একে একে বদলে দেওয়া হচ্ছে দেশের মুসলিম ঐতিহ্য জড়িত শহরগুলির নাম। তারই ধারাবাহিকতায় মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের স্মৃতিবিজড়িত মহারাষ্ট্রের বিখ্যাত শহর আওরঙ্গাবাদের নাম বদলে হল শম্ভাজি নগর। একইভাবে মহারাষ্ট্রের আরেক শহর ওসামানাবাদ শহর নাম বদলে হল দারাশিভ। গদি সংকটের মধ্যেই উদ্ভব ঠাকরে সরকার এই সিদ্ধান্ত নেয়। এ ছাড়া নবি মুম্বাই এয়ারপোর্ট নাম বদলে হবে ডিবি পাতিল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে মুম্বাদেবীর নামে বোম্বাইর নাম বদলে হয় মুম্বাই। ২০১৪ সালে কর্ণাটকের রাজধানী ব্যাঙ্গালোরের নাম বদলে করা হয় বেঙ্গালুরু। ম্যাঙ্গালোর হয় মেঙ্গালুরু। ২০১১ সালে উড়িষ্যা হয় ওডিশা। একই বছর পন্ডিচেরির নাম বদলে হয়েছে পুদুচেরি। আর ইংরেজি নাম ক্যালকাটা হয়েছে কলকাতা।
উত্তর প্রদেশের বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ২০১৮ সালে তাঁর রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী শহর এলাহাবাদের নাম বদলের উদ্যোগ নিয়ে ওই শহরের নাম করেন ‘প্রয়াগরাজ’। পাশাপাশি ফৈজাবাদের নাম বদলে করা হয় অযোধ্যা। একসময় এলাহাবাদের নাম ছিল প্রয়াগ। ষোড়শ শতকে মোগল সম্রাট আকবর প্রয়াগের গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতী নদীর সঙ্গমস্থলের কাছে একটি দুর্গ গড়ে ছিলেন। এরপর ওই দুর্গ ও সন্নিহিত এলাকার নাম হয় ইলাহাবাদ। পরে সম্রাট শাহজাহান গোটা শহরের নাম রাখেন ইলাহাবাদ বা এলাহাবাদ। দেশের রাজধানী নতুন দিল্লীর ৬৫০ কিলোমিটার দক্ষিণপূর্বের এলাহাবাদ ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর জন্মস্থান।
এর আগে বিজেপি উত্তর প্রদেশের ঐতিহাসিক রেলস্টেশন মোগলসরাইর নাম বদলে করে পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় নগর জংশন। উত্তর প্রদেশের এই ঐতিহাসিক মোগলসরাই হল ভারতের চতুর্থ ব্যস্ততম রেলস্টেশন। এই স্টেশনেরই রয়েছে ৫ হাজার ওয়াগন রাখার ব্যবস্থা। এটি এশিয়ার সর্ববৃহৎ রেল ইয়ার্ড। ১৯৬৮ সালে মোগলসরাই স্টেশনের কাছে কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ভারতীয় জনসংঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে উত্তর প্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ সরকার মোগলসরাই স্টেশনের নাম পরিবর্তন করে। যদিও আপত্তি ওঠে, বলা হয় যদি পরিবর্তন করতে হয়, তবে নামকরণ করা হোক ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর নামে। কারণ, শাস্ত্রী জন্মেছিলেন এই মোগলসরাইতে।
দেশের ঐতিহ্যশালী শহরগুলির নাম বদলের হিড়িকে গুজরাটে আহমেদাবাদের নাম বদলে হয়েছে কর্ণাবতী৷ এদিকে, দক্ষিণের রাজ্য তেলেঙ্গানার বিজেপি সাংসদ রাজা সিং ইতিমধ্যে হায়দ্রাবাদের নতুন নাম হিসাবে প্রস্তাব করেছেন ‘ভাগ্যনগর’৷ শুধু হায়দরাবাদই নয়, বলা হয়েছে সেকেন্দ্রাবাদ ও করিমনগরের নামও বদলে দেওয়া হবে। এমনকি তাজ মহলের জন্য বিশ্বখ্যাত শহর আগ্রার নাম পরিবর্তন করে ‘অগ্রভান’ বা ‘অগ্রওয়াল’ করারও কথা শোনা যাচ্ছে৷ ইতিমধ্যে মুজফফরনগরকে লক্ষ্মীনগর করার প্রস্তাবও উঠে এসেছে৷ লক্ষণীয়, যে শহরগুলির নাম পরিবর্তন করা হয়েছে এবং বিজেপির তরফে পরিবর্তনের দাবি উঠছে, সেই প্রত্যেকটি নামেরই রয়েছে মুসলিম শিকড়৷

কোনো শহরের নাম বদল করা যেতেই পারে। কিন্তু পুরনো নামের সঙ্গে মিশে থাকে ইতিহাস এবং ঐতিহ্য। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও শহরের নামবদল হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে বিজেপি আমলে এই নামবদল আসলে ভারতের গোঁড়া হিন্দু ভোটকে সংগঠিত করা। বিভিন্ন রাজ্যের মুসলিম ঐতিহ্য জড়িত শহরের নামবদলে সিদ্ধান্তের পিছনে কাজ করছে ‘হিন্দুকরণ’-এর প্রক্রিয়া৷ বিশেষঙ্গদের মতে, এই নামবদল দেশের বহুমুখী সত্ত্বার বিরোধী৷ বিজেপি দেশের গোঁড়া হিন্দু ভোটারদের তোয়াজ করতেই এই উদ্যোগ নিয়েছে৷ কিন্তু এই ভাবে মুসলমান ঐতিহ্যে আঘাত হানলে তা বিপজ্জনক৷
রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের গোড়া থেকেই মূল লক্ষ্য ভারতকে ধর্মীয় সংখ্যালঘু-মুক্ত একটি ‘হিন্দু রাষ্ট্রে’ পরিণত করা৷ সেই মনোভাবই নামবদলের রাজনীতির মধ্যেও সমানভাবে রয়েছে৷ আরএসএস ও বিজেপির এই নীতি দেশের বহুত্ববাদী নীতিকে চরম আঘাত করে৷ স্বাধীনতার পর থেকে যে বহুত্ববাদী নীতি ভারতের অন্যতম বৈশিষ্ট বলে পরিচিত, বিজেপির বেছে বেছে মুসলিম নাম বদল ঘটিয়ে দেশের ঐতিহ্য বিরোধী কাজ করছে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে। দেশের বিভিন্ন জায়গার নামবদল বহুবার হয়েছে৷ স্বাধীনতার পর, ব্রিটিশ প্রভাব থেকে বেরোনোর জন্য অনেক শহরের নাম বদলানো হয়৷ ইংরেজি নামের বদলে জায়গা করে নেয় বিভিন্ন ধর্মগোষ্ঠী দ্বারা অনুপ্রাণিত নাম৷ কিন্তু বিজেপি যে নাম বদল করছে স্রেফ ধর্মের ভিত্তিতে৷ যে কারণে বিশেষঙ্গরা বলছেন, নরেন্দ্র মোদির সরকার যে ভারত থেকে মুসলিম ঐতিহ্য মুছে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন সেটা প্রমানিত হয় এই নাম পাল্টানোর মাধ্যমে।
আওরঙ্গাবাদ ওসামানাবাদ শহরের নাম বদলে গত আড়াই বছরে ‘মহাবিকাশ আঘাডী’ জোটের মন্ত্রিসভায় একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। কিন্তু জোটের শরিক এনসিপি ও কংগ্রেসের আপত্তির কারণে বাস্তবায়ন হয়নি। বিদ্রোহী নেতা একনাথ শিন্ডের ‘হিন্দুত্বের স্লোগান’ কাড়তে মরিয়া উদ্ধব ফের আওরঙ্গাবাদের নাম বদলের বিষয়টি সামনে আনেন। প্রসঙ্গত, বালাসাহেবই নব্বইয়ের দশকে প্রথম আওরঙ্গাবাদের নাম বদলের দাবি তুলেছিলেন। ২০১৯ সালে মহারাষ্ট্রে বিধানসভা ভোটের পর ন্যূনতম অভিন্ন কর্মসূচির ভিত্তিতে কংগ্রেস ও এনসিপির সঙ্গে জোট সরকার গড়ে শিবসেনা। তারও আগে আওরঙ্গাবাদ ওসামানাবাদ শহরের নাম পরিবর্তন করার ঘোষণা করেছিল ক্ষমতাসীন বিজেপি। কিন্তু নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতে ধর্মনিরপেক্ষতার আবহ রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া উদ্ধব কার্যত সরে গিয়েও নিজেকে বাঁচাতে পারলেন না।
দুর্ভাগ্যজনক। আবহমান সব কিছুই গিলে খেতে চায় শাসকের শক্তি