার্ডেনরিচ, সাউথ সুবারবন ও যাদবপুর যুক্ত হওয়ায় ও ১৯৮৫ সালে মেয়র পরিষদ গঠিত হওয়ার পর থেকে শিক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দ বেড়ে চলেছে।
সত্তরের দশকে কর্পোরেশনের স্কুলগুলোতে ছাত্রসংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে। কিন্তু ১৯৮০ সালে মেয়র পরিষদ গঠনের পর শিক্ষা বিভাগের তৎপরতায় স্কুলগুলির শিক্ষক-শিক্ষিকা, স্থানীয় অভিভাবকবৃন্দ, স্থানীয় নাগরিক কমিটি, বিভিন্ন সংগঠন হওয়ায় ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।
এবার আমাদের আলোচ্য বিষয় ২০২২ সাল। বিগত কয়েক দশকে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। কলকাতা পুরসভার অন্তর্গত এখন ২৪১টি বিদ্যালয় আছে এবং কলকাতা পৌরপ্রাথমিক স্কুলগুলির প্রয়োজনীয়তা আজও অমলীন। বিশেষ করে বিগত ১০-১১ বছর ধরে কলকাতা পৌরসংস্থার শিক্ষা বিভাগ শহরের প্রান্তিক এলাকাতে ব্যাপক হারে শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে অক্লান্তরূপে কাজ করে চলেছে।

পৌর বিদ্যালয় ছাড়াও কলকাতা পৌরসংস্থার বিভিন্ন ওয়ার্ডে শিশু শিক্ষা কর্মসূচীর অর্ন্তগত ১০৪টি শিশুশিক্ষা কেন্দ্রে রয়েছে। মন্টেসরি সেশনে ৩ বছরের উর্ধ্বে শিশুদের জন্মের নথিপত্র দেখে ভর্তি নেওয়া হয়। প্রিপ্রাইমারিতে ভর্তির বয়স ৫ বছর। শিক্ষাবর্ষ শুরু হয় জানুয়ারি থেকে। শেষ ডিসেম্বর মাসে। পুরো শিক্ষাবর্ষে প্রথম পর্ব পরীক্ষা হয় আগস্ট মাসে। তৃতীয় পর্বের পরীক্ষা হয় ডিসেম্বর মাসে। পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর ত্রুটি গুলি চিহ্নিত করে রেমিডিয়াল চিটিং এর ব্যবস্থা করা হয় ও পরবর্তী ক্লাসের যোগ্য করে তোলা হয়। সকল শিশুর জন্য শিক্ষাগ্রহণ ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করতে নিয়মিত ভর্তিকরণ কর্মসূচীর আয়োজন করা হয়। পৌর শিক্ষা বিভাগের সুদক্ষ ভিজিলেন্স টিম মাঝে মধ্যেই বেরিয়ে পড়ে ওয়ার্ড ভিত্তিক বস্তি অঞ্চল অথবা শ্রমিক কোয়াটার পরিদর্শনে এবং সেখানে থেকে শিশুদের চিহ্নিত করে চলে স্কুলমুখি করবার কাজ।
পৌরসংস্থার শিক্ষা বিভাগের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নতুন শিশুদের ভর্তি-সহ বিদ্যালয়ছুট শিশুদের বিদ্যালয় ফিরিয়ে প্রয়াসও জারি রয়েছে। বিদ্যালয়ে পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ বজায় রাখতে প্রতিটি বিদ্যালয় সংলগ্ন শিশুদের মায়েদের নিয়ে সভা (মাদারস্ মিটিং) ও বিদ্যালয় উন্নয়নের কমিটির সভার আয়োজন করা হয় নিয়মিত। এই সব মিটিং-এ সভার ইস্কুলের প্রধান শিক্ষক, সহ-প্রধানশিক্ষক, অন্যান্য শিক্ষকদের উপস্থিতি থাকার সাথে সাথেই সভার প্রতিনিধিত্ব দেন সেই অঞ্চলের পৌরপ্রধানেরা।

