দেশবিদেশের কনফারেন্স, সেমিনার, অনুষ্ঠান শেষে প্রতিবছর এই সময়টায় গুরুজী দেশে ফেরেন। আকাশ তখন আকুল হয়ে বৃষ্টির আবাহনী গায়।
গুরুজী বলেন, “বেটা বর্ষার এমনটি রূপ আর কোত্থাও দেখা যায় না।তাই তো আমি প্রতিবার ফিরে ফিরে আসি এসময়। কান পেতে শোন — আকাশে, বাতাসে, জলে, মাটিতে এখন সুর আর তাল। মেঘেরা পাখোয়াজ বাজাচ্ছে। বৃষ্টির ফোঁটায় কখনো রিমঝিম কখনো ঝমঝম ছন্দ। কুলকুল করে বইছে নদী। ঝিঁঝিঁ পোকা গাইছে রিনরিনে সুরে। লে বেটা তু ভি সুর লাগা”।
ধৈবতের পেটের ভেতর গুড়গুড় করতে থাকে, “গুরুজী একবছরের জন্যে কেন যে চলে যান? রেওয়াজ-টেওয়াজ সব মাথায় ওঠে! বিনা রেওয়াজে সুর এদিক ওদিক পালায়। কি করে গাই এখন? গুরুজী ঠিক ধরে ফেলবেন যে!”
বাড়িতে তাদের রীতিমতো গানবাজনার চর্চা, ভালোবাসা। ধৈবতের বাবাও গুরুজীর মত বৃষ্টিপ্রেমী। অসময়ের নিম্নচাপে দু’দিন টানা বৃষ্টি হলেই বাড়িতে তাদের গানবাজনার আসর বসে। তবুও যে কেন সে মন দিয়ে রেওয়াজটা করে না?
ধৈবত সুর লাগাতেই গুরুজীর ভুরু কুঁচকে উঠল। “কি হল ধৈবত? আজকাল চর্চা করো না? ‘মা-বাপ তোমার সাধ করে এমন সুরেলা নাম রেখেছে, আর পা থেকে ধায়ে যেতেই তোমার সুর কোথায় যায়?”
গানের ক্লাসে সবুজজামা পরা মেয়েটা একথা শুনে ফিকফিক করে হাসল।
“ভারি অসভ্য মেয়ে তো! কই একে আগে তো দেখিনি। নতুন মেয়ে? এবছরেই গুরুজীর কাছে নাড়া বেঁধেছে বোধহয়! চোখ গোলগোল, নাকচাপা মেয়েটা দেখতে মন্দ নয় কিন্তু এমন হাসে কেন?”
ধৈবতকে অবাক করে দিয়ে গুরুজি ফচকে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললেন, “সোনা তুমি শুরু কর”।
সোনা চোখ বুঁজে গৌড় মল্লারের আরোহতে সুর লাগাল, “স র গ ম, প ধ ন র্স।
অনায়াসে ফিরল অবরোহণে : র্স ধ ণ প, ম, গ র গ, র স।
বন্দিশে যেতে যেতে বাইরে অঝোরধারায় বৃষ্টি। ধৈবত ভিজল। সোনার সুরের ধারায়। ঝমাঝম বৃষ্টিতে। ধৈবতের কি যে হল?! শয়নে, স্বপনে, জাগরণে, গানে তার সোনা আর সোনার কণ্ঠস্বর।
কিন্তু মেয়ে শুধু ফিকফিক হাসে আর গান গায়। সবুজ রঙ বোধহয় ভারি পছন্দ এ মেয়ের! প্রতিদিন প্রকৃতির সঙ্গে রঙ মিলিয়ে সবুজ জামা পরে। ক্লাস শেষ হলেই জল ছপছপ করে চলে যায়।
ধৈবত কি করে জানাবে তার মনের কথা!? ওদিকে গুরুজি রোজ ধমক দিয়েই চলেছেন। বৃষ্টির জলে ডুবছে, ভাসছে মাঠ, ঘাট, পথ, পুকুর। পুড়ছে শুধু প্রেমিকের মন।
ধৈবত রোজ ভোরবেলা গলা সাধে। “গান দিয়েই জয় করতে হবে সোনাকে। হাতে বড্ড সময় কম। বর্ষাশেষে গুরুজী আবার পাড়ি দেবেন কোন মুলুকে। গানের ক্লাস বন্ধ হয়ে যাবে এ বছরের মত।”
সেদিন গুরুজীর শেষ ক্লাস। ধৈবত একটু দেরী করে ফেলেছে। প্রায় লাফাতে লাফাতে ক্লাসে এসেই আড়চোখে দেখে নিল সোনা এসেছে কিনা! সবাই একসঙ্গে আবার গাইছে গৌড় মল্লার, — “গরজত বরসত ভিজত আয়ী লো তুমহারে মিলনকো আপনে প্রেম পিওরয়া….”
গুরুজী একজন একজনকে ইশারায় তান ধরতে বলছেন। ধৈবত সেদিন গলা খুলে নির্ভয়ে, সুর-তাল-লয়ে নিখুঁত তান গেয়ে আবার সমে ফিরল। গুরুজী তারিফ করলেন। সোনার মুখেও হাসি। তবে তা ফচকেমির নয়।
গুরুজীকে প্রণাম করে ক্লাস থেকে বেরোতেই ধৈবতের পিঠে নরম একটা মেয়েলি ছোঁয়া। কানের কাছে চেনা রিনরিনে মিঠে আওয়াজ, — “বাইরে চলো।কথা আছে। সঙ্গে ছাতা এনেছি।”
বাইরে তখন অবিশ্রান্ত বৃষ্টিধারা। খোলা সবুজমাঠ বৃষ্টিতে টইটম্বুর। জলভরা মাঠে সোনা হাত ধরে টেনে নামাল ধৈবতকে। বৃষ্টি মানছে না ছাতার আড়াল। প্রেম মানছে না কোনো বাধানিষেধ!
এক ছাতার নিচে ধৈবত আর সোনা ভিজছে আর ভিজছে। গলা ফুলিয়ে গাইছে মত্ত দাদুরীসঙ্গীত, “ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ, ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ”।
মানুষী ভাষায় তার অনুবাদ করলে হবে, “প্যার হুয়া, ইকরার হুয়া, প্যার সে ফির কিঁউ এ ডরতা হ্যায় দিল….”
শুরুটা যেমন সুরের গাম্ভীর্যে আর মূর্চ্ছনায় আভিজাত্যপূর্ণ, শেষটুকু তেমনই মিষ্টি, একেবারে ক্ষীরকদমের মত…!!!
দূর্দান্ত!!
ভালোবাসা সতত
মিষ্টি প্রেমের সুরেলা মূর্ছনা…..
ভালোবাসা সতত।
খুব ভাল গল্প। রোম্যান্টিক!! কবিতার মতো গদ্যের চলন!!
আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানবেন ????। আপনাদের ভালোলাগা প্রত্যয় জাগায়।