সালটা ২০১৫। সময়টা ভালো যাচ্ছিল না। সংসারে আবদ্ধ থেকে শান্তির পথ খুঁজতে গিয়ে সঠিক পথের দিশা পাচ্ছিলাম না। এমন একজন মানুষ চাইছিলাম যে শান্তির প্রলেপ দিয়ে হৃদয় ও মনটা শান্ত করবে। প্রায়শ ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের জন্মস্থানে ছুটে যেতাম। কেন জানিনা। তবে শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশ আমার ভালো লাগত। এখানকার সাধুসঙ্গ আস্তে আস্তে শান্তির আলোরপথ দেখাতে লাগল। বিশেষ করে এখানকার তৎকালীন মঠের অধ্যক্ষ স্বামী বিশ্বনাথানন্দ মহারাজ শান্তির পথ দেখালেন। তখনই হৃদয় ব্যাকুল হয়ে উঠল একজন সঠিক পথপ্রদর্শকের সান্নিধ্য লাভের জন্য। পেয়েও গেলাম। এই মঠেই গুরুদেব হিসেবে পেয়ে গেলাম তৎকালীন বেলূড় মঠের সহ সভাপতি স্বামী স্মরণানন্দ মহারাজকে।
তখনও বুঝিনা দীক্ষা কী? গুরু ও শিষ্যের সম্পর্কই বা কী? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ সরলভাবে দিয়েছিলেন স্মরণানন্দ মহারাজ। তিনি বলেন, ‘দীক্ষা’ শব্দের অর্থ-কিছু আরম্ভ করবার সঙ্কল্প বা ব্রত-গ্রহণ। ইংরেজীতে ‘দীক্ষা’কে বলা হয় ‘initiation’, প্রবর্তন বা সূচনা, অর্থাৎ কোন বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করা অথবা করানো। দীক্ষার উদ্দেশ্য ও প্রকরণ নানারকম হতে পারে। শাস্ত্রে ‘যজ্ঞদীক্ষা’র উল্লেখ আছে, যার অর্থ — কোন অভীষ্টলাভের উদ্দেশ্যে বিশেষ যজ্ঞ করবার সঙ্কল্প। এখানে মন্ত্রদীক্ষা অর্থাৎ কাউকে মন্ত্র জপ-করবার সঙ্কল্প বা ব্রত গ্রহণ।
মন্ত্র কি? ‘মন্ত্র’ হলো আধ্যাত্মিক অথবা অলৌকিক সঙ্কেতসূত্র, যা বারংবার আবৃত্তির দ্বারা অজ্ঞানের বন্ধন, জন্ম-মৃত্যুর পরম্পরা থেকে মুক্তিলাভ করা যায়। এই হলো মন্ত্রদীক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্য। মন্ত্রদীক্ষা কি এবং আমাদের আধ্যাত্মিক জীবনে এর গুরুত্ব কতখানি তা নিয়ে আমাদের মনে অনেক সংশয়, অনেক ভ্রান্ত ধারণা আছে। অনেকেই মন্ত্রদীক্ষার তাৎপর্য কি এবং আধ্যাত্মিক জীবনে মন্ত্রদীক্ষার দ্বারা কি লাভ হবে তা স্পষ্টভাবে না বুঝেই ‘মন্ত্রদীক্ষা’ নিতে চান। ঈশ্বরলাভের উদ্দেশ্যে গুরুদত্ত মন্ত্র নিয়মিত জপ করতে ব্রতী হওয়া অর্থেই ‘মন্ত্রদীক্ষা’। সংস্কৃতে মন্ত্র শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো — “মননাৎ ত্রায়তে ইতি মন্ত্রঃ”। ‘মন্ত্র’ মানে যা মনন করে মানুষ জন্ম-মৃত্যুর পরম্পরা, সংসার-সমুদ্র, মায়া বা অবিদ্যা থেকে মুক্তি পায়। আর ‘দীক্ষা’ হলো গুরুনির্দিষ্ট পন্থা অনুসরণ করে এই মন্ত্র জপ করা।
তিনি আরও বলেন, গুরু কী? গুরু স্বয়ং ঈশ্বর। গুরুস্তোত্রে আছে: “গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু গুরুদেবো মহেশ্বরঃ। গুরুরেব পরং ব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।।” — গুরুই ব্রহ্মা, গুরুই বিষ্ণু, গুরুই শিব, গুরুই স্বয়ং ব্রহ্ম। সেই গুরুকে প্রণাম। গুরু এবং পরব্রহ্মকে অভিন্ন মনে করা হয়। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, সচ্চিদানন্দই গুরু, গুরুই সচ্চিদানন্দ। বেদ এবং শাস্ত্রের শিক্ষার সঙ্গে এই ধারণার সঙ্গতি আছে। কিন্তু আমরা যখন মন্ত্রদীক্ষা নিই তখন উপলব্ধি করতে পারি না, সর্বজ্ঞ সর্বশক্তিমান ব্রহ্ম আমাদের দীক্ষা দিচ্ছেন। আমরা ভাবি, আমাদের সঠিক পথে চালিত করবার উপযুক্ত এমন একজন ব্যক্তিবিশেষকে আমরা গুরুরূপে নির্বাচন করি, যিনিও জন্ম-মৃত্যুর অধীন বা পার্থিব অনেক দুর্বলতার অধীন; তাঁর জাগতিক সামর্থ্যের সীমা আছে। সুতরাং ব্রহ্মের সঙ্গে তিনি অভিন্ন হতে পারেন না। কিন্তু শাস্ত্রের দৃঢ় নির্দেশ — গুরু এবং ঈশ্বর এক।
