হিসেব বলছে ২০২২ সালে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত কলকাতা তথা সারা রাজ্যে বৃষ্টির ঘাটতি রয়েছে উল্লেখজনক ভাবে। তবু কলকাতা যে কয়েকদিন বর্ষার মরশুমে বৃষ্টি পেয়েছে তার মধ্যেই দুর্ঘটনার কারণে বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়েছে তিন জনের। এর মধ্যে দুই জন কমবয়সী বালক। শহর কলকাতার হরিদেবপুরে জুন মাসের শেষ সপ্তাহে বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে মারা গেছে এক স্কুল পড়ুয়া। এই ঘটনার মর্মাহত হয়েছেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম। তিনি তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতিতে তদন্ত কমিটি তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং সেই কমিটির প্রাথমিক রিপোর্ট কলকাত পুরসভায় জমা পড়েছে। এছাড়া ৩ জুলাই ১৩ বছরের মহম্মদ ফরজান আনসারির মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে। ঘটনাটি ঘটে নারকেলডাঙায়।

এই দুর্ঘটনা কী ভাবে আটকানো যায় বা তার জন্য কলকাতা পুরসভা কী ব্যবস্থা নিচ্ছে এই বিষয়ে লাইটিং বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মেয়র পারিষদ সন্দীপ রঞ্জন বক্সি জানালেন, ‘বর্ষাকালে ত্রিফলা বাতি স্তম্ভগুলি বন্ধ রাখা হচ্ছে। হরিদেবপুরের ঘটনার জন্য ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাব-জুনিয়ার ইঞ্জিনিয়রকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। ডিজি এবং এক্সকিউসিভ ইঞ্জিনিয়রকে শো-কজ করা হয়েছে। কমিটি যে রিপোর্ট দেবে তার ওপর নির্ভর করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটেছে ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে। সেখানে গলির ভিতরে টুলু পাম্প বসিয়ে জল চুরি করা হতো। হুকিং করে সেই পাম্পের মাধ্যমে জল তুলতেন কিছু বাসিন্দা। যে ল্যাম্পপোস্টটির কথা বলা হচ্ছে সেখানে কারেন্ট ছিল না। এছাড়া এলাকাটিতেও খুব একটা জল জমে না। তার পরেও ঘটনাটি ঘটেছে। জায়গাটি পরিদর্শণে গিয়ে দেখতে পেয়েছি উক্ত স্থানে অনেকগুলি ওপেন প্লাগ আছে। ওই প্লাগের মাধ্যমেই টুলু পাম্প চালানো হতো। ট্যাঙ্কে জল ভরার জন্য অনেকগুলি পাইপও আমরা দেখতে পাই। আমাদের ধাড়না টুলু পাম্প চালানোর জন্যই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। এছাড়া বিদ্যুৎ ট্যাপিং-এর একাধিক প্রমাণ ওখান থেকে পাওয়া গেছে। সেটাও একটি কারণ হতে পারে।

তৃতীয় ঘটনাটির সঙ্গে কলকাতা পুরসভার কোনও সম্পর্ক নেই। মৃত ব্যক্তি দোকানের মধ্যে রান্না করছিলেন, সেখান থেকে উনুন বাস্ট হয়ে দুর্ঘটনাটি ঘটে। তবে দোকানটির পাশে থাকা লাম্পপোস্ট থেকে তারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ চুরি করা হতো অসৎ উপায়ে। আগুন লাগার ফলে তারটিও ভষ্মিভূত হয়ে যায় ও দোকানের সাটারটির মধ্যে বিদ্যুৎ চলে আসে। আগুন লাগার পর বের হবার সময় দোকানের দরজাটিতে হাত লেগে বিদ্যুৎপৃষ্ট হবার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ঘটনার পরবর্তী সময় নবান্ন আমাদের ডেকে পাঠিয়েছিল। আমরা সেখানে গিয়ে মিটিং করেছি। বিদ্যুৎ মন্ত্রী উক্ত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। উনি আমাদের থেকে রিপোর্ট চেয়েছেন। আগামী এক সপ্তহের মধ্যে আমরা রিপোর্ট জমা দেব। মৃত্যু সবসময়ই দুঃখ-জনক। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষকেও সচেতন হতে হবে। অবৈধ ভাবে হুকিং বা ট্যাপিং করা উচিত নয়।

কোথায় কোথায় হুকিং বা ট্যাপিং করা হচ্ছে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তার দিকে নজর রাখাও সবসময় সম্ভব হয় না কলকাতা পুরসভার পক্ষ থেকে। রাস্তার ওপর অসত উপায়ে টুলু পাম্প চালালে ও তার পর বৃষ্টি হলে সেখানে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। হরিদেবপুরের ঘটনাটির ক্ষেত্রেও আমরা যা জানতে পেরেছি, পাশেই নতুন বিল্ডিং তৈরি হচ্ছিল। সেখান থেকে বিদ্যুৎ চুরির ঘটনা ঘটতে পারে। তবে সব ক্ষেত্রেই তদন্ত চলছে। তদন্তের মাধ্যমে যা রিপোর্ট পাওয়া যাবে তার ওপর নির্ভর করে দোষীদের শাস্তি দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে শহরের সব ল্যাম্পপোস্টগুলি পরীক্ষা করা হয়েছে। ত্রিফলা আলোর সুইজগুলি মোটা সেলোটেপ দিয়ে সিল করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বড় ল্যাম্পপোস্টগুলির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে শহরের যেখানে বৃষ্টির জল জমার সম্ভাবনা আছে, সেই সব জায়গায় জল জমলে বড় ল্যাম্পপোস্টগুলির আলো আমরা জ্বালাবো না। তারপর বৃষ্টি কমে গেলে ও জল নেমে গেলে আবার পুনরায় আলো জ্বালানো হবে। এছাড়া শহরের অন্যত্র যেখানে জল জমে না সেখানে স্বাভাবিক ভাবে যে আলো জ্বালানো হয়, তা জ্বলবে।’
বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছে দুর্ঘটনার দায় কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপানোর আগে জনগনকেও কিছুটা সচেতন হতে হবে। মৃত্যু কারোর কাছেই কাম্য নয়। অকালে প্রাণ ঝড়ে যাওয়া রুখতে কলকাতা পুরসভা বা রাজ্যে বিদ্যুৎ বিভাগের নিচু তলার কর্মীদেরও আরও দায়িত্বশীল হওয়া দরকার।