নর্মদার উভয় তটে বিন্ধ্য ও সাতপুরা পর্বতের কোলে শত শত জাগ্রত শিব তীর্থ আছে। সারা ভারতবর্ষই শিবময়, তার মধ্যে নর্মদা হল জীবন্ত শঙ্কর ভাষ্য– যে ভাষ্যের প্রথম অধ্যায় অমরকন্টকে আরম্ভ হয়ে শেষ হয়েছে ওঁকারেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গে; নদীর বলয় যেখানে সাগর সংগমে।
শংকর প্রিয় মহা তীর্থ অমরকন্টক অপর নাম মেকল বা ঋষ্য। নর্মদার উৎসস্থল। মহাকবি কালিদাস এই পর্বত শৃঙ্গকে আম্রকূট বলে উল্লেখ করেছেন। পূর্বকালের আম্রকূটই হয়তো অপভ্রংশে লোকমুখে হয়েছে অমরকণ্টক। পর্বতের মধ্যভাগে যখন আরোহন করবেন তখন দেখতে পাবেন এক অদ্ভুত দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য—পর্বতের মধ্যভাগে শ্যামল এবং অবশিষ্ট অংশকে পান্ডুবর্ণ দেখাবে যেন মনে হবে পর্বতের এই অংশটি ধরিত্রী মাতার স্তনের রূপ ধারণ করেছে।
নর্মদা মন্দির : নর্মদা মন্দিরের নির্মাণকাল নিয়ে সঠিক কোন প্রামাণ্য নথি পাওয়া যায় না। সম্ভবত দশম বা দ্বাদশ শতাব্দীতে কলচুরি রাজাদের আমলে বাঁশ বনের মধ্যে নর্মদার উদ্গম কুণ্ডআবিষ্কৃত হয়। অতপর রেবা নায়েক স্বপ্নাদেশ পেয়ে এখানে মন্দির নির্মাণ করেন। যদিও কালের গর্ভে সেই মন্দির আজ বিলুপ্ত। পরে নাগপুরের ভোঁসলে রাজারা মন্দিরের জীর্ণ কাঠামো উদ্ধার করেন এবার মহারাজ গুলাব সিংহ এই মন্দিরের সংস্কার করেন।

অনেকের মতে এই মন্দিরের নির্মাণশৈলী অনেকটাই মুসলিম ঘরানার মত মনে হয়। এর কারণ গুলাব সিংহের মুখ্য কারিগর ছিলেন মুসলিম। রাজা মন্দিরের নির্মাণ কাজ দেখতে এসে মন্দিরের প্রবেশ দ্বারে এসে দেখেন, তোরণটি অনেকটি মসজিদের প্রবেশদ্বারের মত লাগছে। তার নির্দেশেই প্রবেশদ্বারের শীর্ষে একটি গণেশ মূর্তির স্থাপনা করা হয়। এই মন্দিরের কারুকাজ আর গঠনশৈলি অসাধারণ উৎকর্ষতার প্রমান রেখেছে।
বিশাল তোরণ পেরিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করলে বিশাল প্রস্তরময় চত্বর। চত্বরের মাঝখানে একাদশ কোণ বিশিষ্ট একটি কুণ্ড। পরিধি প্রায় ২৬০ হাত আট দশ হাত গভীর স্থির কাকচক্ষু জল এত স্বচ্ছ যে তলদেশ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, এই হল পরম পবিত্র নর্মদা কুন্ডু। যেখানে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন শঙ্করের তেজসম্ভূতা নর্মদা। শাস্ত্রনুসারে এই জলাধারকে বিশাযন্ত্র বলা হয়। মহাত্মদের দৃষ্টিতে এই বিশাযন্ত্র মহাসিদ্ধির আধার। কুন্ডের পশ্চিম দিকে জল নিঃসরণের একটি নালা, এরই নাম গোমুখ। ছয় সাত হাত লম্বা এই গোমুখ দিয়ে নর্মদা আরো একটি ছোট কুণ্ডে ঝরে পড়েছে। এর নাম কোটিতীর্থ। মহাদেবের পরীক্ষালীলায় বিভ্রান্ত কামমোহিত দেবতারা নর্মদা মাতার কাছে পরাজিত হয়ে এইখানে বসে নর্মদা বন্দনা করেছিলেন। এই জল তীর্থযাত্রী ও পরিক্রমাকারী সাধুদের কাছে পরম পবিত্র। যে সমস্ত তপস্বী নর্মরদার উত্তরতট থেকে পরিক্রমা শুরু করেন তাদেরকে এই কোটিতীর্থর জলে সংকল্প করতে হয়, কারণ পরিক্রমাকারীরা উত্তরতট থেকে নর্মদাকুন্ডে বা মন্দিরে যেতে পারে না। শাস্ত্রের এই নিয়ম।
কোটি তীর্থের পাশে আরো দুটি কুণ্ড আছে। গায়ত্রী এবং সাবিত্রীকুণ্ড। একটি ছোট নদী ‘উদগম’ মন্দিরের উত্তর-পূর্ব কোন হতে বয়ে এসে মন্দিরে পূর্ব ধার হয়ে নর্মদায় মিলিত হয়েছে-এর নাম সাবিত্রী। আরো একটি জলের ধারাও মন্দিরে উত্তরদিক বেষ্টন করে মন্দিরের পশ্চিম ধার দিয়ে এসে নর্মদাধারার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এই তিনের মিলিত ধারাকে ত্রিকুটি বলে। ত্রিকুটি যন্ত্র এই তিন পবিত্র ধারার সংগ্রামকে ত্রিকুটি যন্ত্রের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

নর্মদা কুন্ডের প্রস্তরমণ্ডিত চত্বরে চারিদিকে ১৬ টি মন্দির। প্রত্যেকটি মন্দির পাথরের দেওয়ালগুলি শ্বেতশুভ্র ,উচ্চচুরা বিশিষ্ট। এই মন্দিরের ১৬টি দেবতা ছাড়াও আরো সাতটি ছোট ছোট মূর্তি আছে। মোট ২৩ টি মূর্তি। কুন্ডের মধ্যে উত্তরদিকে পার্বতী ও অমরকণ্ঠস্বরের মহাদেব মন্দির। মন্দিরের নিচে মধ্যে জলের নিচে বিরাজ করছে নর্মদেশ্বর মহাদেব, কন্যা নর্মদা তার ডান পায়ের উপর কৃতঞ্জলি পুটে দন্ডায়মানা উত্তর তাতে আরও দুটি মন্দির আছে মাঝখানে একটু সভামণ্ডপ। সভামন্ডপের দক্ষিণ দিকে প্রবেশপথে দেবনগরীঅক্ষরে লেখা আছে ‘হর নর্মদে’, উত্তর দিকের প্রবেশপথে লেখা আছে ‘জয় মা নর্মদে ‘. পূর্বমুখী মন্দিরটি তে নর্মদা মাতা সমাসীন নাম কালো কষ্টিপাথরের মূর্তি আকর্ণ বিস্তৃত চক্ষু, উন্নত নাসা, ক্ষীণকটি নীরাভরণ তপস্বিনী মূর্তি।
আদিকন্যা শক্তির প্রতীক মহাকুমারী অপলক দৃষ্টি তাকিয়ে আছেন সম্মুখেই পশ্চিমমুখী মন্দিরস্থ অমরনাথ মহাদেবের দিকে আনন্দ বিধাযিনি আত্মজার দিকে তাকিয়ে পিতারও চোখের পলক পরছে না দুচোখ দিয়ে বাৎসল্য ঝরে পড়ছে যেন।
মূল মন্দিরে বিরাজ করছেন মা নর্মদা, মন্দির পরিসরে মোট সাতাশটি মন্দির আছে। মূল মন্দিরকে বেষ্টন করে আছে কার্তিকেয়, গোরক্ষনাথ, প্রাচীণ অষ্টবসু, সিদ্ধেশ্বর,অন্নপূর্ণা, শিব, সূর্যনারায়ণ, ভাঙেশ্বর, রাম-জানকী, শিব পরিবার, একাদশ রুদ্র, রেবা নায়েক মন্দির, হনুমান, ভৈরবীচক্র…. যজ্ঞশালা দেখতে পাবেন।
এখান থেকে সামনে এগিয়ে গেলেই একটি প্রস্তরের হাতি দাঁড়িয়ে রয়েছে যার নিচ দিয়ে গলে যেতে পারলেই নাকি পুণ্য অর্জন হয় বলে, ভক্তদের ধারণা।
প্রতি সন্ধ্যায় আলোর সাজে সেজে ওঠে গোটা মন্দির। নর্মদার পুজো হয় কুন্ডে। সমবেত মন্ত্রসংগীতে মুখরিত হয়ে ওঠে রাতের অমরকণ্টক।
রয়েছে কর্ণ মন্দির। মহারাজ কর্ণের সময় অমরকন্টক ক্ষেত্র খুবই সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে। রাজা কর্ণ অত্যন্ত সাত্ত্বিক প্রকৃতির শক্তিশালী রাজা ছিলেন। কলচুরি রাজাদের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে তার প্রতি শ্রদ্ধা রাখতে এই মন্দির নির্মাণ করানো হয়েছে পরবর্তীকালে।
নর্মদা মন্দিরের বাঁদিকে ১০০ মিটার দূরে অবস্থিত প্রাচীন মন্দিরগুলি বর্তমানে ভারতের পুরাতাত্ত্বিক বিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত। মন্দিরের শুরুতেই কাউন্টার আছে যেখানে আপনি নর্মদার জল, মিষ্টি, নারকেল, ভোগ ইত্যাদি টিকিট কেটে কিনতে পারবেন। ভক্তদের কাছে একটাই নিবেদন কুণ্ডের জল দয়া করে নোংরা করবেন না, বহু মানুষ কুণ্ডে জলের মধ্যে বিধি নিষেধ থাকা সত্ত্বেও নানা জিনিস ভাসিয়ে দেয়। নির্দিষ্ট বর্ডার লাইন ধরে হাঁটলে মন্দির পরিক্রমা করতে পারবেন।

অমরকন্টক পর্বতের চারিদিকে ঘনঘর অরণ্য ভরা ছিল। সেখানে ঘুরে বেড়াতো হিংস্র শ্বাপদ। পাকদন্ডী বেয়ে ঘন জঙ্গল ভেদ করে এই অগম্য মহাতীর্থে
প্রাণ হাতে নিয়ে যেতে হতো। পথে মিলতে না খাদ্য বা জল। নিবিড় জঙ্গলে দিনের বেলাতেও ক্ষীণ আলোর প্রবেশ হতো। জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে বন্য প্রাণী, মানুষ দেখলেই থাবা বসতো। আদি কোল মুন্ডা ইত্যাদি উপজাতির লোকজন এইসব অঞ্চলে দেখা যেত।
এই পর্বতভূমির বন্ধুরতা, গ্রীষ্মকালে উগ্র গরম, শীতকালে হিমশীতল শৈত্য, ভয়ঙ্কর অরণ্যের তমসা…প্রকৃতির বাধার মধ্যে কজন সাহস করে যেতে পারতেন? কজনের ভাগ্যেই বা জুটতো নর্মদেশ্বর এবং তৎকন্যা নর্মদার দর্শন লাভ? সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন অসাধ্য সাধন করেছে। কত সহজে আজ ভক্তরা পৌঁছে যেতে পারেন ভব্য মন্দিরের দর্শনে।
মাই কি বাগিয়া (মায়ের বাগান) : নর্মদা মন্দিরে পূর্ব দিকে প্রায় এক কিলোমিটার হাটা পথ গেলেই পড়বে মায়ের বাগান। ফুল ফলে ভরা বাগান এক সুমিষ্ট গন্ধে ভরপুর।এর অন্য নাম চরণোদক কুণ্ড। এটি নর্মদা মায়ের খেলার জায়গা। মৈকল রাজার কন্যা রূপে নর্মদা তার বাল্যসখা গোলাব কাওলির সঙ্গে এই বনে খেলা করতেন। এখানে একটি জলপূর্ণ কুণ্ড আছে যেটি নর্মদার জলময়ী রূপ। মায়ের বাগানে বিভিন্ন প্রকার ঔষধি বৃক্ষ রয়েছে। এদের মধ্যে গোলাপ কাওলি বৃক্ষ চোখের রোগে খুব উপকারী। আগে গোলাপকাওলি কেবল অমরকন্টকে দেখতে পাওয়া যেত এখন অন্যত্র এর চাষ হয়। তবে এখানে সবচেয়ে ভয়ের জিনিস হচ্ছে বানরকূল যারা নিজের খেয়ালে ঘুরে বেড়ায়। একটু বেখেয়াল হলেই আপনার প্রয়োজনীয় জিনিস হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।
Bhalo hoyeche
থ্যাঙ্ক ইউ