তাহলে কি শাস্ত্রবাক্যের সঙ্গে বাস্তবের বিরোধ ঘটছে না? এর উত্তরে বলেন — হ্যাঁ, একদিক দিয়ে ঘটছে। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যাপারটা আমাদের প্রতিমাপূজার মতো। ঈশ্বরের বিশেষ রূপ কল্পনা করে আমরা প্রতিমা গড়ি। প্রতিমাগুলি এমন সব উপকরণ দিয়ে তৈরি, যা জড় পদার্থ এবং তাতেই আমরা পূজা ও ধ্যান করি। কেন করি? কারণ আমরা অনন্তের ধারণা করতে পারি।
আমার চোখে গুরুদেব গোটা বিশ্বকে আধ্যাত্মিকতার পথ দেখিয়েছেন। আজও তিনি বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ ভক্ত ও অনুগামীদের অনুপ্রেরণা। সেবায় তাঁর জীবন উৎসর্গ। অগণিত মানুষের হৃদয় ও মননে অমলিন ছাপ রেখে গেছেন। তিনি আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। পাড়ি দিয়েছেন রামকৃষ্ণলোকে। তিনি হলেন সকলের স্মরণীয় ও বরণীয় রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের ষোড়শ অধ্যক্ষ স্বামী স্মরণানন্দ মহারাজ।
উল্লেখ্য, স্বামী স্মরণানন্দ মহারাজের শিষ্যত্ব গ্রহন করার সৌভাগ্য হয়েছিল। ফলে প্রায় পনেরো বছর ধরে তাঁর সংস্পর্শে থেকে হৃদয়শুদ্ধি ঘটানোর সুযোগ হয়েছে। শিবজ্ঞানে জীব সেবারই জীবনের মূল মন্ত্র করে বাঁচার পথ খুঁজে পেয়েছি। দেখেছি স্মরণানন্দ মহারাজকে যে কোনো সেবা কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে। জীবনে সেবার আদর্শ শুধু মুখে বলা নয়, তা জীবনে কীভাবে আত্মস্থ করতে হয় তারও পাঠ দিয়েছিলেন। বেলুড়মঠ, জয়রামবাটি ও কামারপুকুরে স্বামী স্মরণানন্দ মহারাজ যখনই গিয়েছেন, তখনই দর্শন পেয়েছি। বঞ্চিত করেননি কোনো ভক্ত ও অনুগামীদের। একটা কথা গুরুদেবের বারবার মনে পড়ে। তাহল যেদিন কামারপুকুর মঠ ও মিশনে স্বামী স্মরণানন্দ মহারাজের কাছ থেকে দীক্ষা নিলাম। মূল মন্ত্র কানে কানে শুনিয়ে ত্রিসন্ধ্যা যপ করতে বললেন। আমি একটা কথা বলেছিলাম, সারাদিনে নির্দিষ্ট সময়ে আমার পক্ষে জপ সম্ভব নয়। উনি বলেছিলেন যখন তোর সময় হবে তখন করবি। সেভাবেই চলে আসছে। বেশ শান্তিতেই কাটছে।
পরিশেষে গুরুদেব সম্পর্কে শ্রদ্ধাবনত স্বামী প্রেমাশানন্দj কথায় বলতে হয় — “গুরুদেবের জন্য হা-হুতাশ করিলে আমাদের যে হাসি পায় গো। গুরু মরেন না কি? চোখের দেখাই বড় কথা নয়। ধ্যানে দেখিবার জন্যই চোখের দেখা। বিশেষতঃ আজকাল ফটো তুলিবার সুবিধা থাকায়, মরণ মোটেই ক্ষতি করিতে পারে না। ঐ দেখ তাঁহার ছবির পানে চাহিয়া — গুরুদেব করুণাঘন মূর্তিতে তোমার সম্মুখে আসীন। তুমি মঠে যাঁহাকে দেখিয়াছ, তিনিও তো শ্রীগুরুর ছবি, — তবে একটু নরেন চরেন এই তফাৎ। ধ্যানে ডুবিয়া যাও, প্রকৃত গুরুর দেখা পাইবে। তোমরা ধ্যান করিবে বলিয়াই তিনি অন্তর্হিত হইয়াছেন।”