| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সাঁঝে-সকালের ঝিঙা ফুল : ছোট গল্প লিখেছেন নলিনী বেরা

Reporter
নলিনী বেরা / ১১৩৫ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

বাইরের উঠানে সাইকেলের প্যাডেলে পা রেখে হরিহর হাঁক দিল, ‘এসো’!

সকালবেলা। ঝলমলে রোদ উঠেছে। বাঁশঝাড়ে নিম চল্লার গাছে কাক-কুইরি যেমন ডাকে, ডাকছে। বেগুনাঝাড়ের বেড়ায় লতিয়ে-ওঠা কাবাগুড়ি ফল পেকে এখন টকটকে লাল।

হরিহর সাইকেলের বেলটায় আলতো চাপ দিয়ে ‘ট্রি-নি-টি’ করে বাজাতে লাগল আর সকালবেলার ঝলমলে আলোয় ধোয়া চারধারটা দেখতে লাগল।

ওই তো—

গোবর-নাদির ঝুড়ি মাথায় দাঁতন কাঠি চিবুতে চিবুতে ভরতের বউ চলেছে নদীধারের পালজমিনে। সরকারী পাতকো থেকে ঘড়্‌রি ঘুরিয়ে জল তুলছে নিতাইয়ের বউ নিতম্ব দুলিয়ে। চাতালে ডাঁই-করা তার ক্ষারে-ভেজা গাদাগুচ্ছের কাপড়! একটু বাদেই ধাপার পাটের মতো চাতালে কাপড় আছড়ানোর আওয়াজ উঠবে—’ছ-পা-ট’! ‘ছ-পা-ট!!’

ছাগলের দাড়ি-হাতে টানতে টানতে উদার ডাঙার মাঠের দিকে নিয়ে চলেছে—ওই তো ব্লু-শাড়ি-পরা বৈকুণ্ঠের বউ! মাঠেই খুঁটি পুঁতে ছাগলটাকে ছেড়ে আসবে। সারাদিন খুঁটির চারধারে ঘুরে ঘুরে ছাগলটা ঘাস খাবে। বেলা ‘আড়’ হলে, অর্জুন-বট-পাকুড়ের ছায়ায় সারামাঠ ছাকা পড়লে, কপট গালি দিতে দিতে ফের ছাগলটাকে টানতে টানতে ঘরে নিয়ে আসবে বৈকুণ্ঠের বউ।

অ, এই তো—বউগুলোর সারাদিনের নিত্যকর্ম-পূজাপাঠ-পদ্ধতি। তার মধ্যে তার বউ-ই কেবলমাত্র ‘অঙ্গনওয়াড়ি’।

সাইকেলের প্যাডেলে পা দিয়ে হরিহর রেডি-ই ছিল। অনিতা হন্তদন্ত এসে সামনের দিকে সাইকেলের রডের উপর বসল। বসে ঘড়ি-পরা ডানহাতটা এলিয়ে দিলো সাইকেলের হ্যান্ডেলে।

হরিহর দেখল—’টাইটান’। ছ-টা পঁয়তাল্লিশ। ‘একটু দেরি হয়ে গেল’ বলেই সে সাইকেল ছুটিয়ে দিলো ঘোড়ার বেগে!

পেরিয়ে গেল বড়োডাঙা-কুসুমতলা-সীতানালা খালপাড়-খান্দারপাড়া-দেউলবাড়-তিলকমাটি’ হুড়ি—

যে দেশে যা নাম। এদেশের লোকেরা জঙ্গলাকীর্ণ উঁচু টিলাটাকে…. বলে ‘হুড়ি’। এভাবেই কি দেউলবাড় আর নিচু-পাতিনা গ্রামের মধ্যবর্তী পাতলা অরণ্যসংকুল দেড়-দু মাইল বিস্তৃত উঁচু টিলার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘তিলকমাটি হুড়ি’ ?

না বোধহয়। অর্থটা পুরো হলো না। ‘হুড়ি’ তো ‘হুড়ি’— তার সঙ্গে ‘তিলকমাটি’ শব্দটাও জুড়ে আছে যে! আসলে ঐ যে ‘পাতলা অরণ্য সংকুল’—তার মানে জঙ্গলের মাঝে মাঝে ফাঁকা জায়গায় স্পষ্টত দৃশ্যমান হলুদ রঙেক মাটি, যাকে বলে ‘তিলকমাটি’, যা দিয়ে তল্লাটের বোষ্টম-বোষ্টুমীরা নাকে-কপালে-গলায় রসকলি আঁকে, সাঁওতাল বাউড়ি-ঝিউড়িরা মাটির দেয়ালে ‘মধুবনী আর্ট’ দেয়—সেই তিলকমাটি শোভিত হুড়ি-ই ‘তিলকমাটি হুড়ি’।

বাঁ-দিকে তিলকমাটি হুড়ি, ডাইনে নদী সুবর্ণরেখা। নদীর পাশ দিয়ে গরুর গাড়ি, সাইকেল আর পায়ে চলার রাস্তা। আগে আগে ভোর ভোর রাস্তায় জনমনুষ্যের পায়ের ছাপ পড়ার আগে তার ধুলোয় ছাপ দেখা যেত চিতাবাঘের পায়ের।

এখন সে চিতাও নেই, তার পায়ের ছাপ মেলাও দুষ্কর। না ‘বাটা কোম্পানি’ তার পায়ের জুতসই জুতো বানাতে চাইলেও তার আর মাপ পাবে না। অথচ আগে আগে আশপাশের গ্রামের লোকেরা, গরুবাগালরা, সকাল হলেই কাঠি নিয়ে মাপতে বসত—’একবিঘৎ দু-আঙুল এক চাঁখর’ একআঙুল— ‘দু-বিঘৎ থেকে ছ-আঙুল কম’—

তবে চিতা না হোক, দলমা-রাঁচি-রানিচুম্বার ওদিক থেকে ধান বা আখ পাকার মরশুমে দলে দঙ্গলে ‘কালাপাহাড়ের’ মতো এখনও নেমে আসে হাতির পাল! তখন রাস্তার ধুলোয় পদ্মফুলের বড়ো বড়ো গোলান্দার পাতার মতো হাতির পায়ের ছাপ দেখা যায়।

তা নিয়ে বড়োদের তেমন কৌতূহল থাকে না। অবশ্য ছোটোরা, গরু-চরানে ছাগল-চরানিরা হাতির ছাপে একসঙ্গে দু-তিন জনের পায়ের ছাপ এঁকে ছড়া কাটে—

“হাতি তোর গোদা গোদা পা।

হাতি তুই নেদে দিয়ে যা।।”

জলে ‘খল্ বল্’ আওয়াজ তুলে হাতে জুতো নদী পারাপার করছে দুয়েক জন। তিলকমাটির ডুংরিতে গরু চরাতে এর মধ্যেই উঠে পড়েছে গরু বাগাল কাড়া বাগালরা। কোথাও রাস্তার ধুলোয় হাতি-চিতার পায়ের ছাপ পড়ে নেই। শুধু ডুংরি থেকে চুর্নী-গরুর গলায় বাঁধা ‘ঠর্কা’র বাজনা বাজছে— “ঠ-র-ক্!” “ঠ-র-ক্”!!

সাইকেল না থামিয়ে প্যাডেল করতে করতেই হরিহর ফূর্তিতে জিজ্ঞাসা করল, ‘ডাকব’ ?

অনিতা হকচকিয়ে বলল, ‘কাকে’ ?

‘স্যাঙাৎ-কে’। বলেই অনিতার অনুমতির অপেক্ষা না করে হরিহর সুরেলাগলায় ডেকে উঠল—’স্যা-ঙা-ৎ—হে-এ-এ-এ-এ-এ!’

সুরেলা ডাকের প্রত্যুত্তরে সে ডাক তিলকমাটি হুড়ির গায়ে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো পুনরায় হরিহর অনিতার কানে—“স্যা-ঙা-ৎ—হে-এ-এ-এ-এ-এ!!!”

অনিতা হরিহর দু-জনেই হেসে উঠল।

এখন দিনের বেলায়, প্রকাশ্য দিবালোকে, যখন এখানে-সেখানে ইতস্তত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দু-চার জন, তাদের গরুমোষ নিয়ে গরুবাগাল কাড়া বাগালরাও উপস্থিত, এই মুহূর্তে এ-ডাক হাসির বিষয়বস্তু হলেও সায়াহ্নে, যখন ঐ অর্জুন-পাকুড়ের মাথার উপর সন্ধ্যাতারাটি জ্বল জ্বল করে, এই দেড়-দু মাইল বিস্তৃত বনস্থলীতে একটা জনমানুষও থাকে না, কেবল মশানির দহের ওদিকটায় ভুসাকালি-মাখা-মুখের হুলুম ঝুলুম করে বেরিয়ে আসা ‘ভুঁড়া-শিয়াল’ দেখে ঘেউ ঘেউ করতে থাকে দু-চাট্টা কুকুর, তখন এ-রাস্তায় চলমান পথিকের একমাত্র বল ভরসা ঐ ‘স্যাঙাৎ’—

সে ডাক দেয়—’স্যা-ঙা-ৎ—হে-এ-এ-এ-এ-এ!’

অমনি তার কানে বাজে—’আছি—হে-এ-এ-এ-এ-এ’—

সত্যি সত্যি কে যেন তার সামনে-পিছনে থেকে সাহস জোগায়—’চল, চল! ভয়ের কি! আমি তো আছি!’

তদুপরি আশপাশের গ্রামের লোক—যে কী না সদ্য সদ্য গোহালে ফেরা তার গরুগুলোর জাবনার জন্য ‘ঘ্যাঁ-এ-স-র্’ ‘ঘ্যাঁ-এ-স-র্’ করে বসেছে খড় কাটতে, যে কী না বিল-বাতান থেকে এইমাত্র উঠে এসে উঠোনে জলের কলসি গড়িয়ে পা ধুয়ে পুবের দিকে জোড়হাত করে দাঁড়িয়েছে সান্ধ্য-আহ্নিক সারতে, যে কী না অনের দূর সাইকেল চালিয়ে ধূলিধূসরিত দেহে এই তো সবে তাদের ঘরের নাচদুয়ারে একটা পা রেখেছে মাটিতে—’স্যা-ঙা-ৎ—হে-এ-এ-এ-এ-এ!’ ডাক শুনে ভাবল নির্ঘাত কোনো ডরপুক লোক তিলকমাটি’ হুড়ির হাবড়ে পড়েছে!

অমনি সাইকেল ঘুরিয়ে, চট্‌জলদি আহ্নিক সেরে, থাকল পড়ে জাব্‌নার খড়কাটা—চলল তারা লাঠি-লণ্ঠন-হাতে উদ্ধার করতে ডরপুক লোকটাকে।

হয়ত এর মধ্যে আবারও ডাক আসে—’স্যা-ঙা-ৎ—হে-এ-এ-এ-এ-এ!!!’ এদিক থেকে ওদিক থেকে সম্মিলিত উত্তর যায়—’আছি—হে-এ-এ-এ-এ-এ!’

অনিতাকে নিয়ে তিলকমাটি হুড়ি পেরিয়ে গেল হরিহর, যেমন রোজ যায়। তালডাঙরা পেরিয়ে উপর পাতিন গ্রামে ঢুকে পড়ল। অজিত চৌধুরীর ভাড়াবাড়িতে ‘অঙ্গনওয়াড়ি’ কেন্দ্রে অনিতাকে নামিয়ে দিলো সে।

কেন্দ্রের সামনে এরমধ্যেই দু-চার জন আদিবাসী মহিলা শিশু কোলে উপস্থিত। একজন তো উদোম বুকে শিশুকে মাই দিচ্ছে, শিশুটি তার মায়ের একটি বুক মুখে গুঁজেছে, বাকিটাও হাতছাড়া করছে না। চেপে ধরে আছে হাতে। ঐটুকু হাত কী আর সম্পূর্ণ বেড় পায়!

তবে তার মায়ের কোনো হিন্দোল নেই। পিছনে ঈষৎ হেলে পড়ে হাতে কাঠিখুঁটি নিয়ে পিঠের ঘামাচি মারছে তো মারছেই।

সাইকেল থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ে অনিতা ধমকে উঠল, ‘এ্যায় ঝুমরি! টিকে জুত করি বুসো!’ তারমানে একটু ঠিক করে বসো।

সচকিত ঝুমরি পরনের কাপড় গুছিয়ে ছেলে কোলে উঠে দাঁড়াল। নাকবিন্ধা চামরবাঁধ মলতাবেণী ফুলবেণী আর উপরপাতিনার আদিবাসী অধ্যুষিত প্রায় সাত শ’ জনসংখ্যার জন্য এই অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র। অনিতা তার একজন কর্মী।

ঝুমরির ‘রকম’ দেখে হরিহর মুচকি হাসছে। ঝটিতি তার দিকে ফিরে অনিতা বলল, ‘রোজ রোজ তোমার এই দিতে আসা আবার নিতে আসা, কষ্ট না! তার চাইতে আমাকে একটা সাইকেল কিনে দাও, লেডিজ। যেতে আসতে পারব একা-ই।’

হরিহর বলল, ‘আচ্ছা’।

২.

নতুন ঝকঝকে লেডিজ সাইকেল, গায়ে এখনও গন্ধ লেগে আছে। সারা দিনমান দৌড়োচ্ছে তো দৌড়োচ্ছে—এ গ্রাম থেকে সে গ্রাম, এ বাখুল থেকে সে বাখুলে। নতুন স্পোকগুলি সূর্যের আলো পড়ে যতই ঝকমকাচ্ছে, ততই সাইকেলের গতি যেন বাড়িয়ে দিচ্ছে অনিতা।

কোথায় কোথায় না যেতে হয় তাকে। কত কী যে খবর নিতে হয়—কার ঘরে আছে গর্ভবতী মা, কেই বা প্রসূতি, আর কার ছেলে-মেয়েরই বা বয়স ছ-বছরের নীচে। গর্ভ নিরোধক পিল কম পড়ল কার, কার শেষ হয়ে এলো ‘কন্ট্রাসেপ্টিভস্ টিউব’:  পাল্‌স পোলিও কি খাওয়ানো হয়েছে?  আগামী রোববার কিন্তু দিন আছে।

সাইকেলটা গাছের গায়ে ঠেস দিয়ে রাখা। ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্তিও তো আসে! দুপুর বেলা। বট-অশ্বত্থের ছায়ায় ঝিম্ এসে যায়। পাখপাখালিও ঝিমোচ্ছে। কিন্তু অনিতার ঘুম-নিদ্রা নেই। কৌতূহল ভরে চারধারটা দেখছে।

হাল-লাঙল চলছে জমিতে। মাটি যত ফালা হচ্ছে, তার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছে পোকামাকড়। আরতাই খেতে উড়ে-ঘুরে-বেড়াচ্ছে কাকপক্ষী, শালিক-চটা। ‘হাটুয়া’ ঘরের মেয়ে, ‘হাটুয়া’ ঘরের বউ অনিতা—এসব তার দেখা।

সামান্য ঝিমুনি কি এসে গিয়েছিল চোখে? তন্দ্রাভাব? চটকা ভেঙে সে তো দেখল— গলগল করে রক্ত ঝরছে!লাঙলের লোহার ফলা গিঁথে গিয়েছে সামনের জমিতে লাঙল ধরা মাহিন্দরটির পায়ে। আর সে  খুঁজে পেতে গরুর গোবর এনে ঘায়ের উপর থেপে থেপে লাগাচ্ছে। তবু কি রক্ত বন্ধ হয় ?

ঝাঁপিয়ে পড়ল অঙ্গনওয়াড়ি অনিতা। গ্রামের লোকেরা ‘অঙ্গনওয়াড়ি’ তো বলে না, বলে ‘অঙ্গনারী’।

“কী করছেন?  টিটেনাস হয়ে যাবে যে! ধনুষ্টঙ্কার!”

একে মেয়েমানুষ ‘অঙ্গনারী’—তার উপর সে পাড়ার হরিহরের বউ। খানিকটা ইতস্তত করছিল হেলে মাহিন্দর। বলল, “মোর কিছো হবিনি গো। টিকে চুন-চিনির মলম লেপি দিলে সারি যাবে ধাঁই ধাঁই করি।”

গরুর গোবর, চুন-চিনির মলম ? —অজ্ঞতা আর কাকে বলে। পরিষ্কার জলে পা ধুয়ে এলে ক্ষতস্থানে অনিতা ‘কন্ট্রাসেপ্টিভস্ টিউব’ গর্ভনিরধোক পিল, ইত্যাদির বটুয়া খুলে লাগিয়ে দিল ‘টিন্‌চার আয়োডিন’।

পিছনের ক্যারিয়ারে থাপুড় মেরে বলল, ‘উঠুন’!

হেলে-মাহিন্দর বুঝতে পারছে না—কেন তাকে উঠতে হবে সাইকেলে। দূর সম্পর্কের ভাশুর-ভদ্র বউ। তার উপর মেয়ে সাইকেল। ‘না’, ‘না’ করছিল সে।

“উঠতেই হবে আপনাকে।”

“হঁ ত, যাইতে হব কঁঠে?”

“হেল্‌থ সেন্টারে। টিটেনাস ইঞ্জেকশান দিতে হবে।”—সাইকেলের এপাশে-ওপাশে পা রেখে বেলটায় আলতো চাপ দিয়ে “ট্রি-নি-টি” করে অনিতা বাজাচ্ছে।

“ধুর্ বাবু! তোমার ডাগ্‌তরি রখ ত! অখন হাল লাঙল ছাড়ি হাসপাতালে গেনে মোর মালিক মোকে বাঁশ দিয়ে পিটাইবে!”

যেন জামিন থাকছে অনিতা। বলল, “আমি তো আছি।”

নাছোড় সাইকেল চলল।—’চলুক গাড়ি বেলপাহাড়ি’। অর্ধেক চষা জমিতে জোয়াল কাঁধে জোড়া বলদ দাঁড়িয়ে। তাদের নধর পেট, পিঠের ‘শিব’ শিউরে উঠছে মাঝে মাঝে।

হেলে-মাহিন্দরকে ‘বাবু’ হয়ে সাইকেলের ক্যারিয়ারে চড়ে যেতে দেখে তারাও যেন বলল, “যাও! টা-টা!”

লাল মোরামের উপর দিয়ে রিম্‌ঝিম্ করে গাড়ি ছুটল চাঁদাবিলা হেল্‌থ সেন্টারের দিকে। গাড়ি হেলে-মাহিন্দারকে নিয়ে গেল যেমন, দিয়েও গেল তেমন। তখন বেলা ধীরে ধীরে ‘আড়’ হচ্ছে।

আড়বেলায় ফের সাইকেলে উঠল অনিতা। ফের শুরু হলো সাইকেলের নতুন স্পোকে অপরাহ্ন সূর্যের আলোখেলা। ঝিক্ ঝাক্, ঝিক্ ঝাক্! যে-ই দেখছে, দূর থেকে চেঁচাচ্ছে—“ঐ যাচ্ছে অঙ্গনারী! অনিতা অধিকারী। সাকিন বড়োডাঙা—ওরে ছুয়া সরে দাঁড়া—”

এ সমস্তই তাদের মুখে মুখে রচনা ওই যারা ডুব্কা ডুংরিঙে গরু চরাচ্ছে ছাগল চরাচ্ছে, ওই যারা খেতে খামারে কাজের ফাঁকে উঠে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙছে। শুনতে তো মন্দ লাগে না অনিতার। তবে এমনও তো শুনতে হয় যখন এ-ওকে চিমটি কেটে ‘টিজ্’ করে বলছে—’চা না বে, চা!’—’ কী?’— ‘রাঙতা মোড়া বেলুন’—তখন কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করে, দু-গালে পটাপট চড় কষাতে ইচ্ছা হয়—

অনিতা পারে না—সে যে অঙ্গনওয়াড়ি। ‘সুসংহত শিশু বিকাশ সেবা প্রকল্প’-এর কর্মী। তার দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে নোটিশ তো ঝোলানোই আছে—

*প্রতিমাসে শিশুদের ওজন ও সেই অনুযায়ী বৃদ্ধি তালিকায় যথাযথ রেখাচিত্র অঙ্কন, শিশুদের ও মায়ের প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে বা অন্য কোন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পাঠাবার জন্য পরামর্শ ও চিকিৎসা

*গৃহ পরিদর্শনর মাধ্যমে বাবা-মাদের শিক্ষিত করে তোলা যাতে তারা শিশুদের বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যোন্নতির জন্য যথাযথ ভূমিকা পালন করে

*সরকার প্রদত্ত খাদ্যসামগ্রী দিয়ে ৬ মাস থেকে ৬ বছরের শিশু, গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের জন্য পরিপূরক পুষ্টি খাবারের ব্যবস্থা করা

হেন-তেন, জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ—আরও কত কী যে করতে হয় তাকে! এই তো এক হেলে-মাহিন্দরকে টিটেনাস দিতে নিয়ে যেতে হলো চাঁদাবিলায়। এখন আবার নাকবিন্ধির লোধা বস্তিতে—

খেজুর পাতার চাটাইয়ে বসে আছে অনিতা। খেজুর তো নয়, ‘খাজুর’। ঘাড় হেঁট করে বুনো ‘খাজুর’ পাতায় বোনা মাদুরের কাজ দেখছে সে। কেমন মাছের কাঁটা, মাছের কাঁটা! আশপাশে দু-চাট্টা মুরগি ঘুরে বেড়াচ্ছে টিঁ-টিঁ করে। একটা লাউ চারাকে পরম মমতায় ঘুপচির ছাদে তোলার ব্যবস্থা পাকা। যদিও রুগ্ন, অনমনীয়—চায় না উঠতে কিছুতেই। তাই ডগায় দড়ি বেঁধে ঝোলানো হয়েছে।

পোয়াতি সুরগুঁজা লোধানি ঘরে নেই, গিয়েছে জঙ্গলে। কাঠ কুড়োতে, পাতা ছিঁড়তে। তার মেয়ে সুসি চাটাই পেতে বসতে বলল, “বুসো না! মা এই আইল বলে! ক-খ-ন গেছে!”

বলেই সে ঘাড় তুলে ‘বেলা’ দেখল। তারপর সাইকেল—নতুন, ঝক্ঝকে! সাইকেলের ঘণ্টিতে হাত ঘষল—নতুন, ঝক্ঝকে! ঘণ্টির হাঁড়ায় নিজের মুখ দেখল— গোল, থুম্বা! আঙুল টিপে বেল বাজালো, বাজছে—“ট্রি-নি-টি”।

ঘণ্টাধ্বনিতে চোখ তুলে অনিতা হাঁ—ক জন অচেনা ছোকরা মাথায় টুপি পায় গামবুট পরে লোধাপাড়ার রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে! বুকটা ধক করে উঠল তার। এতদিন আসছে—কই? কোনোদিন তো দেখেনি!

—“অ্যাই সুসি—”

“কি গ?” কাছে এসে দাঁড়ালো মেয়েটা।

তার কানে কানে ফিস্ ফিস্ করে জিজ্ঞাসা করল অনিতা, “ওরা কারা?”

এক পলক দেখে নিয়ে সুসি উত্তর করল, “নাই জানি কারা। তবে ক-দিন ধরেই ত আসছে—নাকি গুল্‌তি দিয়ে এ-গাছে সে-গাছে ক্যাঁক্‌লাস মারছে!”

“কী মারছে? ক্যাঁক্‌লাস? তারমানে গিরগিটি?”

মাথা নাড়ল মেয়েটা। আর সহ্গে সঙ্গে চোখ চলেগেল অনিতার—ওই যেখানে রুক্ষ হাঁদা মাটিতে অতিশয় রুগ্ন লাউচারাটি গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে রয়েছে, অদূরবর্তী ঘুপচি ঘরের দেওয়ালে ওই যেখানে অপটু হাতে কাঠ কয়লা তিলকমাটি আর পাতার রস দিয়ে আঁকা হয়েছে গরুর গাড়ির চাকার মতো আলপনা। সেখানেই একটা গিরগিটি হেলানো লাঠির গা বেয়ে সর্ন্তপণে ধীরে ধীরে উঠছে।

একটু উঠল তো থমকে দাঁড়াো। এদিক-ওদিক দেখছে, উপর-নীচ লাঠি বরাবর মাথাটা ঘন ঘন নাড়ছে। দেহের তুলনায় মাথাটা ভারী। মাথার রং অর্ধেক হলুদ তো অর্ধেক খয়েরি। মাথার শিরা বরাবর ঘোড়ার কেশরের মতো খাঁজ কাটা। চোখ যেন চামড়ায় ঢাকা।

কে জানে শিকার ধরতে কখন আবার এখানেও এসে পড়বে ক্যাঁকলা-শিকারীরা!

“উঠি রে!” বলেই উঠতে যাচ্ছিল অনিতা, আর মাথা থেকে ঝুড়ি কাঠের বোঝা উঠোনেই আছড়ে রাখল সুরগুঁজা।

পেটটা ভুয়াঙ লাউয়ের মতো ফুলে আছে। উঁচু হয়ে উপরের দিকে ঠেলে উঠেছে। ন-মাসেরও বেশি চলছে। চোখ দুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসবে। হাঁপাচ্ছে। তবু সে হাসছে!

“এটা কিন্তু ঠিক হচ্ছে না, সুরগুঁজা।”

“কীসের কী?”

“এই যে ভরা পেট নিয়ে জঙ্গলে যাওয়া। একটা কিছু ঘটে গেলে—”

উবু হয়ে বসে দু-হাত দু-হাঁটুতে মেলে ধরে লোধানি বলল, “কী ঘটবে? জঙলে খালাস ত?”

অবাক দৃষ্টিতে চেয়েছিল অনিতা। চোখে তার হলুদ- খয়েরি মাথাওয়ালা সেই ক্যাঁক্‌লাস! মাথা দোলাচ্ছে তো দোলাচ্ছে—

“হলে হবেক। কা-ই আর করব! হামাদের উরম হয়। হলে শালা জঙলি পাল্‌হা-পতরে পুঁছে লুবো, ব্বাস!”

অঙ্গনওয়াড়ি অনিতা এবার ধমকে উঠল, “থাম!”

লোধানিকে কে থামাবে! সে বকেই চলে, “হায় দেখ-অ! বিশ্বাস করলে নাই ত? সীতারানি লব-কুশকে কোথায় বিয়াঁইছিল? এই তব্‌বনের জঙলে ঐ দু-টো শাল গাছের তলায় ত?”

“তা হোক, তবু সে-যুগ আর এ-যুগ!” বলেই সুরগুঁজার উঁচু পেটে হাত বুলোচ্ছে, কান পেতে শুনছে নবাগতের জীবন স্পন্দন, যৎকিঞ্চিৎ হলেও নড়ানড়ি—

“লড়ছে? হি-হি করে হাসছে সুরগুঁজা।

ঘাড় নাড়ল অনিতা। তারপর টুকিটাকি ওষুধের বড়ি হাতে গুঁজে দিয়ে সাইকেলে উঠল সে। অচেনা মানুষগুলোর সম্পর্কে একটা কথাও জিজ্ঞাসা করল না লোধানিকে। কে জানে কী আছে কার মনে! সে তো ‘অঙ্গনারী’—অত পুরুষের খোঁজে তার কী দরকার?

৩.

মুদিখানার কারবারি হরিহর। তেল-নুন বেচে। হপ্তার মাল গস্ত করতে এসেছিল সুবর্ণরেখা নদী পেরিয়ে সাউয়েদের দোকানে রণজিৎপুরে।

রোহিনি-রণজিৎপুর বড়ো গঞ্জ এলাকা। ‘নদী-সেপার’-এর মানুষদের কাছে বিলাত-আমেরিকা। লন্ডন-নটিংহ্যামসেয়ার কানাডা কি কালিফোর্নিয়া। এখানে আছে বি-ডি-ও অফিস। একটা হাই স্কুল। মেয়েদের স্কুল। আর আছে—মান্ধাতা আমলের রোহিণীগড়ের ‘বাবুঘর’। আরও কত ‘গ্যাঁড়াকল’!

হপ্তায় হাট বসে দু-দিন—মঙ্গল আর শুক্রবার। হাটে এলে হরিহরের ওই কবিতাটা খুব মনে পড়ে। ওই যে—“হাট বসেছে শুক্রবারে বক্সীগঞ্জে পদ্মাপারে।” আসলে এখানেই ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছে কী না সে!

সকাল-সন্ধে এখানে বাস ছাড়ে। বাস আসে। আর আসে বাস কনডাক্টরের হাত মারফৎ খবরের কাগজ। হরিহরের গ্রাম বড়োডাঙায় খবরের কাগজ তো যায় না, যায় হাটুরে লোক মারফৎ ‘খবর’। কখনো-শখনো শখদার লোকের হাত ঘুরে একটা আস্ত খবরের কাগজ।

হরিহর খুব ফুর্তিতে আছে—সকাল সকাল মাল গস্ত হয়ে গিয়েছে। তদুপরি সে একটা সাইকেল কিনে দিয়েছে অনিতাকে, লেডিজ। সে-সাইকেল এখন কোথায় কোথায় না ছুটে বেড়াচ্ছে! উপর-পাতিনা, নামো-পাতিনা, তালডাংরা, মলতাবনী, নাকবিধি, চামরবাঁধ—

ওই তো—

রিম্‌রিম্ করে ছুটে চলেছে! পেরিয়ে যাচ্ছে রামেশ্বর ডাঙা-টিয়াকাটি-কেয়াঝরিয়া, আঁটারি চুর্‌চুর ঝাড়, বাবুই ঘাসের বন, কদো গুঁদ্‌লি খসা কুরথির ক্ষেত। চাকা ঘুরছে কি ঘুরছে না—বুঝা যাচ্ছে না। সূর্যের আলো পড়ে সাইকেলের ‘আরা’ বা স্পোকগুলি ঝক্‌মকাচ্ছে—ঝক্‌মক্‌ ঝক্‌মক্!

ঝক্‌মক্‌ ঝক্‌মক্!

সাউদের দোকানের পূর্ব দিকে পুকুরপাড়ে—ওই যেখানে নিম গাছের তলায় কতক খালি কতক ভরতি কেরোসিনের ব্যারেল স্তূপীকৃত হয়ে পড়ে আছে—সেখানে লাল রঙের প্লাস্টিকের চেয়ার পেতে খবরের কাগজ পড়ছে সাউদের মেজো তরফ।

পিছন থেকে গায়ের উপর উটকো ছায়া পড়তেই ঘাড় ঘুরিয়ে মেজো কর্তা বলল, “অ: তুই? মুই ভাবনু—কে না কে! খবর শুনিছু?”

“কী খবর মেজদা?” পায়ের কাছে মাটিতেই বসে পড়ল হরিহর। কাছে-পিঠেই দোকান থেকে ছুড়ে দেওয়া মুসুর ডালের দানা খুঁটে খাচ্ছে ঘুরে ঘুরে ‘বক্ বক্ বকম্’ ‘বক্ বক্ বকম্’ করতে করতে খান কতক গোলা পায়রা। যেন ভাবখানা— ‘মারিতং গণ্ডার, লুটিতং ভাণ্ডার!’

তার মধ্যেই মেজো কর্তা কাগজটা মেলে ধরে বলল, “হা দ্যাক্! নদী সেপারের পরিস্থিতি নিই কী লিখছে, পড়!”

হরিহর মাথা নিচু করে পড়তে লাগল—“ওড়িশা- সংলগ্ন সুবর্ণরেখা নদী তীরবর্তী নয়াগ্রাম ও গোপীবল্লভপুর থানায় এবার সক্রিয় মাওবাদীরা। নয়াগ্রাম থানার দক্ষিণ-পূর্বে ওড়িশার বালেশ্বর জেলা ও দক্ষিণ-পশ্চিমে ময়ূরভঞ্জ জেলা। আবার, গোপীবল্লভপুরের পশ্চিমে ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ আর উত্তর-পশ্চিমে ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূম জেলা। সবটাই জঙ্গল অধ্যুষিত!

গোয়েন্দা সূত্রে খবর, মাস তিন-চার ধরেই এতদ্ অঞ্চলে মাওবাদীরা তাদের মুক্তাঞ্চল গড়ে তুলতে তৎপর। লালগড়-ঝাড়গ্রাম ছেড়ে মাওবাদী স্কোয়াড সদস্যরা যেমন নয়াগ্রাম গোপীবল্লভপুর-সাঁকরাইলে ঢুকছে, তেমনই ওড়িশা বা ঝাড়খণ্ড থেকেও নয়াগ্রাম-গোপীবল্লভপুরে ঢুকে পড়ে বড়োসড়ো হামলা চালানোর ফন্দি আঁটছে।

মুক্তাঞ্চল গড়ে তোলার মতলবে মাঝে মাঝেই আক্রমন সানাচ্ছে তারা। এর মধ্যেই আক্রমণ চালিয়েছে—কলমাপুকুরিয়ায়, কাদো কাঠায়, নরিশোলে। পাতিনা চাঁদাবিলা বড়খাঁকড়ি মলম আর বড় নিগুই অঞ্চলে গোপনে গোপনে প্রভাব বাড়াচ্ছে মাওবাদীরা—”

জোরে জোরেই পড়ছিল হরিহর, থেমে গেল। তার চোখের সামনে ততক্ষণে ঘূর্ণায়মান সাইকেলের নতুন আর ঝক্‌ঝকে স্পোকের উপর থেকে আচমকা সরে সরে যাচ্ছে আলো, ‘ছায়া ঘনায়েছে’ ধীরে ধীরে আঁটারি কুড়চির বনে। সব কিছুই ঝাপসা লাগছে। ঝাপসা, ঝাপসা। ঝাপসা দৃষ্টিতে কাগজটাও আর পড়তে পারছে না সে।

মোজ কর্তা বলল, “থাক, আর পড়তে হবে না। মোট কথা তোদের ওদিককার অবস্থাও খারাপ হয়ে গেল রে হরিহর। সাবধানে চলাফেরা করিস!”

“আর সাবধান!” বলেই সাঁৎ করে সরে এলো সে। না জানি কাগজটায় আরও কত কী লেখা আছে! হয়তো আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে লিখেছে—নয়াগ্রাম-গোপীবল্লভপুরে ঢুকে পড়ে বড়োসড়ো হামলা চালানোর ফন্দিই শুধু আঁটেনি, তপোবন জঙ্গলমহলের ভিতর দিয়ে চাঁদাবিলা যাবার মোরাম রাস্তার ধারে গুলি করে মাথা থেঁতলে রেকে দিয়েছে ‘লাশ’। পাশেই সাদা কাগজের উপর লাল কালিতে মাওবাদী পোস্টার—’পুলিশের চরকে চরম শাস্তি দেওয়া হল’। হয়তো লিখেছে, সুরুবালাকে রাতের অন্ধকারে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছে, চুনিবালাকে ঘরের মধ্যেই আগুন জ্বেলে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, কোপানো হয়েছে নিরুবালাকে, খুন হয়ে গিয়েছে এক ভূসিমালের দোকানদার—

“অও যে হরিহর! খালি ঘুরি বুলুটু, মুদি মালের ফর্দটা মিলা!” বলেই গড়গড় করে পড়ে যেতে লাগল সাউয়েদের বড়কর্তা—’হরিদ্রা-২ কেজি, জিরা-১ কেজি, ধনিয়া-১ কেজি, পিপল-৫০০ গ্রাম, শুঁট—’

প্রায় ছোঁ মেরে ফর্দটা ছিনিয়ে নিল হরিহর—“আর মিলাইতে হবেনি বড়দা, বেলা পড়ি গেলা।” সত্যি সত্যি বেলা আড় হয়ে গেছে কখন! গাছে… পাতায় রৌদ্রে ঝিমধরা ভাব।

ঝিমধরা ভার তার মনেও।

‘ভারী’র কাঁধে মালপত্র গছিয়ে দিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এলো বিষণ্ণ অপরাহ্নের মতো হরিহরও। সে এবার যাবে রনজিৎপুর থেকে রোহিণী। রোহিণীর পরমেশ্বর দে’-এর কাপড়ের দোকান থেকে, মাহিনী মিলের একটা ধুতি কিনবে, একজোড়া শাড়ি।

রনজিৎপুর থেকে রোহিণী এক হাঁকের ভিতর। বলাই যায়—রোহিণী রনজিৎপুর পিঠোপিঠি দুই ভাই। তা ছাড়াও রোহিণী গ্রামের আলাদা একটা ইতিহাস আছে। এই গ্রামেই ১৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে জন্মেছিলেন বৈষ্ণবাচার্য রসিকানন্দ, যাঁর জীবন অবলম্বন করে তাঁরই প্রিয় পার্ষদ গোপীজনবল্লভ দাস লিখেছিলেন ‘রসিকমঙ্গল’ কাব্য। যেখানে আছে—

“উৎকলেতে আছয়ে সে মল্লভূমি নাম।

তার মধ্যে রোহিণী নগর অনুপম।।

ডোলঙ্গ বলিয়া নদী গ্রামের সমীপে।

গঙ্গোদক হেন জল অতি রসকূপে।।”

সে ‘রসিকমঙ্গল’ কাব্য ও রোহিণীর ইতিহাস হরিহরের সহসা জানার কথা নয়। কারণ সে রোহিণী হাই স্কুলের ক্লাস এইট। তবে গ্রামের সমীপে ও রোহিণী হাই স্কুলের সন্নিকটে ‘ডোলঙ্গ’ বা ডুলুঙ নামের যে নদী আছে, বর্ষাকালেও সে নদী ডুবসাঁতার চিৎসাঁতার দিয়ে কত পারাপার করেছে! গ্রীষ্মে হাতড়ে হাতড়ে কত বাটা-মাগুর-চ্যাঙ-গড়ুই ধরেছে!

রোহিণী গ্রাম সাঁকরাইল থানার অন্তর্গত। যে সাঁকরাইল থানা হালের ইতিহাসে ঢুকে পড়েছে, সে ইতিহাস অবশ্য হরিহরের অজানা নয়। হাটুরে লোকেরাই খবরটা পৌঁছে দিয়েছে নদী সেপারে। মাওবাদীরা সাঁকরাইল থানায় ঢুকে গুলি করে মেরেছিল দুই ছোটো দারোগাকে, অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল বড়ো দারোগাকে।

রোহিণীর হাটতলায় আম্রকুঞ্জে উড্‌ক্র্যাফ্টের টিচার কুইলা স্যারের সঙ্গে হরিহরের মুখোমুখি দেখা—

“কী হে হরিহর, আছো ক্যামন?”

“আর থাকাথাকি স্যার!” কেমন শুষ্ক শ্রীহীন দেখাচ্ছে হরিহরকে।

“কেন হে, কী হলো?”

“যা সব শুনছি—যা সব খবরের কাগজে বেরুচ্ছে স্যার—”

মুহূর্তে বুঝে গেলেন কুইলা স্যার, যা পরিস্থিতি হাঁ করলে একটা ছোটো ছেলেও বুঝতে পারবে। বললেন, “স্থানীয় ছেলে ছোক্‌রারাই আছে, না হলে এতদূর আস্পর্ধা—আচ্ছা, চল তো দেখি—কী লিখেছে খবরের কাগজে!”

বলেই হরিহরের হাত ধরে নিয়ে গেলেন একটা চায়ের দোকানে। চেয়ার টেনে বসলেন কুইলা স্যার, হরিহর বেঞ্চিতে বসল। একটা লোক কাগজ পড়ছিল।

“দেখি তো মনতোষ কাগজটা—আজকের কী খবর।”

কাগজ ছেড়ে সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়ালো মনতোষ। বলল, “পড়ুন স্যার!”

‘উড্‌ ক্র্যাফ্ট’-এর স্যার কাগজ পড়ছেন। পিছনে দাঁড়িয়ে ঘাড়ের ফাঁক দিয়ে লাইন বাই লাইন দেখছে হরিহর—

“….পুরুলিয়ার বান্দোয়ান থানার লেদাম গ্রামে এক অঙ্গনওয়াড়ী কর্মীকে অপহরণ করল মাওবাদীরা। অপহৃতার নাম অনিমা বেসরা। তাঁর খোঁজে মেদিনীপুরের জঙ্গলমহলেও তল্লাসি চলছে।

মাওবাদীদের হাতে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী অপহরণের ঘটনা নতুন নয়। এ বছর বাঁকুড়ার সারেঙ্গা থানার বেজডাঙা গ্রামের এক বধূকে তুলে নিয়ে যায় মওবাদীরা পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনি থানার ভাঙ্গাবাঁধ গ্রামের অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ছবি মাহাতোরও আজ অব্দি কোন হদিশ নেই।

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বান্দোয়ান বাজার থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে জঙ্গলঘেঁষা লেদাম গ্রামে রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা নাগাদ হানা দেয় সশস্ত্রকারীরা। প্রথমে দরজায় ধাক্কা। দরজা খুললে অনিমা বেসরাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে…”

আর দেখতে পারছে না। হরিহর অস্থিরতায় মনে মনে ছটফট করতে করতে বলে উঠল, “চলি স্যার! ছোটো হয়ে আসছে বেলা।”

হাটচালা থেকে বাহির হলেই ডুলুঙের ধারে সারি সারি বট-অশ্বত্থের ছায়া। দেখলেই একটু বসি বসি মন করে। কিন্তু হরিহর বসতে পারছে না—কে জানে এতক্ষণে ওদিকে অনিতা—!

থাকল পড়ে পরমেশ্বর দে-র দোকানে মোহিনী মিলের ধুতি-শাড়ি খরিদ করা, বট-অশ্বত্থের ছায়ায় বসে দু-দণ্ড সুদূর দিক্‌চক্রবালে তাকিয়ে থাকা, পাখি দেখা, কত পাখি উড়ছে—ঢেপ্‌চু, ক্যার্‌কেটা-ট্যাঁসা-মাছরাঁকা—

হরিহর দৌড়ুল—দৌড় দৌড়—

মুদিমালের ভার-কাঁধে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে বাহক দামু সিং। নদী-বালিতে একটা বিন্দুর মতো—ওই—ওই তো দেখা যাচ্ছে! ধরতে হবে তাকে। দু-জনে জোট বেঁধে যাওয়াই ভালো। গায়ে তার গন্ধ আছে না!

দামু সিংকে ধরতে হরিহর লদো পদো দৌড়ুচ্ছে।

৪.

পরের দিন থেকেই সাইকেলটার আর দেখা নেই। মোরাম দেওয়া রাস্তায় আর আওয়াজ উঠছে না রিম্ রিম্ করে। রৌদ্রে আর ঘুরন্ত স্পোকে দেখা যাচ্ছে না আলোর ঝলকানিও। হরিহরই নিষেধ করে দিয়েছে অনিতাকে বেরোতে।

ডুব্‌কা-ডুংরিতে গরু-ছাগল চরাতে গিয়ে ছাগল বাগাল-গরু বাগালরাও মুষড়ে পড়েছে। তারা তো আর সাইকেলটাকে দেখামাত্র চেঁচিয়ে জরপ করে বলতে পারছে না—“ঐ-ঐ যাচ্ছে অঙ্গনারী! অনিতা অধিকারী। সাকিন বড়োডাঙা—ওরে ছুয়া সরে দাঁড়া।” তারা হাত কামড়াচ্ছে।

‘ইভ টিজার’রা—ওই যারা ক্ষেতে-খামারে কাজে- অকাজে থাকে, তাকে দেখামাত্র লুকিয়ে চুরিয়ে এ-ওকে উসকে দিয়ে রাঙতা-মোড়া ‘বেলুন’ চায়—তারাও আড়ভাঙার অজুহাতে উঁকিঝুঁকি মারছে, দেখতে না পেয়ে হতাশ হচ্ছে। হাই তুলতে তুলতে নিজের ভাষায় খেদোক্তি করছে, “কাঁই গেলা রে! অখনও ত আইলা নি!”

কোথায় গেল! এখনও তো এলো না।

মোট কথা অঙ্গনওয়াড়ি অনিতার অনুপস্থিতির জন্য গাঁ-গঞ্জ মাঠ-ঘাট বিল-বাতান—যেখানে সারাদিন রৌদ্র-ছায়ার খেলা চলত—সেখান থেকে যেন সহসা রৌদ্রই উবে গিয়েছে! ছায়াচ্ছন্ন এখন সব কিছুই।

বাইরের উঠোনে যদিও হরিহর আগের মতোই পা রেখেছে, তবু হাঁক দিয়ে সে আর ডাকতে পারল না, “এসো।’’ উত্তরে অনিতাও আর সাড়া দিয়ে বলল না, “হ্যাঁ, যাই।”

সাইকেল নিয়ে একা একাই বেরিয়ে পড়ল হরিহর। সঙ্গে সাইকেলের ক্যারিয়ারে থাকল অনিতার সেই বটুয়া। বটুয়ার ভিতর গর্ভনিরোধক পিল, কন্ট্রাসেপ্টিভস্ টিউব, ‘ফার্স্ট এইড’-এর টুকিটাকি। রোজ যেমন থাকে।

হরিহরের সাইকেলটাও নতুন নয়, আজ থেকে বছর দশেক আগে কেনা। রং চটেমটে একশা, স্পোকগুলোয় জং ধরেছে। তাই সূর্যের আলো পড়ে ঝলসে ওঠার কথাও নয়। তবে হ্যাঁ, স্টিলের ঘণ্টিটা এখনও ঝক্‌ঝক্ করছে। রং চটেনি একফোঁটাও।

রোজকার অভ্যাসবশত ঘণ্টিতে বুড়ো আঙুলের আলতো চাপ দিয়ে বাজাল হরিহর। বাজছে—ট্রি-নি-টি! ট্রি-নি-টি! ঘরের ভিতর থেকে শুনল অনিতা, কোনো সাড়া দিলো না। ‘তাকে চোখে দেখিনি, শুধু বাঁশি শুনেছি’—গোত্রের একটা রহস্যময় আবহ তৈরি হলো।

তারমধ্যে সাইকেল ছুটিয়ে বেরিয়ে পড়ল হরিহর।

বড়োডাঙা-কুসুমতলা-সীতানালা-খালপাড়-খান্দারপাড়া দেউলবাড়….। ‘তিলকমাটি হুড়ি’র কাছ এসে যা একটু থমকে দাঁড়াল। এক পা সাইকেলে এক পা মাটিতে রেখে ঘাড় ঘুরিয়ে ‘হুড়ি’ দেখছে হরিহর।

কেমন থম মেরে আছে হুড়ি-পাহাড়! দৃশ্যমান তিলকাঞ্চলও যেন ডোরা-কাটা বাঘের রূপ দিয়েছে। মাঝে মাঝে হেথা হোথা ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ছে মাটি ও পাথর। কারা যেন হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে।

কারা কি, অন্য সময় হলে হরিহর অনায়াসেই বলে দিত—হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে শিয়াল-ভাম-খাটাস, বড়োজোর একটা দুটো বনবরা-ঝিঁকর, নদী সেপারের কাঠকুড়ানিরা। কিন্তু এখন? কথা পেটে আসছে তো মুখে আসছে না, আনতে নেই।

পড়ি-কি-মরি সাইকেল ছুটিয়ে দিলো হরিহর।

ডুব্‌কা-ডুঙরিতে গোঠে-ডহরে গরু চরাচ্ছে ছাগল চরাচ্ছে গরু বাগাল ছাগল বাগালরা, যেমন রোজদিন চরায়। ক্ষেতে-খামারে বিলে-বাতানে কাজে ডুবে আছে মুনিষ-মাহিন্দররা, যেমন থাকে।

সহসা অনিতার বদলে সাইকেল আরোহী হরিহরকে যেতে দেখে তাদের মধ্যে কোনো ‘পদ্য’ই রচিত হলো না, কোনো ‘অশ্লীল’ আব্দারও তৈরি হলো না আজ। সে অবকাশও নেই। খালি যা হতচকিত দুয়েক জন মুখ ফসকে বলে উঠল, “উরিঃ হা দ্যাক্! আজ অঙ্গনারীর বদলে অঙ্গপুরুষ যায়েটে বে!”

কথাটা শুনেও শুনল না হরিহর, সে এগিয়ে গেল।

কিন্তু অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে পৌঁছে সে অঙ্গপুরুষের উপস্থিতি হাড়ে হাড়ে টের পেল।

যারা উদ্‌লা বুকে মাই দিচ্ছিল শিশুকে, এই যেমন আদিবাসী ঝুমরি,—যারা উদ্‌লা পিঠে কাঠিখুঁচি দিয়ে ঘামাচি মারছিল, এই যেমন ভূঁইয়াদের ফর্সা মেয়ে কিরণ,—যারা, গর্ভবতী মায়েরা, পেট খুলে হাওয়া খাওয়াচ্ছিল অনাগত ছ মাস ন-মাসকে, এই যেমন লোধানি সুরগুঁজা—তারা সবাই ধ্যাড়াস্ ধ্যাড়াস্ করে এক ধারসে চাপাচাপি দিয়ে উঠে দাঁড়াল। শুধু যা ‘ন্যাঙটা ভুটুঙ সাধের কুটুম’ কচিকাঁচারা—ওই যারা কোমরের ঘুনসির বাড়তি ‘অঁটাদড়ি’টা মুখে পুরে চুষছিল—তারাই কেবল অনড় থেকে তার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল।

প্রসূতি ও গর্ভবতী বধূদের কেউ একজন মাথায় ঘোমটা টেনে দিয়ে উল্টো দিকে মুখ করে হরিহরকে জিজ্ঞাসা করল, “বউদিমেনে আইলা নি কেনে গো?”

হরিহর সাইকেলের ক্যারিয়ার থেকে অনিতার সেই বটুয়া খুলতে খুলতে বলল, “কেনে মোকে দিই হবে নি?” আমাকে দিয়ে হবে না?

পথচলতি একজন মোটর সাইকেল আরোহী হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে ব্যাপারটা লক্ষ্য করছিল এতক্ষণ। শুনতে পেয়ে যেই উত্তর দিলো, “হ্যাঁ হবে, কাল থেকে কিন্তু শাড়ি পরে আসতে হবে।”

বলেই সে গাড়ি স্টার্ট দিলো। উপস্থিত প্রসূতি ও গর্ভবতী বধূরা এক যোগে হেসে উঠল। পোয়াতি ঝুমরির হাসি আর থামে না। দেখাদেখি বাচ্চাকাচ্চারাও না বুঝে হাসছে। একটা কুকুরও যেতে যেতে আচমকা বসে পড়ে জিভ বের করে হ্যাল্ হ্যাল্ করছে।

হরিহর গায়ে মাখল না। অনিতার করা ‘লিস্ট’ অনুযায়ী যার যা বরাদ্দ দিতে থাকল। বাড়ি বাড়ি ঘুরে যা জিনিস, টুকিটাকি ওষুধ, গর্ভ নিরোধক পিল্—দিয়েও এলো।

সব কিছুই করল ফর্দ মিলিয়ে, হুবহু। শুধু যা একটা জিনিসই সে করতে পারল না—কোনো গর্ভবতী বধূর স্ফীতকায় উদরে হাত বুলোতে, কান-মাথা চেপে ধরে অনাগত নবজীবনের স্পন্দন শুনতে।

‘অঙ্গনারী’ তো সে নয়—সে ‘অঙ্গপুরুষ’।

একটু বেলার দিকে রাঁধুনিদের সঙ্গে সে বসে গেল ‘মিড-ডে মিল’-এর তদারকিতে। একাজে সে বড়োই পারদর্শী। গ্রামে বিবাহে-শ্রাদ্ধে-উৎসবে অপরাপর প্রীতিভোজে তার ব্যবস্থাপনার নামডাক আছে।

তদুপরি মুদিমালের কারবারি হরিহর চাল-ডালের পরিমাপটাও বুঝে ভালো। পুষ্টি প্রকল্পের চাটাটাও তার সঙ্গে দিয়েছে অনিতা—

*গর্ভবতী ও প্রসূতি (শিশুর বয়স ৬ মাস পর্যন্ত) মহিলার জন্য বরাদ্দের পরিমাণ—চাল-৭২ গ্রাম, ডাল-৪০ গ্রাম

*শিশু যেখানে অত্যন্ত অপুষ্ট আর বয়স ৬ মাস থেকে ৩ বছর, সেখানে— চাল-৭২ গ্রাম, ডাল-২০ গ্রাম

*প্রসূতি মহিলা যার শিশুর বয়স ৩ থেকে ৬ বছর, তার জন্য বরাদ্দ—চাল-৩৬ গ্রাম, ডাল-২০ গ্রাম

চাল-ডাল তো আর শুকনো খাওয়া যাবে না, যার যা তার তা দিয়ে দিলে রান্নার তেল নুন তারা জোটাতেও পারবে না। অতএব রান্না করা রেডিমেড খাবারই তাদের দিতে হবে।

ওই তো হা-পিত্যেস করে বসে আছে মায়েরা! ন্যাঙটা ভুটুঙ সাধের কুটুমরা—ওই যারা কোমরের ‘অঁটাদড়ি’ চুষছিল আর ভ্যান্ ভ্যান্ করে ডাকছিল।

হরিহর ভাঁড়ার খুলে চাল-ডাল দিয়েছে পরিমাপ করে, দিয়েছে তেল-নুন, আরও কিছু মসলাপাতি, ডিম। রাঁধুনিরা রান্না করছে, পাশে বসে এটা সেটা জরিপ করে বলছে হরিহর—

“এক নোকের দু পো এক ঝি। ঝিটার নাম করলী। বড় পো বাহা হিচ্ছে, ছোট পা হিনি—”

“ছোটটার বিয়ে হয়নি তো এখনও? এবার হবে। তার আগে একবারটি চলো!”

বলেই কারা এসে ডেকে নিয়ে গেল হরিহরকে। বেশ কিছুক্ষণ বাদে ফের ছেড়ে দিলো। কিন্তু ফিরে আসা এ হরিহর যেন সে হরিহর নয়। চোখদুটি লাল, মাথার চুল উস্‌কো-খুস্‌কো। কাঁপছে ঠক্ ঠক্ করে।

এতক্ষণে রান্নাবান্না, খাওয়া-দাওয়াও শেষ। হাঁড়ি-কড়া থালা-বাসন ধুয়েপুঁছে রাঁধুনিরাও চলে গেছে যে-যার সে-তার। মোটে তো ঘণ্টা চারেক ডিউটি! প্যাডেলে পা রেখে গাড়ি ছুটিয়ে দিলো হরিহরও। অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের দিকে সে আর ফিরেও তাকাল না—ওই যেখানে লেখা আছে, ‘সুসংহত শিশু বিকাশ সেবা প্রকল্প, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র, পাতিনা’।

সাইকেলে পথ ভাঙছে হরিহর। উপর পাতিন, তালডাংরা, নিচু পাতিনা—চেত্‌লা খাল, মশানির দহ। বেলা ‘আড়’ হয়ে গেছে কখন! গরুর গোঠ এখন ঘরমুখো—পিছনে ধুলোর ঝড় চলছে। ধুলো থেকে গা বাঁচিয়ে ধীরে ধীরে সাইকেল চালাচ্ছে সে।

কখনও চড়াই কখনও উতরাই। সাইকেল-সহ হরিহর একবার ডুবছে, একবার উঠছে! আসলে ‘তিলকমাটি হুড়ি’ সন্নিহিত গ্রামগুলি নদীর পাড় থেকে এতটা উঁচুতে অবস্থিত যে, বর্ষায় বর্ষায় জঙ্গলমহলের ‘ঝোপ্’ অর্থাৎ প্রবল জলধারা গ্রামগুলিকে বেষ্টন করে নদীতে নামার পথে তৈরি করে ফেলেছে বড়ো বড়ো খাদ, যাকে বলে ‘ঢড়া’। বর্ষায় ঢড়া-ভরতি জল, গ্রীষ্মে ঠা ঠা।

তা সে ঢড়ায় পড়ে মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে হরিহর, ফের ভুস্ করে ভেসে উঠছে তার মাথা। উঠন্তি-ডুবন্তি।

অবশেষে এসে গেল সেই ‘তিলকমাটি হুড়ি’। হুড়ির আড়ালে এতক্ষণে ঢাকা পড়ে গিয়েছে সূর্য। জায়গাটা ছায়াচ্ছন্ন, আঁধার আঁধার। আশ্চর্যজনকভাবে রাস্তায় আজ আর ইতস্তত লোক দেখা যাচ্ছে না একটাও। লোকগুলো তো বলেছিল—এখানেই সেই—

ছাঁৎ করে উঠল হরিহরের বুকটা! চোখের সামনে দেউলবাড় আর নিচু-পাতিনা গ্রামের মধ্যবর্তী পাতলা অরণ্যসংকুল দেড় দু-মাইল বিস্তৃত উঁচু টিলা। পাতলা আর কই! এখন যেন ঘন সন্নিবদ্ধ, ঠাসা। নদীর পাড় থেকে আর দূরেও নেই, যেন এগিয়ে এসেছে অনেকটা।

বিপদে-আপদে পড়লে ডরপুক মানুষ হাঁক দেয়—’স্যা-ঙা-ৎ—হে-এ-এ-এ-এ-এ!’ বিপদে না পড়েও স্রেফ্ মজা করতে হরিহরই কতদিন ডাক দিয়েছে ‘তিলকমাটি হুড়ি’র স্যাঙাৎকে! কান খাড়া রেখে সে উত্তরও শুনেছে অব্যবহিত পরেই—’আ-ছি—হে-এ-এ-এ-এ-এ!’

আজ আর মজা মজাকি নয়, কাদের যেন অঙ্গুলি নির্দেশে মুখের কাছে দু-হাত জড়ো করে যন্ত্রচালিতের মতো হরিহর হাঁক দিলো—’স্যা-ঙা-ৎ—হে-এ-এ-এ-এ-এ!’ পরক্ষণে উত্তরও এল— ‘আ-ছি—হে-এ-এ-এ-এ-এ!’

উত্তরের আড়া-ধাড়া—সব কিছুই কি আগের মতো হুবহু? না সামান্য তফাত। প্রতিধ্বনির সঙ্গে আলোর ঝল্‌কানি। ‘তিলকমাটি হুড়ি’র একটা নির্দিষ্ট জায়গা থেকে টর্চ লাইটের ফোকাস দিঙ্-নির্দেশ করে বারকতক জ্বলল নিভল।

খানিক থমকে দাঁড়াল। ভাবল হয়তো বা। না, ভাবাভাবির কোনো অবকাশই আর নেই। নিশির ডাকের মতো আলোর উৎস অনুসরণ করে ‘তিলকমাটি হুড়ি’র দিকেই এগিয়ে চলল হরিহর।

৫.

গ্রামে যখন ঢুকল, পিছনে পাকুড় গাছের মাথায় সন্ধ্যাতারা জ্বল-জ্বল করছে। নদীঘাটের অস্পষ্ট অন্ধকারে এই বুঝি নৌকো ভিড়াল বধুকের পো! হাটুরে লোকজন কথা বলছে, তবে খুব চাপা স্বরে।

যেন একটা যুদ্ধ জয় করে ফিরছে হরিহর। তার খুব ইচ্ছা হচ্ছে হেঁকে-ডেকে চেঁচিয়ে কথা বলতে। তার হাতে মোবাইলও নেই যে কথা বলে অনিতার সঙ্গেও। কিনব কিনব করে এতদিনেও কেনা হয়নি, অথচ কিনলে কত সুবিধে হতো! ‘তিলকমাটি হুড়ি’র ডেরায় বসেও কথা বলা যেত—

সাঁক্ করে মাথার প্রায় ব্রহ্মতালু ছুঁয়ে একটা ‘রাতচরা’ উড়ে গেল। বাদুড়-টাদুড় হবে হয়তো—হরিহর গ্রাহ্য করল না। কিন্তু পরক্ষণেই পাখিটা ‘ট্র্যাঁ ট্র্যাঁ’ করে ঘুরে এলো। দেখেই বুঝল—কাল প্যাঁচা! 

সন্ধ্যার অন্ধকার যত ঘন হবে, পাকা ফল-পাকুড়ের সুবাস যত ছড়াবে, প্যাঁচা-বাদুড়ের উৎপাতও তত বাড়বে। তার উপর এখন তো হাতি আর—। মুদিমালের কারবারি হরিহরের মনে হঠাৎ চিন্তার উদয় হলো—সাধারণ প্যাঁচা হলে বলার কিছু ছিল না, তাবলে ‘কাল প্যাঁচা’? ইত্যবসরে কোনো অঘটন ঘটে গেল না তো?

চোখের সামনে খবরের কাগজের পাতাটা এখনও জ্বল জ্বল করছে—“…..স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বান্দোয়ান বাজার থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে জঙ্গলঘেঁষা লেদাম গ্রামে রবিবার সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ হানা দেয় সশস্ত্রকারীরা। প্রথমে দরজায় ধাক্কা। দরজা খুললে অনিমা বেসরাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে…”

হরিহর এই ভর সন্ধ্যা বেলাতেও সুনসান গ্রামের রাস্তায় সাইকেল ছুটিয়ে দিলো জোরে। জোরে, জোরে।

নিজের ঘরের উঠোনে পৌঁছে দেখল—আলো নেই, বাতিহীন তুলসীতলায় দু-চাট্টা যা জোনাকি পিছনে ‘টিপা-লাইট’ গুঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছে ইতস্তত।—ওই খুঁটি পোঁতাই হয়েছে, গ্রামে বিদ্যুৎ আসা এখনও সুদূর পরাহত। জোনাকির মিচিক্ মিচিক্ আলোতেও ঝক্‌মক্ করছে দাওয়ায় ঠেস দিয়ে রাখা অনিতার নতুন কেনা লেডিজ সাইকেলটা। যেন ‘প্রতাপ’-হীন ‘চৈতক’।

ধক্! ধক্ ধক্ করে উঠল হরিহরের বুক! এমন তো কতই দেখা যাচ্ছে, শোনা যাচ্ছে—সাইকেল রাখা আছে যেমনকার তেমন, এক-দেড় মাইল দূরে শাল কি পিয়াশাল গাছের নীচে পড়ে আছে আরোহীর থ্যাঁত্‌লানো মুখ! মোটর বাইক স্টার্ট দেওয়াই আছে, হাত-পা বাঁধা অবস্থায় গাছের ডালে ঝুলছে বাইকবালার গুলিবিদ্ধ দেহ—

মুখে কথা সরছে না, উন্মাদের মতো হরিহর সাইকেলের বেল বাজাচ্ছে—“ট্রি-নি-টি”-করে তো নয়—“ক্রীং-ক্রীং-ক্রীং”—পাগলা-ঘণ্টির মতো বাজিয়ে চলেছে, বাজিয়েই চলেছে—ততক্ষণ, যতক্ষণ পর্যন্ত না অনিতা এসে হাত চেপে ধরল তার।

“হচ্ছেটা কি?”

অনিতার হাতের স্পর্শে ধাতস্থ হলো সে। কোনো কথা বলে অনিতার মুখের দিকে দু-দণ্ড তাকিয়ে থাকল। মুদিমালের কারবারি হলে কী হবে, কতকটা—“তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়—সে কি মোর অপরাধ”—সেই ঢঙে।

তারপর সংবিৎ ফিরে পেয়ে জিজ্ঞাসা করল, “হেরিকেন জ্বালাওনি যে?”

আদুরে গলায় অনিতা বলল, “এই তো এলাম!”

মুহূর্তে ফের দাওয়ায় ঠেস দিয়ে রাখা ‘লেডিজ’-এর দিকে চোখ চলে গেল হরিহরের।—“কঁঠে যাইথিলো?”

কোথায় গিয়েছিলে?

নিচুস্বরে অনিতা উত্তর করল, “ক-হি-টি।” নিজের কথা না বলে উল্টে পরিহাসচ্ছলে স্বামীকেই জিজ্ঞাসা করল, “অঙ্গপুরুষের এতে দেরি হেলা যে?”

সন্তর্পণে চারপাশটা দেখে নিয়ে ততোধিক নিচুস্বরে হরিহর বলল, “ঘরে চল—সব বলছি!”

সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় থেকে গাঢ়তর হলো। জঙ্গলমহালের গাঁ-গঞ্জ ‘তরুছায়া মসী মাখা’ তো নয়, সত্যি সত্যি ঘোরঘট্ট কালিমায় ঢাকা পড়ল। তার মধ্যেও আকাশে তারার মতো জোনাকির মিচ্‌মিচানি, দূরদূরান্তে ডিব্‌রি-আলোর ঝল্‌কানি, দু-চাট্টা টর্চের ফোকাস—এদিক- সেদিক। “হাতি ঝুলঝুল আইল বান”—হাতি নামারও সময় এসে গেল।

হাত-মুখ ধুয়ে ঘরের ভিতর পাশাপাশি বসল দু-জনে। বাটিতে মুড়ি ঢেলে নুন-লঙ্কা-পেঁয়াজ দিলো অনিতা, নিজেও নিল। ক্ষেতেরই লঙ্কা, ছোটো ছোটো পেঁয়াজ—।

দু-গাল খেয়েই টর্চ হাতে উঠে পড়ল হরিহর। ঘরের চারধারে টর্চ-লাইটের ফোকাস ফেলে তন্ন-তন্ন করে খুঁজে দেখল—কেউ কোত্থাও লুকিয়ে নেই তো! ওই তো—

উদারডাঙার মাঠ—জনমনুষ্যহীন, খাঁ খাঁ, শুধু অন্ধকারের ধোঁয়া ‘গাবাচ্ছে’। কতক ‘বাঘসুগ্‌নি’ পোকাও উড়ছে-ঘুরছে। নদীধারের পালজমিন—রাতের টসা টসা শিশির ঝরছে ডিঙ্‌লা-রহড়-কাঁকুড়ের ক্ষেতির উপর। দু-চাট্টা শেয়াল যা থেকে থেকে সমস্বরে ডেকে উঠছে, “হু-উ-উ-উ—”। জঙ্গলমহাল—শুকনো পাতায় খড়্‌মড়ে আওয়াজ, ও কিছু নয়, ও কিছু নয়, বুকে হেঁটে ‘নিশিলতা’ সল্‌সল্‌ করে পথ ভাঙছে, পথ ভাঙছে—

ঘরে ঢুকে ফের বাটির মুড়িতে আঙুল চালাতে চালাতে হরিহর নিরুদ্বেগ কণ্ঠে বলল, “আর কোনো ভয় নেই, কাল থেকে তুমি ডিউটিতে নির্ভয়ে যেতে পারবে।”

শুনেও কিছুক্ষণ গুম মেরে থাকল অনিতা, কোনো কথা বলল না। এক-দু মুঠো মুড়িও চিবোল, চিবোচ্ছে—

তারপর আচমকা মুখ তুলে জিজ্ঞাসা করল, “কী করে?”

নদীধারে এসময় এক ঝাঁক শিয়াল ডেকে উঠল একসঙ্গে—“হু-উ-উ-উ-!” তবে তো হাতির দঙ্গল ডিঙ্‌লা-রহড়-বেগুন-বাইগনের ক্ষেতিতে শুরু করে দিয়েছে তাণ্ডব!

করুক গে। হরিহর মরিয়া, হরিহর বেপরোয়া। গলার স্বর নামিয়ে প্রায় ফিস্‌ফিস্‌ করে বলল, “তুমি-আমি—আমরা আজ থেকে ‘মাও’ হয়ে গেলাম অনিতা।”

বলেই উত্তেজনায় উঠে দাঁড়াল হরিহর, হাতের চেটোয় থাপ্পড় ঠুকে নির্লজ্জ হাসিতে ফেটে পড়ে বলে উঠল, “মার দেয়া কেল্লা—আর কাকে ভয়?”

তেল-নুনের হিসাবি হরিহরের এ হেন অঙ্ক কষা মন্তব্যে আর নির্ভীক আস্ফালনেও রা কাড়ল না অনিতা। চুপচাপ, শেষ হয়ে যাওয়া মুড়ির বাটি জলে ধুয়ে তুলে রাখল। রাত বাড়ছে। ধীরেসুস্থে রাতের রাঁধাবাড়া সারতে অতঃপর রান্নাঘরে ঢুকল সে।

রাত বাড়ছিল, রাত তো বাড়েই। ঝিঁ ঝিঁ ডাকে, রান্নাঘরের আশপাশে থাকা ‘কট্‌কটি’ ব্যাঙ কট্‌ কট্‌ করে মাঝেমধ্যেই ডেকে ওঠে। আজ যেন সব কিছুই খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিল সে। একসময় রান্নার কাজ সেরে হাত-পা ধুয়ে নিশ্চিন্তে মুদিখানার হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত কুশলী ‘ম্যানেজার’—তার স্বামীর কাছে এসে বসল অনিতা।

ভেজা হাত-পা শাড়ির আঁচলায় মুছতে মুছতে বলল, “তার আর দরকার নাই।”

যেন আকাশ থেকে পড়ল হরিহর। মুখ তুলে জিজ্ঞাসা করল, “কীসের কী?”

“কাল ডিউটিতে যাবার। খানিক থেমে দাঁতে ঠোঁট কামড়ে অনিতা কোনোমতে বলল, মুই তো আজ বি-ডি-ও আপিসে ‘রেজিগ্‌নেশান লেটার’ জমা করি আইনু!”

আর কোনো সাড়াশব্দ নেই, অনেকক্ষণ চুপচাপ। যেন ঘরের মধ্যে মড়া আগলে বসে আছে স্বামী-স্ত্রী! এখন আর কিছু করার নেই। দিঙ্ দিঙ্ কর্ রাত বাড়ছে, রাত ক্রমশ বড়ো হচ্ছে—

সহসা তারা দু-জনেই জানলার দিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখল—গ্রিল টপকে ঘরের ভিতর শুঁড় বাড়াচ্ছে ঝিঙালতা! গতকালের সাঁঝে ফোটা ফুলে ঝিঙালতা রদবিয়ে ভরে আসছে।

“ওঠো! রাত অনেক হলো, খাবে চলো!”

সংগ্রামী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ২০১৬ পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev