এবছর কাশ্মীরে পর্যটকদের ঢল নেমেছে। অনন্তনাগের আপেলবাগানের ফুলে ফুলেও মৌমাছি আর প্রজাপতিদের ভীড়। “ইনশাআল্লাহ, যদি সব কিছু ঠিকঠাক থাকে আমদানি নেহাত কম হবে না। “শ্রীনগর এয়ারপোর্টে সরকার ফ্যামিলির জন্যে অপেক্ষা করতে করতে নওয়াজ ভাবছিল।
নতুন কেনা স্কোডা অক্টাভিয়াটা আজ ড্রাইভারের হাতে ছাড়তে তার মন চায় নি। গাড়ির এই ম্যাপেল ব্রাউন শেডটাও অনেক অপেক্ষার পর পাওয়া গেছে। গাড়িটা চালিয়ে তার ভারি সুখ! “না, পার্টি যদি ভালো হয়, তাহলে পুরো ট্যুরটা আমিই করাব। রমজান মাসে আম্মী অবশ্য একটু নারাজ হবে। ভোরের সেহরী আর সন্ধ্যের ইফতারে সবাইকে একসঙ্গে পেতে চায়। দেখা যাক”।
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে সরকার স্যরের ফোন। কোলকাতার ফ্লাইট শ্রীনগরের মাটি ছুঁয়েছে। জিনিসপত্র নিয়ে প্রায় কুড়ি মিনিট পরে সরকার পরিবার এয়ারপোর্টের বাইরে পা রাখতেই নওয়াজ হাতবাড়িয়ে অতীন্দ্র সরকারকে মিষ্টি হেসে বলল, “ওয়েলকাম টু হেভেন অন আর্থ স্যর। আইয়ে।”
নওয়াজের দৃষ্টি অবশ্য তখুনি আটকে গেল অতলান্ত গভীর দুটি চোখে। সে চোখে মায়াময়-বিষণ্ণতা। উদাসীনতার রহস্য। পাহাড়ের ছেলে নওয়াজ কখনো সমুদ্র দেখেনি। তার মনে হল সে চোখে যেন অকূল দরিয়ার হাতছানি।
এই কাজলকালো, দীর্ঘপল্লবের চোখদুটির মালকিন নীপা। অতীন্দ্র সরকারের বড় কন্যা। নওয়াজ কবি নয়। তাই শায়রী হল না। ঘোর ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে নওয়াজ সে দুটি স্বপ্নালু চোখের মায়ায় আটকে পড়ল।
নওয়াজের নতুন গাড়ি মসৃণভাবে চলতে থাকে পাইনের ছায়াপথ ধরে। উইলোগাছের শুকনো ফুল হাওয়ায় ভাসে। বনফুলের তীব্র মদির গন্ধ বাতাসে। নীপার ছোটবোন নীতা প্রশ্ন করে “এ কিসের স্মেল ভাইয়া?” নওয়াজ হেসে বলে, “আভী কাশ্মীরমে বাহার হ্যায়। কত নাম না জানা ফুলের গন্ধে চারিদিক ভ’রে আছে”।
ততক্ষণে অতীন্দ্রর স্ত্রী মনীষা ব্যাগ থেকে মিষ্টি বা’র করে ফেলেছে। নওয়াজকেও দেয়। “কোলকাত্তাকা মিঠাই লো নওয়াজ”। নওয়াজ সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করে। তার রমজানের উপবাস চলছে। মনীষা মনে মনে ভাবে, “আহা রে! এইটুকু ছেলে একমাস ধ’রে এইরকম কৃচ্ছসাধন করবে! তারই সামনে আমরা বসে বসে ভালোমন্দ খাওয়াদাওয়া করব!”
মনীষা আলাপী মেয়ে। এরই মধ্যে গল্প করে জেনে নিয়েছে, নওয়াজের বাড়ি কোথায়? বাড়িতে তার কে কে আছে? দু’দিনেই সে ম্যাডাম থেকে হয়ে গেল নওয়াজের আন্টি।
শ্রীনগরের ওয়াজিরবাগে নওয়াজ তার আব্বু-আম্মী আর ছোটদুই বোন রেশমা আর রেহানার সঙ্গে থাকে। তাদের ট্রান্সপোর্ট আর আপেলের ব্যবসা। সে গাড়ি চালাতে ভালোবাসে। তার খাস গাড়ির ড্রাইভারি সে নিজেই করে। ট্যুরিস্ট পছন্দ হলে পুরো ট্যুরটাই সে নিজেই করায়। বাড়িতে তার বিয়ের চেষ্টাচরিত্র চলছে। কিন্তু নওয়াজের কাউকেই পছন্দ হয় না। সবাইকেই তার ‘মোম কি গুড়িয়া’ লাগে। এ-কথা শুনে মনীষা আর নীতার কি কলকলিয়ে হাসি!
নীপা তার বাপের মতই চুপচাপ। শান্ত। কথা কম বলে। শোনে বেশি। তার দুচোখেই যেন অনেক না-বলা কথা। দীর্ঘ, শ্যামল, একঢাল চুলের মেয়ে নীপা তার সৌন্দর্যকে যেন গাম্ভীর্যের আবরণ দিয়ে ঢেকে রেখেছে। ভেতরে ভেতরে ছটফট করে নওয়াজ। মন কি বাত বলতেই হবে নীপাজীকে। রীয়ার ভিউ মীররে বারবার নীপাকে দেখেও তার আশ মেটেনা। নীতা কনুই দিয়ে ঠেলা মারে দিদিকে। নীপা নিরুত্তর। নওয়াজের কিছুই চোখ এড়ায় না।
লীডার নদীর পাশ দিয়ে পহেলগাঁও যেতে যেতে, দিগন্তবিস্তৃত দুধপতরীর তৃণভূমিকে, বেতাবভ্যালির স্বর্গীয় সৌন্দর্যকে, গুলমার্গের বরফঢাকা পাহাড়চূড়াকে আবার নতুন করে ভালোলাগে নওয়াজের। এ ভালোলাগা কি ভালোবাসারই নামান্তর? হিসেবী, বাস্তববাদী নওয়াজ নিজেকে নতুন করে চিনতে চেষ্টা করে।
শালিমারবাগে কাশ্মীরী ফিরহান আর গয়না পরে নানারকম ভঙ্গিমায় ছবি তুলল নীতা। নওয়াজ সাহস করে বলেই বসল নীপাকে, “আপ ভি উঠাইয়ে না, সুন্দর লাগেঙ্গে”। নীপা স্মিত হেসে বাগানের অন্যদিকে চলে যায়।
অবন্তীপুরার ভাঙাচোরা ধ্বংসস্তূপে নীপাকে দেখে তার মনে হয় “পাত্থর কা মূরত”। কোন ইতিহাসের পাতা থেকে সে উঠে এসেছে তার নায়িকা। চকিতে সে ছবি তুলে নিতে ভোলে না।
দুধপথরীর পাহাড়ি নদী শালিগঙ্গার ছড়ানো পাথরে বসবে নীতা। দিদিকে ডাকে, “আয় না দিদি!” দুই বোনকে হাত ধরে নওয়াজ নদীর পাথরে বসিয়ে দেয়। এই একটুকু ছোঁওয়াতেই নওয়াজের মনে “রচি মম ফাল্গুনী”। নীপার বলা, ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ তে
তার হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়। ফর্সা গালে ডালিমের লাল আভা ফুটে ওঠে। যদিও বলি বলি করেও তার গোপন কথাটি গোপনেই রয়ে যায়। টিউলিপবাগানের লাল, গোলাপী, হলুদ ফুলে ফুলে রঙিন প্রজাপতি নেচে বেড়ায়। গুলমার্গের পাহাড়ে পাহাড়ে বরফ গ’লে সিন্ধুনদী উচ্ছ্বল হয়। ডাল লেকের জলে সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের লালরঙ মিশে যায়। গাড়ির মিউজিক সিস্টেমে অরিজিত সিংয়ের দরদী গলায় বাজতে থাকে, “রোকে না রুকে নয়না….”।
সরকার দম্পতি সবটাই বোঝেন। মাঝেমাঝে বিরক্ত হয়ে অতীন্দ্র স্ত্রীকে বলেন, “ছেলেটার নীপাকে নিয়ে বড় উৎসাহ। তুমিও ওকে নিয়ে আদিখ্যেতা কম করো না। একটু সামলে চলো”।
মনীষা হেসে বলেন, “আমি মানুষ চিনি গো। নওয়াজ বাড়াবাড়ি তো কিচ্ছু করে না। বয়সটাই তো অল্প ওর। ভালো লাগতেই পারে। তবে তোমার বড় মেয়েকে তো তুমি চেনো। কতটা শান্ত, রিজার্ভ ও। হঠকারিতা একেবারেই করবে না। নিজের পড়াশোনা, তারপর চাকরী। এর বাইরে কিছুতে মন দিয়েছে? প্রেম-বিয়ে কিছুতেই যেন মন নেই। তুমি নিশ্চিন্তে থাকো তো”।
পহেলগাঁও, গুলমার্গ, শোনমার্গে রোজাভাঙার সময় নওয়াজ সরকারদের সঙ্গেই থাকে। মনীষা বাজার থেকে খেজুর, তরমুজ, মিষ্টি কিনে হোটেলের ঘরে, নিজে হাতে খাওয়ায় নওয়াজ কে, “খাও নওয়াজ। দিনভ’র কুছ খায়া নেহি তুমনে”। দুই বোন মিটিমিটি হাসতে থাকে মায়ের কাণ্ডকারখানা দেখে। অতীন্দ্রর অস্বস্তি হয়।
নওয়াজ বিহ্বল হয়ে পড়ে এই সমাদরে। সরকার পরিবার কে সেও একদিন দাওয়াত দিয়ে বসে তাদের ওয়াজিরবাগের বাড়ির ইফতারে।
ফুলের বাগান ঘেরা নওয়াজের বাড়ি দেখে তো উচ্ছ্বসিত সরকার পরিবার। কেশর দেওয়া হাল্কা গরমদুধ আর কতরকমের মেওয়া দিয়ে অভ্যর্থনা করা হল তাদের। নরম গালিচায় পা ডুবে গেল। সারা বাড়িতে আখরোটকাঠের আসবাবে সূক্ষ্ম লতাপাতার নক্সা। বাগানের গোলাপে কত রঙ আর সুগন্ধ। মনীষা আর নীতার ‘কি ভালো’, আর ‘কি সুন্দর’ বলা আর শেষ হয় না। নওয়াজের বাড়ির মানুষগুলো যেমনি সুন্দর, তেমনি তাদের মেহমান নওয়াজী। গালিচার ওপর এমব্রয়ডারী করা লম্বা দস্তরখানা পেতে তাদের পরিবেশন করা হল কতরকমের কাবাব, নাদরু কি সবজি, ইয়াখনি পোলাও, রোগনজোশ, ফিরনি, হালুয়া। অতীন্দ্র, মনীষা, নীতা, নীপা কোনটা ছেড়ে কোনটা খাবে বুঝতে পারে না। অনেক গল্প হয় ওদের। মনীষা ফোন নম্বর বিনিময় করে নওয়াজের আম্মীর সঙ্গে। নীপার ফোন নম্বর যদিও অধরাই থেকে যায় নওয়াজের কাছে। অতীন্দ্র আর মনীষা কথা দেয়, সামনের বছর অমরনাথ যাত্রার পথে তারা এসে উঠবে নওয়াজের বাড়িতেই। কোলকাত্তা গেলে নওয়াজরাও যাবে তাদের বাড়িতে।
সরকারদের ফিরে যাবার দিনে শ্রীনগরের আকাশের মুখ ভার। মনখারাপের আবহাওয়া গাড়ির ভেতরেও। মনীষার মনে এলোমেলো ভাবনারা ঘুরপাক খাচ্ছে। নওয়াজের মত এমন একটা সুন্দর হাসিখুশি ছেলে থাকলে বেশ হত তার। জামাই হলেও বা ক্ষতি কি ছিল? এয়ারপোর্টে জিনিসপত্র নামাতে নামাতেই মনীষার চোখে জল টলমল। নওয়াজের মুখেও বিষণ্ণতার অন্ধকার। জোর করে মুখে হাসি আনল সে। মনীষার হাত ছুঁয়ে কদমবুসি করে বলল, “অব সে আপকো মাম্মী বোলুঁ?” ছেলেকে কি আর বখশিস দেওয়া যায়?
নওয়াজের পকেটে ঈদি গুঁজে দেয় মনীষা…
Khub sundar akti golpo
কি মিষ্টি গল্প…!!! অপূর্ব বর্ণনা…!!!
কথাকলি,জয়া তোমাদের দুজনকেই ভালোবাসা জানালাম
চমৎকার