কলকাতা পৌরশিক্ষাব্যবস্থা যে পড়ুয়াদের শুধুমাত্র পাঠ্য শিক্ষা দিতেই ব্রতী তা নয়। পড়াশুনার পাশাপাশি ছাত্র-ছাত্রীদের নাচ, গান, আবৃত্তি প্রভৃতি বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও অভ্যাস করান হয়। কলকাতা পৌরসংস্থা আয়োজিত স্বাধীনতা দিবস, রবীন্দ্রজয়ন্তী সহ অন্যান্য অনুষ্ঠানে এই সমস্ত ছাত্রছাত্রীরা নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন।
এছাড়াও কলকাতা পৌরসংস্থার শিক্ষা বিভাগের উদ্যোগে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ‘বুক ডে’ পালন করা হয়। কলকাতা পৌর প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলির (Pre-Primary) পরিকাঠামোগত মানোন্নয়নের প্রয়াস জারি রেখে কলকাতা পৌরসংস্থার শিক্ষাবিভাগ নতুন বিদ্যালয়ের ভবন ও শ্রেণীকক্ষ নির্মাণ সহ বিভিন্ন রকমের মেরামত, বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা, উপযুক্ত বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম স্থাপন ছাড়াও সময় সময় বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে সুষ্ঠ শিক্ষাঙ্গন উপাহার দিতে স্বচেষ্ট থাকে সবসময়ই।
যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইংরাজি মাধ্যম স্কুলের প্রয়োজনীয়তা মাথায় রেখেই আরও বেশি স্কুল গুলিকে ইংরাজি মাধ্যমের আওতায় আনার প্রয়াস চলছে। এছাড়াও প্রতিটি বিদ্যালয়ে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ই-লার্নিং-এর মাধ্যমে পড়ুয়াদের করে তোলা হচ্ছে সময়-উপযোগী।

কলকাতা পৌরসংস্থার শিক্ষা বিভাগ পরিচালিত পৌর প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলির ছাত্র-ছাত্রীদের সিংহভাগ সমাজের গরিব ও বস্তি এলকার অর্ন্তভুক্ত হওয়ার অভিভাবকদের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করেই শিক্ষাবিভাগ সময় সময় ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য পোষাক, জুতো, মোজা, স্কুলব্যাগ, বই, খাতা, পেনশিল, এসমস্ত পৌর প্রাথমিক বিদ্যালয় ও শিশুশিক্ষা কেন্দ্রের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য নিয়মিত ‘মধ্যাহ্নকালীন আহার’ প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ‘মধ্যাহ্নকালীন আহার’-এর মনোন্নয়ন ও সুষ্ঠুভাবে সরবরাহ করার উদ্দেশ্যে ‘গুচ্ছ পাকশালা’ গুলিকে আধুনিকিকরণ ও পরিষেবার ক্ষেত্র বাড়ানোর দিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পৌরপ্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠরত প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য চক্ষুপরীক্ষা, দন্ত পরীক্ষা সহ নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবার ব্যবস্থা করা হয়েছে।বং পড়ালেখার জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস প্রতি বছরই বিনামূল্য প্রদান করা হয়।
স্কুলগুলি সঠিক ভাবে শিক্ষা প্রদানের নিমিত্তে চুল চেরা নির্বাচনের মাধ্যমে সুদক্ষ শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বাছাই করা হয়। এবং শিক্ষাপ্রদানের পদ্ধতির মান উন্নয়নের জন্য প্রতিবছরই শিক্ষক-শি আপাতত পুরসভার এই সব বিদ্যালয় গুলির নাম করণ এলাকা বা ঠিকানা ভিত্তিক হয়ে আছে। আগামীতে এই সমস্ত বিদ্যালয়ের নামকরণের বিষয়টি পুরো কর্তৃপক্ষের বিবেচনাধীন রয়েছে। দেশ ও বিদেশের গুণীজন ও মনিষীদের নামেই স্কুল বাড়িগুলির নাম করণ করা হতে পারে। এছাড়াও প্রসাশনিক কাজের সুবিধা আনতে প্রতিটি বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সহ অন্যান্য তথ্য সম্বলিত ‘স্কুল ডাইরেক্টরি’ প্রস্তুত করবার কাজ চলছে। শিক্ষা-দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মেয়র-পারিষদ সন্দীপন সাহা বললেন ‘বর্তমান যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুরসভার শিক্ষাবিভাগ অত্যাধুনিক হচ্ছে। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে আমরা কাজ করছি। শিশুরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। বিগত কয়েক বছরে কলকাতা পুরসভার অন্তর্গত প্রতিটি বাড়িতে আমরা শিক্ষার আলো পৌঁছে দিয়েছি। এখন স্কুল ছুটের সংখ্যা অনেক কমে গিয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধূলাতেও আমরা সমান গুরুত্ব দিচ্ছি।’