আবার একটি নন্দীগ্রামের ‘রক্তাক্ত সূর্যোদয়’ দিবস। ১৪ বছর আগে পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম থেকেই শুরু হয়েছিল জমি আন্দোলন। ওই বছর ১৪ মার্চ বাম সরকারের নির্দেশে পুলিশ কৃষকদের উপর গুলি চালিয়ে ১৪ জন কৃষককে প্রাণে মেরেছিল। সেই ঘটনার আট মাসের মাথায় নভেম্বর মাসে নন্দীগ্রামে ফের হিংসার ঘটনা ঘটে। রক্ত ঝড়ে, শহিদ হন কয়েকজন৷ ‘নন্দীগ্রামে সূর্যোদয় ঘটেছে’— ঘোষণা করে আলিমুদ্দিন।
তখন রাজ্য জুড়ে সিপিএমের দাপট৷ সিপিএমের ডাকাবুকো নেতা-সাংসদ লক্ষ্মণ শেঠ সালিম গোষ্ঠীর কেমিক্যাল হাবের জন্য চিহ্নিত করেছিলেন হলদি নদীর পাড়ে নন্দীগ্রামকে। ২০০৭-এর শুরু থেকে তেতে ওঠে নন্দীগ্রামের মাটি। গড়ে ওঠে নন্দীগ্রাম ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি৷ রাস্তা কেটে আন্দোলন শুরু হয়৷ ১৪ মার্চ পুলিশ, অভিযোগ পুলিশের সঙ্গে ‘চটি পরা পুলিশ’ও জোর করে নন্দীগ্রামে ঢুকতে গেলে ১৪ জন গ্রামবাসীর প্রাণ যায়৷ সেদিনের ‘সূর্যোদয়ে’র ঘটনায় শিহরিত হয়ে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধী বলেছিলেন, ‘দীপাবলীর আলোকে ম্লান করে দিয়েছে নন্দীগ্রামের ঘটনা।’ নন্দীগ্রামে হাজার হাজার গ্রামছাড়া আর্ত মানুষদের দেখতে তিনি হাজির হয়েছিলেন। কেবল ১০ নভেম্বরের পরেই নয়, তার আগে ১৪ মার্চের ঘটনার পরও তিনি নন্দীগ্রামে গিয়েছিলেন।
তারও আগে ২০০৬-এর ২৯ ডিসেম্বর নন্দীগ্রাম বাসস্ট্যান্তে তৎকালীন সিপিএম সাংসদ ও হলদিয়া উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান লক্ষণ শেঠ দলীয় সভায় ঘোষণা করেন, নন্দীগ্রামে কেমিক্যাল হাব ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা সেজ গড়া হবে। কিন্তু বিরাট সংখ্যক মানুষ সেজের জন্য জমি দিতে নারাজ। কিন্তু লক্ষণ শেঠের অনুগামীরা জমি নিতে সশস্ত্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাধারণ কৃষকদের উপর। ৩ জানুয়ারি, কালিচরণপুরে হাজার হাজার কৃষকের গণপ্রতিরোধ, ভুতার মোড় অধুনা শহিদ মোড় বড় বাঁধের উপর গ্রামবাসীদের লক্ষ্য করে পুলিশের টিয়ার গ্যাস ও গুলি, ৪ জানুয়ারি, গঠিত হয় ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি। এরপর ১৪ মার্চ গোটা দুনিয়া জেনেছিল নন্দীগ্রামের সেই বিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনের কথা সেই সঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের বর্বরোচিত পুলিশ ও ক্যাডারদের সম্মিলিত গণহত্যার কথা।
নন্দীগ্রামে সালেমের শিল্প গড়ে ওঠার আগেই এলাকা দখলের জন্য নন্দীগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে পুলিশ ক্যাম্পগুলি তুলে নিয়ে নন্দীগ্রাম থানার পুলিশকে নিষ্ক্রিয় রেখে ১০ নভেম্বর শান্তিপূর্ণ মিছিলের ওপর হামলা, হত্যালীলা, লাশ পাচার, গুম, অপহরণের মতো নিকৃষ্ট ঘটনাবলির পাহাড় গড়া হল অপারেশন সূর্যোদয়ে। আলিমুদ্দিনে বসে মুখ্যমন্ত্রী, বামফ্রন্টনেতা বললেন সূর্যোদয় হয়েছে, সূর্যের তাপও পাওয়া যাবে। একের পর এক ঘটনায় তাপ পাওয়া গেল— নন্দীগ্রামে বামপ্রার্থীর মহম্মদ ইলিয়াসের শোচনীয় পরাজয় ঘটল বিধানসভার উপনির্বাচনে, এরপর ২০০৮-এর পঞ্চায়েত নির্বাচন, ২০০৯-এর লোকসভা নির্বাচন এবং ২০১১-এর বিধানসভা নির্বাচনে সেই যে বামেরা গুড়িয়ে গেল আজ তাদের দূরবিন দিয়েও দেখা যায় না।
প্রসঙ্গত, সেদিন নন্দীগ্রামের সংগ্রামী এবং বুক দিয়ে আগলে রাখা নন্দীগ্রামের বিশিষ্ট নেতা শুভেন্দু অধিকারী, আবু তাহের প্রমুখ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ঘাসফুল শিবিরেই ছিলেন। তারপর হলদি নদী দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে৷ ইতিমধ্যে নন্দীগ্রাম অনেক দেখেছে, একুশের ভোট-যুদ্ধও দেখেছে৷ দল বদলে নিজের প্রাক্তন নেত্রীকে এই নন্দীগ্রামে একুশের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত করে শুভেন্দু অধিকারী এখন নন্দীগ্রামের বিধায়ক এবং বিরোধি নেতা৷ ঠিক এই আবহেই আরও একটা ১০ নভেম্বর৷
প্রতি বছর ১০ নভেম্বর ভূমি উচ্ছেদ কমিটি নন্দীগ্রামে ‘রক্তাক্ত সূর্যোদয়’-এ শহিদদের কুর্নিশ জানিয়ে আসছে। তৃণমূল কংগ্রেসও এই দিনটিতে শহিদদের শ্রদ্ধা জানায়। এবারও মুখ্যমন্ত্রী নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে লিখেছেন, ‘নন্দীগ্রামের শহিদদের আমরা ভুলছি না, ভুলব না। নন্দীগ্রাম সহ সারা পৃথিবীর সকল শহিদদের জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।’ পাশাপাশি এদিন নন্দীগ্রাম ভূমি উচ্ছেদ কমিটি আয়োজিত গোকুলনগরের করপল্লির স্মরণসভায় উপস্থিত ছিলেন তৃণমূলের একাধিক নেতা। এর আগে অবশ্য শুভেন্দু অধিকারীই প্রতি বছর নন্দীগ্রাম দিবসের কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিতেন। তবে এবারে তিনি পদ্ম শিবিরে। এদিন তৃণমূলের তরফ থেকে যেমন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল, তেমনই শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বেও আরেকটি কর্মসূচি নেওয়া হয়। অর্থাৎ এদিন দুটি ব্যানারে পালিত হয় নন্দীগ্রাম দিবস। তবে গত বছরও শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে পৃথকভাবে পালিত হয়েছিল নন্দীগ্রাম দিবস।
এদিন দুপুরেও গোকুলনগর পেট্রলপাম্প থেকে শহিদ স্মরণ পদযাত্রা হয়৷ উপস্থিত ছিলেন নন্দীগ্রামের বিজেপি বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী৷ বিকেলেও নন্দীগ্রামে বিজেপির বিশেষ কর্মসূচি ছিল। বলার কথা হল মাত্র এক বছরে নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক সমীকরণে অনেকটা বদল ঘটল৷