যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর অবশেষে নতুন বিজ্ঞাপন নীতি আনতে চলেছে কলকাতা পুরসভা। পুরসভা সূত্রে খবর, জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহেই এই নীতি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে। পুরসভার দাবি, শহরের আর্থ-সামাজিক কাঠামো মজবুত করা এবং বিজ্ঞাপন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানোই এই নীতির মূল লক্ষ্য। শহরের রাস্তায় থাকবে শুধু মনোপলের (এক ধরনের লোহার থাম) বিজ্ঞাপন — এমনই সিদ্ধান্ত পুরসভার। এ বিষয়ে রাজ্যের মন্ত্রী তথা কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম জানিয়েছেন, ‘শহরের বিজ্ঞাপন নীতির যে খসড়া রাজ্য সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছিল, তাতে সিলমোহর দিয়েছে নবান্ন। এবার কলকাতার রাস্তায় মনোপোলে বিজ্ঞাপন চালু করা হবে। নতুন বিজ্ঞাপন নীতি অনুসারে মূলত রাস্তা-ভিত্তিক টেন্ডার করা হবে। পদ্ধতিগত নিয়ম অনুসারে যেসব সংস্থা টেন্ডারের মাধ্যমে নির্বাচিত হবে তারাই পুরো রাস্তা বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য পাবেন। বিজ্ঞাপনে শুধুমাত্র LED ও হোর্ডিং ব্যবহার করা যাবে। নয়া এই বিজ্ঞাপন নীতির ফলে শহরে অবৈধ হোর্ডিং লাগানোর প্রবণতা কমবে এবং একইসঙ্গে পুরসভার আয় বাড়বে বলে আশা করছি।’
নতুন বিজ্ঞাপন নীতির অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হল – কলকাতা শহরে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ সংস্থার/মন্ত্রকের যেসব বিজ্ঞাপন বসানো হয়, সেগুলি থেকে অর্জিত আয়ের ৫০ শতাংশ ভাগ এবার থেকে দিতে হবে কলকাতা পুরসভাকে। এর ফলে রেল, মেট্রো রেল, জাহাজ পরিবহণ মন্ত্রক-সহ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থার বিজ্ঞাপন আয়ের একটি বড় অংশ পুরসভার কোষাগারে প্রবেশ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতদিন পর্যন্ত এই বিজ্ঞাপনগুলি থেকে অর্জিত সমস্ত অর্থ সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় সংস্থারই ঘরে ঢুকত। এবার সেই প্রথার ইতি ঘটতে চলেছে। নতুন নীতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, শহরের যে-কোনও বিজ্ঞাপন থেকে আয়ের ক্ষেত্রে পুরসভা অন্যতম অংশীদার হবে। বর্তমানে শহরে যেসব হোর্ডিং এখনও পুরসভার আওতার বাইরে রয়েছে, সেগুলির কাঠামোও এবার পুরসভার নিয়ন্ত্রণে আসবে। পাশাপাশি, সমস্ত বিজ্ঞাপনী হোর্ডিং ধাপে ধাপে ‘মনোপলি’ ভিত্তিতে পরিচালনার পরিকল্পনা নিচ্ছে পুরসভা। এই ‘মনোপলি’ ব্যবস্থা কেমন হবে, তা নির্ধারণ করবে পুরসভাই। কিছু হোর্ডিং ডিজিট্যাল রূপে রূপান্তরিত করা হবে।

পরিবেশ সংরক্ষণের কথা মাথায় রেখে বেশ কিছু কড়া নিষেধাজ্ঞাও জারি হচ্ছে। শহরের কোনও ব্রিজ, উড়ালপুল বা ফুট ওভারব্রিজের বিমে বিজ্ঞাপন বসানো যাবে না। সেই সমস্ত স্থান সবুজায়নের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। পাশাপাশি, শহরের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা পুরোপুরি বেসরকারি বিজ্ঞাপন-মুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ডিজিট্যাল বিজ্ঞাপনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে নতুন নীতিতে। পাশাপাশি পরিবেশ-বান্ধব বিজ্ঞাপনের দিকেও নজর দিচ্ছে পুরসভা। পুনর্নবীকরণযোগ্য উপাদান দিয়ে যদি কেউ হোর্ডিং বা ব্যানার তৈরি করে, তবে সেখানে মিলবে বিশেষ ছাড়। কলকাতা পুরসভার বিজ্ঞাপন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মেয়র পারিষদ দেবাশিস কুমার এ বিষয়ে জানান, ‘কলকাতা ঐতিহ্যবাহী এক আন্তজার্তিক শহর। বিজ্ঞাপনে এই শহরের মুখ ঢেকে যাবে এটা আমরা চাই না। বিজ্ঞাপন থাকবে, তবে এক জায়গায় ভিড় করে নয়। নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে পরিকল্পনা করে বিজ্ঞাপন দেওয়ার স্থান নির্ণয় করা হবে। যত্রতত্র বিজ্ঞাপন দেওয়ার কাজ নিয়ন্ত্রণ আনতেই নতুন বিজ্ঞাপন নীতি আনা হচ্ছে। তবে বিজ্ঞাপন বাবদ আয় যাতে না কমে সে দিকটাতেও লক্ষ্য রাখা হবে।
কী আছে নতুন বিজ্ঞাপণ নীতিতে?
যেমন, বিজ্ঞাপনী পরিকাঠামোর অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি রদ করা এবং হোর্ডিং এর কাঠামো সংখ্যা কমিয়ে আনা। বিজ্ঞাপন মুক্ত অঞ্চল এবং সবুজ বলয়ে বিজ্ঞাপন প্রদর্শনে বিধিনিষেধ আরোপ করা। বিজ্ঞাপন গুলি যাতে কোনও ভবনের স্থাপত্য দৃশ্য বা বৈশিষ্ট্যগুলিকে জনসাধারণের দৃষ্টি থেকে অবরুদ্ধ, আড়াল বা অন্য কোনো সমস্যার স্মমুখীন করতে না পারে, সে বিষয়ে নিশ্চিত থাকতে হবে। হোর্ডিংগুলিতে যখন কোনও বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন পাওয়া যাবে না, তখন শহরের সৌন্দর্যায়ন ও নান্দনিকতা বজায় রাখতে হোর্ডিংগুলিকে সাদা ফ্লেক্স দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। কলকাতা পৌরসংস্থার বিল্ডিং বিভাগ যে সব বাড়িকে বিপজ্জনক, জরাজীর্ণ বা অসুরক্ষিত বলে ঘোষণা করেছে, সেগুলিকে কোনও বিজ্ঞাপন বা হোর্ডিংয়ের অনুমতি দেওয়া হবে না। হোর্ডিং বোর্ডের প্রামাণ্য আকার এবং দুটি হোর্ডিংয়ের মধ্যে ন্যূনতম দূরত্ব নির্দিষ্ট করতে হবে ইত্যাদি।
প্রসঙ্গত কলকাতা শহরের সমস্ত সরকারি, বেসরকারি সাইনবোর্ড, বিজ্ঞাপনী হোর্ডিং, রাস্তার নাম ইত্যাদি এবার থেকে বাংলায় লিখতে হবে। এমনই বিজ্ঞপ্তি জারি করল কলকাতা পুরসভা। পুরসভা সূত্রে খবর, বাংলা ভাষা, ‘ধ্রপদী ভাষা’-র স্বীকৃতি পাওয়ার পরই কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম শহরের সমস্ত সরকারি, বেসরকারি বিজ্ঞাপন, হোর্ডিং বাংলায় লেখার নির্দেশ দেন। চাইলে কেউ অন্য ভাষায় লিখতেই পারে, কিন্তু সবার ওপরে বাংলা ভাষায় লিখতে হবে, তার পর অন্য ভাষায় লেখা যেতে পারে। এ-বিষয়ে সম্প্রতি মেয়রের মন্তব্য, ‘সম্প্রতি আমি দেশের অন্য শহরে গিয়ে দেখেছি, রাস্তার বিজ্ঞাপন ও হোর্ডিংগুলিতে সেই শহরের তথা রাজ্যের মাতৃভাষাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কলকাতা পুরসভায় এই নিয়ম আগে থেকেই আমরা চালু করেছি। এবার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির কাছেও আবেদন করব, তাঁরা যাতে বাংলা ভাষাকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে বিজ্ঞাপনের প্রথমে তা ব্যবহার করেন।’