আরাবল্লির সবুজ পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত ভানগড়ের দুর্গটি ইতিহাস, ঐতিহ্য, রহস্য সব মিলিয়ে এক রোমাঞ্চকর জায়গা। রাজস্থানের নীরব সৌন্দর্য ও মৃত্যুর নিস্তব্ধতা এখানে বসবাস করে একত্রে। ভানগড়ের দুর্গ জয়পুর এবং আলওয়ার শহরের মধ্যে সরিস্কা অভয়ারণ্য থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
কছোয়া নৃপতি ভগওয়ান্ত সিং তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র মাধো সিংয়ের জন্য একটি দুর্গ নির্মাণ করান, যার নাম ভানগড় দুর্গ। সালটা ১৫৭৩। পরাক্রমী মোঘল সম্রাট আকবরের প্রধান সেনাপতি ও নবরত্ন সভার অন্যতম ছিলেন রাজপুত মান সিং। এই মান সিংয়ের সহোদর ছিলেন মাধো সিং। অনেকের মতে তিনিই নাকি এই দুর্গটি বানিয়েছিলেন।
এই মাধো সিংয়ের মৃত্যুর পর তার পুত্র ছত্র সিং (Chatr Singh) ভানগড় প্রাসাদে স্থলাভিষিক্ত হন। ছত্র সিংয়ের একটি পুত্র আজব সিং ও একটি কন্যা ছিলো রত্নাবতী। আজব সিং আজবগড় কেল্লা বানানোর ফলে এই ভানগড় দুর্গ এবং প্রাসাদের সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন রাজকন্যা রত্নাবতী। প্রায় এক কিলোমিটারের বেশি জায়গা ঘিরে অবস্থিত এই দুর্গ-প্রাসাদ। যদিও আজ দুর্গের বহুলাংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। দুর্গের বোর্ডে লিখিত আছে, এটি ভারত সরকারের সম্পত্তি।

পর্যটকদের কাছে রাজস্থানের ভানগড় দুর্গ ক্রমে ক্রমে হয়ে উঠেছে একটি ভৌতিক স্থান। যদিও অলৌকিক কার্যকলাপের বিচার করা কঠিন, তবে সরকার যখন আপনাকে নির্দিষ্ট জায়গা থেকে দূরে থাকতে বলে, তখন এমন কিছু আছে যা ঠিক নয়।
আপনি যখন এখানে থাকবেন, এই দুর্গের মহিমান্বিত স্থাপত্য দেখে আশ্চর্য হতে পারেন, তবুও অনেকে বলেন এত সৌন্দর্যের মধ্যেও তারা এক অজানা উদ্বেগের অনুভূতিতে ভারাক্রান্ত। কিছু দর্শনার্থী মনে করে যে তারা এক অদ্ভুত অনুভূতির স্বীকার, যেন কেউ তাদের চারপাশে অনুসরণ করছে। যে কারণে, এর জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও, দর্শনার্থীরা দুর্গের চারপাশে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করা থেকে সকলেই এড়িয়ে চলে।
রাতের বেলা ভানগড় ফোর্টের ভিতরে প্রবেশ করা বা থাকা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমনকি আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (এএসআই) সূর্যাস্তের পরে এবং সূর্য ওঠার আগে দর্শনার্থীদের দুর্গ প্রাঙ্গনে না থাকার জন্য সতর্ক করে ভানগড়ের বেশ কয়েকটি স্থানে বোর্ড লাগিয়েছে। স্থানীয়দের মতে, অনেকেই রাতে লুকিয়ে-চুরিয়ে অত্যাধিক সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে দুর্গের ভিতরে যেতে পেরেছে, কিন্তু তারা তাদের গল্প বলার জন্য ফিরে আসেনি, মানুষের বিশ্বাস রাতে দুর্গের চারপাশে আত্মারা ঘুরে বেড়ায়, যা এই জায়গাটিকে অলৌকিক কার্যকলাপের একটি প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করেছে।

এনডি টিভির বিখ্যাত শো ‘ইন্ডিয়াজ মোস্ট হন্টেড’ এ ভানগড় দুর্গকে দেখানো হয়। রেকর্ডিং এ অদ্ভুতভাবে নাইট ভিশন ক্যামেরার মোশন সেন্সর কাজ করা বন্ধ করে দেয়। শোনা যায় নারী কণ্ঠের আর্ত চিৎকার, পায়ের আওয়াজ।
বিশ্বের সেরা দশটি ভুতুড়ে স্থানের মধ্যে একটি ধরা হয় ভানগড় দুর্গকে। ভানগড়ের দুঃসাহসিক পর্যটকদের ঘিরে অনেক ভয়ঙ্কর গল্প রয়েছে। এটির ইতিহাস দুঃখ এবং যন্ত্রণায় পূর্ণ যা স্থানীয়রা বিশ্বাস করে। স্থানীয়রা বলেন, একবার তিনজন সাহসী এ্যাডভেঞ্চারার পাহারাদারকে ম্যানেজ করে ভানগড় দুর্গ প্রাঙ্গণে সূর্যাস্তের পরে থেকে যায়। সত্যিই ব্যাপারটা ভূতুড়ে ছিল কিনা জানা নেই, তবে টর্চ থাকা সত্ত্বেও, তাদের মধ্যে একজন খাড়া কূপে পড়ে যায়। তখন তার বন্ধুরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে তিনজনই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।
কোনও এক অজানা কারণেই দুর্গের চারিপাশে কোন জনপদ নেই। জনশ্রুতি আছে, দুর্গের কোন ধ্বনি এলাকার বাইরে যেতে পারে না। রাজস্থানের কেবল এই দুর্গটিই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তবে এই ধ্বংসের কোন সঠিক ইতিহাস নেই, রয়েছে শুধু প্রচলিত বিশ্বাস আর অজানা রহস্য। দুর্গ নিয়ে আলোচনা হলে দুটি কাহিনী শোনা যায়। একটি হলো…

মাধো সিংয়ের শাসনকালে দুর্গের সংস্কারের প্রয়োজন হয়। দুর্গের পরিকল্পিত চত্ত্বরের মধ্যে তখন বাস করতো বালুনাথ নামের এক ক্ষমতাধর সাধু। মাধো সিং সাধুর অনুমতি চাইতে গেলে সাধু শর্ত দেন যে কেল্লার ছায়া যেন সাধুর কুটিরে না পড়ে। দুর্গের শ্রীবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে কেল্লার উচ্চতা এতটাই বৃদ্ধি পায় যে দিনের কিছু সময় দুর্গের ছাওয়া সাধুর কুটিরের উপর পরে।
আর সেই কারণেই যা ঘটলো তা অপ্রত্যাশিত অসম্ভব বললে ভুল হবে না। সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুব্ধ বালুনাথ গোটা ভানগড় দুর্গ ধ্বংস করে দিলেন। দুর্গ আর তার সংলগ্ন শহর দুর্ভাগ্যের এক বিচিত্র আঘাতে ধ্বংসাবশেষে পরিণত হলো। রাজস্থানের ওই প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষেরা মনে করেন, যোগীর অভিশাপ আজো জীবিত আছে। ফলে ওই অঞ্চলে আর কোনও জনবসতি গড়ে ওঠেনি। এখনো নাকি দুর্গের আশেপাশে বাড়ি তৈরি করতে গেলে ভেঙ্গে পরে। (চলবে)
Valo lekha
Beautiful presentation