| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

নবারুণ ভট্টাচার্য-এর ছোটগল্প ‘কালমন ও মোগলাই’

Reporter
নবারুণ ভট্টাচার্য / ৬২৬ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ২৪ জুন, ২০২২

কালমন আর আমি মোগলাই চুরি করতাম। আমরা কলোনিতে থাকি। আমাদের জন্মের সাল আমরা জানি না তবে আমার দাদা আর কালমনের কাকা যখন পুলিশের গুলিতে, পার্টির লোকের হাতে একই রাতে মারা পড়ে তখন আমরা দেড়-দুবছরের বাচ্চা। মাথা-ভরতি উকুন। কালমনের হাড়গিলের মতো চেহারা—মুখটা লম্বাটে। কান-ঢাকা ঝোপ-চুল। পুরোনো বোমার মশলা নিয়ে আগুন ভসকাতে গিয়ে আমার মুখের একদিক পুড়ে যায়। সেই থেকে আমার নাম মোগলাই। কেউ কেউ পরোটা বলেও আমাকে ডাকে। আমার পোড়া কানটা কুঁকড়ানো ছোট। এক চোখের ভুরু নেই। অন্যদের কথা শুনে আমর মা-ও লিজ-দলিল নেয়নি। অমাদের কলোনিতে সিপিএম বেশি। কংগ্রেসও আছে। আমাদের বাড়িতে লাইট নেই। বাড়িতে লোকজন এলে আমরা ল্যাম্পপোস্টে তার লাগিয়ে কারেন্ট টেনে আনি।

আমি ক্লাস সিক্সে উঠেছিলাম। তারপর বাবার কারখানা লক আউট হয়ে গেল। পড়া ছেড়ে দিলাম। মনে আছে বাবা একটা ছাপ-মারা কৌটো নিয়ে স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকত। কলোনির হরিপদ কাকাও থাকত। বাবার হাঁপানি ছিল। খুব বিড়ি খেত। একদিন রাতে ভাত খাবার সময় খুব কাশি হয়। মুখ দিয়ে রক্ত বেরোল। মরে গেলে। খুব বৃষ্টি পড়ছিল তখন। আমি ভিজে ভিজে এ-বাড়ি ও-বাড়ি খবর দিয়েছিলাম। আমার মা খুব রোগা। কোমরে ব্যাথা আছে। তিন-চার মাস অন্তর অন্তর আমি গড়িয়ায় যাই বায়োকেমিক ওষুধ আনতে। ওরা বিনা পয়সায় দেয়। রেশন তুলতে হয়। কেরাসিন কিনতে হয়। আমি চুরি করি। মা ঠোঙা বানায়। তারপর নিজেই গিয়ে দোকানে দোকানে দিয়ে আসে। মা হয়তো জানে আমি চুরি করি। কালমনের ছোটবেলা থেকেই বদনাম। কালমন আমাকে যখন রাতে ডাকতে আসে তখন মা বুঝতে পারে বোধহয়। কিন্তু কিছু বলে না। কালমনের বাবা আছে, মা আছে। ওর দিদি আশা গত বছর এক টেম্পো ড্রাইভারের সঙ্গে পালিয়ে গেছে। শোনা যায় হাওড়ায় নাকি থাকে। আমার মা আর বেশিদিন বাঁচবে না। চালশে ধরে যাচ্ছে। লোকে বলে মা-র শরীরে রক্ত নেই। খেলে তো রক্ত হবে। রক্ত হচ্ছে!

গত বছর আমরা গ্যারেজের মবিল পেট্রলের জেরিক্যান ও দুটো খোলা হেডলাইট যখন প্রথম চুরি করি তখন আমাদের ভয় ছিল। এখন লোক ঘুমোলে আমাদের সাহস বাড়ে। সেই চোরাই মাল বেচে অনেকদিন আমরা চিনি-বিস্কুট;  সিগারেট, চা খেয়ে ছিলাম। সিনেমা দেখেছিলাম। তারপর আমরা ঘড়ি চুরি করেছি জানলা দিয়ে হাত গলিয়ে। একটা রেডিও জানলা অব্দি এনেছিলাম। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে গলেনি। গোলমাঠ ছাড়িয়ে যে নিচু রাস্তা সোজা ফুঁড়ে নেহরু নগরের দিকে গেছে সেখানে একটা বাড়িতে কাঁটাতার ঘেরা বাগানে রাখা বাচ্চার রং-করা জিপগাড়ি চুরি করে ফেরার সময় আমাদের সঙ্গে ফকিরের আলাপ হয়। ফকির দোখনা মাল। আমাদের মতো বাঙাল নয়। ফকির দিনে স্টেশনে মোটমাল টানে, মাল খালাশের কুলির বদলি হয় কয়লা বা স্টোনচিপস নামায়। রাতে চুরি করে। স্টেশনে ঘুমোয়। ফকিরই আমাদেব বুদ্ধি দেয়—

“এই টিনের গাড়ি চুরি করলে দিন চলবে ? খাব না খাব না ইচ্ছে একপালি চাল, একটা উচ্ছে। নাইনে যাখন নেমেইচিস ত্যাখন ভালো পয়সা কবতে চাস তো ছেনতাই কর। মেলা টাকা পাবি। দুজনা আচিস।”

ছেনতাই যদি ভালো হয় তাহলে তুই  করিস না কেন ? ফকির বলে ওর সাহস নেই ছেনতাই করতে ছুরি লাগে, বন্দুক লাগে।

“পোঙা ঢাকার কাপড় নেই বন্দুক ছুরি পাব কোথায় ? হ্যাঁ এই কারবার চলে টেরেনে—শালা তিন-চারজন করে ঝপাঝপ উঠবে—গর্দানে ভোজালি ঠেইকে বার কর শালা কী আছে ট্যাঁকে। ব্যাস্ খামচা মেরে সব কেড়েকুড়ে নে টেরেন ঢিলে দিলেই দুদ্দাড়ে নাফ দে পালাও। তারপর আর কী ? বসে বসে খাও।”

ফকির আমাদের চোলাই আর চিতি কাঁকড়ার চচ্চড়ি খাইয়েছিল। আমরা বসেছিলাম স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের কোণে। ওখানে ঢাল শুরু হয়েছে মাটির দিকে। খালি পেটে ঝালে মালে জব্বর নেশা ধরেছিল। দুনিয়ার এই হল নিয়ম। ভগবানের বানানো। একজন পড়েয়ে যাবে আর মুরগিরা ফেঁসে যাবে। এইভাবেই আমাদের লাইন ঠিক হয়। তারপর রেলগাড়ি চলতে শুরু করবে। দাদাকে ফাঁসিয়েছিল পার্টি। বাবাকে ফাঁসিয়েছিল লক্‌-আউট, হাঁপানি। আমাদের ফাঁসিয়েছে ফকির। এত নেশা যে ঠোঁটে বিড়িটা অব্দি কালমন ধরে রাখতে পারে না। ট্রেনগুলো মনে হয় নেশার ঘোরে বেসামাল হয়ে বুকের ওপয় উঠে আসবে। আমার সঙ্গে একটা মেয়ের ধাক্কা লাগে ওভারব্রিজের ওপরে। মেয়েটা খিস্তি করে। কালমন আর আমি ওভারব্রিজের ওপরে লোহার বারান্দায় দাঁড়াই। পায়ের তলা দিয়ে ট্রেন চলেছে। ফাঁসাও, যত চাও ফাঁসাও। মুরগি রেডি।

বসে বসে খেতে চাইলে নতুন ধান্দা খুঁজতে হবে। ছিঁচকেমিতে চলবে না। কালমন একটা টিপনি ছুরি জোগাড় করেছিল। আমার জন্যে এনেছিল কলের জোড়ের একটা বেঁকা পাইপ। ওইটা দেকলে লোকে ভাববে পিস্তল। যুক্তি হল যে কোয়ার্টারে ছেনতাই করতে যাওয়া হবে। কোয়ার্টারের মাঠে অনেক বাড়ি। বাড়ি বাড়ি টাকা আর গয়না। জায়গাটা কিন্তু ফাঁকা। চারদিকে মাঠ। আলো কম। রাস্তার আলো তো জ্বলেই না। মঙ্গলবার আমরা কোয়ার্টারে যাব। রাত দশটার থেকে নাইট-গার্ড আসে। হুইসল মারে। ল্যাম্পপোস্টে লাঠি মারে। ঠং শব্দ হয়। তায় আগেই। কোয়ার্টারের ঘরে ঘরে বড়লোক। ছিলিমের দমের মতো ভয় আমাকেই প্রথম ধরেছিল—

—‘এই দ্যাখ। যদি ধরে কিন্তু এক্কেরে মাইরা ফ্যালাইব।’

“ব্যাঙ! জায়গা তো জান না। চাইর ধারে মাঠ। ধাওয়া করা সহজ নয়।”

কালমন কী যেন ভাবছিল আর হাতের নখ দিয়ে পায়ের নখ ছিঁড়তে চেষ্টা করছিল। আমার খটকা ছিল দরকারে ও ছুরি টানতে পারবে কিনা—

—“তুই চাক্কু চালাবার পারবি?”

“না পারার কী আছে? গত কালীপূজায় মনে নাই পোদ্দার পার্কের লগে গোলমাঠে খিট হইল, সমুদা কেমন দুইটা ছেলেরে জখম করল?”

“সমুদা করল করল। তুই পারবি?”

দেইখা নিবি। ছেনতাই-এর চাক্কু সাবধানে চালাইতে হয়—ঠেকাইলেই তো সব চুদুরবদুর খতম। প্যাটফ্যাট ফাইডা গেলে কি গলায় লাগলে তো মইরাই যাইব।”

“গয়না তুই বেচবি কোথায়। গ্যালেই তো চিনব।”

“তুই একটা মইষ। পাড়ায় কে যায়! বড়বাজার চিনি না? কইলকাতায়।”

যদি মার্ডার হয়ে যায়। কথাটা আমরা তলিয়ে দেখিনি, কালমন ভেবেও বলেনি। এতক্ষণ আমরা অন্য কথা ভাবছিলাম। দু-হাজার টাকা ভরি। একটা হার যদি জুটে যায়। কিন্তু মার্ডার। বাঁচকে রহনা রে বাবা, বাঁচকে রহনা হ্যায়…থানাতে এখনো ডাক পড়েনি

আমাদের। তবে কনস্টেবলগুলো বোধহয় চিনে ফেলেছে। এরপর একদিন থানাবাবুর চিঠি নিয়ে সাইকেল যাবে কলোনি কমিটির কাছে। কলোনি কমিটি ওয়ার্ড কমিটিকে জনাবে। বাড়িতে কাকুরা আসবে। ছেনতাই করো আর ডাকাতিই করো বাঁচকে রহনা রে বাবা তুঝপে নজর হ্যায়।

“একটা ভারী ওজনের হার যদি পাই তাহলে কী করব বল দেখি?”

—“চপ, কাটলেট, চাইনিজ খাব। বিয়ার টানব।”

“ওইদিন জানিস তো ফুটনের বোনটারে মটনরোল খাওয়াইয়া খুব টিপছি।”

—“দিল?”

—“দিল। হাড়ডিগডিগা।”

“তর ওই পোড়ামুখ দেইখাও মাল আসে? হালা আমারই তো ভয় লাগে। যা একখান খোমা বানাইছস। আমার মাইরি একটা মাল জোটে না যে উড়ামু। এই তো পারুলরে সেদিন সিনেমায় যাইতে বললাম। গেল না।”

—“তর কথা নাই বার্তা নাই হঠাৎ চাইপা ধরবি। কেন দিবে? অগো কি মন নাই?”

—“দাড়া, কোয়াটারে যদি একটা গয়না পাই তারপর পারুলরে দেখুম কেমন না দেয়।”

ফি মঙ্গলবারই লোডশেডিং বিকেলে রুটিনমাফিক শুরু হৃয়ে যায়। ক্লাবের ঘরে টিভি দেখা যায় না। কুপকুপ করে অন্ধকার। মধ্যে তিনটে দিন। ওই তিনদিন আমরা আর চুরি করতে বেরোইনি। কলমন ছুরিতে তেল দিল। স্প্রিং-এ তেল পড়ায় ফলা লাফ দিয়ে বেরোয়। কালমন ফলাটা প্যান্টে মুছে নেয়। চকচক করে। আমিও আচমকা পকেট থেকে কলজোড়ার নল বের করে চমকাই। এক এক করে আমাদের চোখের সামনে রাতের সব আলো নিভে যায়। নানা গয়না, হার, বালা, চুড়ি, দুল ঝলমল করতে থাকে। এভাবেই একসময় মঙ্গলবার এসে পড়ে।

কোয়র্টারে পৌঁছেতে হলে মাঠ ভাঙতে হবে। আমরা আমাদের কলোনির দিকের মাঠ এড়িয়ে উলটোমুখের রংকলের মাঠ উজিয়ে আসি। আমাদের দুজনের গায়ে নাইলন গেঞ্জির ওপরে রাপার জড়ানো পায়ে ছেঁড়া কেডস। অন্ধকারে কুয়াশায় ভেজা ঘাস, একটু বড় শেয়ালকাঁটা গাছ, বাবলার চারা পায়ে সপাট-সপাট করে লাগে। আকাশে মেঘলা কারণ একটা এরোপ্লেন গল যার আলো দেখা গেল না। ভ্যাপসা শীত।

—“মোগলাই।”

—“ক।”

—“তুই নল দূরে ধরবি।”

—“ধরব ।”

—“আমি চাক্কু এদিক-ওদিক ঘুরামু।”

—“ক্যান?”

