নলিনী বেরা
ওপারের টাংগাইল বইলানপুর কামুটিয়া বাসাইল ঘাটাইল ধলাপাড়ায় যখন চলছে ঘোরতর মুক্তিযুদ্ধ, ভাতকুরা কোদালিয়া দেওহাটা গজারিয়া সূত্রাপুর মির্জাপুর শবুল্লা পাকুল্লার সেতু ধ্বংস হচ্ছে একের পর এক, এপারের বেতারে অলৌকিক গলায় দেবদুলাল খবর পড়ছেন, গান বাজছে ঘন ঘন, ‘ও আমার সোনার বাঙলা আমি তোমায় ভালবাসি’, গানের গলা নাই তবুও তো ঝাড়গ্রাম রাজ কলেজের অর্থনীতি অনার্সের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র জ্যোতির্ময় তার সহপাঠী সহপাঠিনীদের সঙ্গে ঝাড়গ্রামেরই ডি.এম লাইব্রেরির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ‘সোনার বাঙলা’ গীতিআলেখ্যের সমবেত গানে গলা মিলাচ্ছে, ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত প্রাণ হল বলিদান লেখা আছে অশ্রুজলে’, প্রভাসচন্দ্র মিত্রের ‘চক্রান্ত’ উপন্যাসের জ্যোতির্ময় যেমন, ‘জ্যোতির্ময়ের বাপ মা থাকিলেও, জ্যোতির্ময় বিদেশে জেঠা-জেঠাইমার কাছেই থাকিত; জেঠা-জেঠাইমা যখন তাহাকে সুন্দরপুরে লইয়া আসেন তখন তাঁহাদের সন্তানসন্ততি হয় নাই, তখন তাঁহারা জ্যোতির্ময়কে নিজ পুত্রের মত যত্ন করিতেন; জ্যোতির্ময়ের তখন বয়স প্রায় নয় বৎসর; সে জেঠা-জেঠাইমার কাছে বেশ থাকিত’, তেমনই দূর মফস্সলের এই জ্যোতির্ময়ও ঝাড়গ্রামের বামদা ফরেস্ট কলোনিতে বসবাসকারী ও ওপারের চট্টগ্রাম জিলার আঁধারমানিক গ্রাম থেকে চাকরিসূত্রে আগত শ্রী সদানন্দ পালিতের বাড়িতে ‘পেয়িং গেস্ট’ হিসাবে বড়ো মন্দে ছিল না; নিমের বীচি দিয়ে লইট্যা শুঁটকির ঝাল খেতো, আর আধো আধো করে চাট্গাঁইয়া ভাষা বলতে গিয়ে ‘হু’-এর জায়গায় বলে ফেলত ‘উ’, হবে ‘আঁই এ্যাহন হুতি’, আমি এখন ঘুমোব, আর সে বলল কিনা ‘আঁই এ্যাহন উতি’! ঘরসুদ্ধ চাট্গাঁইয়া লোকেদের মধ্যে হাসির হল্লা পড়ে যাবে না? অপ্রস্তুত জ্যোতির্ময় রাগ করে উঠে যেতে চায় মজলিশ ছেড়ে, তাকে ফের হাত ধরে বসিয়ে দেন মমতাময়ী বাড়ির মালকিন, ‘অ পুত, গোঁসা গইর্গ্যস কীঅল্যাই? বাআজিরে, বিয়াগ্গিন ঠিক অই যাইবো গই! আঁই তোঁয়ারে শিখাই পড়াই লইয়্যম, চিন্তা নো গর!’ সেই জ্যোতির্ময় কি সেদিন স্বপ্নেও ভেবেছিল—যে বছর ‘জয় বাঙলা’ হল, তার ঠিক তিন বছর বাদে নতুন চাকুরিসূত্রে তার পোস্টিং হয়ে যাবে সীমান্ত শহর বনগ্রামে, বনগাঁয়? যেখান থেকে হাত বাড়ালেই বাঙলাদেশের যশোর-খুলনা, মেহেরপুর চুয়াডাঙা মাগুরা চৌগাছা বাঘারপাড়া নড়াইল ঝিকরগাছা সাতক্ষীরা—এত কাছে? এত কাছে?
এককালে বনগ্রামও তো ছিল যশোরের মধ্যে, তার আগে ছিল নদিয়ার সঙ্গে, আঠার শো বিরাশি সালে নদিয়া ছেড়ে যশোহরে, আর এখন তো এপারে চব্বিশ পরগনায়! বনগাঁয় এসে জ্যোতির্ময়ের—সেই যে সেই ছড়াটি, ‘বনগাঁ মাসি বনগাঁ পিসি বনের ধারে ঘর, কখনও মাসি বলে নাকো খৈ মোয়াটা ধর’—কি আর মনে পড়েনি? পড়েছে বৈকি, তবে এই বাহ্য, কোথাও যেন একটা অনাদর অবহেলার অনুযোগ অভিযোগ ছড়াটিতে স্পষ্ট! আর এটাও স্পষ্ট যে, মাসি-পিসিকে বনের ধারে ঘর গড়ে দিয়ে বন-ঠাসা করে তাদের দূর সম্পর্কের প্রায় অনাত্মীয় করে তুলেছে তার নিকটতম আত্মীয়রাই, তবু তাদের—দুধটা, ঘিটার জন্য—প্রত্যাশাও বড়ো কম নয়! প্রথম দিন এসেই জ্যোতির্ময়ের মনে হয়েছিল—কলকাতা থেকে বনগাঁ কম দূরত্বের নয়, আর তার আদি জন্মস্থান ঝাড়গ্রাম থেকে তো ততোধিক দূরের, যেন সেই কোন্ ধ্যাদ্ধেড়ে গোবিন্দপুরের! তার উপর এসেই শুনেছে—সীমান্ত শহর বনগ্রামে প্রতিদিনই দু-চারটে খুন হয়, রীতিমতো ভয়-ভীতির শহর—কখনও লাশ পড়ে থাকে ২ নম্বর রেলগেটে, কখনও গলায় বাঁশ দিয়ে চেপে কাউকে মেরে ফেলা হয় কোথাও সিন্দ্রানীতে, সাতভায়া কালীতলায় গুলিতে ঝাঁঝ্রা হয়ে যায় তরতাজা যুবকের দেহ, বি.এস.এফের আচমকা অপারেশনে নিজের জমিতেই লুটিয়ে পড়ে কৃষক, সাত জন দুষ্কৃতীকে সাত- সাতটা সারিবদ্ধ নারকেল গাছে বেঁধে রাতের অন্ধকারে জলজ্যান্ত লাশ বানিয়ে পুলিশের বড় কর্তা বুক ফুলিয়ে ঘোষণা করেন, ‘মারা গেছে এনকাউন্টারে’, পেট্রাপোলের কাছে ছয়ঘরিয়ার ছা-পোষা স্কুলমাস্টারও ‘গরু পাচারকারী’ হিসাবে ধরা পড়ে পচতে থাকেন ওপারের বি ডি আরের কোর্টে!
অথচ বাইরে থেকে সাদামাটা শহরটার ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার হালহকিকত চেহারা-চৌহদ্দি দেখে বুঝে-ওঠার কোনও পরিসর থাকে না—যে, বনগাঁ বেবাক ভিতরে ভিতরে এইরকম! যশোর রোডের দু-ধারে খোলা ছাতার মতো বিশাল বিশাল রেইন ট্রি, জিউলি আর শিশুগাছ—কবেকার সব নির্দোষ বৃক্ষ, ছায়ায় মায়ায় জায়গাটাকে করে রেখেছে হিমশীতল, সূর্যের রৌদ্রও তেড়েফুঁড়ে সেখানে ঢুকতে পারে না! রাস্তার একধারে বাসগুমটি—সরকারি ও বেসরকারি—সেখানে মেছোহাটার মতো দিবারাত্র চিৎকার-চেঁচামেচি, হই-হট্টগোল, ড্রাইভার-কন্ডাক্টারের হাঁকাহাঁকি-ডাকাডাকি—‘বাগদা-হেলেঞ্চা’ ‘দত্তপুকুর-বারাসাত’ ‘বারাকপুর-গোপালনগর-বৈরামপুর-চৌবেড়িয়া’ ‘উখড়া-ভাণ্ডারকোলা-রানাঘাট-দত্তফুলিয়া’, ‘কলকাতা কলকাতা’—তলে তলে কেউ কেউ কি অন্যরকম হেঁকে চলেছে—‘ঝিকরগাছা-লাউজানি-চাঁচড়া’ ‘চান্দুরিয়া-সোনাবাড়িয়া-চালতাবাড়িয়া-কেশবপুর’ ‘সাতক্ষীরা-মাগুরা-রাড়ুলি-পাইকগাছা’? ‘যাত্রী প্রতীক্ষালয়’-এ নাক ডাকিয়ে কেউ একজন ঘুমোচ্ছে, খোঁচা খোঁচা চুল গলায় তাবিজ, আচানক ঘুম ভেঙে ধড়্ফড়িয়ে উঠে বসে সে না হয় জিজ্ঞাসা করবে কেন—‘ই বাসভা কতি যাতিছে? আমাগোর চাঁচড়ার বাস নি? হে-ই চাঁ-চ-ড়া—চাঁ-চ-ড়া’ বলে সে উঠেও দাঁড়ালো—দৌড়ুবে কি? ঘোরটা কেটে গেল, এই ‘দ্যাশের’ এক বাবুলোক তাকে এখানে এই ‘বাস স্ট্যান্ডে’ অপেক্ষা করতে বলেছে, সে তাকে ‘র্যাশান কাট’ করে দেবে, রেশন কার্ড না হলে সে ‘ইন্ডিয়ার’ নাগরিক হতে পারবে না—এ দেশে সে ঊনিশ শো একাত্তর সালের একত্রিশে মার্চের পরে এসেছে কী না! ‘শালোর হাজারো কুটি ফ্যাগ্ড়া দিছে—হ্যান কইরো ত্যান কইরো, একাত্তরের আগে আইলে আপনে নাগরিক হতি পারেন, এ্যাকদিনও পরে আইলে আপনের পিটিশান টান-ডাউন—’
পায়ে প্যাডেল করে চালানো তিন চাকার রিকশা অবশ্য এ শহরে একটাও নেই, না আমলাপাড়া না হাসপাতাল মোড়, না মতিগঞ্জে না চাঁপাবেড়িয়া-খয়রামারিতে, না স্টেশন রোড না যশোর রোডে, শুধু শহরে কেন—সুখপুকুরিয়া রসুলপুর শিমুলিয়া- শ্রীনগর ডুমা-সরুইপুর মড়িঘাটা গাঁড়াপোতা- গোবরাপুর বাগদা-হেলেঞ্চা সুন্দরপুর- পাটশিমুলিয়া শিমুলতলা হরিদাসপুর—গ্রামে গঞ্জেও না, এ পর্যন্ত বনগাঁয় আসা জ্যোতির্ময়ের তো চোখে পড়েনি, তবে হাঁ—দাপট আছে চারদিকে চারচাকা ভ্যান রিকশার, কখনও কখনও তা বাস-ট্রাক-ট্যাক্সির গুমরকেও ছাপিয়ে যায় বৈকি! কোথা দিয়ে কোথা দিয়ে কোথায় কোথায় সে চলে যায়, বনগাঁ ‘টাউন দে ইস্টিশনের ওদিক পানে তো ভ্যানগাড়ি চৌপর দিনরাত যাতিছে আসতিছে!’ ভ্যানের উপর কেউ বসে আছে বাবু হয়ে, কেউ-বা পা ঝুলিয়ে—যেতে যেতে পা নাচাতে নাচাতে নছল্লা করতে করতে পা থেকে খুলে পড়ে যায় লাল ক্যাট্ক্যাটে পলিথিনের চটি জোড়াটি! অমনি শোর ওঠে, ‘হ্যারা, ভেন-ডেরাইভার! ভেনির ইস্পিড এট্টু কমাও দি নি—পা দে দামি চটিজুতাডা পাড়ি গিয়েলো!’ গাড়ি শ্লথ হয়, যার চটি সে লাফ দিয়ে হুড়মুড় করে নেমে যায়, চটিজোড়া কুড়িয়ে ফের গাড়িতে উঠতে উঠতে বলল, ‘এই চটিজুতাডা তেনায় আমারে জন্মদিনে গিপ্ট দিয়েলো!’ কখনও কখনও ভ্যান রিকশায় মানুষ নয়, উঠে বসে ‘ক্যাঁটাল’, সার সার ক্যাঁটালের গাড়ি আসছে তো আসছে, আসছে পেট্রাপোল-হরিদাসপুর-ছয়ঘরিয়ার ওদিক থেকে, হয়তো সীমান্ত পেরিয়ে আরও দূর ‘দ্যাশদে’—যেখানে ‘কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে’; এপারে এতদ্অঞ্চলেও রাস্তার দুধারে ক্যাঁটাল গাছের আধিক্য বড়ো কম নয়, তাতে মায়ের কোলে কাঁধে একাধিক সন্তান ঝুলে থাকার মতো ঝুলে আছে অগুন্তি ক্যাঁটাল! কেউ কেউ ফার্নিচারের দোকান সাজিয়ে হয়তো এমনি কত ক্যাঁটালগাছের ছায়াতেই বিক্রি করে চলেছে ক্যাঁটাল কাঠের আসবাব, শো-কেস, দেয়াল-আলমারি, বুক-সেল্ফ, ইত্যাদি ইত্যাদি; তদুপরি জ্যোতির্ময় বনগাঁয় আসা ইস্তক শুনে আসছে—এই সাদামাটা সাধারণ শহরটাতেও কিছু অসাধারণ গুণীজন আছেন, তার মধ্যে একজন নাকি প্রাতঃকালে জলাহার শেষে নিজেরাই ঘরের উঠুনে বাঁধানো ক্যাঁটালগাছের তলাতেই খাতা-কলম আর এক ‘কাঠা’ বিড়ি নিয়ে যাত্রার ‘পালা’ লিখতে শুরু করেন, নাকি বিড়িও শেষ হয়, যাত্রার পালাটিও সম্পূর্ণ ও তার যবনিকাপাত হয়! ক্যাঁটাল, ক্যাঁটালগাছ তো হলো, তবু যেন ভ্যানরিকশর ভ্যানভাড়া এই সাদামাটা শহরটার বুকে আর ফুরোবার নয়; জ্যোতির্ময় তো একদিন নিজের চোখেই দেখল—ভ্যানরিকশায় বাদ্য-বাজনা বরযাত্রী সানাইওয়ালা সমভিব্যাহারে বর-কনে তুমুল যাচ্ছে যশোর রোড ধরে! একটা ভ্যানে বর-কনে পা ঝুলিয়ে বসে, হাতে জাঁতি ও কাজললতা, জোড়ের কাপড় বাঁধা, আরেকটা ভ্যানে বাদ্যকর ও সানাইওয়ালা, পিছনে লাইন দিয়ে ভ্যানের উপর বরযাত্রীরা, ভ্যানরিকশা যাচ্ছে তো যাচ্ছে—অনন্ত প্রবাহ মধ্যে জ্যোতির্ময়ের জিপগাড়িটা আটকা পড়ল, ভ্যানবালারা ভ্রূক্ষেপও করল না!
বর-কনে, ভ্যান রিকশা—জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছে না তো জ্যোতির্ময়? যেমনটা দেখত প্রভাসচন্দ্র মিত্রের ‘চক্রান্ত’ উপন্যাসের জ্যোতির্ময়ও—‘দ্বিপ্রহরে বসিয়া বসিয়া জ্যোতির্ময় জাগ্রত অবস্থায় একটা যেন স্বপ্ন দেখিল! দেখিল যে কলিকাতার সংলগ্ন একটী বালিময় মেটে গলি রাস্তার দুধারে দু তালা বাড়ী, তাহার মধ্য দিয়া সে যাইতেছে, আর বাঁ হাতের দিকের একটা দুতালা বাটীর উপরের ঘর হইতে জ্ঞানা তাহাকে দেখিয়া ছুটিয়া আসিয়া তাহার দু পা জড়াইয়া ধরিয়া আকুল হইয়া কাঁদিয়া বলিতেছে ‘নাথ! পায়ে ঠেলো না!’ স্বপ্ন দেখিয়া আশুতোষকে বলিল, ‘মহাদেবের বাড়ীর ঠিকানা দে ত’—
আশুতোষ।। কেন রে?
জ্যোতি।। আমি যাবো!
আশুতোষ।। কেন?
জ্যোতির্ময় সে স্বপ্নটী ব্যক্তি করিল; আশুতোষ ও তাহার সহপাঠী বিকট হাস্য করিয়া উঠিল! সে হাস্য জ্যোতির্ময়ের বিকৃত মস্তিস্ক সম্পূর্ণরূপে বিকৃত করিয়া দিল; বিদ্রুপ করিয়া আশুতোষ জিজ্ঞাসা করিল—
কি বললে—নাথ না কি ব’ললে?
জ্যো।। নাথ—
উভয়ের আবার বিকট হাস্য!
আশু।। প্রাণেশ্বর বলে নি?
আবার বিকট হাস্য!
আশু।। তুই ম’রবি, তাকে বিয়ে ক’রলেই মরবি!
পুনঃ পুনঃ অট্টহাস্য ও পুনঃ পুনঃ বিদ্রূপ—
জ্যোতির্ময় তাহা সহ্য করিতে না পারিয়ে পলায়ন করিল; সেই দিন হইতে প্রত্যহ জ্যোতির্ময়ের প্রত্যুষে বাসা ছাড়িয়া সমস্ত দিন রৌদ্রে রৌদ্রে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরিত ও অনেক রাত্রি হইলে বাসায় আসিয়া শুইয়া পড়িত—’
‘রেড বুক’-এর মতো রেক্সিন-কাপড়ে বাঁধাই করা একটা চটি বই ‘চক্রান্ত’, ত্যামন স্থূল নয়, একুনে মাত্র আশি পাতার, লেখক শ্রী প্রভাসচন্দ্র মিত্র, ‘Printed by PARIKSHIT CHARAN GUPTA, KAMALA PRINTING WORKS. 3, KASHIMITRA GHAT STREET, CALCUTTA’ প্রকাশ কাল—২৮শে অগ্রহায়ণ, ১৩৩২; মূল্য—110 আনা; ‘ভূমিকা’য় গ্রন্থকারের আলাপ—‘আমাদের এ জীবনে অতীব সুখ-দুঃখ-দায়ক যাহা কিছু দেখি বা শুনি তাহা জগৎ সমাজের অবগতির জন্য প্রকাশ না করিলে মানব সমাজের প্রতি কর্ত্তব্য পরায়ণতা পূরণ করা হয় না—এই বিশ্বাসের বশবর্ত্তী হইয়া আমি সুদীর্ঘকালব্যাপী এই যাতনা কাহিনীটী প্রকাশ করিলাম—’
‘চক্রান্ত’ তেমন উল্লেখযোগ্য কোনও উপন্যাসও নয়, নিছকই ‘জ্ঞানা’ নাম্নী একটি মেয়ের সঙ্গে জ্যোতির্ময় নামের একটি ছেলের প্রেম ও প্রেমে ব্যর্থতাঘটিত এক ‘যাতনা কাহিনী’, যা প্রকাশের দায় ছিল লেখকের, প্রকাশ করেছেন—এ তো গ্রন্থকারেরই স্বীকারোক্তি! তবে কি নায়কের নামের সঙ্গে নিজের নামের সাদৃশ্যহেতু ‘চক্রান্ত’-কে গ্রহণ করেছে জ্যোতির্ময়? বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’র প্রকাশকাল তের শো পঁয়ত্রিশ, প্রায় তিন বছরের প্রাচীনতা আছে ‘চক্রান্ত’-এ, কেননা ‘চক্রান্ত’-এর প্রকাশকাল তের শো বত্রিশ, তা বলে ‘পথের পাঁচালী’র ধ্রুপদীয়ানা সে পাবে কোথায়? সে লাবণ্যও নেই, তুল্যমূল্য আলোচনাতেও নামটা আসে না, হয়তো এখানে এই পরিস্থিতিতে জ্যোতির্ময়ের মনে করাটাও অপ্রাসঙ্গিক হবে, তবু সে জেগে স্বপ্ন দেখার প্রসঙ্গেই স্মরণ করল, তার কারণ—এক, বইটা সে বনগাঁ বা বনগ্রাম মহকুমায় আসার প্রাক্মুহূর্তে হস্তগত করেছে, দুই, সদ্য সদ্যই পড়েছে, তিন, উপন্যাসের নায়ক ‘জ্যোতির্ময়’-এর সঙ্গে তার নিজের নামের মিল পেয়েছে, সর্বোপরি জেগে জেগে স্বপ্ন দেখার ব্যাপারটা—
বনগাঁ-চাকদা রোড, যে রোড যশোরের মাতৃভক্ত সন্তান কালী পোদ্দার তাঁর মায়ের গুরুগৃহে যাবার জন্য একদা গড়ে দিয়েছিলেন, সে রাস্তা ধরে সোজা পশ্চিমে কিছুদূর গেলে পড়বে শ্রীপল্লীর মোড়, ডাইনে ঘুরলেই বাজিতপুরের পিচ সড়ক, তারপরই তো নদী ইছামতী—ইছামতী, ইছামতী—‘ভগবানের একটি অপূর্ব শিল্প এর দুই তীর, বনবনানীতে সবুজ, পক্ষী-কাকলীতে মুখর—মড়িঘাটা কি বাজিতপুরের ঘাট থেকে নৌকো করে চলে যেও চাঁদুড়িয়ার ঘাট পর্যন্ত—দেখতে পাবে দু ধারে পলতে মাদার গাছের লাল ফুল, জলজ বন্যেবুড়োর ঝোপ, টোপা পানার দাম, বুনো ত্রিপল্লা লতার হলদে ফুলের শোভা, কোথাও উঁচু পাড়ে প্রাচীন বট-অশ্বত্থের ছায়া-ভরা উলুটি-বাচড়া-বৈঁচি ঝোপ, বাঁশঝাড়, গাঙশালিখের গর্ত, সুকুমার লতাবিতান’—অতদূর যেতে হবে না, ইছামতীকে ডাইনে রেখে একটু এগোলেই তো বিভূতিভূষণের বারাকপুর গ্রাম, বারাকপুর-ঘাট থেকে এখন যদি দেখতে পাও নদীতে স্নান সেরে খর রৌদ্রে ভিজে কাপড়ে উঠে আসছে সর্বজয়া, পায়ের পাতার জল মাটিতে পড়ামাত্রই শুকিয়ে যাচ্ছে, পিছন পিছন তার ফেলে যাওয়া পায়ের ছাপের উপর পা ফেলতে ফেলতে হেঁটে আসছে ন্যাঙটো-পোঁদো অপুও—তবে সে তো প্রকাশ্য দিবালোকে জেগে জেগে স্বপ্ন দেখাই হবে! কিংবা, বনগাঁর এই সাদামাটা শহরটা ছাড়িয়ে, পেরিয়ে ইছামতী, বনগ্রাম-বয়রা রোড ধরে ডাইনে-বাঁয়ে ঘাট-বাঁওড় গাঁড়াপোতা সুন্দরপুর আষাঢ়ু হেলেঞ্চার বাজার ফেলে, দুধারে ধানের ক্ষেত পাটের ক্ষেত নকফুল গাঁড়াপোতা ঘাটবাঁওড়ের বাঁওড় রেখে, কোথাও রাংচিতা- ওড়কলমীর ফুল কোথাও দূরে বারাসে-মধুখালির বিল—আসা যাক বেত্রবতী বা বেতনা নদীতীরস্থ বাগদা গঞ্জের বাজারে, একদা যেখানে বাণিজ্য তরী ভিড়ত, এখন সে নদী আর কোথায়, ‘কোন্ প্রাচীন কালের নদী শুকাইয়া গিয়া জীবনের যাত্রাপথের পদচিহ্ন রাখিয়া গিয়াছে’! বাগদহ ছাড়ালেই সীমান্ত, এপারে বয়রা গ্রাম ওপারে কোটচাঁদপুর মহেশপুর তাহিরপুর চৌগাছা ঝিকরগাছা—মাঝে নদী ঐ বয়ে চলে যায় কপোতাক্ষ কী কপোতাক্ষী! তাও তো ভৈরব থেকে আগত সে নদী এপারে এখন মরে হেজে গিয়েছে, ওপারের ‘মধুবংশী’র ঘাটে নৌকো কিন্তু বাঁধা থাকে! ওপারের গরু চরতে আসে এপারে, এপারের গরু-ছাগল হল্ক-দল্ক ভরতি পেট নিয়ে ওপারের মাঠে বসে বসে জাবর কাটে, দিন গত হলে ওপারের রাখালিয়া বড়োজোর বাড়িমুখো খেদিয়ে দেয় এপারে—তা, কপোতাক্ষ এখন থাক বা না থাক, এককালে তো ছিল—ছিল, ছিল—বয়রা গ্রামের ভাঙাচোরা, মুক্তিযুদ্ধের সময় দেয়ালে গুলি-খাওয়া পোস্টাপিসের ধারে মরা-হাজা কপোতাক্ষের তীরে এপারের যে কেউ বাঙালি এসে দাঁড়ালে, সাগরদাঁড়ি গ্রামের সে কপোতাক্ষ যতদূরেই থাক না কেন, সে কী আর মনে মনে দেখবে না—গলায় কালো ‘কারে’ ঝুলানো একটা ‘তাবিজ’, সম্পূর্ণ আদুল গায়ে নাবালক মধু হাতে ঘুড়ির লাটাই নিয়ে হাওয়ার বিপরীতে ফাঁসি দেওয়া বটগাছের তলা দিয়ে তলা দিয়ে, পাঁক-বোদ আর পানায় ভরা চরণবিলের ধার দিয়ে ধার দিয়ে দৌড়ুচ্ছে তো দৌড়ুচ্ছে? হাওয়ার পাল্টি খেয়ে সে ঘুড়ি ফত্ ফত্ করে উড়ল কী উড়ল না—সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ নেই! কপোতাক্ষের জলে কখনও কখনও ছিপ্ ফেলে বসে থাকে, ‘মাছ প্রায়ই হয় না, শরের ফাৎনা স্থির জলে দণ্ডের পর দণ্ড নিবাত নিষ্কম্প দীপশিখার মত অটল—এক স্থানে অতক্ষণ বসিয়া থাকিবার ধৈর্য তাহার থাকে না, সে এদিকে ওদিকে ছট্ফট করিয়া বেড়ায়, ঝোপের মধ্যে পাখীর বাসার খোঁজে, ফিরিয়া আসিয়া হয়ত চোখে পড়ে ফাৎনা একটু একটু ঠুক্রাইয়া ছিপ তুলিয়া বলে—দূর! ঝেঁয়া মাছের ঝাঁক লেগেছে, এখানে কিছু হবে না’—
মরা-হাজা কপোতাক্ষের এপারে দাঁড়িয়ে জেগে জেগে সে যেন স্বপ্নে আরও দেখে ফেলে—‘যশোরে সাগরদাঁড়ী কপোতাক্ষ তীরে’ ভবিষ্যতের মধুকবি বট-পাকুড়ের ছায়ায় বসে শৈশবেই মক্সো করে চলেছে সেই মহাকবিতার—
‘সতত হে নদ তুমি পড় মোর মনে—
… … … … … … …
বহু দেশে দেখিয়াছি বহু নদ দলে,
কিন্তু এ স্নেহের তৃষা মিটে কার জলে?
দুগ্ধস্রোতোরূপী তুমি জন্মভূমি-স্তনে!’
যেমনটা মাঝে মাঝে জ্যোতির্ময়ও নাওভাঙা নদীধারের গ্রাম, যবন হরিদাসের নামে নাম ‘হরিদাসপুর’ তথা ‘পেট্রাপোল বর্ডার’-এ গাড়ি চালিয়ে এসে দাঁড়ালেই মনে মনে দেখতে পায়! ‘নো ম্যান’স্ ল্যান্ড’ পেরোলেই ওপারে বেনাপোল বর্ডার, বি ডি আর বা বাঙলাদেশ রাইফেল্সের ঘাঁটি এপারে আমাদের ‘পেট্রাপোল বর্ডার’ বি এস এফ বা বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের অফিস-কাছারি; রাস্তার দু-ধারে, কী এপারে কী ওপারে—সেই সব সারিবদ্ধ রেইন ট্রি শিশু আম-কাঁঠাল—যশোর রোড চলছে তো চলছে, পেরিয়ে যাচ্ছে বেনাপোল শার্শা নাভারন গদ্খালী ঝিকরগাছা চাঁচ্ড়া দিয়াড়া, ভাগ হয়ে যাচ্ছে ইছামতী বেত্রবতী কপোতাক্ষ বা কপোতাক্ষী, দেশটা তো ভাগ হয়ে গিয়েছে কবেই, এতদিনে যা হোক ইস্ট পাকিস্তান থেকে হল ‘বাঙলা দেশ’! জ্যোতির্ময় যেমন করে নিজের জেলার সুবর্ণরেখা কাঁসাই ক্ষীরাই রূপনারায়ণ পেরিয়ে গঙ্গা পেরিয়ে বাসে-ট্রেনে এসে যায় কলকাতায়, কলকাতা-শিয়ালদা থেকে নাওয়াই নদী শুন্টি নদী বাবিতি বিল বাইকার বিল নাঙ্গালা বিলকে এদিক ওদিক রেখে এসে পৌঁছোয় বনগাঁয়, ইচ্ছা হলে বনগাঁ থেকে চলে যেতে পারে স্বরূপনগর কি নদিয়া রানাঘাট বাতকুল্লায়, তার জন্য কোনও ভিসা-পাসপোর্ট লাগে না, কাঁটাতারের বেড়ারও কোনও আড়াল থাকে না, তেমন করে যেন নাওভাঙা, ভাগের নদী বেত্রবতী কপোতাক্ষ ইছামতী পেরিয়ে যশোর-বেনাপোল সড়ক ধরে রেইন ট্রি শিশু ‘আম ক্যাঁটালের’ ছায়ায় ছায়ায় হেঁটে চলেছে, রাস্তার দু-ধারে দুধমনি দাহর নাগরা বশিরাজ গন্ধকস্তুরী ধানের ক্ষেত থেকে পাকা ধানের সুবাস উঠছে, যেখানে ধানকাটা শেষ সেখানে ধানবিলের ডোবায় কাদায় ভূত হয়ে তিতপুঁটি চেঙ ফলি ইকেখোটা মাছ ধরতে লেগেছে পোলাপানরা, মাছ মারা শেষে কখন তারা ডোবা ছেড়ে উঠবে—তার আশায় ওৎ পেতে গাব-কড়ইয়ের ডালে ওদিকে বসে থাকে অরল বিল ইছামতী বিল বেড়-গোবিন্দপুর বেদাপাড়া বাওড়ের কানীবক বুনো মাছরাঙা গাংগা কৈতর—জেগে জেগে এসব স্বপ্ন দেখার হক জ্যোতির্ময়েরও আছে কি না, কেননা একদা ওপারের আধ-খাঁড়া ভূখণ্ডটা তারও যে স্বদেশ ছিল! ঢাকা চট্টগ্রাম রাজসাহী রংপুর ঝিনাইদহ নড়াইল নেত্রকোনা খাগড়াছড়ি লালমণির হাট সিরাজগঞ্জ গাইবান্ধা নরসিংদী—যেখানে খুশি যাওনের স্বাধীনতা ও স্বাচ্ছন্দ্য ছিল, মধুমতী মেঘনা ধরলা ধলেশ্বরী আড়িয়ালখাঁ আঠারবাঁকী পদ্মা পশর ভৈরব ভদ্রা—যে কোনও নদীতেই পা ডোবাবার রায়তি ভোগদখল ছিল, সেখানে না জন্মালেও, জন্মসূত্রে উদ্বাস্তু হওনের মর্মন্তুদ ট্র্যাজেডি তার জীবনে না থাকলেও স্বদেশ হারানোর জন্য কোথাও নিভৃতে একটু কাঁদতে পারবে না, তার জন্য জেগে জেগে স্বপ্নও দেখবে না জ্যোতির্ময়—তাও কি কখনও হয়?
সংগ্রামী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ২০১৯ পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত