বাঙালীর রবিবার কিম্বা অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গ এলেই মাটন নিয়ে কোথায় যেন একটি আদিখ্যেতা শুরু হয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে দূরে সরে যায় কোলেস্টেরল, হাই প্রেসার, সুগারের চোখ রাঙানি। আর মাটন যদি তৈরি হয় নবাবি কায়দায়, তাহলে তো খানাপিনায় ঝোঁক বাড়বেই। আজ গল্প হবে মাটন রারা নিয়ে যা এমনি একটি ডিশ যার কানায় কানায় মিলবে নবাবি মেজাজের স্বাদ, সঙ্গে জাফরানি খুশবু।
মাটন রারা, রারা মাটন নামেও পরিচিত, একটি ডিশ যা দুর্ঘটনা থেকে উদ্ভূত হয়। এই রেসিপিতে, মাটনের টুকরো এবং কিমা করা মাটন একসাথে রান্না করা হয় একটি ঘন গ্রেভি তৈরি করে। পদটিতে মাটন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে রান্না করা হয় এবং মশলা দিয়ে সিজন করা হয়। ডিশটি আপনি হাতে করা রুটি, তন্দুরি, নান, রুমালি রুটির সঙ্গে বা গরম ভাতের সাথে উপভোগ করতে পারেন।

মটন রারার রন্ধনপ্রণালী নিয়ে রূপকথার একটি গল্প শোনা যায়। গল্পটি প্রেমের কিন্তু তার মধ্যে লুকিয়ে আছে একটি নৃশংস এবং দুষ্ট ডাইনী, যা ছাড়া রূপকথা সম্পূর্ণ হয় না।
কিংবদন্তি অনুযায়ী শোনা যায় … আওয়াধের ছোট নবাব এবং জয়পুরের রাজকুমারীর ভীষণ ভাব ছিলো। এই ভাব পরিণত হয় ভালোবাসায়। একে অপরের প্রেমে পাগল হয়ে উঠেছিল। তারা একসাথে থাকতে চেয়েছিল কিন্তু নিয়তির পরিকল্পনা ছিল অন্য। তাদের পরিবার জানতে পেরেছিল এই সম্পর্কের কথা। দুই পরিবারের অমিল থাকায় জয়পুরের রাজা তাঁর রাজকন্যাটিকে গভীর জলে ঘেরা একটি দুর্গে বন্দি করে রাখলেন এবং দূর্গ পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব দিলেন একটি দুষ্ট ডাইনির ওপর।
এদিকে রাজপুত্র তার রমণীর জন্য আকুল কিন্তু কিছুতেই প্রবেশ করতে পারছেন না দূর্গে। তখন ডাইনিকে প্রলুব্ধ করার একটি ফন্দি আঁটলেন। জাদুকরী রারা ছিল কিন্তু তার একটা দুর্বলতা ছিল— মাটন। সেই দুর্বলতার সৎব্যবহার করতে রাজপুত্র তার মহান সাম্রাজ্যের সেরা বাওয়ার্চিদের ডাকলেন শুধুমাত্র একটি কাজের জন্য— এমন একটি মটনের পদ তৈরি করতে হবে যা ওই ডাইনিকে শক্তিহীন করে দেয়।

হুকুম পেয়ে বাবুর্চিরা জাদু দুর্গের পরিখার কাছে রান্নার প্রস্তুতি নিলেন। ধীরে ধীরে এবং ধৈর্যের সাথে ভারতীয় গোটা মশলা দিয়ে রান্না করা হলো মাটন— মশলাগুলি এমনই যা হিন্দুস্তানকে সারা বিশ্বে বিখ্যাত করেছে— কালো এলাচ, সবুজ এলাচ, তেজপাতা, দারুচিনির কাঠি, লবঙ্গ, গোটা কালো গোলমরিচ, জায়ফল, জিরা এবং কাশ্মীরি লালমরিচ।
সেই বিখ্যাত মশলা দিয়ে বানানো মাংসের সুগন্ধ রাজবাড়ী ছাড়িয়ে সুদূর দূর্গ পর্যন্ত পৌঁছলে দুর্গের মধ্যে ডাইনি আর নিজেকে সংযত করতে পারলো না।
ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন মাংসের হাঁড়ির ওপর। সেই সুযোগে রাজকুমারও পৌঁছায় তার প্রেয়সীর কাছে। যদিও তাঁদের প্রণয় পরিণয়ে রূপান্তরিত হয় কিনা তা অজানা কিন্তু ডাইনি রারা-এর নাম অনুসারে মাংসের এই জাদুকরী পদটির নামকরণ করা হয়— মটন রারা।
আবার অন্য একটি কাহিনীতে শোনা যায়, উত্তর প্রদেশের আওয়াধ-এ এই পদটি আবিষ্কার হয়। এখানকার নবাবদের ভোজনবিলাসীতা ইতিহাসের ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে আছে। সেখানকার বাবুর্চিদের কদরই ছিলো অন্যরকম। অনেক বছর আগে, একবার এক নবাব একটি জমকালো পার্টি ডেকেছিলেন। এই অঞ্চলের রাজারা নবাব নামে পরিচিত। বিভিন্ন বাবুর্চি বিভিন্ন খাবারের দায়িত্বে ছিলেন।

সেই পার্টিতে, এক বিখ্যাত বাবুর্চি ভুলবশত কিমা করা মাটন রেসিপি এবং মাটন রেসিপি মিশ্রিত করে, ধরে নিয়েছিল যে উভয় পাত্রে একই রেসিপি রয়েছে। বাবুর্চি যখন তার ভুল বুঝতে পেরেছিল তখন তার মুখ থেকে যে শব্দটি বেরিয়েছিল তা হল ‘আরে রা রা রা!’ লোকেরা সাধারণত হিন্দিতে এই শব্দটি ব্যবহার করে যা “উফ, ওহ” এর মতো। তাই এর নাম রারা—মাটন রারা।
অন্যমত অনুসারে হিমাচলি রারা মাটন একটি ঐতিহ্যবাহী হিমাচলি খাবার যা সাধারণত বিশেষ অনুষ্ঠানের সময় প্রস্তুত করা হয়। এটি মসলাযুক্ত এবং সাধারণত হিমাচল অঞ্চলে ভাতের সাথে খাওয়া হয়।
নতুন বছরে পথ চলা শুরু হয়েছে ঠিকই কিন্তু কাটেনি করোনার ক্ষতিকারক এফেক্ট। আপাতত রেস্তোরাঁয় যাওয়া বন্ধ। অতএব, ঘরেতেই বানিয়ে ফেলুন রেস্তরাঁ থেকে হেঁশেল সর্বত্রই জনপ্রিয়— মাটন রারা। ঘরের টেবিলে বসে নবাবী ডিশটির স্বাদ গ্রহণ করতে গিয়ে নিজেকে নবাবও মনে হতে পারে আপনার। ক্ষতি কী!!
ফাটাফাটি
Rinki you are multitalented…apni eto sundor ekta subject nea likhechen mon ta vore gelo
দারুন লাগলো লেখাটা