—“চকচক করব। হালারা মুইত্যা দিব।”

—“আন্ধারে কিছু ঠাহর হয় না। চাক্কু চমকাইব ক্যামনে?”

—“চাক্কুর ধক আছে।”

ছুরিটার বাঁট মোষের শিঙের। তাতে তামাটে,পেরেক মারা। পাকা রাস্তা শুরু হয়। অন্ধকার। কয়েকটা জায়গায় দূরে ব্যাটারির আলো জ্বলছে। মোমবাতির হলদেটে আলো।

—“দেখছস। বেটারির লাইট। ঘরে ঘরে টিউব। হালাগো কত পয়সা জানস?”

—“চুরির পয়সা। গরিবের পোঙা মাইরা বাড়িগাড়ি বনাইছে।”

—“খায় কী! ফল, আঙুর, গরু, মোরগা, টিনের মাখন—লাশগুলা কী মোটা!”

—“মাইয়াগুলাও সলিড।”

—“ভাবলেই তাইত্যা যায়।”

—“অত হিট ভালো নয়।”

আমরা কোয়ার্টারের প্রথম গলিতে ঢুকে পড়ি। তিন-চারটে বাড়ি পেরোতে না পেরোতে একটু তফাতে সিগারেটের আগুন দেখা যায়। লোকের গলা, ফিন-ফিনে মেয়েমানুষের গলা পাওয়া যায়। আসছে। আমাদের শিরা টানটান হয়। তলপেটে কিছু একটা হয়। মুখে ভয় জমে। গিলে ফেলি।

সবচেয়ে যখন দরকার চুপচাপ থাকার তখনই খোঁদলে গাড়ি ধোয়ার জল না কিসের মধ্যে কালমন খপাৎ করে পা ফেলে। কাদাজল ছিটকোয়।

টর্চ ঝলসে ওঠে। কালমনের হাতে ছুরি নেই। আমারও কলের নল পকেটে ঠাণ্ডা হচ্ছে। কোথাও ট্রানজিস্টার রেডিও চলছে। ইংরিজি খবর বলছে।

লোকটার ছাঁটা গোঁফ ছিল। মিলিটারি বা পুলিশের লোক হবে। পেল্লায় চেহারা। গায়ে চিকনের পাঞ্জাবি, পায়জামা, শালজড়ানো। হাতে দামি ঘড়ি চকচক করছে সঙ্গে প্যান্ট জ্যাকেট পরা তিনটে মেয়ে। লোকটা বাঘের মতো চোখ করে আমাদের দুজনকে দেখে। আমরা নড়ি না। আমি কালমনকে বলি—

—“গয়না নাই। তুই কস তো নল বার করি।”

—“চুপ কইরা থাক্। নড়বি না।”

একটা মেয়ে চওড়া পাছা, লোকটাকে বলে—

—“ড্যাড আর দে ক্রিমিনালস্?

লোকটা ঘোঁত‌্ ঘোঁত্ করে। আধবুড়ি একটা মেয়েলোক বলে ওঠে—

“স্ক্রু দেম হানি। লেটস্ মুভ অন।”

ওরা চলে যায়। একটা মেয়ে বলে ওঠে, ইয়ে তো কামাল হো গয়া। মেয়েগুলো হেসে কুটিপাটি হয়। লোকটা দু-একবার পেছনে টর্চ মারে।

—“বাপরে, তাকাইয়া থাকে য্যান গণ্ডার!”

—“হালার সাহেব, আমরাও ভদ্রলোকের বাচ্চা। বল্?”

দু-তিনটে রারান্দায় আলো জ্বলে টর্চের। গলা শোনা যায়। আমরা এগোই। এ-গলি ও-গলি দিয়ে বাঁক মারি। এলোপাথাড়ি চলতে চলতে দুজনের মধ্যে ধাক্কা লেগে যায়। দূরের আকাশে আগুনের মতো আলো। ওদিকে কারেন্ট আছে।

—“হালায় তর গয়নাপরা মাগীরা আর বাইরাইব?”

—“তর বউ বাইরাইব। শুয়ারের বাচ্চা। চুপ মাইরা চল্।”

দেওয়ালে বিরাট বিরাট ছায়ার নাচানাচি দেখে আমরা থমকে যাই। নানারকম মুখের আওয়াজও পাওয়া যাচ্ছিল। অনেকগুলো মোমবাতি জ্বেলে দরজা জানলা সব হাট করে খুলে, দুটো ছেলে দুর্দান্ত ক্যারাটে লড়ছে। হাত দুটোতে দুজনেরই মাসলের ঢেউ খেলছে। সরু কোমর। চওড়া বুক। খালি গায়ে। জিনস পরা। আমরা ব্রুস লি’র সিনেমা ‘এন্টার দা ড্র্যাগন’ দেখেছি কিন্তু কখনো সামনে এরকম তাজ্জব লড়াই দেখিনি। ছেলেদুটো দরদর করে ঘামছে। প্রচণ্ড জোরে চার্জ করছে। পা তুলে দিচ্ছে মুখের ওপর। কানের পাশে কাটারির মতো কোপ মারছে। এত কিছু চলছে কিন্তু কারো গায়ে হাত লাগছে না। পেছনের কোনো বাড়ি থেকে জেনারেটারের শব্দ আসছে। এদিকে ওদিকে দু-একটা জোনাকি। হাঁ করেছিলাম বলে মুখে মশা ঢুকে গিয়েছিল আমার। থুথু ফেলে বের করতে হয়।

আর একটু এগোতে ছোট একটা পার্ক পড়ে। দোলনা, ঢেঁকি সব থেমে রয়েছে। পার্কটাকে ঘিরে একসার একরকম দেশলাই বাক্সের মতো বাড়ি। প্রত্যেকটা বাড়ির সামনে ছোট বাগান রয়েছে। কোনার একটা বাড়িতে বাইরের ঘরে ব্যাটারিতে টিভি চলছে। টিভির নীলচে আলো একদিকে দেওয়ালজোড়া লেনিনের ছবির ওপরে কমছে বাড়ছে। ককনো কখনো ছবিটা প্রায় অন্ধুকার ছুয়ে যাচ্ছে। কোনো লিডারফিডার থাকে, হবে।

হাঁটতে থাকি। কালমন আর মাগলাই আমরা এগোই। রাস্তায় লোক নেই। ফাঁকা বেবাক। সান্নাটা। কাকে ছেনতাই করব? যাদের দেখছি তাদের ছেনতাই করা যায় না। তবে ছেনতাই করা যায় কাদের? তাদের কখন পাওয়া যায়? চোর? আছি ভাই। ছেনতাইবাজ?

ঠাণ্ডা হাওয়া এসে আলগা ছোবল মারে। চুমোয়। আমাদের চোয়াল, আলটাকরা, জিভ, ঠোঁট কেমন অসাড় হয়ে যায়। কুয়াশায় চুবিয়ে রেখেছে এই বেফয়দা রাত। ফালতু। বেকার। কোনো বাডির মাথায় ডেকে উঠল প্যাঁচা। তার ঝটপটে ফ্যাকাশে উড়ে যাওয়াও দেখা যায়। আমরাও ভাগ্যকে লড়িয়ে দিয়েছি শিকারের খোঁজে। গয়না পরে ইঁদুর বা ব্যাঙ এখনো আসেনি। তিন-চারটে কুকুর আমাদের পেছনে চলতে শুরু করে। আমরা ইট, পাথর কুড়োই। কুকুরগুলো আর এগোয় না। কিন্তু ডাকতে শুরু করে। ওপরের দিকে মুখ তুলে ককিয়ে ওঠে। চাঁদের মুখের মধ্যে মেঘ ঢুকছে। কোথাও একটা মোটরসাইকেল স্টার্ট দিল। হাসল কেউ? আমরা কিন্তু হাঁটছি। এত হাঁটছি যে ছেনতাইয়ের কথা প্রায় ভুলে গেছি। আমার থাইতে কলের বেঁকা নলটা ফুটছে। কেডসের, ভেতরে পা চুলকোচ্ছে, ঘামছে। ঠাণ্ডা মরা ল্যাম্পপোস্টে গাল ঠেকাতে, কপাল ঠেকাতে ইচ্ছে করে। জলতেষ্টা পেয়েছে। আমাদের কলোনির পাশে একটা বড় পকুর আছে। আমরা বলি বিল। জোর মেঘ ডাকলে কইমাছ উঠে আসত। আমরাহ দেখেছি। ওখানে মাটি ফেলে বুজিয়ে আটতলা বাড়ি উঠবে। খব জলতেষ্টা পেয়েছে। কালমন গুন গুন করে গান করছে। ওরও কি ছেনতাইয়ের কথা মনে নেই? অসাড় ভাবটা নামছে। শিরদাঁড়ার হাড়ে হাড়ে পা রেখে রেকে নামছে। চোর? আছি ভাই। ছেনতাইবাজ?

হেডলাইট জ্বেলে একটা গাড়ি হুডুম করে এসে জোরে বাঁক নেয়। আমরা তড়বড্ করে দুপাশে দুজনে সরে যাই। আমাদের দুজনকে আলাদা করে দিয়ে গাড়িটা বেরিয়ে যায়। গাড়ির চোখ ধাঁধানো আলোয় রাস্তার ওপারে কালমনকে ছিটকে যেতে দেখে আমার মনে হয় ওকে যেন চলন্ত গাড়ির ভেতর থেকে কেউ গুলি করল। সিনেমায় এরকম দেখা যায়। কলের বেঁকা নল আমার পকেটে। আমরা ছেনতাই করতে এসেছি কোয়ার্টারে। এখনো পারিনি।

কত বাড়ি রে ভাই। আন্দাজ আসে না। যেমন আন্দাজে আসে না হাজত, কোর্ট, থানা। কত থানা বানিয়েছে। এত থানা যদি, এত পুলিশ, তাহলে চোর কত? সবাই? এই বিরাট এলাকার মধ্যে এক এক রকমের বাড়ির ফাঁকফোঁকর দিয়ে এঁকাবেঁকা রাস্তা বরাবর—সাবধান। জিগজ্যাগ রোড—একশো ফুট দূর থেকে সিগনাল দিয়ে সাবধানে দিনের বেলা হর্ন, রাত্তিরে আলো, হর্ন দিয়ে যাবেন—আমাদের পা ব্যাথা করছে—ঠ্যাংঠেঙে চারটে পা, দুখানা জিরজিরে ইঞ্জিন—ক্লাচ ব্রেক অন্যের পায়ে রয়েছে—এই এসে গেছে দুরন্ত তুখোড় বাঁক বা হেয়ারপিন বেন্ড—সাবধান—থানার পর থানা—আবার দিনের বেলা হর্ন, রাত্তিরে আলো, হর্ন, একশো ফুট দূর থেকে সিগনাল দিয়ে সাবধানে—ঠা ঠা করে আলো ফিরে আসে—বাড়িতে বাড়িতে আলো দপ দপ করে এঘরে-ওঘরে জ্বলে ওঠে—অন্ধকার টুকরো টুকরো হয়ে গাছের ফাঁকে, বেড়ায়, আনাচেকানাচে ছিটকে যায়। বাচ্চারা চেঁচায়। টিভি-র আওয়াজ, স্টিরিও-র আওয়াজ রেডিও-র আওয়াজ, গাড়ির আওয়াজ। কাচের শব্দ করে জানলা খোলে। বন্ধ হয়। হাসির শব্দ, কথার শব্দ চারদিকে একেবারে হাট বসিয়ে দেয়। লোকজন বেরিয়ে আসে। বাচ্চা নিয়ে বাবা-মা বেরোয়। কেউ আমাদের পাত্তা দেয় না। এত আলো, মার্কারিগুলো রাস্তার ধারে ঝিমোচ্ছিল, এখন তেতে উঠছে। আমাদের কি দেখাই যাচ্ছে না?

আমরা ছেঁচড়ে-ছেঁচড়ে চলচি। হেঁটে-হেঁটে থকে গিয়েছি। কেউ আমাদের কদর করছে না। বাদ দিয়ে দিয়েছে হিশেব থেকে। অথচ অন্তত একটা ছুরি আমাদের সঙ্গে রয়েছে। সেটা নিয়ে কেউ ভাবছে না। চারদিকে কুকুর ডাকছে। কিছু রাস্তার কুকুর। বাকিগুলো বাড়ির পোষা। ল্যাম্পপোস্টের তলায় একটা সিমেন্টের বাঁধানো বেঞ্চিতে আমরা বসি এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পেছনের বাড়ির গ্রিলের ভেতর থেকে রাশভারী আওয়াজ বেরিয়ে আসে—

“এখানে কী চাই?”

“কিছু না। আমরা একটু জিরাইতাছিলাম।”

“এটা বাইরের লোকের বসার জন্যে বানানো হয়নি।”

“দাদু আমরা কাছেই থাকি।”

“কী? ”

বুডো লোকটা বেরিয়ে আসবে এবার। আরো লোক বেরোবে। ঝামেলা হবে। চারদিকে আলো। আমরা উঠে আবার হাঁটতে থাকি।

“কেমন হারামি দেখলি? আমরা কোনো দোষ করছিলাম?”

“কর নাই? হালা ছেনতাই করতে আস নাই? পকেটে কী আছে? চিল্লামু?”

“ধরা পড়লে তুই য্যান বাদ যাবি। ছেনতাই করুম, ছেনতাই ভালো, তুই বলস নাই?”

গার্ডদের হুইসল শোনা যাচ্ছে। ল্যাম্পপোস্টে লাঠির বাড়িও পড়ছে। এতক্ষণ কী নেপালিগুলো অন্ধকারে লুকিয়েছিল?

কোয়ার্টার ছাড়িয়ে আমরা মেন রাস্তায় উঠে পড়ি। রাস্তার আলোগুলো জ্বলছে না। দু-একটা সাইকেল চলছে। গাড়ির শব্দও আছে। গোঁ গোঁ করে একটা পুলিশের পেট্রল ভ্যান পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। আমাদের পাত্তা না দিলেও মনে হল যেন একটু আস্তে হল আমাদের দেখে। আসলে রাস্তা খুবলে গাড্ডা হয়ে গিয়েছিল ওই জায়গায়। তবু ঝুটঝামেলা বাঁচাতে আমরা ধারের মাঠে উঠে পড়ি। দূরে কোয়ার্টারের আলো ঝলমল করছে।

“তুই হালায় ধুর, ছেনতাই করতে বুকের পাটা লাগে।”

“তরে আমি কই নাই আমারে দিয়া হইব না। তুই বা কী লোম্বাটা ছিঁড়লি? মোটকা লোকটারে দেইখা তো মুইতা দিলি?”

“হ, মুইতা দিলাম।”

“দিলি না?”

আবছা চাঁদের আলো। ঠাণ্ডায় কুয়াশার সঙ্গে ধোঁয়া আর ধুলোর মিশেল মাঠের ওপর থিতিয়ে রয়েছে। যে আসছিল তাকে দূর থেকে ভুতুড়ে দেখায়। মাঠ চিরে ভূত আসছে বা মনুষ আসছে। কালমন একবার আমার দিকে তাকায়। কাছে আসতে দেখা যায় লোকটা রোগা আর একটা পা একটু লেংচে চলে। পিঠে একটা বস্তা। বেশ ভারী। আরো কাছে আসতে আমরা লোকটার আধবুড়ো খোঁচা দাড়ি মুখটাও দেখেছিলাম। আমরা ওর রাস্তা আটকে সামনে দুজনে দাঁড়াই। ও ডানদিকে যেতে চেষ্টা করে। আমরাও সরে যাই। ও বাঁদিকে সরে। আমরাও রাস্তা আগলাই। কালমন বোতামটায় চাপ, দিতেই ফস করে ছুরির ফলাটা বেরিয়ে আসে। আমার হাতে কলের নল।

—“টাকা পয়সা কী আছে বার কর হালায়।”

লোকটা মুখ হাঁ করে। ভয়ে পা-দুটো কাঁপছে।

—“পয়সা নেহি হায় বাবা। গরিব আদমি হ্যায়। ছোড় দিও বাবু…”

—“চুপ, মার হালার মাউড়া। বস্তায় কী চোরা মাল আছে উপুড় কর… নেহি তো…”

—“দেখ্ লেও বাবু কেয়া হ্যায়…”

বার বার ভগবানের নাম করতে করতে লোকঢা ভারী বস্তাটা উপুড় করে ঢালে—পুরোনো তক্তার কাঠ, পেরেকমারা, লোহার মরচে পড়া অ্যাঙ্গেল, শিশি, ছোট ছোট প্যাঁচ-কাটা রড, ভাঙা পিঁড়ি, কয়েকটা শিশি ছাতা-পড়া টিন, শিক, ফাটা সুইচ ইলেকট্রিকের পুরোনো তার—ভালো করে দেখবার জন্যে কালমন নিচু হয়। লোকটা ওর মধ্যে থেকেই একটা কাঁটা লাগানো তক্তা হঠাৎ আমার হাতের দিকে ছুঁড়ে মারে। আচমকা লেগে আমার হাত থেকে কলের নলটা পড়ে যায়। লাগে। তারপরই ও একটা শিক তুলে বনবন করে ঘোরাতে থাকে। কালমন সরে না এলে ওর মাথায় লাগত। লোকটা লাফায় আর চেঁচায় বিকট চিৎকার করে, থুথু ছিটোয় খিস্তি করে। রাস্তায় টর্চের আলো জ্বলে ওঠে। বোধহয় একটা গাড়িও দাঁড়াল।

“লোক আইয়া পড়ব। দৌড় মার।”

আমরা বেদম ছুটতে শুরু করি। লোকটা আমাদের খিস্তি করছে আর চেঁচাচ্ছে। মাঠের এদিকটা উঁচুনিচু। আমরা লাফ মেরে মেরে ছুটি। দৌড়তে দৌড়তে আরো আরো অন্ধকারে সরে যাই। সাঁইবাবলার ভাঙা ডাল পায়ে লেগে কাঁটাতে প্যান্টের ওপর দিয়েও পা ছড়ে যায়। দৌড়! দৌড়!

শালা না হল গয়না, না হল নোট, এখন মুখে থু থু শুকোচ্ছে, বুক ধড়ফড় করছে—মুরগি রেস চলছে। খেলার মাঠের ভেতর দিয়ে আড়াআড়ি তারপর বিলের ধার দিয়ে ডাঁই করা শুকনো কচুরিপানা, মরা গুগলির খালা মাড়িয়ে ধপ্ ধপ্, ধপ্ ধপ্—এ কী গলতা রে বাবা। হাতে জ্বালা করছে। রাগ হচ্ছে কালমনের ওপরেও। গ্যাস খেয়ে তোর বেলাইনে যাওয়ার দরকারটা কী? এর চেয়ে শালা পাম্পে গিয়ে গাচটি ধুলে ভালো। এক-এক গাড়ি মাসে পনেরো টাকা, কুড়ি টাকা…ক্লাচ্, ব্রেক, অ্যাক্সিলেটার…ক্লাচ, ব্রেক…

আর দৌড়বার দরকার নই। পেছনে অন্ধকার ছাড়া আর কিছু আমাদের তাড়া করছে না। কোনো চিৎকারও শোনা যাচ্ছে না। ভীষণ হাঁপাচ্ছি। শীত বাড়ছে। মাঠ পেরিয়ে আমরা পাড়ায় ঢুকি। আমাদের লাথিতে রাস্তার ধুলো ওড়ে। লোকটা এরকম করবে আমরা ভাবতেও পারিনি। দুজনের কেউই এ নিয়ে কোনো কথা বলি না। আমাদের মধ্যে তর্ক জমে ওঠে ডিস্কো ড্যান্স নিয়ে। কালমন বলে মিটুল সবচেয়ে ভালো ডিস্কো নাচে। আই অ্যাম এ ডিস্কো ড্যান্সার। আমি বলি নামাকহালালে অমিতাভ বচ্চন দেখিয়ে দিয়েছে ডিস্কো ড্যান্স কাকে বলে। আমরা ছেনতাই করতে পারিনি। হাতে লেগেছে আমার। কেটে গেছে। তাতে কী?

কালমন ছুরিটা বের করে মাটিতে ফেলে রেখে ছুরিটাকে ঘিরে নাচতে শুরু করে। আমিও নাচতে শুরু করি। একটা একলা আধবুড়ো মাউড়ার কাছে ঝাড় খেয়ে যাওয়ার কথা কে মনে রাখতে চায়? আর তাতেই-বা কী? লোকটাকে আবার যদি কখনো একা পাই! আমাদের দুজনের চোখেই লোকটা আধলা ইটের বাড়ি খেয়ে থুবড়ে পড়ে যায়। তারপর আমরা দুজনে লোকটার দিকে এগিয়ে যাই। লোকটার সারা মুখে রক্ত। তার ওপরেই আমরা লাথি মারি। আমাদের হাতে, ছুরি, বল্লম, পাইপগান। দুজনেই মুখ দিয়ে ইলেকট্রনিক বাজনার শব্দ করতে থাকি। কোমরের তলা ধেকে অদ্ভুত ভাবে কাঁপতে থাকে আমাদের শরীর। মিঠুন আর মোগলাই। বচ্চন আর কলমন। বাঁচকে রহনা রে ববা…বাঁচকে রহনা রে। আমাদের ঘিরে চাঁদ, রাস্তার আলো, এরোপ্লেনের আলো জ্বলে আর নেভে। তারা খসে পড়ে টুনি বালব ফিউজ হওয়ার মতো। ডিস্কো লাইট।

১৯৮৫

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev