যে সময় আমরা মুন্সি প্রেমচাঁদের ১৪০তম জন্মবার্ষিকী বিষয়ে প্রতিবেদন পেশ করছি, সেই সময়ই জানা যাচ্ছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের নিয়ন্ত্রক শক্তি আরএসএস বলছে, পাঠ্যসূচি থেকে প্রেমচাঁদের লেখা বাদ পড়ুক। আশ্চর্য কথা! ভারতীয় জনজীবনকে যাঁরা কথারূপ দিয়েছেন সেই সব মহত্তম লেখকরা যাঁকে কুর্নিশ জানান তাঁর নাম মুন্সি প্রেমচাঁদ। হিন্দি এবং উর্দু মিলিয়ে তাঁর লেখার সংখ্যা বিপুল। একদিকে গল্প, উপন্যাস-এর পাশাপাশি নানা ধরনের ফিচার লিখেছেন মুন্সি প্রেমচাঁদ। রামায়ণ কাহিনিকে সহজ-সরল ভাষায় প্রকাশ করতে লিখেছেন রামচর্চা। এই রামচর্চা লেখার সঙ্গে অবশ্য আরএসএস প্রবক্তাদের গড়ে তোলা রামচরিত্রের কোনও মিল নেই।
১৮৮০ সালের ৩১ জুলাই বেনারস বা কাশী থেকে চার মাইল দূরে লমহি গ্রামে মুন্সি প্রেমচাঁদের জন্ম। বাবা মুন্সি অজয়াব রায়, মা আনন্দী দেবী। খুবই নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার। প্রথম লেখা গল্পগ্রন্থ সোজ-এ-ওয়াতান বা দেশমাতার বিষাদ সংগীত। বইটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ সরকার এই বই বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন। নবাব রায় নামে তখন প্রেমচাঁদ গল্প লেখেন। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে আপামর সাধারণ ভারতবাসীর দৈনন্দিনের কড়চা। বিশেষত হিন্দিভাষী গরিব খেটেখাওয়া মানুষের জীবনযুদ্ধের ছবি এঁকেছেন প্রেমচাঁদ। খুব অল্পবয়সে তাঁর বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই বিবাহ থেকে দূরে থেকেছেন মুন্সি প্রেমচাঁদ। ১৫ বছর বয়সে পিতৃহারা হন। সেই সময় থেকে সংসারের জোয়াল তাঁর ঘাড়ে। পড়াশোনাও অনিয়মিত। বেনারসের কাছে চুনারে এক স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ২২ বছর শিক্ষকতা করেছেন। কখনও প্রতাপগড়, বমরৌলি, এলাহাবাদ, কানপুর, মির্জাপুর, হামিরপুর, বস্তী, গোরখপুর প্রভৃতি নানা জায়গায় স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। ১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে গোরখপুর সরকারি স্কুলের চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন।
প্রথমে নবাব রায় পরে ধনপত রায় শেষে প্রেমচাঁদ নামে লেখা শুরু করেন হিন্দি ভাষার প্রধান এই লেখক। শরৎচন্দ্রের লেখায় মুগ্ধ হয়ে এক বার শরৎবাবুকে অনুরোধ করেছিলেন তাঁর গল্পসংকলনের ভূমিকা লিখে দেওয়ার জন্য। শরৎচন্দ্র বলেন, এদেশে একমাত্র রবীন্দ্রনাথ ব্যতীত এই বইয়ের ভূমিকা লেখার যোগ্য কেউ আছেন বলে মনে হয় না। নির্মলা, কায়াকল্প, গোদান, কর্মভূমি, রঙ্গভূমি এগুলো তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস। গ্রামজীবনের নানা ছবি এঁকেছেন ছোটো ছোটো বহু লেখায়.। জঙ্গল কি কাহানিয়া শীর্ষক লেখাগুলিতে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে সচেতনতামূলক লেখাও লিখেছেন প্রেমচাঁদ।
তিনি বলতেন, আমি গান্ধীবাদী। আবার আরেক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট বলেছেন, ম্যায় কমিউনিস্ট হুঁ— বামপন্থীও সে মেরা লাগাঁও। একদিকে ম্যাক্সিম গোর্কি তাঁর প্রিয় লেখক, অন্য দিকে লিও তলস্তয় তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন। কী অর্থে তিনি বামপন্থী? তাঁর বক্তব্য, দেশে যেন শেঠ, শাহুকার, জমিদার, বড়ো জমির মালিকরা যেন গরিব কৃষককে শোষণ না করে। বড়ো পুঁজিপতি শ্রমিককে শোষণের ‘মওকা’ না পায়। তিনি চান, এই সভ্যতা শ্রমের মূল্যায়ন করুক। একজন মানুষ সারা জীবন কঠোর পরিশ্রম করে শেষ জীবনে পেট ভরা খাবার পাবে না, এটা মেনে নিতে তিনি নাচার। তাঁর নিমক কা দারোগা, পৌষ কি রাত, কফন, সত্যাগ্রহ— এই সব লেখা ভারতবর্ষকে আমাদের সামনে মেলে ধরেছে। তিনি ছিলেন দরিদ্র ভারতবর্ষের সঠিক রূপকার। আজকের আরএসএস বলছে, তাঁর গল্পে নাকি ভুল বার্তা যাচ্ছে দেশ-বিদেশে! তাঁর সতরঞ্জ কি খিলাড়ি এবং সদগতি অবলম্বনে ফিল্ম নির্মাণ করেছেন সত্যজিৎ রায়। কফন অবলম্বনে ছবি করেছেন মৃণাল সেন। আরও বহু ছবি নির্মিত হয়েছে। ১৯৩৬ সালের ৮ অক্টোবর প্রয়াত হন।