নিবন্ধ কী? কোন চারিত্রিক বৈশিষ্ট তাকে গদ্যের অন্যান্য রূপ থেকে পৃথক, স্বতন্দ্র, স্বাধীন ও অনন্য করে তোলে? কাব্যে হৃদয়বিত্তির স্থান মুখ্য, প্রবন্ধে চিদবৃত্তি। প্রথমটির পথ সংশ্লেষণের, দ্বিতীয়টির বিশ্লেষণের। একটির লক্ষ্য কল্পনার রসায়নে সৌন্দর্য-মাধুর্যের সৃষ্টিছাড়া আনন্দলোক রচনা, অন্যটির উদ্দেশ্য তথ্য প্রয়োগে সত্য প্রতিষ্ঠা। চিন্তার প্রাখর্যে, তথ্যের অন্বয়ে এবং তর্কের ক্রম সংবদ্ধতায় প্রবন্ধের সার্থকতা। কিন্তু আরও এক ধরনের প্রবন্ধ আছে, যেগুলি তথ্য-বিনির্ভর এবং যুক্তিরিক্ত, ব্যক্তিরস এবং ব্যক্তির স্বগতঃ গুঞ্জরণই সেখানে মুখ্য। নবনীতা দেবসেনের বহু প্রবন্ধের অনেকগুলিকেই কি এই দ্বিতীয় শ্রেণিভুক্ত করা যায় না? আমাদের এই কথনে সেই দিকগুলোই দেখার চেষ্টা করব।
হাজার প্রতিকূলতার মধ্যেও জীবনকে কীভাবে যাপন করতে হয়, আধুনিক কালে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলতে থাকা মানুষকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেছেন নবনীতা দেবসেন। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে শুধু কি নবনীতাই দেখিয়েছেন? সত্যিকারের কবি যাঁরা জীবন-মৃত্যুর জগতে লড়াই তাঁদের নিরন্তর। সেই লড়াই কারোর ক্ষেত্রে বাহ্যিক দৃশ্যমান, কারোর ক্ষেত্রে তা নয়। চিরভাস্বর ‘হাসি’ তাঁদের সর্বক্ষণের সম্পদ। এই প্রেরণা জোগায় অফুরন্ত প্রাণশক্তি। নবনীতা দেবসেন এই প্রাণশক্তির প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ক্যান্সারের মত মারণ রোগের আশঙ্কায় যখন আমরা প্রায় সকলেই দুশ্চিন্তায়, তখন সেই রোগকেও মৃত্যুর কদিন আগে ফুৎকারে বুড়ো আঙুলটি দেখিয়েছেন তিনি। জীবনের শেষক্ষণটিতে দাঁড়িয়ে তিনি লিখছেন, “মরিনি, মরব কি না, তার ঠিকও নেই। এখন থেকে এত শোক কিসের? যেসব মানুষ আমাকে একবারও চোখে দ্যাখেননি, দূর দূর গ্রাম থেকে ছুটে আসতে চাইছে, একবার শেষ দ্যাখা দেখতে — আরে এটাই শেষ দ্যাখা — তোমায় কে বলল? এরপর তো আমি ইলেকশনে দাঁড়াব। তারপর হইহই পড়ে যাবে। শেষ দ্যাখাটা তখনকার জন্য তোলা থাক। একশত জরুরি কাজ ফেলে রেখে আমি কিনা শেষ দর্শন দেব? অ্যাই যে এত লম্বা জীবনটা কাটালুম তার একটা যথাযথ সমাপন তো দরকার! পাঁজিপুঁথি দেখে, শুভ দিন, শুভ লগ্ন স্থির করে, স্বজনবান্ধবকে নেমন্তন্ন খাইয়ে তবে তো শুভযাত্রা।”
কিন্তু জীবন যে জীবনের গতিতে এগিয়ে চলবে, সে কারো বাধা-নিষেধ, ইচ্ছা-অনিচ্ছার পরোয়া করে না, সেই গভীর জীবন সত্যকেও সোজা সহজ ভাষায় পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন নবনীতা। এই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নবনীতা দেবসেনের প্রাণশক্তি ও রসবোধ আমাদের মনের কোথায় যেন প্রশ্ন তোলে “তোরা যুদ্ধ করে করবি কী তা বল?” তিনি লিখেছেন, ‘জীবনের সবকিছু কি পরিকল্পনামাফিক করা যায়? আমার এক কবিরাজ দাদা একটি ভেষজ উদ্যান কিনতে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে ঝড়ের মধ্যে ওই বাগানেরই একটি গাছ ভেঙে ওঁর গাড়িতে পড়ার ফলে দাদার মৃত্যু হয়। জীবন যে কখন ফুরবে, তা কি আমরা জানি? বেচারা ক্যানসারকে এত দোষ দিয়ে কী হবে? তাই এই জানা-অজানা, চেনা-অচেনা, আত্মীয়বন্ধুর হাহাকারে, শেষ দর্শনের ধাক্কায়, শেষ প্রণামের আবেদনে বেজায় ঘাবড়ে গেলুম। এ কী রে বাবা! রোজ তো ভুল বিসর্জনের লাইন লেগে গিয়েছে! আর তাছাড়া, আমার কি তালা-ভাঙা দরজার অভাব আছে? আমার তো হৃদকমল থেকে শ্বাসকমল — সব দরজাই আদখোলা। তো এই কর্কটমলের এত মাতব্বরি কীসের? লাঠিসোঁটা একটু বেশি আছে বলে? দ্যাখো বাপু, এই বিশাল পৃথিবীতে কতরকম বড়ো বড়ো লড়াই-যুদ্ধ চলছে, সেখানে তোমার এই লাঠিসোঁটায় ভয় পাব ভেবেছ? ওসব তো তুচ্ছ! ‘আই ডোন্ট কেয়ার্ কানাকড়ি — জানিস্ আমি স্যাণ্ডো করি?’ মৃত্যুকে নিয়ে এই যে ঠাট্টা, এমনভাবে একজন মৃত্যুপথ যাত্রীর পক্ষেও করা যে সম্ভব — তা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন নবনীতা দেবী।
মারা যাবার সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। কিন্তু এটা তো শরীরের বয়স! মনের বয়স? সত্যিই তিনি চিরকিশোরী। তাঁর ৮০ বছরের জন্মদিন উপলক্ষ্যে অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘নবনীতাদির আশি হচ্ছে শুনে সত্যি বলতে কী আমার পেল্লায় হাসি পাচ্ছে। ও নবনীতাদি, তুমি তো সবসমই চিরকিশোরী ডাণ্ডাধারী, প্রেমে ও প্রতিবাদে আমাদের পাশে, আমাদেরও টপকে চলে যাও তুড়ুকলাফে — তোমার আশি-টাশি কী সব বলছে এরা। সত্যি করে তোমার বয়স নিয়ে তো কখনো ভাবিনি?’ তিনি নবনীতা দেবসেন, চিরটাকালই স্থির ও অস্থির। একদিকে তাঁর হাত ধরা আদিকবি বাল্মীকির, অন্য হাত ধরা লীলা মজুমদার, আশাপূর্ণা দেবীর। ভ্রমণ বৃত্তান্তর সঙ্গে হাস্যরসের মিশেল করতে তার মতো খুব কম সাহিত্যিকই পাবেন। তাঁর এই প্রতিভা সম্পর্কে অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন — ‘তোমার ভ্রমণে যেমন লাগেজ নিয়ে বিপর্যস্ত থাকতে, এক মগজে প্রজ্ঞা তো অন্য আর এক কাঁধে ট্রাভেলগ তো অন্য হাতে পানসুপারি আর বুকপকেটে সেনস অফ হিমউমার! কারা যেন বলাবলি করত যত হিউমার সব নাকি পুরুষ গদ্যকারদের একচেটিয়া, তো তাদের মুখে তোমার এক-একখানা বই তো জোঁকের মুখে নুন!