সকাল থেকে পড়ছি ‘আমার মন’। কমলাকান্তের দপ্তরের ‘আমার মন’। জন্মদিনে সন্ধান করছি আমার মনের। আজ থেকে দেড়শো বছর আগে একদিন কমলাকান্তের মনে হল, তার মন নেই, কে যেন চুরি করেছে। তাই মনের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল কমলাকান্ত।
কমলাকান্ত পেটুক মানুষ। মনে হল পাকশালায় হয়তো পড়ে আছে তার মন। যেখানে পোলাও, কাবাব, কোফতার সুগন্ধ, যেখানে আকাশে লুচি-চন্দ্রের উদয় হয়, যেখানে ছাগনন্দন দধীচির মতো মানুষের রসনার জন্য নিজেকে বলি দেয়, সেখানেই হয়তো থাকতে পারে মন। কমলাকান্ত পাকশালায় তন্নতন্ন করে খুঁজল। না, সেখানে তার মন নেই।
এবার মনে পড়ল প্রসন্ন গোয়ালিনির কথা। তার সঙ্গে কমলাকান্তের গব্যরসাত্মক প্রণয় ছিল। কারণ প্রসন্ন কমলাকান্তকে দুধ, সর, নবনীত, ক্ষীর দেয়। তাই প্রসন্নের ঘরের জানালার নিচে কমলাকান্তের মন ঘুরে বেড়াত। সেখানে ছুটে গেল সে। না, সেখানেও মন নেই তার।
পথে যেতে যেতে সে দেখল এক সুন্দরী যুবতী কলসি নিয়ে জল আনতে চলেছে। বেলা যে পড়ে এল জলকে চল। কমলাকান্ত সরল মানুষ। সরলভাবেই সে যুবতীকে বলল, — ‘তুমি আমার মন চুরি করেছ’? শুনে রেগে আগুন যুবতী।
মুশকিলে পড়ল কমলাকান্ত। দেখল এ সংসারে কোথাও তার মন নেই। শারীরিক সুখে মন নেই, রহস্যালাপে মন নেই, পুঁথি-পুস্তকে মন নেই। গেল কোথায় মন? ভাবতে ভাবতে তার মনে হল সে তো কখনও কিছুতে মন বাঁধে নি, তাই তার মন নেই কিছুতেই। আফিমফোর কমলাকান্তের মনে সহজভাবেই উদয় হল এক দার্শনিক চিন্তা : “এ সংসারে আমরা কি করিতে আসি, তাহা ঠিক বলিতে পারি না –কিন্তু বোধহয় কেবল মন বাঁধা দিতেই আসি। “ তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ সুরের বাঁধনে।
মন বাঁধা দিতে হলে অহংটিকে ত্যাগ করতে হয়, স্বার্থমগ্ন বিমুখ হলে চলে না। আপন হতে বাহির হয়ে বাহিরে দাঁড়ালেই সুখ। ‘সুখ’! আজ এই একুশ শতকে মানুষ ছুটে বেড়াচ্ছে অলীক সুখের সন্ধানে, আর জমা করে যাচ্ছে বস্তুর বিপুল বোঝা। সাড়ম্বরে বলছি ‘গ্লোবাল ভিলেজের’ কথা, বলছি প্রযুক্তির কৃপায় বিশ্ব আজ হাতের মুঠোয়। যানবাহনে, মুঠোফোনে, ইন্টারনেটে পৃথিবী আজ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া। অথচ, এক মানুষের সঙ্গে, এক সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে, এক দেশের মানুষের সঙ্গে যোজন যোজন দূরত্ব। বন্ধুত্বের কথা বলি, দেঁতো হাসি হাসি, চুক্তি হয়, মীমাংসা হয় আদালতে, মনের দূরত্ব ঘোচে না কিছুতেই। থেকে যায় সংশয়, অবিশ্বাস, সন্দেহ। সুখটা যে বস্তুগত নয়, কিছুতেই নয়, তত্ত্বগতভাবে জানলেও মানি না।
কমলাকান্ত এক রকম বলেছিল। আমি বলি জীবনানন্দের কথা। অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয়, আরও এক বিপন্ন বিস্ময় আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতর খেলা করে। সে বিস্ময় হল মৃত্যু। তাই জীবিত মানুষের শ্মশানে বা কবরখানায় যাওয়া প্রয়োজন নিয়মিত। সেই শ্মশান বা কবরখানা, যেখানে একই গতি লাভ করে ধনী-মানী-সাধু-তস্কর-হাসিম শেখ-রামা কৈবর্ত। এসব জায়গায় কিছুক্ষণ কাটালে চৌচির হয়ে যায় ফুটানিকা ডিব্বা। আর তখনই মনে হয় আয় আমরা বেঁধে বঁধে থাকি।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক
Khub bhalo
Amar man lekhata parlam.asadharan lekhata.ai birat jagate kichu manush tar mon kothao kothao badhar soubagha arjan kore,tara satyi baghaban