“শরীরটা আজ বেজায় খারাপ,/বিশেষ কিছুই খাব না।/আমায় কেজি দেড়েক মাংস দিও/আর চপ কাটলেট দুচার খানা।”
রেকর্ড প্লেয়ারে চাপানো রেকর্ড ঘুরছে আর তার থেকে বেরিয়ে আসছে এক অদ্ভুত গলায় সুরেলা গান, আর তাই শুনে ঘরে গান শুনতে জড়ো হওয়া ছেলেমেয়ে বুড়ো বুড়ি সবাই হেসে উঠছে।
যখন গ্রামোফোন রেকর্ডের যুগ ছিল, যখন রেকর্ড কোম্পানীর বিজ্ঞাপন বেরোত ‘সুখী গৃহকোণ, শোভে গ্রামোফোন’, সেই যুগে সঙ্গীত রসিক শ্রোতাদের সংগ্রহে শচীনদেব বর্মন, পঙ্কজ কুমার মল্লিক, কুন্দনলাল সায়গল, কানন দেবী প্রমুখ প্রখ্যাত শিল্পীদের গানের রেকর্ডের সঙ্গে সঙ্গে দু-চারখানা হাস্যকৌতুক-এর রেকর্ডও থাকত, মুখ বদলানোর জন্য। আটপৌরে বাঙালীর জীবনে হাসি ছিল, হাস্যকৌতুক ছিল। আর এই হাস্যকৌতুক এর রেকর্ডের লেবেলে একজনের নাম থাকতই। তিনি নবদ্বীপ হালদার। সেই সময়ে যে সব জলসা হতো, সেখানে বড়ো বড়ো শিল্পীদের পাশাপাশি তাঁর নামও ঘোষণা করা হত লোক টানার জন্য। তাঁর জনপ্রিয়তা এমনই ছিল।

১৯১১ সালে বর্ধমানে সোনপলাশি গ্রামে জন্ম। যদিও প্রথাগত শিক্ষা বেশীদূর এগোতে পারেনি, কিন্তু তাঁর কথাবার্তায়, ভাষায়, ভঙ্গিতে একজন শিক্ষিত রুচিশীল মানুষেরই পরিচয় পাওয়া যেত। রসিক এবং সদালাপী মানুষটির গুণগ্রাহী ছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের মতো সাহিত্যিকরা। জীবিকার তাগিদে তাঁকে অনেক রকম কাজ করতে হয়েছিল। তখনকার সাহেবি কোম্পানি ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানীতেও কাজ করেছিলেন কিছুকাল। তবে অভিনয়ের প্রতি টান ছিল ছোটবেলা থেকেই আর সেই টানে ছোটবেলাতেই গ্রামের নাটকের ক্লাবে জুটে গিয়েছিলেন। অভিনয়ের প্রাথমিক পাঠ সেখানেই।
বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল হাইস্কুল থেকে পাশ করে তিনি পরবর্তীতে পরিবারের সাথে কলকাতা পাড়ি দেন। তবু গ্রামের প্রতি তাঁর আজীবন ভালোবাসা থেকে গেছে, কিছুতেই কাটাতে পারেননি গ্রামের মায়া। তাই তিনি গ্রামের গাজন, দুর্গাপুজায় নিয়মিত আসতেন। এমনকি কলকাতা থেকে দল এনে যাত্রাপালাও করেছেন। সোনপলাশি গ্রমের ৮৩ বছরের শক্তিশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আমার বয়স তখন মাত্র আট। গ্রামে যাত্রা বসত। কলকাতার বিভিন্ন দল আসত। তিনি তখন গ্রামে এসেছেন। তাঁকে জোর করে মঞ্চে তোলা হল। নবা বামুন মঞ্চে উঠে নিজের সংলাপ ভুলে গিয়ছিলেন। সংলাপটা ছিল, হাঁড়ি খুলে দেখি মাংস নেই। কিন্তু তিনি বললেন, হাঁড়ি খুলে দেখি, বাবা নেই। সেটা শোনা মাত্রই হাসতে লাগল সকলে। আসলে তাঁর এই ভুল সকলকে হাসানোর জন্যই ছিল।” ‘নবাদাদু’-র স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে আজও বদলায়নি মাঝেরপাড়ার একটি মিষ্টির দোকান। সেটির প্রথম মালিক অভয় মোদক দীর্ঘ দিন আগেই প্রয়াত হয়েছেন। দোকানের মালিক এখন অভয়বাবুর নাতি দীনবন্ধু মোদক। দীনবন্ধুবাবু বললেন, “একটা হাস্যকৌতুকে আমাদের দোকানের একটি দৃশ্য ব্যবহার করেছিলেন নবাদাদু। শুধু সেই ঘটনার স্মরণেই আমার দোকানটাকে সেই পুরনো দিনের মতই রেখেছি।

১৯৩০ সালে দেবকী বসুর নির্বাক ছবি “পঞ্চশর” দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিনয় জীবনের আরম্ভ। এরপর বিভিন্ন পরিচালকের প্রচুর ছবিতে অভিনয় করেছেন, তবে অধিকাংশই ছোট দৃশ্যে কমিক চরিত্রে। কারণ ততদিনে হাস্যকৌতুক শিল্পী হিসেবে নাম হয়ে গিয়েছিল। তাই সেই গণ্ডির বাইরে তাঁকে অধিকাংশ পরিচালকরা ভাবতে চাননি। যদিও ক্লোজআপ দৃশ্যে ওনার মুখের প্রকাশ ভঙ্গি দেখিয়ে দেয় কতখানি অভিনয় ক্ষমতা তাঁর ছিল। অনেক দৃশ্যে তিনি তৈরী করে নিতেন এমন কিছু বিশেষ মুহূর্ত, যা পরিচালকের কল্পনাতেও আসেনি। শহর থেকে দূরে, মানে না মানা, হানাবাড়ি প্রভৃতি ছবি তার সাক্ষ্য দেয়। সাহিত্যিক ও চিত্রপরিচালক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, “সেইসব দৃশ্যে এমন মারাত্মক এক্সপ্রেশন দিল যে আমি স্ক্রিপ্ট চেঞ্জ করে ওর রোলটা বাড়াতে লাগলাম। ওর মুখে যে কত বিচিত্র রকমের এক্সপ্রেশন্ আছে, চোখের মধ্যে কত বিচিত্র কাজ আছে, তা অকল্পনীয়।” শ্যাম লাহার সঙ্গে জুটি বেঁধে মানিজোড় প্রভৃতি চলচ্চিত্রে তাঁর কমিক অভিনয় দর্শকদের মনে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। সাড়ে চুয়াত্তর ছবিটি যাঁরা দেখেছেন তাঁদের স্মৃতিতে মেসের চাকর মদনের ছোট্ট ভূমিকায় তাঁর অভিনয় অমলিন হয়ে আছে।
তবে তিনি তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন তাঁর কৌতুক নকশাগুলির জন্য। তাঁর সৃষ্ট এক বিশেষ বাচনভঙ্গি এবং এক বিশেষ কণ্ঠস্বর এই নকশাগুলিকে এক অন্য মাত্রা দিয়েছিল। ‘বৌদিদি রেস্টুরেন্ট’, ‘গানের মাস্টার’, ‘রসগোল্লায় ইঁদুর’ প্রভৃতি নকশাগুলি শ্রোতারা বারে বারে শুনতে চাইত। একাধিক চরিত্রে বিভিন্ন কণ্ঠস্বরে অভিনয় করার ক্ষমতাও তাঁর আয়ত্তে ছিল। তাঁর কয়েকটি নকশায় তুলসী চক্রবর্ত্তী, হরিধন মুখোপাধ্যায়, শ্যাম লাহা প্রমুখ শিল্পীরাও সহশিল্পী হয়েছিলেন। শুধু নকশাই নয়, হাসির গানের কয়েকটি রেকর্ডও তাঁর ছিল। এরমধ্যে “শরীরটা আজ বেজায় খারাপ” এবং “আর খেতে পারিনা মাগো ফ্যান্তা ফ্যাচাং চচ্চড়ি” এক সময়ে লোকের মুখে মুখে ফিরত। দ্বিতীয় গানটি তিনি একাই তিন চার রকমের গলায় গেয়েছিলেন, সুরছুট না হয়ে।

নকশাগুলির অধিকাংশই ‘নবাদার’ নিজের লেখা বলে জানিয়েছিলেন তাঁর ‘মন্ত্রশিষ্য’ সুশীল চক্রবর্ত্তী, যিনি নিজেও কৌতুকশিল্পী হিসেবে নাম করেছিলেন। সোনপলাশীর মানুষজনের কাছে ‘নবা বামুন’ বলে
পরিচিত নবদ্বীপ হালদারের পরিবেশিত নির্মল, অনাবিল হাস্যরসের পেছনে থাকত অতি সাধারন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট সুখ দুঃখ, আনন্দ বেদনার টুকরো কথা, যা সকলের মনেই দাগ কাটত। শিক্ষিত মহল থেকে অতি সাধারণ মানুষ, নয় থেকে নব্বুই, ঠাকুমা থেকে নাতনি — সকলের কাছেই অবাধ ছিল তাঁর গ্রহণযোগ্যতা। সেটাই ফুটে উঠেছে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, “রেকর্ডের কথা যদি কও, তবে নবাদার কমিকের কাছে আমরা হইলাম গিয়া সব পোলাপান। আমাদের দৌড় বড়জোর আসানসোল পর্যন্ত। আর নবাদার স্কেচ শুইন্যা খাসকেন্দা কোলিয়ারির কুলি কামিনরাও হাসে”।
যুগ পালটেছে, রুচি পালটেছে। হাস্যরসের পরিবেশনে রসবোধের পরিবর্তন এসেছে। এই অসামান্য বাচিক শিল্পী ও অভিনেতা বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছেন। এটা আসলে আমাদেরই আত্মবিস্মৃতির নমুনা। তাঁর জন্ম তারিখও কোথাও নথিভুক্ত করা নেই, তাই জন্মদিন পালনে তাঁকে স্মরণ করারও কোন দায় আমাদের নেই। তবু মনে হয়, গোমড়ামুখ ,বিষণ্ণ, হতাশ সময়ে তাঁকে মনে করলে আমাদের ‘রামগড়ুরের ছানা’ হয়ে থাকতে হবে না। তাঁর বহু সৃষ্টি অবহেলা উদাসীনতায় হারিয়ে গেলেও এখনো কিছু কৌতুক নকশা ইউটিউব খুঁজলে পাওয়া যায়। এখনো সেগুলি বিষণ্ণতায় নেতিয়ে পড়া মনকে নির্মল হাস্যরসের রৌদ্রে তরতাজা করে তোলার শক্তি রাখে।
ঋণ: সাতরঙ : রবি বসু, রানা সেনগুপ্ত • সোনাপলাশি, ছবি অন্তর্জালের সৌজন্যে
খুব ভালো বিষয়… আর লেখাটাও ।
Khub bhalo lekha .. purono diner kotha pranobonto chorritra sotti mone chaap cheye jai
লেখক এক বিস্মৃতপ্রায় শিল্পীর কথা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন । রচনার ভাষা অত্যন্ত সাবলীল ও সুখপাঠ্য ।
Bengali Comedian Nabadip Haldar birthday 25th November 1911, Sonpalsi, Purba Bardwan WB.
Devoki Boss’s First movie “MantraSakti”