নালন্দা (৪২৫ খ্রিঃপূঃ – ১২০৫ খ্রি)
নালন্দার পণ্ডিত
নালন্দার শিক্ষক পণ্ডিতদের হাত ধরে ক্রমশঃ নালন্দা বিদ্যালয় বিশ্বশ্রুত পাঠকেন্দ্র হয়ে ওঠে। নালন্দা সংক্রান্ত লেখাপত্তরে শিক্ষক/পণ্ডিতদের থেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় নালন্দা বিদ্যালয়ের কাঠামো, তার রাজযোগকে। বিদ্যালয়ের বিশাল কাঠামো তার নাম যশের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়ে ওঠে না যদি না বিদ্যালয়ের বৌদ্ধিকচর্চা বিকাশে পণ্ডিতি/শিক্ষগকবর্গ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন না করেন। নালন্দার পণ্ডিতদের আকর্ষণে যেমন দূরদূরান্ত থেকে ছাত্র আসতেন, তেমনি পণ্ডিতেরা উদ্যোগী হয়ে অন্যান্য পন্থের পণ্ডিতদের সঙ্গে তর্কে পরাজিত করে বৌদ্ধপন্থে নিয়ে আসতেন। এই সব পণ্ডিত তাদের ভাবনা-বৈচিত্র অবলম্বন করে নালন্দার মত শিক্ষাকেন্দ্রের বৌদ্ধিক কাঠামো ভিত্তিকে আরও জোরদার করেন। এ প্রসঙ্গে বলা দরকার হিউ-এন-সাং জানিয়েছেন তিনি এখানে বৌদ্ধপন্থ ছাড়াও ভুত, নিগ্রন্থ, কাপালিক, জুতিকা, সাংখ্য এবং বৈশেষিকী দর্শন পাঠ নিয়েছিলেন। এমনই পাঠদান বৈচিত্র ছিল নালন্দায়। রাজা শ্রীহর্ষ নালন্দা থেকে বিভিন্ন এলাকার শিক্ষাকেন্দ্রে পণ্ডিত পাঠাতেন। এই সব তথ্য থেকে মহাবিদ্যালয়ের গুরুত্ব বৃদ্ধির আন্দাজ পাওয়া যেতে পারে। মহাযানী বিদ্যালয়ের পণ্ডিতেরা হীনযান পন্থেরও বিশেষজ্ঞ ছিলেন, সে বিষয়েও তাঁরা পাঠদান করতেন। কান্বকুব্জে হিউ-এন-সাং-এর সঙ্গে শ্রীহর্ষর মুখোমুখি আলাপআলোচনা সময় নালন্দার ১০০০ শিক্ষক আলোচনাসভায় উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্বশ্রুত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়টি আধুনিক বিহারের রাজগীরের কাছের বারাগাঁও জেলায় অবস্থিত। নালন্দা গ্রামের বিহারকে ঘিরে যে বিদ্যাচর্চাকেন্দ্র গড়ে ওঠে সেটি কালক্রমে বিশ্ববিখ্যাত বৌদ্ধ জ্ঞান ও কৃষ্টিচর্চাকেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়। বিহারটিকে ভবিষ্যতের শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে প্রখ্যাত পণ্ডিত নাগার্জুন এবং তার সাক্ষাত ছাত্র আর্য দেবের ভূমিকা আজও স্মরণীয়। চতুর্থ শতকে চিনা পর্যটিক ফা হিয়েন নালো গ্রামে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোগুলোকে অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। কিন্তু এই ঘটনার তিনশ বছর পর সপ্তম শতে এটি বিশ্বশ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিগণিত হয়ে উঠেছে। জ্ঞানচর্চা করতে আসা প্রখ্যাত মুসাফির হিউএন সাং এবং ইত সিং এখানে সংস্কৃত শিখে ভারতীয় আচার্য ধর্মপাল এবং শীলভদ্রের নির্দেশ পালন করে বৌদ্ধ ধর্ম বিষয়ে শিক্ষা গ্রহন করেন। সেই সপ্তম শতে আরও দুজন চিনা পণ্ডিত মুসাফির ঔ-কুং এবং তাঁর পরে কি-য়ি নালন্দা বিহার ভ্রমণে আসেন। অর্থাৎ তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিত্যনতুন কাঠামো নির্মানের কাজ চলছে।

এছাড়া এই বিদ্যালয়ে তিব্বতি ভাষা কৃষ্টি শিক্ষার একটা গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ গড়ে ওঠে। ফলে আমরা দেখি নালন্দা বিদ্যালয় থেকে চিন এবং তিব্বতে নিয়মিত ধর্মপ্রচারক পাঠানো হয়েছে। ভারতীয় পণ্ডিতেরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিব্বতি ভাষা শিখে নানান সংস্কৃত পুস্তক তিব্বতিতে অনুবাদ করতে থাকেন। এই অনুবাদের মধ্যে দিয়ে আমরা তিব্বতিয় বৌদ্ধধর্মের অক্ষহৃদয়টি ছুঁতে পারি।
তিব্বতি রাজা খ্রি-স্রন-দেউ-ৎসান-এর (৭২৮-৭৮৬ খ্রিঃ) আমন্ত্রণে আচার্য পদ্মসম্ভব এবং শান্তি রক্ষিতের মত প্রখ্যাত পণ্ডিত নালন্দা থেকে তিব্বত পরিভ্রমণে এবং বৌদ্ধপন্থ প্রচারে যান এবং সেখানে ভগবান বুদ্ধের শিক্ষা প্রচার করেন।
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতি আলোচনায় আমরা যে সব পণ্ডিত বিষয়ে আলোচনা করব, তাদের মধ্যে থাকবেন মহাচার্য আর্য দেব; ধর্মপাল; আচার্য শীলভদ্র; চন্দ্র গোমিন; পদ্ম সম্ভব; শান্ত রক্ষিত; সুমতি সেন; কর্ণপতি; মহাযোগিন কুমার শ্রী; স্থিরমতি।
আর্য দেব
আর্য দেবের উপাধি ছিল মহাচার্য এবং তিনি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিককার ধারক-শিক্ষক-পণ্ডিত ছিলেন। তাঁর উদ্যমে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। তিব্বত এবং তার সংস্কৃতির ওপরে আর্য দেবের প্রভাব ছিল অসামান্য, তাঁর রচিত বইগুলি তিব্বতি পণ্ডিতদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় হয়।
আর্য দেবের জীবন নিয়ে আলোচনা করেছেন লামা তারানাথ, হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ান বুদ্ধিজম বইতে। আর্য দেব তাঁর সময় অনেক সময় শুধুই দেব নামেও অভিহিত হতেন। চৈনিক মুসাফির শিক্ষার্থী হিউএন সাং তাঁর ভ্রমণ কাহিনীতে লিখেছেন, কীভাবে আর্য দেব নাগার্জুনের থেকে জ্ঞান আহরণ করেছিলেন। আর্য দেব, পণ্ডিত নাগার্জুনেরর সঙ্গে তত্ত্ব আলোচনার জন্যে উদ্দিষ্ট হয়ে প্রথম তার গৃহে এসেছেন। আর্য দেবের আগমনবার্তা শুনে তার বৌদ্ধিক বয়স মাপার জন্যে নাগার্জুন যুবকের কাছে এক বাটি ভর্তি জল পাঠান। দেব সেটিতে একটি সূচ ডুবিয়ে পাঠিয়ে দেন। সেটি দেখে নাগার্জুন বলে উঠেছিলন এই ব্যক্তি জ্ঞানী। নাগার্জুনের এক শিষ্য তাঁকে আর্য দেবের এই মন্তব্যের বিষয়ে প্রশ্ন করলে নাগার্জুন বলেন, বাটি ভর্তি জল ছিল তাঁর নিজের জ্ঞানবিশ্ব। এবং সেই জলে একটি সূচ ফেলে দেওয়ার অর্থ দেব তাঁর সমস্ত জ্ঞানচর্চার সংক্ষিপ্তসার করলেন। তিনি তখন দেব’কে বৌদ্ধ ধর্মের গূঢ়ার্থ আলোচনার জন্যে আহ্বান করেন। দেব আলোচনার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন এবং নিজেকে নাগার্জুনের পদপ্রান্তে নিক্ষেপ করেন। নাগার্জুন তখন তাঁকে বৌদ্ধ ধর্মের গূঢ়ার্থ বিষয়ে অবগত করান।
গুরুর কাছে পাঠ শেষ হলে দেব গুরুর অনুমতি নিয়ে মগধে তীর্থকের সঙ্গে আলোচনা করার অনুমতি চান, এবং গুরু তাঁকে এই অনুমতি দান করেন।

লামা তারানাথ সূত্রে আমরা আজ জানি যে আর্য দেব নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানতম পণ্ডিত ছিলেন। এই প্রসঙ্গে আমরা একটা প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারি যে, আর্য দেব যখন তাঁর জ্ঞানচর্চার শৃঙ্গে উঠছেন, তখনই কী নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এবং তার বিকাশ ঘটেছিল? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের আর্য দেবের সময় নিয়ে স্থির নিশ্চিত হতে হবে। তারানাথ সূত্রে জানতে পারছি তিনি চন্দ্র গুপ্তের সমসাময়িক। তাহলে তাঁর সময়ক্রম হয় চতুর্থ শতাব্দ। ফাহিয়েন ভারতে এসে নালো গ্রামে দেখেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়টি গড়ে উঠছে, কাঠামোটি অর্ধসমাপ্ত হয়ে আছে। আর্য দেবের সময়ে যদি নালন্দা পুরোপুরি প্রখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় তাহলে আর্য দেব চতুর্থ খ্রি সময়ে থাকতে পাররেন না। সে সময় সেটির গড়ে ওঠার কাল। নালন্দাকে ১০ হাজার ছাত্রের অধ্যয়নস্থল হিসেবে গড়ে তোলার কাজে তাঁর বড় ভূমিকা থাকলেও, তাঁর সঙ্গে অন্যান্য আচার্যের ভূমিকাও অস্বীকার করা যায় না।
তিনি তিনিটি পুস্তক রচনা করেন সেগুলির শুধু তিব্বতি সংস্করণই পাওয়া গিয়েছে শতক-শাস্ত্র; ব্রহ্ম-প্রমথন-যুক্তি-হেতু-সিদ্ধি; মধ্যমাক-ব্রহ্ম-ঘাত-নাম।
শেষ বইটি তিনি লেখেন নালন্দা বিহারে জম্বুদ্বীপের রাজা হডসাম-ভুই-গ্লিন-গি-রিগ্যাল-পো-র, সুখচার্য ওরফে উদয়ী, সদবাহের অনুরোধে। এটি তিব্বতীতে অনুবাদ করেন উপাধ্যায় দীপঙ্কর শ্রী জ্ঞান (৯৮০জ)।
শীলভদ্র
প্রখ্যাত চৈনিক মুসাফির হিউ-এন-সাং তাঁর স্মৃতি কথায় নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান আচার্য শীলভদ্রের বিষয়ে বিশদে লিখে গিয়েছেন। শীলভদ্র যখন নালন্দায় পাঠদান করতেন, তখন হিউএন সাং স্বয়ং তাঁর কাছ থেকে সংস্কৃত ভাষায় পাঠলাভ করেন। হিউ-এন-সাং ছাত্র হিসেবে শীলভদ্রের খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন, শিষ্যত্বের দাবিতে তিনি গুরু প্রশস্তি রচনা করেন। আরেক চৈনিক মুসাফির ইত-সিংও তাঁর সম্বন্ধে লিখেছেন।
হিউএন সাং সূত্রে আমরা জানতে পারছি, আচার্য শীলভদ্র পূর্ব বাংলার সমতটের রাজার পুত্র ছিলেন। তিনি ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান। যুবা বয়সেই শীলভদ্র পড়াশোনায় অসম্ভব মতি ছিল। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে থিতু হওয়ার আগে জ্ঞানার্জনের জন্যে তিনি সারা ভারতে পরিভ্রমণ করেছেন। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান আচার্য ধর্মপাল, শীলভদ্রকে বুদ্ধপন্থ বিষয়ে জ্ঞানাগ্রহী ছাত্র হিসেবে খুঁজে বার করেন। ধর্মপাল পুষা (বোধিসত্ত্ব) শীলভদ্রকে নিজের ছাত্র এবং ভবিষ্যতের জ্ঞানী হিসেবে তৈরি করার কাজ বেছে নিয়ে বৌদ্ধ নানান দর্শনে তাঁকে যোগ্য করে তুলতে থাকেন এবং একটা নির্দিষ্ট সময়ে তিনি ভিক্ষুত্বে উপনীত হন। শীঘ্রই তাঁর নাম সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়বে। তাঁর যখন ত্রিশ বছর বয়স, জনৈক জ্ঞানী ব্রাহ্মণ দক্ষিণাপথ থেকে নালন্দায় এসে ধর্মপালকে বিতর্কে আহ্বান করেন। সে সময় শীলভদ্র ধর্মপালের সব থেকে নামী ছাত্র। শীলভদ্র স্বয়ং ব্রাহ্মণের এই আহ্বান স্বীকার করলেন। ধর্মপালের অনুমতিতে তিনি এই তর্ক যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং ব্রাহ্মণকে পরাজিত করতে সফলকাম হন। রাজা, শীলভদ্রের বিজয়ের খবরে উৎফুল্ল হয়ে তাঁকে একটি গ্রাম উপহার দেওয়ার প্রস্তাব দেন। শীলভদ্র প্রত্যুত্তরে জানিয়েছিলেন ‘একজন জ্ঞানী ভিক্ষুর ছোপানো চীবর এবং তাঁর ধর্মস্থান থেকে দেওয়া বরাদ্দতেই খুশি থাকা উচিৎ; সৎচিত্তের জীবনযাপন এবং ইন্দ্রিয়সংযম ছাড়া একজন ভিক্ষুর শহরের কাছে আর কীইবা পাওনা থাকতে পারে’। রাজা বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিপালনে তাঁকে এই দানখানি নেওয়ার জন্যে চাপাচাপি করলে তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানের জন্যে রাজকীয় দান নিতে সম্মত হন।

হিউ-এন-সাং, শীলভদ্র এবং গুণমতীকে প্রখ্যাত পুষা (বোধিসত্ত্ব) হিসেবে চিহ্নিত করে বৌদ্ধপন্থ প্রচারে তাঁদের অসামান্য অবদানের কথা স্বীকার করেন।
শীলভদ্র কখন বিরাজ করতেন? আমরা আজ স্পষ্টভাবে জানি যে তিনি হিউএন সাংএর প্রত্যক্ষ গুরু ছিলেন, এবং তিনি নালন্দায় ভ্রমণ করতে এসেছিলেন ৬৩৫ খ্রিঃ। ফলে এটা স্পষ্ট যে এই সময়ের আগেই তিনি মঠাধ্যক্ষ্য হন এবং তিনি অবশ্যই পঞ্চাশ বছরে উপনীত হয়েছিলেন। ফলে আমরা তাঁর বিচরণের সময় ৫৮৫-৬৪০ খ্রিঃ নিশ্চিত করলাম।
আচার্য শীলভদ্র বৌদ্ধপন্থের এক অসামান্য দার্শনিক ছিলেন। তার বহু কাজ কালের হস্তাবলেপনে হারিয়ে গিয়েছে, শুধু তিব্বতি ত্রিপিটকই আমরা তাঁর একটামাত্র টিকে থাকা জ্ঞানচর্চার নমুনা হিসেবে স্বীকৃতি দান করি। বইটার নাম আর্য-বুদ্ধ-ভূমি-ব্যাখান। এটি তিব্বতিতে অনুদিত হলেও এর অনুবাদকের নাম আমরা পাই নি। তিব্বতীদের কাছে শীলভদ্র, স্লব-দপন (আচার্য) নান-ৎশুল-বজান-পো (শীলভদ্র) নামে বিখ্যাত। (চলবে)