পাঁচুগোপাল খুব নিরীহ লোক। ভোর চারটের সময় ও আর ওর বউ ফাস্টঁ ট্রেন ধরে। তখনো অন্ধকারে লোক চেনা যায় না। ভোরের গাড়ি না রাতের গাড়ি। গতর টেনে কোনো ফিকিরে চড়ে বসলেই যে যার মতো ঘুমিয়ে পড়ে। পয়তাল্লিশ মিনিটের ঘুম সেরে পাঁচুগোপাল তার স্টেশনে নেমে পড়ে। বলা যায় এখান থেকে কলকাতার শুরু। কলকাতার আর এক ওভারব্রিজ জংশন বেপাত্তা রংবাজদের এলাকায় পাঁচুগোপালের বউ মৌরি ডালকলে কাজ করে। বউকে ছেড়ে দেয় পাঁচুগোপাল ট্রনের হাতে। নেমে বিড়ি ধরিয়ে লাইন টপকে উলটো প্লাটফর্মদিয়ে উঠে আসে। সাড়ে পাঁচটার মধ্যে গণেশ দেবনাথের তিনশো রিকশার মধ্যে একটাকে পাঁচুগোপাল লাইনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
পাঁচুগোপালকে আমি খুব ভালোবাসি। ও ঠাকুরের ভক্ত। লোকে গালিগালাজ করলে ও মুখ বুজে মেনে নেয়। এটাও লাইন হিশেবে সঠিক। কারণ দু-একটা কেস বাদ দিলে যারা বাজারে খিস্তিখাস্তা করে, একে ওকে চড়-চাপড় লাগায় তাদের হয় সিনার জোর নয় পার্টির জোর আছে। আজ যে খুচরো নেই বলে খচে গেল, চড় মারল কাল সেই মালফাল খেয়ে দশ টাকা দিয়ে দেবে। একেবারে সেন্ট পার্সেন্ট হারামি কেউ নেই। থাকলেও ঠাকুর তাকে শাস্তি দেবে। পাঁচুগোপালের কাছে ঠাকুরের বই আছে। গলায় লকেট আছে। রিকশার পেছনে নিজের খরচে পাঁচুগোপাল ঠাকুরের নাম লিখেছে—শ্রীশ্রী—ঠাকুরের দয়ায় রিকশা চালনা করি ইতি পাঁচুগোপাল। সত্যি কথা বলতে এত ম্পষ্ট করে নিজের বিশ্বাসের কথা অকপটে পাঁচুগোপালের মতো লোকরাই বলে। পাঁচুগোপাল কাউকে ঢপ দেয় না। অকারণে ভাট্ বকে বিরাট গেঁড়ে সাজতে চেষ্টা করে না। পাঁচুগোপাল তার বউকে ভালোবাসে। পাঁচুগোপালের বউ মৌরির চেহারা গড়ন সব যেমনটি হওয়া উচিত তার চেয়ে একটু বাড়তি হলেও এখনো তার বাচ্চাকাচ্চা হয়নি। পাঁচুগোপালের মতে ওটা ঠাকুরের ব্যাপার। সবার সবকিছু হয় না। ঠাকুরের কল্যাণে দুজনার রোজগারে ভালোই চলে যায়। পাঁচুগোপাল কখনো খিস্তি করে না। একটা লোককেও হিংসে করে না। কিন্তু পাঁচুগোপালের গোপন কয়েকটা অ্যাডভেঞ্চার আছে। সেগুলো তার কাছে প্রায় রূপকথার মতো। সেগুলো আমি ছাড়া আপাতত কেউ জানে না। অবশা এই গল্পটা পড়ে ফেললে সকলেই জেনে যাবে। তাতে খুব একটা কিছু এসে যায় না। কারন পাঁচুগোপালের আসল নাম আলাদা। তার বউয়ের নামও আলাদা। ঘটনাগুলোও কৌশলে ওলটপালট করা আছো জানবার চেষ্টা করলেও উপায় নেই।
