“নর্মদা সরিতাং শ্রেষ্ঠা রুদ্রতেজাৎ বিনিসৃতা। / তারয়েৎ সর্বভূতানি স্থাবরাণি চরাণি চ।।”
গঙ্গা, যমুনা, গোদাবরী, সরস্বতী, নর্মদা, সিন্ধু ও কাবেরী — এই সাত নদীকে ভারতের পবিত্রতম নদী মানা হয় এবং এদের মধ্যে নর্মদা শ্রেষ্ঠা। রুদ্রের তেজ হতে সমুৎপন্না, স্থাবর জঙ্গম সমস্ত কিছুতেই তিনি ত্রাণ করেন। স্কন্ধপুরাণে বলা হয়েছে সরস্বতীর জলে তিন দিন, যমুনার জলে সাত দিন আর গঙ্গার জন্য একদিন স্নান করলে মানবজীবন পবিত্র হয় কিন্তু কেবলমাত্র নর্মদার দর্শন করলে এই পুণ্যফল পাওয়া যায়। নর্মদার তট হলো তপস্যার উত্তম ভূমি।
পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক গল্পগাথার দিক থেকে সমৃদ্ধ হওয়ায় সাধু সন্তদের মনে নর্মদা নদীর আলাদা স্থান রয়েছে। বায়ুপুরাণ বা স্কন্দপুরাণের মতো পুরাণকাহিনিতে নর্মদার উৎপত্তি নিয়েও ভিন্ন মতভেদ রয়েছে। সর্বপাপহরিনী নর্মদাকে শুধু সকল দেবতা, গন্ধর্ব এবং মুনি ঋষিগণ পূজা করেন না, দেবাদিদের মহাদেবেরও তিনি পরম স্নেহের পাত্রী।
নর্মদার উৎপত্তিস্থল অমরকন্টকের চূড়ায় একবার ধ্যানমগ্ন ছিলেন ধুর্জটি। সহসা মহাদেবের নীলকন্ঠ হতে আবির্ভূত হলেন নর্মদা, নির্গত হয়েই তিনি মহাদেবের দক্ষিণ চরণের উপর দাঁড়িয়ে শিব তপস্যায় রত হলেন। সত্যযুগে দশ হাজার বছর তপস্যায় মগ্ন রইলেন দেবী।
যথাকালে স্বয়ম্ভূ ব্যথিত হলেন এবং তাঁর সমাধি হতে দৃষ্টি উন্মীলন করে তিনি দেখতে পেলেন মাথায় সুপিঙ্গল জটাবেশী এক অপরূপা কন্যাকে। তাঁর সারা অঙ্গ থেকে বিকীর্ণ হচ্ছে উজ্জ্বল দীপ্তির ছটা যাঁর দিব্য লাবণ্য ও জ্যোতির বিচ্ছুরণে সমগ্র পর্বত শৃঙ্গ অপূর্ব প্রভায় আলোকিত। বাম হাতের সুডৌল কব্জিতে একটি কমন্ডুল, ডান হাতের একটি অঙ্গুলিতে অক্ষমালা দুলছে।

কুমারীর ধ্যান ভঙ্গ করে শিবসুন্দর জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কে তুমি মা? তোমার কঠোর তপস্য আমি প্রীত হয়েছি। বর প্রার্থনা করো।’
মহাকন্যা উত্তর দিলেন, ‘কি আর বর চাইবো প্রভু! সমুদ্রমন্থনের গরল পান করে মন্ত্রমূর্তি মহেশ্বর আপনি নীলকন্ঠ হয়েছেন। আমার উদ্ভব সেই নীলকন্ঠ হতেই। কেবল প্রার্থনা করি আমি যেন চিরকাল আপনার সঙ্গে নিত্যযুক্তা হয়ে থাকতে পারি’।
‘হে প্রভো, সমস্ত পর্বত নদ-নদী সাগর যখন লয়প্রাপ্ত হবে, তখনও আমি যেন বিলুপ্ত না হই। সকল পাতক আমার জলে অবগাহন করলে যেন তারা কলুষমুক্ত হয়। আমার জলে অবগাহন মাত্রই মুক্তিলাভ করে। আমার তীরে যারা আপনার অর্চনা করবে তারা যেন মৃত্যুর পর শিবলোকে গমন করে।’
‘তথাস্ত! নীলকন্ঠ হতে জাত বলে ক্ষোভ রেখো না বৎসে, তুমি আমার তপস্যার তেজ যদি উদ্ভূত হয়েছো। তুমি শুধু আমার সঙ্গে নিত্য যুক্ত হয়েই থাকবে না তুমি হবে মোক্ষদাত্রী এবং সর্বসিদ্ধিপ্রদায়িনী।’
বর দিয়েই মুহূর্তে অন্তর্হিত হলেন মহেশ্বর। অমরকন্টক পর্বতে পুনরায় তপসায় বসলেন মহাকন্যা। দেবতারা ভীত হলেন। তপস্যার পরীক্ষা আছে, মহাসিদ্ধি লাভের পূর্বক্ষণেও আছে অগ্নিপরীক্ষা। কোথাও যেন মহাদেব পরীক্ষা করতে চাইছিলেন আত্মজা কন্যাকে।

মর্তের মানুষদের মতো দেবতারাও কুমারী কন্যার অপরূপ কান্তিতে, সৌন্দর্য্যে চঞ্চল হয়ে ছুটে গেলেন। নর্মদার কাছে অনেক আবেদন নিবেদন প্রলোভন দেখিয়েও কান্তার কন্যাকে স্বর্গের দেবতারা এতটুকু বিচলিত করতে পারলেন না।
সহস্র প্রেম প্রার্থনা যখন বিফল হল তখন দেবতারা স্থির করল শক্তির দ্বারা তাঁকে তাঁরা জয় করবেন। দেবতাদের দূরভিসন্ধি বুঝতে পেরে চকিতে নদীরূপ ধারণ করে, গহণ কান্তারের মধ্যে দিয়ে পর্বতগাত্রের ফাঁকে ফাঁকে ছুটে চললেন কুমারী।
শেষ পর্যন্ত দেবতাদের দর্পচুর্ন হলো, কুমারী শক্তির কাছে তারা পরাজয় স্বীকার করলেন। মহাদেব দর্শন দিয়ে বললেন, ‘কন্যা বড়ই আনন্দ লাভ করলাম তোমার কান্ড দেখে। আজ থেকে তুমি আমার আনন্দ, বিলাসের ক্ষেত্র হলে — তোমার নাম দিলাম নর্মদা। নর্ম অর্থাৎ পরিতৃপ্তি বিধায়িনী, পরম সুখ ও অন্নদায়িনী মহাকুমারী শক্তির প্রতীক তুমি।’
আরও বর দিচ্ছি — ‘আজ থেকে তুমি আমার জলময় রূপ হলে। হে শিবাত্মজা, তুমি জলময়ী শিবা। তোমার পুত্র হয়ে তোমার কোলে নিত্যকাল ধরে আমি বিরাজ করিব।’
নর্মদার তপশক্তি এবং দিব্যবেশ দেখে আনন্দ লাভ করলেন শিবশংকর। প্রাণঢালা আশীর্বাদ দিয়েও যেন তৃপ্তি হচ্ছিলেন না তিনি। পুনরায় বললেন, ‘হে মহাতেজস্বিনী কন্যা এই দেখো আমি এখন থেকেই তোমার কোলে তোমার জলে চিন্ময়শক্তি সম্পন্ন শিবলিঙ্গ রূপে চিরকাল ভেসে বেড়াবো।’

সপ্তকল্পের অবসানকালেও নর্মদা অক্ষত ছিল। নর্মদা তটে তপস্যা করলে অন্য যেকোনো তপস্যার স্থানের থেকে অধিক ও দ্রুততর ফল লাভ হয়।
স্কন্ধপুরাণে অনুযায়ী, রাজা হিরণ্যতেজ তাঁর পূর্বপুরুষদের মোক্ষ দিতে ১৪ হাজার বছর ধরে কঠোর তপস্যা করে ভগবান শিবকে খুশি করেছিলেন এবং নর্মদাকে পৃথিবীতে আগমনের বর চেয়েছিলেন।
ভগবান শিবের আদেশে, নর্মদা কুমিরের উপর বসে ১২ বছর বয়সী মেয়ের আকারে মহাকাল পর্বত থেকে অমরকণ্টকে অবতরণ করেন। তাই তাকে ‘মাখলপুত্রী’ও বলা হয়। এখান থেকে নর্মদা গুজরাটের ভাদুচের খাম্বাত উপসাগরে মিলিত হয়েছে। অমরকণ্টককে মায়ের মাথা এবং ভাদুচকে পাদদেশ বলে মনে করা হয়। স্কন্দ পুরাণে আরও উল্লেখ আছে যে, শ্রীবিষ্ণু প্রত্যেকবার অবতার রূপ গ্রহণ করে নর্মদা নদীর তীরে এসে এই নদীর স্তব করেছেন।
শংকর প্রিয় মহাতীর্থ অমরকন্টক, অপর নাম মেকল বা ঋষ্য। নর্মদার উৎসস্থল। মধ্য ভারতের এই পবিত্র নদীটি ভারতীয় উপমহাদেশের পঞ্চম দীর্ঘতম নদী। ব্রিটিশরা একে নেরবুড্ডা (Nerbudda) বা নরবাদা (Narbada) বলত। এই নদী উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের প্রথাগত সীমারেখা নির্দেশ করে। পশ্চিমবাহিনী এই নদীটি ১৩১২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে গুজরাটের ভারুচ শহরের ৩০ কিলোমিটার পশ্চিমে আরব সাগরের খাম্বাত উপসাগরে পতিত হয়েছে। তাপ্তী ও মাহি নদী-সহ এই নদী ভারতীয় উপদ্বীপের তৃতীয় তথা বৃহত্তম পশ্চিম বাহিনী নদী।
উদয় তিথি অনুযায়ী, এই বছর নর্মদা জয়ন্তী মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের সপ্তমী তিথিতে অর্থাৎ আজ ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ এ অমরকন্টক জেলায় নর্মদা জয়ন্তী উৎসব উৎসাহের সঙ্গে পালিত হচ্ছে। বিশ্বাস রয়েছে যে, আজকের এই বিশেষ তিথিতে নর্মদার জলে স্নান করলে সমস্ত পাপ ধুয়ে যায় এবং পুণ্য লাভ হয়। কালসর্প দোষ থেকে মুক্তি পেতে নদীতে একজোড়া রূপার সাপ ভাসিয়ে দেওয়ার প্রথাও রয়েছে।

আজ ভোর থেকেই আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে পুজোর পর দেবী নর্মদার আরতি এবং নর্মদা অষ্টক পাঠ করা হয়েছে। নারকেল ও মিষ্টি নিবেদন, লোকগান, ভজন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে হাজার হাজার ভক্ত পালন করলো নর্মদা জয়ন্তী। প্রতি বছরের মতো এ বছরও মা নর্মদা নদীকে ৪০০ মিটারের লাল শাড়ি নিবেদন করা হয়।
মধ্য প্রদেশে এই নদীর অবদান প্রচুর। সেই কারণে একে মধ্যপ্রদেশের ‘লাইফ-লাইন’ বলা হয়।
শাস্ত্রে বলা আছে —
গঙ্গা কংখলে পুণ্যা কুরুক্ষেত্র সরস্বতী।/ গ্রামীণ বৈ আদি বারাণে, পুণ্যা সর্বত্র নর্মদা।।
অর্থাৎ গঙ্গা কংখলে পবিত্র কারন দক্ষ এখানে যজ্ঞ করেছিলেন, সরস্বতী কুরুক্ষেত্রে পবিত্র কারণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বিশ্বরূপ দর্শন করেন এখানেই, কিন্তু গ্রাম হোক বা বন, নর্মদা সর্বত্রই পবিত্র।
নর্মদার তটে প্রায় ৬৪ হাজার তীর্থ রয়েছে। তীর্থ যাত্রীদের কাছে নর্মদা পরিক্রমা একটি মহাপুণ্যের কাজ। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে নর্মদা উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত পায়ে হেঁটে পরিক্রমা করতে সময় লাগে ৩ বছর ৩ মাস ১৩ দিন। এই নর্মদার উপর বাঁধ বানিয়ে পরিবেশবিদদের নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন ভারতের রাজনীতির শিরোনামে চলে আসে।
নর্মদার তটের কথা বলবো পরবর্তী পর্বে…..
Beautiful collection and also presentation.
মৌখিক পরীক্ষার অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে এই লেখাটি।
খুবই সুন্দর।
তথ্যে পরিপূর্ণ।
অনেক ধন্যবাদ