উত্তরপ্রদেশে অবস্থিত নৈমিষারণ্য হিন্দুদের একটি বিখ্যাত ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, আধ্যাত্মিক, সামাজিক এবং ঐতিহাসিক পবিত্র তীর্থস্থান। শতরূপা ও মনুর তপস্যা ক্ষেত্র এই শান্ত স্নিগ্ধ তপোভূমি। মহর্ষি দধিচি, ব্যাসদেব, মান্ধাতা, দশরথ, রাম-সীতা, পঞ্চপাণ্ডব-দ্রৌপদীর পাদস্পর্শে ধন্য এই ভূমি। বিশ্বামিত্র ও বশিষ্ঠ স্ব স্ব শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য বাকযুদ্ধর সভা বসেছিলো এখানেই।
মহাভারতের আদিপর্বে কথিত আছে, কুলপতি মহর্ষি শৌনক নৈমিশারণ্যে দ্বাদশ বার্ষিক যজ্ঞ করেছিলেন। সেই সময় লোমহর্ষনের পুত্র পুরাণকথক সৌতির আগমন ঘটে। তিনি রাজর্ষি জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন রচিত বিচিত্র মহাভারতের কথা বৈশম্পায়নের মুখে শুনে এসেছিলেন। ঋষিগনের অনুরোধে মহাভারতের প্রথম পাঠ শুরু হয়েছিল এখানেই। কাহিনীর পর কাহিনী শুনেছিলেন শ্রোতারা। আজো এখানে জীবন থমকে দাঁড়িয়ে মন্দাক্রান্তা চালে চলে শোনে এই কাহিনী।

নৈমিষারণ্য মাতা গোমতী
উত্তর প্রদেশের লখনউ থেকে ৪৫ মাইল (প্রায় ৯৫ কিমি) গাড়ী করে আসা যায়। উত্তরে সীতাপুর এবং খয়রাবাদ রাস্তার সংযোগস্থলে নৈমিষারণ্য অবস্থিত। সীতাপুর থেকে ৩২ কিমি এবং সান্দিলা রেলওয়ে স্টেশন থেকে ৪২ কিমি দূরে অবস্থিত। নৈমিষারণ্য নিমসার বা নিমখার নামেও পরিচিত এবং এটি গোমতী নদীর বাম তীরে অবস্থিত। কোলাহলহীন পরিবেশে বনের মধ্যে দিয়ে পিচের উঁচু-নীচু রাস্তা। আগে এখানে গাড়ির প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিলো, এখন পারমিশন দেওয়া হয়।
রামায়ণ অনুসারে, নৈমিষা গোমতী নদীর তীরে অবস্থিত ছিল। মহাকবি কালিদাস রঘুবংশ মহাকাব্যের উনিশ সর্গে শ্রী রামচন্দ্রের নৈমিষারণ্যে আসার কথা বর্ণনা করেন।

গোমতী নদী
স্থানটির সাথে সংযুক্ত পবিত্রতা এমন ছিল যে, রামচন্দ্র এই বনে অশ্বমেধ যজ্ঞ করায় বহু মুনি-ঋষি ও রাজা মহারাজার সমাগম হয়েছিলো। যজ্ঞের নিয়ম অনুসারে, রাম তার ছোট ভাই লক্ষ্মণকে পুরোহিতদের সহায়তায় যজ্ঞের ঘোড়ার দায়িত্বে রেখে নিজে বনে গিয়েছিলেন। যজ্ঞের সময়ই বাল্মীকি তাঁর শিষ্যদের নিয়ে সেখানে আসেন এবং কিছু দূরত্বে কুঁড়েঘর তৈরি করে থাকেন। এখানেই লব এবং কুশ পুরো রাম গুণকথা পাঠ করলেন যা রামকে নিশ্চিত করেছিল যে তারাই সীতার যমজ পুত্র। কথিত আছে, এখানেই বসুন্ধরার কোলে ঠাঁই পেয়েছিলেন মা সীতা।
রামায়ণ বা মহাভারতের মতো পুরানের কথায় এক অদ্ভুত মোহিনী শক্তি আছে। গল্পগুলির মধ্যে মিশে আছে আমাদের লোকাচার ও সংস্কৃতি। সাহিত্যিক নারায়ণ সান্যালের নৈমিষারণ্যের উপর লেখা একটি বই আছে। ১৯৫৫ সালে তাঁর লেখা ‘বকুলতলা পি এল ক্যাম্প’কে শরণার্থী পুনর্বাসনের এক মহাদলিল বলে মনে করা যেতে পারে। পরবর্তীকালে তিনি এই বইয়ের ঐতিহাসিক উপাদানগুলির অনুসঙ্গে ‘দণ্ডকশর্বরী’ ও ‘নৈমিষারণ্যের রূপকথা’ লেখেন।
ভারত ভ্রমণকালে মহাপ্রভু চৈতন্যদেব নৈমিষারণ্যে গিয়েছিলেন। এরপর এখানে গৌড়ীয় মঠ প্রতিষ্ঠিত হয়। সন্দীপনি মুনি, গর্গমুনি,পরশুরাম, কাশ্যপ ইত্যাদি অষ্টআশি হাজার ঋষির পাদস্পর্শে পুণ্য এই তপভূমি।

নৈমিষারণ্য পুণ্য এই তপভূমি
চক্রতীর্থ নৈমিষারণ্যের প্রধান আকর্ষণ ও কেন্দ্রবিন্দু। চক্রতীর্থ নৈমিষারণ্য সীতাপুর স্টেশন থেকে প্রায় এক মাইল দূরে অবস্থিত। পুরান বলে, মহর্ষি শৌনকের দীর্ঘমেয়াদী জ্ঞানবিস্তার করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু কলিযুগ আসার সম্ভাবনায় এবং জপতপের নিরাপদ স্থানের লক্ষ্যে নারায়ণের শরণাপন্ন হন তিনি। ভগবান বিষ্ণু তাঁর আরাধনায় খুশি হয়ে তাঁর হাতের চক্র ছেড়ে দিয়ে বলেন— এক নিমেষের মধ্যে চক্র যেখানে ছুঁয়ে আমার আঙ্গুলে ফিরে আসবে, সেখানেই নির্দেশিত হবে ঋষিদের অনুকূল তপোভূমি। সুদর্শন চক্রের নেমি ভূমি স্পর্শ করেছিলো বলে সেই জায়গার নাম চক্রতীর্থ। কথিত আছে, চক্র স্পর্শ করার সময় ভয়ঙ্কর প্লাবন ঘটেছিলো। বিষ্ণু সেই প্লাবনের তেজ আটকেছিলেন চক্রাকারের মধ্যে। এটিকে এখন দেখা যায় চক্রাকার কুণ্ডের ন্যায়।
বরাহ পুরাণে কথিত আছে যে, একবার অসুররা ঋষিদের উপর উৎপীড়ন শুরু করে এবং তাদের সাধনা ভঙ্গ করার নানান প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। অতিষ্ঠ হয়ে ঋষিগণ ব্রহ্মার কাছে গেলেন এবং ব্রহ্মা তখন সূর্যের রশ্মি দিয়ে একটি চক্র তৈরি করলেন। তিনি ঋষিদেরকে চক্র বা চাকতি অনুসরণ করতে বলেছিলেন এবং বলেন যেখানেই এটি থামবে সেখানেই তাঁরা শান্তিতে বসবাস করতে পারবেন। চক্রটি নৈমিষারণ্যে থামল। নেমি মানে পরিধি এবং এটি এখানে কুণ্ডের পরিধিকে সংজ্ঞায়িত করে। কথিত আছে, পুকুরের জল আসে পাতাললোক থেকে।

ব্রহ্মার চক্রটিকে মনরূপ চক্র বলা হয়। চক্রতীর্থ মহাবিশ্বের কেন্দ্র বলে মনে করা হয়।
বিশ্বাস আছে যে, ঋষি নারদ জগতের তিনটি সেরা তীর্থ (জলাশয়ের) সন্ধান করেছিলেন। প্রথমটি শিবের আবাসস্থল কৈলাসে, দ্বিতীয়টি বিষ্ণুর আবাসস্থল ক্ষীরসাগর এবং শেষটি নৈমিষারণ্যের জলাশয়। স্থানটি সকল স্বর্গীয় দেবতাদের দ্বারাও পূজিত হয় বলে বিশ্বাস করা হয়।
প্রতি বছর ফাল্গুনের অমাবস্যা থেকে নৈমিষারণ্যের পরিক্রমা শুরু হয় এবং দোল পূর্ণিমা পর্যন্ত তা সম্পন্ন হয়। মাঝখানের পবিত্র জলে পুণ্যার্থীদের নামতে দেওয়া হয় না কিন্তু এর বাইরে বাঁধানো চক্রাকার জলে সবাই স্নান করেন পুণ্য অর্জনের আশায়। এখানে পিতৃতর্পণ করা হয়। প্রবচন পাঠ হয় সর্বদা। (আগামীকাল শেষ পর্ব)
তথ্যঋণ : বিভিন্ন বই এবং ট্যুর এন্ড ট্রাভেল ইন্ডিয়া।
Bhalo lekha
Aro erokhom valo lekhar aasay roilam
সুন্দর পোস্ট। ধন্যবাদ আপনাকে
নৈমিষারন্য স্থানটির নাম শাস্ত্রে পড়েছি। এটি কোথায় অবস্থিত জানতাম না। রিঙ্কি দেবীকে অসংখ্য ধন্যবাদ সুন্দর একটি লেখার জন্য।