সে অনেক অনেক যুগ আগেকার কথা। সে এক অসম সাহসী মেয়ের কাহিনি। মেয়েটি কালো। চিকণ কালো। সে যে ধক্ধকে আগুন-জ্বলা চাঁদকপালী। সে অঘটনঘটনপটীয়সী—লক্লকে জিভ—মুক্তকেশী—ওষ্ঠ ভাসে তার রুধিরপানে—ঢক্ঢক্ করে পান করে সে যে রক্ত!—ভয়ঙ্করী! প্রহারে পটু—নৃত্যে? পায়ের তালে তাল ঠুকে চলে তার অবলীলায় নারীর লাস্য সঙ্গে পুরুষের তাণ্ডব। ভয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর মুণ্ডচ্ছেদ করে পরেছে সে মালা গেঁথে—‘দলম্মল্ দলম্মল্ গলে মুণ্ডমালা’। যখন সে মেয়ে হাসে—সে তো প্রলয়কে যেন আনে ডেকে। দাঁতে লেগে রয়েছে তার রক্ত—সে যে রক্তদন্তিকা। অসীম অবিনশ্বর সময়ের বুকে সে মেয়ে হেঁটে—লক্ষ লক্ষ বার দাঁড়িয়ে রয়েছে সে সেই অবিনশ্বর সময়ের বুকেই পা দিয়ে। দুলছে তার দীর্ঘজটা। সে যে বিস্তৃতজাল মুক্তকেশী। সে কখনও পরাজিত হয়নি, তাই ও মেয়ে আমাদের অপরাজিতা। আদি নেই তার অন্ত নেই তার—অন্নে সে সদাই পূর্ণ—সে আমাদের অন্নপূর্ণা। দৈত্যদলনী। অসুরনাশিনী। সিংহবিক্রমী। শ্মশানবাসিনী। শৃগালপালনী। নিত্যা। দিগম্বরী। বর্ণময়ী—ভাষাময়ী মেয়ে। সে নিষ্কামের কামনার বস্তু। নাম তার কালী।
দেশের মহাসংকটের দিনে প্রচণ্ড শক্তিতে দুর্নিবার বেগে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেই মেয়ে। তার বীর্য, সাহস, বল, তেজ এবং দলবল নিয়ে মহাযুদ্ধে বিজয়িনী হলো সে। একবার নয়—বারবার। শক্তিরূপিণী সেই কন্যা বিজয়িনী হয়ে ভুলে গেল না কিন্তু তার আশ্রিতদের—মাতৃস্নেহে তাদের জড়িয়ে ধরে রইল নিজের বিশাল বক্ষ মাঝে। এবার আকাশ পৃথিবী ব্যেপে ছড়িয়ে পড়ল নিজে—কখনও মহালক্ষ্মী, কখনও-বা মহাসরস্বতী—কখনও দুর্গা, অন্নপূর্ণা, মহাবিদ্যা, আদ্যাশক্তিরূপে। মানুষের মনকে চাষ করতে লাগল। আর, মহাকালের সঙ্গে মহাকালী হয়ে দিন কাটাতে লাগল। যুগে যুগে।

নারীজীবনকে সার্থক করেছে সে। জায়া-সখী-জননীর রূপ ধরে নানা বেশে নানা দেশে। দেশকালের সীমানা ছাড়িয়ে নারীজীবনের অস্তিত্বের শিকড়কে এমনভাবে দৃঢ় করেছে যে, সমাজের প্রতিটি নারী সেই সাহসী মেয়েটির শক্তির অংশে অংশভাক্। সমাজ ও সংসার ভোলেনি তো তাকে! প্রতি বছর পিতৃপক্ষের অবসানে মাতৃপক্ষ আসে। পিতৃতর্পণ সেরে মাতৃযজ্ঞ শুরু হয়। যজ্ঞ শেষ হয় কার্তিকী অমাবস্যায়—দীপাবলি কালীপূজা সাঙ্গ করে। তা ছাড়াও বছরভর চলতে থাকে শক্তির বিভিন্ন রূপের পূজা। স্ত্রীশক্তি যে অনন্যা। কখনও সে নারী, কখনও পুরুষসূক্তের সেই বিশাল পুরুষ, কখনও-বা অর্ধনারীশ্বর। কখনও হয়েছে জগতের ধাত্রী—জগদ্ধাত্রী। রূপে, তেজে টলমল ঈশ্বরী। সে যে আদ্যিকালের কালো মেয়ে। নাম তার শ্যামা—জগৎকে আলো করার জন্য নিজে কালো সেজেছে। আলো আর কালোকে একই সময়ে বেঁধেছে সে। কী অসাধারণ কনট্রাস্ট—কী অদ্ভুত টাইমলাইন!
দিগ্ব্যাপিনী সেই কন্যের আদিও নেই, অন্তও নেই। সে জন্মায় না, মরেও না। তবুও মাঝেমধ্যে জন্মাতে ইচ্ছে করে বৈকি! দক্ষরাজার ঘরে মেয়ে সতী হয়ে সে জন্মেছিল। কিন্তু পারল না যে পতিনিন্দা সহ্য করতে। পারল না সে তার পিতা দক্ষকে পিতা বলে আর মেনে নিতে। চকিতে প্রাণটা ছেড়ে দিল সে তপোতেজে। মহাকালের কোলে। মহাকাল ছাড়া তাকে ধারণ করবে কে, শুনি? তার দেহ-খোলসটা পাল্টে পাল্টে সে কাটিয়ে দিল যুগ-যুগান্ত। খোলসটা যেন তার পোশাক। কখনও ধরল বেশ পার্বতীর—কখনও উমার—কখনও-বা দশমহাবিদ্যার। কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলামুখী, মাতঙ্গী ও কমলা—এসবই তার নানা বেশবদল। এল কত ঋষিকা সেজে—বেদ-উপনিষদ-পুরাণ-মহাকাব্যের যুগ পেরিয়ে—আজও সে আছে আমাদের মাঝে। যুগের প্রয়োজনকে সে অস্বীকার করেনি তো কখনও।
আঁধারকালো সেই মেয়ে নিজের শক্তিকে প্রকাশ করেছে কখনও পূর্ণে, কখনও-বা অংশে। পূর্ণরূপে সে প্রেমের পরাকাষ্ঠা রাধা—ধৈর্যে-ক্ষমায় সহনশীল ব্যক্তিত্বময়ী সীতা—অবগুণ্ঠিতা সঙ্ঘজননী মা সারদা রূপে ‘জ্যান্ত দুর্গা’, যুগ প্রয়োজনে যে শক্তির অবতরণ এবং নিত্যা সিদ্ধারূপে অবস্থান। অংশে অবতরণ করেও সে হয়েছে মহোত্তমা—‘অষ্টসখীর এক সখী’-রূপে প্রখর ব্যক্তিত্বময়ী রানি রাসমণি—সাহসী, তেজস্বিনী, ভক্তিমতী, শিষ্টের পালনী কিন্তু দুষ্টের যম। উনিশ শতকের এক বিরল দৃষ্টান্ত। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের প্রতিষ্ঠাত্রী। মা ভবতারিণীর প্রধানা সেবিকা। এবং শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনার ক্ষেত্র-রচয়িত্রী।

যুগের পর যুগ ধরে এক অখণ্ড কালস্রোতকে ধরে রেখেছে সেই মেয়েটি। বালী-বধূ তারা, কুন্তী, গান্ধারী ও দ্রৌপদীর মধ্যেও অংশে অবতীর্ণ হয়েছে সে। ভিন্ন স্বাদের ব্যক্তিসত্তায় ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যে নিজেকে মেলে ধরেছিল সেই কালোবরণ কন্যা। এসেছিল সে রানি অহল্যাবাঈ, রানি লক্ষ্মীবাই, রানি ভবানী, চাঁদবিবি হয়ে। কাঁপিয়ে তুলেছিল গোটা দেশকে বীণা-কল্যাণী-শান্তি-সুনীতিদের হাতের রিভলবার হয়ে। রানি ঝাঁসি বাহিনী হয়ে সঁপেছিল প্রাণ দেশের তরে।
কালো মেয়ের পায়ের তলায় আলোর নাচন—অনুভব করেছিলেন কবি। এই কালো মেয়েই মহানিশা। এই কালো মেয়েই মহাগগন। ঊষা, সবিতা, চন্দ্রমা, নক্ষত্র, গ্রহের মালা দুলছে তারই কণ্ঠে। এ দেশের সাধনা তাই বলে—জড়বিজ্ঞান মানুক ছাই নাই মানুক। সেই মেয়ে স্বয়ং মহাশূন্য—স্বয়ং মহাপূর্ণ। আজ পর্যন্ত যত নারী জন্মেছে আর যত নারী জন্মাচ্ছে সবই সেই মেয়ের শক্তিরূপের প্রকাশ। ধনীর দুলালি থেকে রাস্তায় ময়লার পাশে পড়ে থাকা মেয়েটি পর্যন্ত। সমাজ-সংসার তা অবশ্য মানে না। নারী পণ্য নয়—নারী হলো শক্তি। আমরা পুজো করি তাকে বেদিতে বসিয়ে কিন্তু রাস্তায় পড়ে থাকা মেয়েটিকে অবহেলা করে। নারীও নারীকে কষ্ট দেয়। পুরুষ করে অত্যাচার—নির্মম নির্দয়। নারী আজও নানাভাবে লঞ্ছিত। পৌরুষ তার আছে কিন্তু সে যে জানে না রুখে দাঁড়াতে। সে ভুলে গেছে যে সে নিজেও সেই কালো মেয়েরই অংশ।
দিগ্বসনা সেই কালো মেয়ে হাসে খল্খল্ রবে—শ্মশানচারিণী মহাকালী শিবা-পরিমণ্ডিতা সে। শ্মশান দেখতে সে বড়ো ভালোবাসে। সমাজের দুর্দৈবে সে আসে—কালক্ষয়ে সে গ্রাস করে—কেউ জানে না কখন আসবে ধেয়ে প্রলয়ঙ্করী সেই মেয়ে। লাস্যতাণ্ডব চলবে তার একই সাথে নৃত্যরত মহাকালের দেহে—অর্ধনারীশ্বর হয়ে। কাল-অকালের তালে, প্রলয়-লয়ের বোলে, ডাকিনী-শাকিনী-যোগিনীকে নিয়ে আনন্দ উথলে ওঠে তার—মহাচণ্ডী যোগেশ্বরী করালী মহাভ্রামরী গুহ্যকালী করে অট্টহাস—অবিনাশী সেই ভ্রমরকালো মেয়ে।
দশভুজা—অনন্তভুজা সেই মেয়ে ছড়িয়ে পড়েছে নিজে সৃষ্টির বীজ নিয়ে দেশকালের সীমানা ছাড়িয়ে—মাটিকে বুকে নিয়ে আকাশে ডানা মেলে—কৃষকবধূ, কখনও-বা সেনানী—মহাকাশচারিণী হয়ে। স্থিতিরূপা সেই মেয়ে হাল ধরেছে জীবনতরীর। হাতে স্টিয়ারিং—নানা পেশায়, ঘরকন্নায়। ঘরটি আগলে রাখে সে মাতৃস্নেহে—অপার করুণায়—শ্রীমুখে ঝরে পড়ে তার হাসি—সেই আলো-ঝরানো মিষ্টি কালো মেয়ে।