পাঁচুগোপালাক আমি খুব পছন্দ করি বললে ঘাটতি থেকে যায়। ওকে আমি প্রায় শ্রদ্ধাই করি মানে বেশ মান্য বলে মনে করি। এতই যে ভালো সেই পাঁচুগোপাল গত পনেরো বছরে অনেক কিছু দেখেছে। কংগ্রেস বনাম সিপিএম, সিপিএম বনাম নকশাল, নকশাল বনাম পুলিশ, পুলিশ বনাম সিপিএম, কংগ্রেস বনাম কংগ্রেস—এসব তো হুদো হুদো ঘটনার সে সাক্ষী। এ তো গেল বড় ব্যাপার। এই জাতীয় টক্করে মার্ডার হলে, বডি পাওয়া গেলে, মাথা পাওয়া গেলে দোকানপাট বন্ধ হয়, রাস্তাঘাট খালি হয়, কাগজে বেরোয়, কত লোক জানতে পারে। কিন্তু ছেঁদো বা পাতি ক্রাইমও তো হয়। এক শালা মিনিবাসের ড্রাইভার বাসমালিকের বউয়ের সঙ্গে খুব পেখম মেলে হাওড়া-শেয়ালদা করছে। একরাতে ব্যাটাকে মাল খাইয়ে আউট করে, বোঝাই যাচ্ছে কে করতে পারে, রেললাইনে পেতে দিয়ে গেল। দুটো পা, ধড় ও থ্যাঁতলানো মুণ্ডু, কাটা হাত। তার পরদিন রহস্যময় এক পদ্ধতিতে পলিটিক্যাল কেস হয়ে গেল। আবার সেই গ্যাঁজগ্যাঁজানির ফেনাও থিতিয়ে গেল। পুরো কারবারটা ওয়াচ করে গেল পাঁচুগোপাল। এইভাবে সে বিশেষ অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছো তবে আমি দেখেছি মৃতের প্রতি পাঁচুগোপালর বড়ই এক আন্তরিক ও জ্যান্ত টান রয়েছে। অনেক যুবকের মৃতদেহের সঙ্গে সে শ্মশানে গেছে যেখানে যেতে বুকের পাটা লাগত। ঝক্কি থাকত। এ তো আর পুতলখেলা নয়। জ্যান্ত মানুষের মরা পুতল। তাকে গুলি করা হয়েছে বা পিটিয়ে খুঁচিয়ে শেষ করে দেওয়া হয়েছো পাঁচুগোপালের এই সিভিক কারেজ আছে অবশ্য এ ব্যাপারে একটা কথা বললে বোধহয় পাঁচুগোপালের নিন্দে করা হবে না। ওর চেহারাটা এমনই নিরীহ ও করুণ যে ও যদি ইলেকট্রিক চুল্লির দোরগোড়ায় উবুহয়ে গালে হাত দিয়ে বসে থাকে কোনো সার্জেন্ট, কমিশনার, ডিসি, ডিডি কারো বোঝার ক্ষমতা নেই যে পাঁচুগোপাল একটি নির্দিষ্ট মানসিক অবস্থান থেকে এখানে এসেছে। মনে রাখবেন মাঝরাতে বা অনেক সময় প্রায়ই শ্মশানে যাওয়া আজ থেকে বছর চোদ্দ-পনেরো আগে খুব সহজ ছিল না।
এখন তার নাম হয়েছে ফোয়ারা। ফোয়ারা বেশ্যা। অনেকেই অবগত নন যে কলকাতার দক্ষিণ শহরতলিতে একটি পট্টি রয়েছে। কালীঘাটের, টালিগঞ্জের বা লকার মাঠের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে চালাক সেজে লাভ নেই সেখানে ফোয়ারা রোজগার করে। পাঁচুগোপাল তার খোঁজখবর রাখে। কারণ আর কিছুই নয় সে তার পাশের গ্রামের মেয়ে। অনেকদিনের চেনা। এই ফোয়ারার গল্প একবার লিখে আমি ফোয়ারাকে সভা সমাজে পরিচিত করতে ও নিজের নাম ফাটাতে চেষ্টা করেছিলাম। কোনোটাই হয়নি। যাই হোক ফোয়ারা সেখানে এক বুক চওড়া এক গলিতে এক পা কাদার মধ্যে বসানো ইটে রেখে অন্য পার গোড়ালি দিয়ে দেয়ালের শ্যাওলা ঘষে চলেছে। এবং নিজস্ব নিজস্ব করে তার একটা সৌন্দর্যও আছো পাঁচুগোপাল মাঝেমধ্যে সেখানে যায় এবং ফোয়ারাকে বিনা পয়সায় রিকশায় বসিয়ে কয়েক পাক ঘুরে আসে, হাওয়া খাওয়ায়। পাঁচুগোপাল বিনা ভয়ে তার বউকে সবটা বলেছে ও মিথ্যে কথা বলে না। ওদের এই বন্ধুত্বের ব্যাপারটা বেশ সাহসের। ওখানে পাঁচুগোপালকে সকলেই সজ্জন মানুষ ও ঠাকুরের সেবক বলে জানে। দাঁড়িপাল্লার দুনিয়ায় এটা কম কথা নয়। অপ্রকাশিত থাকুক ফোয়ারা ও লেখকের সম্পর্ক।
এমনই যে পাঁচুগোপাল সে কিন্তু একবার বেপরোয়া রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিল এবং বিশেষ একটি কাজের জন্যে সিটের তলায় গামছায় জড়িয়ে একটি দেশী রিভলভার আমার এক মুখচেনা লোকের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল। কথাটা ছিল পৌঁছে দেবার। কিন্তু তার পরের ঘটনাটাই কেচ্ছা।
তখন ঘোর শীত। বাদা অঞ্চলের একটি গোপন কারখানা থেকে মালটি পাঁচুগোপাল এনেছিল স্যাম্পেল হিশেবে দেখানোর জন্য। বলাই বাহুল্য যে পাঁচুগোপাল তখন ভেবেছিল যে এই রিভলভার গর্জে উঠবে গরিবের স্বার্থে। কারণ খাওয়া পরার অভাব ও নিত্য অনিশ্চয়তা এত থানাপুলিশের বন্দুকের জোরে বজায় থাকে যে জ্যোৎস্নায় অল্প কাদা হলে চাঁদের টানে মাছ যেমন খেপে যায়, ঘুরপাক খেতে থাকে তেমন মত্ত না হয়ে উঠলে চলবে না। গামছায় মোড়া ঠাণ্ডা নল হাতে টের পেয়ে পাঁচুগোপাল তো ঢুকে পড়েছিল। বিশারদকে দেখাবার জন্য পাঁচুগোপাল একটি বুলেটও এনেছিল। অনেকটা ছোট মাপের লিপস্টিকের মতো দেখতে। মৌরি লিপস্টিক বলে না, বলে ঠোটমিষ্টি। কিন্তু সে যে কি বিশ্রি ও বদ্খত রিভলভার যে ভাষায় এর নিন্দে করা সম্ভব নয়। প্রথমত নলচে যে কি টেম্পারের লোহায় তৈরি তা ভগবান জানে আর বিদঘুটে কাঠের বাঁট, ঘষে গেলে কাঠের আঁশ বাঁশের চোঁচের মতো ফুটে যেতে পারে। এবং একটা গুলি ফুটোলে পরের ফুটোতে গুলি ভরে গরম চেম্বারটি ঘুরিয়ে কাঁটার লাইনে আনতে হবে। বিশারদ দেখল মালটি অত্যন্ত ভারী এবং এর থেকে ফায়ার করা অসম্ভব কারণ ট্রিগার ঘিরে যে গোল পাতটা আছে তার মধ্যে আঙুল ঢোকে না। এমনই ব্যাদড়া কড়া স্প্রিং যে ট্রিগার নড়ে না। পাঁচুগোপাল জানতে পারল যে এরকম রদ্দি ও খাজা মাল চলবে না। এই হাই রিস্ক্ নিয়ে এরকম বিকট জিনিশ আনার কোনো দরকার নেই অতএব বিমর্ষ পাঁচুগোপাল ফের সেই বিরাট ও বেঢপ হাতবন্দুক নিয়ে রওনা দিল। কিভাবে সে ফেরত গিয়েছিল বলে লাভ নেই, ধৈর্যে কুলোবে না। যাইহোক, পাঁচুগোপাল বশীর নামধারী সেই ওস্তাদের ডেরার চারদিকে পুলিশ দেখে কোনোমতে উধাও হয়েছিল। এবং তখন একটি জায়গায় সেই হাস্যকর মারণাস্ত্রটিকে বিসর্জন দিয়েছিল যেখানে পুলিশ কখানো যাবে না কারণ সে জায়গাটি বড়ই জটিল। সেখানে চারদিকে লক্ষ লক্ষ মুণ্ডু সোঁদা হাওয়ায় পচছে। মুণ্ডুগুলো কিন্তু মানুষের নয়। চিংড়ির। চিংড়ির ধড় এক্সপোর্ঢ হয়। মুণ্ডু হয় না। অতএব মুণ্ডু ফেলা হয়। লক্ষ মুণ্ডুর তলায় এখনো হয়তো কিম্ভুত সেই রিভলভার রয়েছে। পাঁচুগোপাল এই ঘটনাটি মাঝে মধ্যে ঘুমন্ত বা জাগ্রত অবস্থায় ভাবে ও ঘামে। এও বোধহয় ঠাকুরেরই ইচ্ছা। পাঁচুগোপালের সঙ্গে তার ঠাকুরের এরকম কাল্পনিক কথোপকথন হয়তো হয়।
—পাঁচুগোপাল, আজ কি করলি বল।
—আজ্ঞে, আজ ঠাকুর আপনারে স্মরণ করিচি।
—করেচিস?
—হাঁ, ঠাকুর।
—দুনিয়ার মতিগতি কি বুঝলি?
—আমি কি বুঝব ঠাকুর। অশিক্ষাত লোক।
—এটা কিন্তু মনের কথা বললি না।
—মনের কথা কেউ বোঝে না ঠাকুর। মন বড় দুঃখ পায়। কষ্ট পায়।
—আমারও পেত।
—বন পোড়ে সবাই দেখে ঠাকুর। মন পোড়ে কেউ দেখে না।
বর্ষায় পাঁচুগোপাল ভিজে ভিজে রিকশা চালায়। হাওয়ার দমকায় রিকশা টানাই যায় না। প্যাডেল হড়কে যায়। এরকম এক বৃষ্টির রাতেই আমার সঙ্গে পাঁচুগোপালের প্রথম আলাপ। লোডশেডিং। কুপকুপে অন্ধকার। আমরা কিন্তু ছোট রাস্তা দিয়ে ঝকঝকে আলোয় এলাম। অথচ পাঁচুগোপালের রিকশায় আলো ছিল না। পাঁচুগোপাল একটা প্রাইভেট গাড়িকে কিছুতেই সাইড দিচ্ছিল না। সাইড দিলে তো আর হেডলাইটের আলো পাওয়া যাবে না। বড়লোক আলো দেখাবে। গরিব উতরে যাবে। এ আবার কোথাকার লাইন?
পাঁচুগোপালের দারুণ ইচ্ছে যে সে রিকশা চালিয়ে টাকা জমিয়ে তার দেশে চলে যাবে। সে বড় অদ্ভুত দেশ। খালি মাঠ আর মাঠ। গাছপালা কম। সেই মাঠের মধ্যে কোথাও বিড়ির দোকান বানাবে। অনেক হাটুরে ওই মাঠ ভাঙে। তারা কিনবে। অবশ্যই পাঁচুগোপাল এ মাঠে দাঁড়িয়ে তারা খসে পড়া দেখেছে। দেখে থাকতেই পারে। তবে ওর বুদ্ধি চট করে উপস্থিত হয়। তারা খসে পড়া দেখতে নেই। অমনি পাঁচুগোপাল চোখ বন্ধ করবে।
মজা ভেড়িতে একসময় নরম কাদায় খোঁটা পুঁতে, মাচা বানিয়ে বোমা বাঁধার কারবার বসত। ঘষ ঘষ করে পায়ের আঙুলের ফাঁক দিয়ে সুতলি দড়ি এসে কেরাসিনে ভেজানো মোমছাল পটাশের পরাণপুঁটলির চারপাশে জড়ায়—এই ঢুকে গেল পেরেক, লোহার কড়াই ভাঙা, বলবিয়ারিঙের গুলি—আবার সুতলি জড়ায় ঘষঘষ করে। বিড়ি বাঁধার মতোই সহজ ব্যাপার। সেখানে মেছোকালীর হাতে বোমা ফেটেছিল। পেট ঝলসে, হাত উড়ে, চোখ বেরিয়ে ঝুলছে। মেছোকালী চেঁচায়—মা। মাগো। পুড়ে যেতেছে! বাঁচাও গো। তালগাছতলায় ভিড় হয়ে যায়। পাঁচুগোপাল খবর পেয়ে মাঠ ভেঙে দৌড়ে ভীমের দোকানের তক্তা সরিয়ে দুবোতল রসা ডিস্টিলারির কানট্রি স্পিরিট বা দেশী মদ হাতিয়ে নিয়ে দৌড়য়। দূর হটো তো সব। দেখছ না বেদনায় কেমন করতেচে মানুষটা। ঢক ঢক করে মেছোকালীর মুখে মাল ঢালে পাঁচুগোপাল। ঢেলেই চলে। মেছোকালীর টাকরা তালু সব ঝিমঝিম করে। ছটফটানি কমে আসে। সবাই ভাবে টেঁসে গেল। কিন্তু মানুষের জান তো আর দান-খয়রাতির বস্তু নয়। অচৈতন্য মেছোকালীকে রিকশায় তুলে পাঁচ পাবলিক ছুটতে থাকে ডাক্তারখানায়। হাসান ডাক্তার জল ফুটোতে বলে। সঙ্গে সঙ্গে একজন কলাপাতায় মুড়ে মেছোকালীর আঙুল এনেছিল। ফেলা গেল। মেছোকালী কিন্তু কোটরকানা আধপোড়া মুখ নিয়ে নুলো হয়ে বেঁচে রইল। হাসান ডাক্তার পাঁচুগোপালের বুদ্ধির তারিফ করে।
—বুদ্দি করে মদটুকু খাইয়েছিলি বলে কত কম হুজ্জুতি হল বল দিকি।
—না মানে ভাবলাম জ্ঞান থেকে কষ্ট পাচ্চে তো।
অজ্ঞান থাকলে কষ্ট কম। ঠাকুরের ওপর অটল বিশ্বাসে পাঁচুগোপাল অজ্ঞান। তাই তার কষ্টও কম হয়। তবে নিজের কষ্টটুকুই। অন্যের কষ্টে পাঁচুগোপাল চুপ করে থাকে না। পাঁচুগোপালকে কতবার আমি ঝামেলা ফৈজতের এই পথ থেকে সরাতে চেষ্টা করেছি খচ্চর না হলে করতে পারবে না এমন কাজ জোগাড় করে দেওয়ার লোভ দেখিয়েছি। লাভ হয়নি। অন্যের কষ্ট দেখলে পাঁচুগোপালের সাহস মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। কুষ্ঠ হাসপাতাপর ফালতু জমি যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে একটা পনেরো ইঞ্চি চওড়া পাঁচিল আছে সেখানে আমাদের এলাকার নেতারা পা ঝুলিয়ে বসে তিলজলার টোকো চালাই খায়। ঢিমেতালে হাওয়ায় হাওয়ায় আমেজ আসে বলে এই মালের নাম আছে। এখানই কে কোথায় টিউবওয়েল বসাবে রাস্তা খুঁড়বে বা মাটিসিমেন্ট সাপ্লাই দবে সব ঠিক হয়। সেখানে গিয়ে একরাতে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো রিকশা নিয়ে পাঁচুগোপাল এসে হাজির।
—বাবু আপনাদের দুপায়ে পড়ি। এক্কুনি চলেন।
—কেন রে? কি হল?
বাবু সে হবে আপনাদের সব ছেলেরা প্লাটফম্মের ওপরে এট্টা ছেলেরে, হায় ভগবান, সে কি পেটনই দিচ্ছে। ছেলেটাকে বাঁচান।
—কেন? মারছে কেন?
—ছেলেটা দোষ করেচে বাবু ওর কাছে চোলাইয়ের ব্লাডার ছিল। তরকারির ঝুড়ির তলায়।
বিভিন্ন দলের নেতাদের বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি সমাজবিরোধী কর্মসূচি চলছিল। সেই ক্যাডারদের হাতে রিকশা স্ট্যান্ডে একটা ছেলে ধরা পড়েছে। তার কাছে চোলাইয়ের ব্লাডার ছিল।
মারতে মারতে ছেলেটাকে উদোম ন্যাংটো করে খোয়ারাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে স্টশনে নিয়ে আসা হয়েছে। ওর বুকে ব্লাডার ঝোলানো। চারপাশ থেকে বেদম মার চলছে। ঠোঁট ফেটে ছিঁড়ে ঝুলছে। রক্ত গড়াচ্ছে সারা শরীর দিয়ে। ছেলেটা কয়েক পা করে হাঁটছে। পড়ে যাচ্ছে। লাথি খেয়ে আবার উঠছে। ছেলেটাকে ওরা একটা কথা বার বার শ্লোগানের মতো করে বলাচ্ছে-
—আমি চোলাই বিক্রি করি, ব্লাডার আমার বুকে। আমি চোলাই বিক্রি করি।
এইসব সময় মার কখনো থামে না। যখন লোকটা মরে যায় সেটা বোঝার পরেও অনেক সময় মার চলতে থাকে। অনেক লোক মিলে মারছে। সমাজের থেকে এই সাংঘাতিক পাপীটাকে দূর করা একান্ত ও চূড়ান্তভাবে দরকার। এটা ভালো কাজ। দরকারী কাজ। অনেক লোক যারা ট্রন ধরবে তারা দেখছে। লজ্জা লাগে তবু মেয়েরাও দেখছে শিশুরাও দেখছে। শিশুদের এরকম দৃশ্য দেখা খুবই জরুরি কারণ এর ফলে তাদের সামাজিক সচেতনতা আরো বাড়বে। ভবিষ্যতে কোনো পাপীকেই তারা রেয়াদ করবে না। প্ল্যাটফর্মের পেচ্ছাপখানার সামনে ছেলেটা আবার মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। বল শুওরের বাচ্চা—
—আমি চোলাই বিক্র করি, ব্লাডার আমার বুকে। আমি চ্চালাই বিক্রি করি…
ওরা ছেলেটাকে প্ল্যাটফর্মের শেষটা যেখানে ঢালু হয়ে অন্ধকারে মিশে গেছে সেখানে নিয়ে যাচ্ছিল। একটা লোহার রেলিং ভাঙা টুকরো ওরা জোগাড় করেছিল। সেটা গলার ওপরে রেখে দুপাশ থেকে দুজনে চাপ দেবে পা দিয়ে। কিন্তু ওখানে তখন পাঁচুগোপালের রিকশায় চড়ে দুজন নেতা এসে গিয়েছিল।
পাঁচুগোপাল ঠাকুরের লকেট চেপে ধরে। ঠাকুর তাকে সারাদিন রিকশা চালাবার জোর দিয়েছেন, ঠাকুর তাকে জলমুড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, ঠাকুরই তাকে এই ওভারব্রিজে তুলছেন, এই মাটিতে আছাড় মারছেন। ঠাকুরের ইচ্ছাতে রিকশার চেন খুলে যায়। রবার টিউব ফাটে। অথচ দিন তো চলে যায়। তাই-বা কম কি?
পাঁচুগোপালের কারো ওপর রাগ নেই। পুলিশের ওপরেও না। অথচ সেই পুলিশ এসে বিনা কথায় বিনা দোষে রিকশার সিট তুলে নিয়ে চলে গেল। সিট ছাড়াতে পাঁচুগোপাল থানায় যেতে ভাগ্যে জুটল লক্আপ। পাশের ঘরে ছেনতাইদের পিটুনি চলে। সারারাত চিৎকার গোঙানির। পাঁচুগোপাল, একটা চোর আর একটা রেপ কেস লক্ আপে রাত কাটায়। পেটি কেসে ফাঁসে। সেখানে অনেক আসামির মেলা বসেছে। পাঁচুগোপাল সব মিলিয়ে আশি টাকা খরচ করে পুলিশ আদালত থেকে ছাড়া পেয়ে সিট বগলে করে দুদিন পরে স্ট্যান্ডে এসে দেখে ডালকলের কাজ ছুটি করে মৌরি তার খবর নিতে এসেছে। দুজনে খুব খশি।
পাঁচুগোপাল ফলিডল খেয়েছে, শুনেছেন? হতেই পারে না। আত্মঘাতী সে কি করে হবে যে নিজের কথা ভাবে না। অবশ্য দুশ্চিন্তা থাকে। সেই বিদঘুটে রিভলভার যদি পুরোনো বন্ধুর মতো ফিরে আস? আসলে ওর বুকের খাঁচায় রিভলভারের পাখি পোষা আছে। মাঝ মাঝে ঝটপট করে। টাকা জমালে ব্যাঙ্কের লোন নিয়ে একটা নতুন রিকশা বার তো করাই যায়। মালিকের রেট তিন টাকা থেকে দেড় লাফে পাঁচ টাকা হয়েছে। নতুন রিকশার দেড় হাজারের কমে ঘোমটা খুলবে না। তবে গ্যারান্টি দেবার লোক চাই। মৌরি সেই রিকশায় চড়বে। ফোয়ারাও চড়বে। পুলিশ এসে যখন তখন সিট নিয়ে যাবে। পেটের মধ্যে ডিম ফেটে পালক উড়বে মেছোকালীর। মাঠের মধ্যে বসে পোড়া মুখের গর্তে মদ ঢালতে হবে। সমাজ-বিরোধীকে বাঁচাতে ছুটতে হাবে সমাজপতিদের ডেরায়। ঠাকুরের লকেট ঝুলছে গলায়। কি উপায়?
না। ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে নয়, গ্যাস চেম্বারে বা ইলেকট্রিক চেয়ারেও নয়। হাসপাতালে তো ভাবাই যায় না। আমার কল্পনায় পাঁচুগোপালের মৃত্যু হবে এইভাবে। অবশ্য ঘটনাটা সে নিজেই কিছুটা আমাকে বলেছে।
একটা খাল আছে। কানাখাল হলেও তাতে জল টলটল করত। মাছ হত। এখন তার গোটা জল নষ্ট, কালো। তার দুপাড় দিয়ে বিরাট চোলাই তৈরির কারখানা গমগম করছে। মালিক আছে, পুলিশ আসে। পুলিশ আসে, অনেক লোক কাজ করে। তারা মাথায় বড় বড় জেরিক্যান ঝুড়িতে বসিয়ে টেম্পোয় গিয়ে মাল লোড করে। রিকশা-ভ্যানে তোলে। সেই মাল কলকাতায় চলে আসে। ইথাইল অ্যালকোহলের সাপ্লাই নেই বলে দিশী মদ বা বাংলা মাল এখন পাওয়া যাচ্ছে না। ডিস্টিলারিগুলো কিছু সেন্ট দেওয়া রং করা মদ বাজারে ছাড়ছে। ঝানু খদ্দেররা ওতে পটে না। চোলাই এখন ক্যাপচার করছে বাজার। করুক গে যাক, ওই কানাখালে ডিস্টিল করার পর বাতিল নানারকম জিনিশ ফেলা হয়। খালের জল এখন কালো হয়ে গেছে। ওপরে বিষের সর ভাসে। সেই নষ্ট জলে সূর্যের ছায়া গ্রহণের মতো দেখায়।
পাঁচুগোপাল একদিন ওই খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে জলে নোংরা ফেলা বন্ধ করতে বলবে। ওরা শুনবে না। ওকে ধরে মালিকের কাছে নিয়ে যাবে। মালিক জানতে চাইবে ও চোলাই কারখানায় কাজ চায় কিনা। পাঁচুগোপাল ভ্যাটের জালায় থান ইঢ মারবে। ওরা তখন পাঁচুগোপালকে পিটিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলবে। ও মরবে চোলাইয়ের মালিকের পায়ের তলায়। রক্ত বেরোবে ওর মুখ দিয়ে। ও মরবে।
সুখের কথা যে পাঁচুগোপাল এখন মরেনি। এখনো ও নিজের মতো করে বেঁচে আছে। পাঁচুগোপাল যেভাবে বেঁচে আছে চলতি সমাজের হিশেবে সেটাই ভালো থাকা বা ভালো হয়ে থাকা। কিন্তু এভাবেই যে সে সব সময় চলবে তেমন নাও হতে পারে। অভিজ্ঞতা, ভুলচুক থেকে ও হয়তো ভেতরে ভেতরে কিছু ঠিক করছে। অতএব ভবিষ্যতে সে কি করে দেখা যাক। অনেকদিন হল আসছে না। ওর কথা দেওয়া আছে আমাকে একবার বাদায় নিয়ে গিয়ে বনবিবির পালা শোনাবে। তবে পুজোর আগে যে একবার দেখা করবে সেটা আমি জানি। আরো সুখের কথা যে দেখা করবে তার নাম পাঁচুগোপাল নয়।
১৯৮৫