… আমাদের ঘরপেরনো সব গল্পের রাস্তায় ব্যাকপ্যাক কাঁধে ছিপছিপে এক তরুণী, চোখে চশমা আর একমুখ স্বপ্ন নিয়ে পথ চলত। তোমার দিকে ফিরলেই আমাদের সব ভ্রমণ কেমন যেন হল্লাহাসির পিকনিক হয়ে যেত।’ নবনীতা দেবসেনের চলন অক্ষর থেকে অক্ষরবৃত্তে মেশার জীবনে। সেখানে যেন জ্বলজ্বল করে ওঠে, ঝলসে ওঠে প্রতিভার চাবুকে। প্রতি দু’লাইনের মধ্যে একটা আকাশ লুকিয়ে রাখতেন নবনীতা দেবসেন। সেখানে মেঘ-বৃষ্টি-রোদের অনায়াস খেলা চলত। আর সবকিছুর মধ্যে স্পষ্ট রুচিশীলতার ছাপ। আটপৌরে আঁচলে তিনি বেঁধে রাখতেন মুল্যবোধ, নৈতিকতার চাবিখানি। কুরুশে উল বোনা প্রচলিত। কলমে নয়। নবনীতা দেবসেন তা পারতেন। আক্ষরিক অর্থে নয় অবশ্যই। তবে অক্ষরে অক্ষরেই। আর উলের পোশাকও নেহাত পরিধেয় নয়। তাতে মিশে থআকত নিপাট বুনন কুশলতা। গেরস্থালি। ভালবাসার ওম। সর্বোপরি আপন জনের ছোঁয়া। নবনীতা দেবসেনের লেখার বারান্দায় সর্বক্ষণ থেকে গেছে এই আত্মীয়তা রোদ্দুর। ভাবনা-কুরুশে অক্ষর-উলের যে পোশাকটি তিনি ভাবীকালের জন্য রচনা করেছেন, অনুভবে তা চাপিয়ে সত্যিই টের পাওয়া যায় যাপনের উলে উষ্ণতা। ভালবাসার ছোঁয়া। নোটবইয়ের প্রযত্নে সযত্নে তিনি একটা পোস্টকার্ড রেখে দিয়েছেন প্রজন্মের ডাকবাক্সে।
শিক্ষার অহঙ্কার অতিক্রম করে তাঁর লেখা পোঁছয় নিটোল নিরাভরণ সরলতায়। আটপৌরে। সরস। শ্লেষে অম্ল কখনো। তবুও জীবনে সংরক্ত। মননের কালিটি তাঁর তৈরি করে দিয়েছিলেন মা রাধারাণী দেবী — যাঁর থেকে তাঁর বহু শিক্ষার একটি হলো লঘুস্বরে গভীর কথা বলা। অথচ লঘুস্বরে সঠিক কথাটি বলতে তিনি কখনই পিছপা হননি। তাই বারংবার তার লেখায় দেখা গেছে, যে কোনো বিচ্যুতির প্রতি তাঁর প্রতিবাদ কড়া মাপের নয়, মিঠে পাকের।মনে প্রশ্ন জাগে সচেতন এই লিখনশৈলী? হয়তো বা। অধ্যাপিকা নবনীতা দেবসেন কী পারতেন না আজীবন ভারী ভারী গদ্য লিখতে! ‘বিবাগী ফুলের গন্ধ’ বা ‘ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী শশী ও কিউ’- এর মতো লেখাতেই ঠাসা হতো তাঁর প্রবন্ধ সংকলন। কিন্তু তা তিনি করেন নি। উল্লেখিত কয়েকটি লেখার দ্বারা তিনি বুঝিয়েছেন — তা তিনি পারেন। কিন্তু রুচি-শিক্ষা-গেরস্থালি-লেখালেখির রসায়নে তিনি চাদ্দিক সামলে দশভূজা হয়ে উঠেছিলেন। লেখক নবনীতা দেবসেনের প্রবল পরাক্রম, তিনি রাস্তা পেরনোর সময় এদিক-ওদিক তাকান না, ফলে ‘পাঠক’ নামক যানকেও সামনে চলতে হয়। এই দার্শনিক নির্লিপ্ততা আসলে তাঁর দূরপ্রসারী লেখক-দৃষ্টির অন্য নাম।