“মারফি ঘর ঘর কি রৌনক, তারাহ তারা কে মারফি রেডিও, লা দেতে হ্যায় ঘর মে জান”।
মারফি রেডিওর এই বিখ্যাত বিজ্ঞাপনের ট্যাগলাইনটি গেয়েছিলেন মোহাম্মদ রফি। ৬০ এবং ৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে যখন টিভি ছিলো ধনী ব্যক্তিদের বিলাসিতা তখন সময় কাটানোর জন্য কম বেশি সব মধ্যবিত্তদের অনেক সাশ্রয়ী মূল্যের এবং অ্যাক্সেসযোগ্য মারফি রেডিওর মালিক হওয়া ছিলো রীতিমতো গর্বের বিষয়। নীল-সবুজ লাল সাদা সুতো দিয়ে কুরুশের কাজ করা আবরণে, ছোটদের নাগালের বাইরে উচুঁ তাকের উপর দু-পাশে ফুলদানি দিয়ে সাজিয়ে রাখা থাকতো রেডিও।
১৯২৯ সালে ফ্র্যাঙ্ক মারফি এবং ইজে পাওয়ারের হাত ধরে মারফি রেডিওর পথ চলা শুরু হয়। ব্রিটিশ কোম্পানিটির মূল লক্ষ্য ছিল সুলভ মূল্যে, টেকসই ঘরোয়া ইলেকট্রনিক গ্যাজেট তৈরি করা। সুন্দর, নিটোল বাচ্ছার ছবি দেওয়া একটি কাঠের বাক্সের আবরণে, মাথায় এন্টেনা বসানো রেডিও কিছুক্ষণ এর জন্যে হলেও পরিবারের সকলকে তার পপুলার প্রোগ্রামের মাধ্যমে বেঁধে ফেলতো এক ছাদের তলায়।

দুটি নব ঘুরিয়ে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি পুরোপুরি সেট করে ক্রিকেটের ধারাভাষ্যর গমগমে আওয়াজে প্রতিবেশীরাও আকৃষ্ট না হয়ে থাকতে পারতো না। ঘরের সকলেই যাতে খুব সহজেই তাদের প্রিয় অনুষ্ঠানটি শুনতে পারে, সেই ভাবেই তৈরি করা হয়েছিলো এই রেডিও।
তবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনীর জন্য একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল এই কোম্পানি। ওয়্যারলেস সেট নং ৩৮ — ব্রিটিশ সেনার কাছে খবর পৌঁছে দেওয়ার জন্য এবং বিশেষ রেডিও সেট বি-৪০ সিরিজ বানানো হয়েছিলো নৌসেনার কাছে খবর পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
১৯৩৭ সালে ফ্রাঙ্ক মারফি কোম্পানিটি ত্যাগ করে ফ্রাঙ্ক মারফি রেডিও বা এফএম রেডিও নামে নতুন একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। তবে আগের কোম্পানির নাম মারফি রেডিও থেকে যায়।
ব্র্যান্ডটি ১৯৪৮ সালে ভারতে আত্মপ্রকাশ করেছিল। সেই সময় রেডিওয় প্রচারিত প্রোগ্রামগুলির মধ্যে বিখ্যাত রেডিও সিলন, বিনাকা গীতমালা, বিবিধ ভারতী এবং পুনে কেন্দ্র (একটি স্থানীয় সংবাদ বুলেটিন) জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলো। মারফি রেডিও খ্যাতি লাভ করে শর্মিলা ঠাকুর যখন এটির বিজ্ঞাপনের প্রচারে আসেন।

তবে মারফি রেডিওর কথা আজো মানুষের স্মরণে আছে মূলত মারফি বেবির জন্য। ঠোঁটের কাছে আঙ্গুল দিয়ে একটি নিষ্পাপ বাচ্ছা মুখের ছবি…. জয় করে নিয়েছিলো সকলের মন। ছবিটি এত সুন্দরভাবে তোলা হয়েছে যে আপনি যেদিকেই যান, শিশুটির চোখ যেন আপনাকে অনুসরণ করবে।
শোনা যায়, তখন নাকি সব সন্তান সম্ভবা মায়েরাই চাইতো তাদের সন্তান যেন মারফি বেবির মতোই হয়। তাই মারফি শিশুর মুখের পোস্টার এবং ক্যালেন্ডারগুলি প্রসূতি হোম, গাইনোকোলজিস্ট ক্লিনিক, নাপিতের দোকানগুলিতে টাঙানো হত। এমনকি কোনো নাদুস নুদুস বাচ্ছার সেরা কমপ্লিমেন্ট ছিলো ‘মারফি বেবি’।
২০১২ সালে অনুরাগ বসুর চলচ্চিত্র ‘বরফি’, যেখানে রণবীর কাপুরের রিল লাইফ মা তাকে মারফির নামে নামকরণ করেছেন কারণ “মারফি মুন্না জাইসা লাল্লা, আম্মা কা থা স্বপ্ন” (মা মারফির মতোই একটি শিশু চেয়েছিলেন) তবে কিছু দিনের মধ্যে সেই মিষ্টি বাচ্ছাটির ছবি সমস্ত বিজ্ঞাপণ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। কারণ মডেল শিশু কন্যাটির অকস্মাৎ মৃত্যু। নতুন বিজ্ঞাপনের জন্য খোঁজ শুরু হয় নতুন মুখের।

অবশেষে মানালিতে একটি তিব্বতি পরিবারে খুঁজে পাওয়া যায় সেই মুখের একটি শিশু পুত্রকে যার মুখ হুবহু সেই বিজ্ঞাপণের কন্যাটির সঙ্গে মেলে। তিন বছর বয়সী কাগিউর তুলকু রিনপোচে। ক্রমে রিনপোচে হয়ে উঠলো নতুন মারফি বেবির মুখ। নিমেষে ছেয়ে গেলেন সারা দেশ জুড়ে।
যদিও তার পরিচয় জানা যায় ঘটনাটির প্রায় ৩৭ বছর পড়ে। ভেষজ চিকিৎসক ডা. রিনপোচে বিখ্যাত বলিউড অভিনেত্রী মন্দাকিনীর স্বামী। যিনি জীবনের প্রায় ২০ বছর কাটিয়েছিলেন বৌদ্ধ মনাস্ট্রিতে।

আইকনিক ব্র্যান্ড মারফি রেডিও এখন আর পাওয়া যায় না। আমাজনের মতো কিছু সাইটে পুরোনো সেট কিনতে পাওয়া যায়। মারফি ব্র্যান্ডটি এখনও ভারতে টিকে আছে এবং মুম্বাই-ভিত্তিক শিরোদকার গ্রুপ অফ কোম্পানির অন্তর্গত। কোম্পানীটি এখন আর মারফি রেডিওর সাথে ডিল করে না যদিও তারা আজকাল মারফি হোম থিয়েটার টেলিভিশন ডিভিডি প্লেয়ার বিক্রি করে। তবে মারফি রেডিও পাওয়া না গেলেও মারফি বেবি কিন্ত মানুষের স্মৃতিতে থেকে যাবে অনেক দিন। ।
Source : Various articles and journals have been referred for the Writeup.
একেবারে নতুন কিছু জানতে পারলাম। ধন্যবাদ।
খুব খুশি হলাম ❤️