আমি বাংলা নববর্ষ উদযাপন কমিটির সম্পাদক সর্বদমন ব্যাটবল, সরি বটব্যাল বলছি। আসলে সন্ধ্যায় আজ নববর্ষের গান, আবৃত্তি বক্তৃতার পর একটু বেশি মদ খাওয়া হয়ে গেল। তাই জিভটা কেমন নিজের বশে নেই, জড়িয়ে যাচ্ছে। সভাপতি মশাই দীনবন্ধু মাল বললেন, ‘সারাদিন বাঙালি খাবার খেয়ে শেষ পাতে একটু বিলিতি হবে নাকি বটব্যাল মশাই?’
অমনি আমার নোলা লকলক করে উঠল। বললাম, ‘বিলিতি খেয়ে নববর্ষের উপসংহার হোক।’ তবে হুঁপোয় পড়ে একটু বেশিই খাওয়া হয়ে গিয়েছে।
হঠাৎ দেখি চারিদিক নিঝঝুম। কেউ কোথাও নেই। মাথার ওপর পেঁচা ডাকছে। একটা পার্কের বেঞ্চে আমি শুয়ে আছি। ভালো করে চারপাশে তাকিয়ে দেখি, নির্জন জায়গা। হঠাৎ আমার নজরে পড়ল আমার পাশের একটা বেঞ্চে এক ভদ্রলোক বসে কী যেন মন দিয়ে লিখছেন। ধড়মড় করে উঠে বসলাম। ভূত নাকি?
আমার উঠে পড়া দেখে সেই ভদ্রলোক আমার দিকে তাকালেন। আবার একমনে লিখতে লাগলেন। বেশ কিছুক্ষণ পরে আমার মনে হল, এ যদি ভূতও হয়, তবে আমার কোনও ক্ষতি করবে না। তাছাড়া ভূতেরা এত মন দিয়ে পড়াশোনা করে না।
আমি সাহস করে একটু একটু করে তাঁর পাশে গিয়ে বসলাম। খাতার দিকে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করলাম, কী লিখছেন উনি।
আমার ঘাড় বাঁকানো দেখে সরাসরি আমার দিকে তাকালেন সেই আধিভৌতিক মানুষটি। আমি মুখে হাসি টেনে বললাম, ‘এত রাতে কী লিখছেন? তাছাড়া এই পার্কে আলোও কম, দেখতে পাচ্ছেন কী করে?’
তিনি বললেন, ‘আমি একটা লেখা লিখছি। বিষয় হল— এবারের বাংলা নববর্ষ। সারাদিন ঘুরে ঘুরে দেখে এখন অভিজ্ঞতার কথা লিখতে বসেচি।’
আমি বললাম, ‘আপনি লেখক? বাহ শুনে খুব খুশি হলাম। আমি একটু আধটু লেখার চেষ্টা করি। তা মশাই আপনার নাম কী?’
উনি বললেন, ‘আমার নামটা একটু অদ্ভুত। আমাকে কি চিনতে পারবেন?’
আমি বললাম, ‘নাও চিনতে পারি, তবে এই সময়ের কোনও এক নব্য লেখকের সঙ্গে সাক্ষাৎ তো হবে।’
উনি বললেন, ‘আমি নব্য নই, প্রাচীন। একসময় বাঙালির ঢিলেমি, হুচুকপনা, ছুঁচোর কেত্তন নিয়ে একটু আধটু লিখেচি। সেসব বোধহয় আজ আর কেউ পড়ে না। আমার নাম হুতোম প্যাঁচা।’
আমি বললাম, ‘আপনি হুতোম প্যাঁচা, আপনি বাংলা সাহিত্যে রসরচনার অন্যতম উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব ঠাকুরদা। আপনার লেখা এখনও অনেকে পড়ে। আপনার ওই নকশাবাজি লেখা, মানে থুড়ি নকশা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়।’
শুনে হুতোমের মুখে হাসির রেখা। বললেন। ‘বেশ আমি লেখাটা শেষ করে নিই। ততক্ষণ আপনি চুপ করে বসে থাকুন।’
আমি বললাম, ‘তবে একটা শর্তে, লেখাটা শেষ করে আমাকে শোনাতে হবে কিন্তু।’

হুতোম ঠাকুরদা বললেন, ‘বেশ, তাই হবে।’
আমি বসে বসে ঝিমোতে লাগলাম আর সকাল বেলায় ফাইভ স্টার হোটেলে খাওয়া ডুমুর ছেঁচকির হেঁচকি তুলতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরে হুতোম ঠাকুরদা গলা খাঁকারি দিলেন। আমি গা ঝাড়া দিয়ে উঠলাম। বললাম, ‘আপনার লেখা বোধহয় শেষ হয়ে গিয়েছে।’
উনি বললেন, ‘হ্যাঁ, শুনুন।’ তারপর পড়তে শুরু করলেন।
‘লেখাটার নাম দিয়েছি ‘নববষ্যের নকশা’। আজ বাংলা নববষ্য। আজ সকাল থেকে বাঙালি নব আনন্দে জেগে উটেচে। তার মধ্যে একটা ‘বাঙালি বাঙালি’ বাই উটেচে দেকলাম। আজ বাংলা সংস্কিতি ধুয়ে খাওয়ার দিন। বারোয়ারি দুগ্গাপুজোর সময় এখন যেমন চাদ্দিকে একটু ফোক ঢংয়ে প্যান্ডেল ও পিতিমে গড়ার বাই ওটে, তেমনি আজ চোঁয়া ঢেকুরের মতো ‘বাংলা বাংলা’ বাই উটেচে তার। আজ সারাদিন সে বাংলা রসে ডুবে হ্যাঁচোড় প্যাঁচোড় করে ম’লো। রস বলতে তোমরা কতটা ঠাহর কত্তে পাচ্চো, তা বোজাই যাচ্চে। আজ ‘বাংলা’ পোশাক, ‘বাংলা’ খাওয়া, থুড়ি সেই অত্থে তোমরা যাকে বাংলা পানীয় বোজো, এ তা নয়। এ এক অন্য ‘বাংলা’ খাওয়া। আজ অধিকাংশ কেরানি বাঙালি, পোমোটার বাঙালি, ঘুষখোর বাঙালি, লম্পট বাঙালি, মস্তান বাঙালি, সিন্ডিকেট বাঙালি, নেতা বাঙালি, তোলাবাজ বাঙালি, শিক্ষিত বাঙালি, অশিক্ষিত বাঙালি, ধম্মপেঁচো বাঙালি, দু’ চাকার বাঙালি, চার চাকার বাঙালি— সকলেই আজ পকেটের রেস্ত মাফিক ফৌত মারতে বেরিয়েচে। ঘরের পটের বিবি তথা পোসাধনে মোড়া বউরা শুক্তো, ধোঁকা, থোড়, মোঁচা রাঁত্তে জানে না। আজ তাই বড় হোটেলে সেসবের বিপুল আয়োজন লেগেচে। আজ বোঁ চক্কর দিয়ে আগাম টেবিল বুক করে বাঙালিয়ানা ফলানোর দিন। শুক্তো সহযোগে কচু-ঘেঁচুর চচ্চড়ি ‘সুপার্ব’ বলে গলাধঃকরণ করার দিন। আজ সাহাবাবু, সেনবাবু, চাকলাদার বাবু, কুচুটে বাবু, দুপুর ঠাকুরপো বাবু সক্কলে ধুতি পড়েচে। এদিকে অনভ্যাসের ধুতি ফসফস করে খুলচে। কেউ কেউ কোমরে লাগিয়েচে চামড়ার কোমরবন্দনী। গায়ে কাজ করা পাঞ্জাবি। মেমসায়েবরাও আজ গিন্নি সেজেচে। গরদে এক্কারে লক্কী ঠাকুরের মতো সেজেচে। পোতিদিনের জিনস, পালাজো, টপ, কুত্তি আজ ব্রাত্য। ইনলিশ মিডিয়ামে পড়া বাচ্চাদের পরনেও চোস্ত পাঞ্জাবি। সব পোশাক থেকেই ম ম করে সেন্টুর বাস বেরুচ্চে।
নানা মল ও ক্লাইম্যাক্সে পেমিক-পেমিকাদের ঢলাঢলিও নজরে পড়ে।….’
আমি বললাম, ‘ঠাকুরদা, ওটা ক্লাইম্যাক্স নয়, ওটা হবে মাল্টিপ্লেক্স।’
হুতোম প্যাঁচা একগাল হেসে বললেন, এই দ্যাকো, আপনাদের এইসব নতুন, নতুন নাম ঠিকমতো মনেও থাকে না। আবার বড় বড় বাজারের নাম নাকি মল। বাপরে, আমরা তো ভাবতেই পারি না। আবার দেখি মলে বসে সব গোগ্গাসে গিলছে। কী যে তোমাদের রুচি আর সংস্কিতি। যাকগে শোনো একটু পরে আলো ফুটে যাবে। আমাকেও চলে যেতে হবে।’
আমি বললাম, ‘পড়ুন ঠাকুরদা।’
হুতোম আবার পড়তে শুরু করলেন, ‘ওদিকে তখন সন্ধ্যা নেমেছে সব ব্যবসা পাড়ায়। চিৎপুর, বড়বাজার, ওদিকে বউবাজারের সোনার দোকান, জামা কাপড়ের দোকান, গড়েহাটের হকার বাজার সব জমজমাট। দোকানের ভেতর থেকে ফুলের বাস ছড়াচ্চে। চোঁ চোঁ উড়চে কোল ড্রিঙ্কস। বক্সে গান বাজচে ‘নাটু নাটু’ কিংবা ‘ঝুমে জো পাঠান মেরি জান’। চাদ্দিকে একটা ঝিঙ্কু চিকু ভাব। দোকানে উপস্থিত কেতারা কেনাকাটা করে মিষ্টির বাক্স আর ক্যালেন্ডার নিয়ে যাচ্ছে। তবে সেই সব বড় মাপের মিষ্টির বাক্স আর ইদানীং দেখা যাচ্চে না। সেই বাক্স ছোট হতে হতে সিগারেটের প্যাকেটের সমান হয়েচে। ক্যালেন্ডার করার খ্যামতা এখন আর সক্কলের নেই। কল্লেও কালি, দুগ্গা, চৈতন্য, লক্ষী, সরস্বতী, রামকিষ্ণ, বিবেকানন্দ, নেতাজির ক্যালেন্ডার এখন আর কেউ করে না। এখন ক্যালেন্ডার ফিলিম স্টারের ছবি। কখনও রশ্মিকা খানদানি কিংবা আলিয়া ভট্ট। আজ খুব একটা কেউ তা নিয়ে কাড়াকাড়ি করে না। ফ্ল্যাট বাড়িতে কেউ দেওয়ালে ক্যালেন্ডার টাঙায় না ঘাপলুর মতো। গাঁইয়া মনে হয়। ….’
আমি থামিয়ে বললাম, ‘ওটা রশ্মিকা খানদানি নয়, হবে মান্ধানা।’
হুতোম সেটা সংশোধন করে ফের পড়তে শুরু করলেন। ‘এর মদ্যে কালীঘাট আর দক্কিণেশ্বরে ভক্তদের ডালা হাতে হুমড়ে পড়া লাইন। বাঙালির সাড়ে চোদ্দ আনার ব্যবসার আজ ঘেঁটি ধরে নিয়েছে অবাঙালিরা। তার থেকে আপ্পান বাঁচার চেষ্টায় ব্যাবসা বাঁচাতে লক্ষী, গণেশ হাতে মা কালীর শরণাপন্ন বাঙালি। একবার ধাঁই করে ঘুরে এলেম কলেজ ইস্টিট। সেকানেও চলচে নববষ্য পালন। ধাড়ি লেখক, কচি লেখক, ছোঁড়া লেখক, ছুঁড়ি লেখক সব ভিড় করেচে। দেকলাম বাঙালি একন তন্তমন্তের রহস্য মাখা ঘাপলা সাহিত্যে ডুবে আছে। কবিরা কেবল ফ্যা ফ্যা করে ঘুরছে আর বিড়ি টানচে।
তবে সারাদিনের হ্যারিকেন চক্করে যা দেকলাম, তাতে বুজলাম বাঙালির ব্যবসা গ্যাচে, বাণিজ্য গ্যাচে, শিল্প গ্যাচে, সংস্কিতি গ্যাচে, সাহিত্য গ্যাচে, মেরুদণ্ড গ্যাচে, বাঙালির আছে বলতে আদেখলাপনা, ঈর্ষা আর নিচু মন। সব জাতের উচ্ছ্বিষ্ট কুড়োতে গিয়ে নিজস্বতা হারিয়ে বাঙালি আজ দৈন্য। তাই নিয়ে শুধু পাঁচমিশালি কচাল আর কিচায়েন। তবুও বছর বছর নববষ্য আসে। নতুন আশা জাগে পাঁচিলের খাঁজে গজিয়ে ওটা স্বল্পায়ু গাছটার মতোই। সেই আশায় হালখাতার দিন জাবেদা আর খতেনের পাতায় সিঁদুর দিয়ে মাঙ্গলিক চিহ্ন আঁকে। টাকায় সিঁদুরের ছাপ দিয়ে খাতায় লাগায়।
আজ জনে জনে শুভেচ্চা জানানোর দিন। সকাল থেকে পর পর হোটসঅ্যাপে ‘শুভ নববষ্য’ জানানোর দিন। বাঙালি সামনে বলে, সারা বছর ভালো কাটুক। পিচনে বলে, তোর সব্বোনাশ হোক। অনেকে শুভ নববষ্যটুকুও লেখে না। লেখে SV NB. এটাই নাকি আজ কালের রীতি। কারও জন্মদিনে বলে HBD. কারও মৃত্যু হলে লেখে RIP.
এখন সবকিছু ছেঁটে ফেলার সময়। মোবাইল-মাদকের নেশা এই পোজন্মকে বড্ড ছোট করে দিচ্চে। আমাদের সবকিছু ছোট হয়ে যাচ্চে। আমরা পোশাকে ছোট হচ্চি, মাপে, আচরণে, প্রেমে, মমতায়, মূল্যবোধে ছোট হচ্চি। কোরমেই বামন থেকে বামনতর হয়ে উঠচি আমরা। আজ এসব ক্ষুদ্যতাকে চাপা দিয়ে সবাই গদগদ, মাকোমাকো বাঙালি। আজ মনের ছপ্পড় ফুঁড়ে এট্টু বেরিয়ে আসার দিন। প্রতিদিনের খ্যামটা ভুলে আজ একটু নাটুকেপনার দিন।….’
হঠাৎ একটা বেমক্কা ধাক্কায় ঘুম ভেঙে যায়। সামনে দেখি বউ দাঁড়িয়ে। বড় বড় চোখ। আমার মাথা তখনও বোঁ বোঁ করছে। বউ বলল, ‘সেই থেকে কী সব বিড় বিড় করে ভুলভাল বকে যাচ্ছ? আর কাল আমরা চলে আসা পর ওইসব ছাইপাঁশ গিলতে গেলে কেন?’
আমি শুধু চারিদিকে তাকিয়ে বললাম, ‘হুতোম ঠাকুরদা কোথায় গ্যালো?’
অপূর্ব লেখা। রম্য-রচনার খাপে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। প্রিয় লেখককে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি