অংশু, তরু, বাবলু, ছোটু, রাণী, রাজু, কাঞ্চন, মলি, বাদশারা রতনদাদুকে ঘিরে গল্প শুনছিল। স্বাধীনতার গল্প। রতনদাদু আবেগভরা কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, “জানিস তো, সে রাতে আমাদের কারো ঘুম আসেনি। সবাই আনন্দে-উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছিলাম। রাত পোহালেই আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক হব। রাত্তির বারোটার সময় আমাদের নতুন প্রধান মন্ত্রী জওহরলাল নেহরু রেডিও থেকে বক্তৃতা দিলেন। আমরা সব্বাই কান খাড়া করে শুনলাম। অত রাতে লোকে বাজি ফাটাতে লাগল। মিষ্টি বিতরণ করল। কোলাকুলি করল, সে একেবারে হৈ হৈ রৈরৈ কাণ্ড!”
— ও দাদু, আরো একটু বলো না তোমাদের স্বাধীনতার গল্প।
— ওমা, স্বাধীনতা কি আমাদের একার নাকি? স্বাধীনতা তো সবার। দেশস্বাধীন করতে কত প্রাণ চলে গেছে! তোদের ক্ষুদিরাম, বাঘাযতীন, ভগৎ সিং, বিনয়-বাদল=দীনেশের গল্প বলেছি না?
— আবার বলো না দাদু, শুনতে ভালো লাগে।
দাদুর গল্প বলার ভঙ্গিতে বাচ্চাগুলোর যেন আর চোখের পলক পড়েনা। তারা নড়ে বসে না। আরো শুনতে চায়। দাদুর কাছে এলে তাদের দু-ঘন্টা সময় কি করে কেটে যায়, তারা বুঝতেই পারে না।
প্রাইমারি স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত, অকৃতদার শিক্ষক রতন দাস। তাঁর বাড়ির কাছেই খালপাড় বস্তির বাচ্চাগুলোকে সন্ধ্যেবেলা বাড়িতে বিনিপয়সায় তিনি পড়ান। গল্প বলেন। মাঝেমাঝে লজেন্স-বিস্কুট খাওয়ান। বাচ্চাগুলো তাঁর কাছে এলে আর যেতে চায় না। তাঁরও সন্ধ্যেবেলাটা দিব্যি কেটে যায় ওদের সঙ্গে। পুরনো বাড়ির লম্বা বারান্দায়, হাতলভাঙা চেয়ারে বসে তিনি ওদের রতনদাদু হয়ে যান। তাঁর ছ্যাতলা ধরা, ভেঙে পড়া, অন্ধকার বাড়িতে তখন যেন হাজার ওয়াটের আলো। বাচ্চাদের কলরোলে প্রাণ পায় সারাদিন নিশ্চুপ থাকা এ বাড়ির প্রতিটি কোণা।
স্বাধীনতার গল্প শুনে উত্তেজিত হয়ে বাণী বলে,
— দাদু কাল পনেরোই আগস্টে আমরা তবে কি করব?
— কেন তোরা ইস্কুলে যাবি। পতাকা উত্তোলন হবে, রতনবাবু বললেন।
রাজা ফুট কাটল,
— লাড্ডু পাব। জনগণমন গাইব।
তরু ঠোঁট উলটে বলল,
— ব্যস, এইটুকু? আর কিছু না?
মোক্ষম প্রশ্নটি ছুঁড়ল কাঞ্চন,
— দেশের জন্যে আমরা কি কিছুই করব না?
— আরিব্বাস, কত বড় কথা! কাঞ্চনের পিঠ চাপড়ালেন রতনবাবু।
— তোরাও কিছু করতে চাস তবে? দাঁড়া ভাবতে দে।
রতনবাবুর কপালে চিন্তার ভাঁজ। সত্যিই তো এদের দিয়ে কোনো ভালো কাজ করানোই যেতে পারে। এত উৎসাহ যখন! এসব কথা ভাবতে ভাবতেই তাঁর দরজায় অস্থির কড়ানাড়া।
— কে রে বাবা, আসছি আসছি। তাড়াহুড়ো করে নীচে নেমে দরজা খুলতেই কিছু চেনাঅচেনা মুখ।
— কি ব্যাপার! রতনবাবু প্রশ্ন করেন।
— স্যর, আমাদের পার্টি থেকে কাল আপনাকে পাড়ায় সম্বর্ধনা দেওয়া হবে। অরুণদা বলেছেন। আপনি সকাল ন’টায় চলে আসবেন। বিশিষ্ট অতিথিরাও আসবেন।
— আমাকে? কেন?
— আপনি খালপাড়ের গরীব বাচ্চাদের বিনা পয়সায় পড়িয়ে সমাজসেবা করেন। আপনি এলাকার একজন বিশিষ্ট মানুষ স্যার।
— ও, এইজন্যে? রতনবাবু স্মিত হাসেন।
— কিন্তু কাল যে আমার একটু অন্য কাজ আছে। আমি যে অন্যদের আগেই কথা দিয়ে দিয়েছি।
— কি কাজ স্যার?
— সেকথা তো এক্ষুণি বলা যাবে না।
— শিবতলার তরুণ সংঘ আপনাকে ডাকেনি তো! ওরাও স্বাধীনতাদিবসের অনুষ্ঠান করছে শুনেছি। ওদের ওখানে গেলে কিন্তু ভালো হবে না স্যর, বলে দিচ্ছি।
— আরে না না, সেসব নয়। রতনবাবু হেসে আশ্বস্ত করেন তাঁর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা পার্টির কর্মকর্তাদের।
তারা খানিক বিরক্তি প্রকাশ করে, নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে বিদায় নেয়।
পনেরোই আগস্টের সকালে এক পশলা বৃষ্টির পর ঝকঝকে রোদ উঠেছে। ছুটিরদিনে মনসাপাড়ার লোকেদের একটু দেরীতে ঘুম ভাঙল। চা খেয়ে গড়িমসি করে কর্তারা ভাবছেন, বাজারটা এবার গেলেই হয়। লাউড স্পীকারের গানে তখন ভারতলক্ষ্মীও জেগে উঠেছেন। চারিদিকে বেশ সাজো সাজো ভাব। পাড়ার লোকেদের হঠাৎ চোখে পড়ল, আরে! বহুদিন অযত্নে পড়ে থাকা, আগাছা-নোংরা ভর্তি ছোট্ট পার্কটা কেমন ঝকঝকে তকতকে দেখাচ্ছে! রতনবাবু তাঁর কুচোকাচা নাতিনাতনীদের নিয়ে কখন সেটা পরিষ্কার করে ফেললেন? গাছের চারা লাগাতে লাগাতে বাচ্ছারা গলা মিলিয়ে তাঁরই সঙ্গে গান গাইছে,
“সবকাজে হাত লাগাই মোরা, সবকাজেই।
বাধাবাঁধন নেই গো নেই, নেই গো নেই…..”।
পাড়ার লোকে চোখ কচলে আরো দেখলো, পার্টির তকমা লাগা, দিনরাত পাড়ার মোড়ে গুলতানি করা ছেলেগুলোও বুঝি হাত লাগিয়েছে রতনবাবুর দলের সঙ্গে!
দূরে কোথায় যেন মঙ্গলশঙ্খ বেজে উঠল।