“আ রে ও বাছিয়া! তনিক উঠ যা তো। মামাজী আয়ে হ্যায়ঁ। প্যয়ের তো ছুঁ লে।”
অনিচ্ছুক বাছিয়া ওরফে বাচ্চী বিছানায় শুয়ে বালিশে মুখ গোঁজে। সে যাবে না। কিছুতেই দেখা করবে না মামাজীর সঙ্গে। তার ভয় করে। “বাপরে, মামাজীর কি লম্বা চওড়া চেহারা! পরনে খাটো ধুতি, হাতকাটা ফতুয়া। হাতে লাঠি। পাকানো গোঁফ। ঠিক যেন ‘বীরপুরুষের’ ডাকাত। হা রে রে রে রে করে এখনই হাঁক পাড়বে।”
“কই, তার মাঈ তো এরকমটা নয়! কত নরম, সুন্দর। সেও তো এই মীর্জাপুরের যাদবদের ঘরের মেয়ে।” বালিকার সরল মনে দ্বন্দ্বের সাদাকালো।
ঘরের কাজকম্মো সেরে মা গুনগুন করে তুলসীদাসের রামায়ণী চৌপাই পড়ে, — “বন্দয়ুঁ গুরু পদ পদুম পুরাগা/সুরুচি সুবাস সরস অনুরাগা ”
চৌপাইয়ের ষোলোমাত্রার ছন্দে দোলে বাচীর মন। অওধি শব্দরা কৌতূহল জাগায়। বাচী মিলিয়ে নেয় রবিঠাকুরের লুকোচুরি কবিতার ছবি!
পূর্ণিমারাতে তাদের মাটির দাওয়ায় চাঁদের আলো। মায়ের কোলে মাথা রেখে বাচী মায়ের মুখে লোরী শোনে। সে দেহাতি ভাষায় বোঝা না বোঝার রহস্য। এমনি কোনো এক ফাগুনী পূর্ণিমার রাতে ঘর আলো করে সে নাকি এসেছিল। বাপু তার মুখ দেখে মাঈকে বলেছিল, “কোন চাঁদটা বেশি সুন্দর বলো তো?”
তবে সে শিশুচাঁদের কপালে অগৌরবের কলঙ্ক। বিকেলে মাঠের খেলুড়েদের কাছে শুনতে হয়, ‘কয়লাওলার মেয়ে।’ ইস্কুলের সহপাঠীদের কাছে, “পূর্ণিমা তো খোট্টা! দেখিস নি ওরা বাড়িতে হিন্দি কথা বলে? ওর মা কেমন করে শাড়ি পরে?”
বাচ্চী মায়ের কোলে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কাঁদে, “ওরা আমায় এমন কেন বলে মাঈ?”
মা বাচীর মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, “সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখিস।”
ব্রাহ্মদিদিমণিদের প্রশংসা আর স্নেহের ছায়ায় পূর্ণিমা এই অগৌরব ভুলতে চায়। তার বাংলা বানান নির্ভুল। রুলটানা দিস্তে খাতায় তার প্রতিটি অক্ষর, মাত্রারা সঠিক বিন্যাসে চলে। কবিতা তার একান্ত আশ্রয়। মুখস্থ করতে হয়না তাকে। একবার পড়লেই মনে গেঁথে যায়।
ধীরে ধীরে শব্দেরা জাল বিছোয় তার চেতনায়। বাড়িতে শোনা দেহাতি হিন্দি, উঁচুক্লাসে সংস্কৃত শব্দের ঝঙ্কার, প্রতিদিনের কথাবলা জগৎ, কেতাবি শব্দ জলতরঙ্গের মত টুংটাং বাজতে থাকে তার মস্তিষ্কের কোষে কোষে। “এ শব্দের উৎস কোথায়, কেমনভাবে ভেঙে গড়ে তারা দিগ্বিদিকে ছিটকে যায়? আমি কি তাদের চিনে নিতে পারব কোনোদিন? শব্দের সঙ্গে বন্ধুত্ব হবে কি আমার?”
শব্দেরা আঁকড়ে ধরে পূর্ণিমার জগতকে। মাঠের খেলুড়ে সাথীরা দূরে চলে যায়। পড়াশোনায় ইতি টেনে বেশিরভাগই তারা তখন ঘরকন্নায় ব্যস্ত। পূর্ণিমার রিস্তেদাররাও কম ব্যস্ত নয় তার বিয়ে দিতে। “বিটিয়া বড়ী হো গঈ। অব তো হাত পীলী কর দো”। বাচ্চী কেঁদে বলে, “না মা এখন না। আরো পড়তে চাই আমি।”
মা মেয়ের বিয়ের স্বপ্ন দেখে। লুকিয়ে বানায় পায়ের পাঁয়জোর, কানের ঝুমকো, নথনী। ‘আইবুড়ো ধিঙ্গি মেয়ে’ সমাজের গালিগালাজ হজম করতে করতে খাতাবই নিয়ে ইস্কুলে যায়। সঙ্গী হয় আরো কয়েকজন।
সেই কয়েকজনের মধ্যে দু-একটি খ্রীস্টান, ব্রাহ্ম মেয়ে। বন্ধু হয় লাবণ্য। “তোর মা কি সুন্দর রে লাবু! কি সুন্দর করে কথা বলেন! আমাকে তোদের মত করে শাড়ি পরা শিখিয়ে দিবি?”
লাবণ্য বলে, “তুইও সুন্দর পূর্ণিমা! দাঁড়া, তোর শাড়িতে একটা ব্রোচ লাগিয়ে দিই। চল আমরা আজ দুজনে মিলে কবিতা বলি।”
আকাশে কালো মেঘ ঘনিয়ে আসে। ছাদে বসে দুই সখি আবৃত্তি করে, “নীলনবঘনে, আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে”।
ইস্কুলে সেলাই শেখান দিদিমণিরা। পূর্ণিমা ব্লাউজের হাতায়, শাড়ির পাড়ে ফুল তুলে লাবণ্যদের মত হবার চেষ্টা করে। নরম গলায় কথা বলে। ইস্কুলের অ্যানুয়াল ফাংশানে খোট্টাদের মেয়ে ‘নটির পূজায়’ শ্রীমতী হয়। দর্শকরা ধন্য ধন্য করে। পূর্ণিমা ভাবে, “এ খোট্টা বদনাম কি আমার ঘুচল তবে!”
বাড়িতে বাপু দুধ দোয়। দুধ বেচে। কয়লার হিসেব করে। মা মাটির দেওয়ালে ঘুঁটে দেয়। মায়ের হাতে প্রতিদিনের গোবর নিকোনো উঠোন, মাটির দেওয়াল ঝকঝক করে। রাতে কুপির আলোয় দেওয়ালে আলো-আঁধারির খেলা দেখে পূর্ণিমা। ম্যাট্রিক পরীক্ষার পড়া মুখস্থ করতে করতে খানিক থমকে যায়। এই আলো-অন্ধকারের মতই ঘরে বাইরে তার বিপরীতমুখী দুই জীবন! সে জীবন কি মিলবে কোনোদিন? পূর্ণিমার কিশোরী মনে আবার জিজ্ঞাসার ভিড়।
বর্ষায় তাদের ভাঙা টালি চুঁইয়ে জল পড়ে। ফাটা টালির ফাঁক দিয়ে শীতের ঠান্ডা হাওয়া গায়ে বেঁধে বর্শার ফলার মত। বাপুর শরীরটাও আজকাল ভালো থাকে না। মা বলতেই থাকে, “ডাগদার দিখাইয়ে জী। ডাগদার দিখাইয়ে।”বাপু অগ্রাহ্য করে। এরপর কোনমুখে পূর্ণিমা কলেজে পড়ার কথা বলে?
দিদিমণিরা আশ্বাস দেন, ভালো রেজাল্ট করেছ, “কলেজে তোমার ফীজ মকুব করা হবে। “তবু বিয়ের জন্যে রাখা বালাজোড়া বাঁধা পড়ে বেণী স্যাকরার কাছে। রবিঠাকুরের কবিতায়, ক্লাসের লেকচারে, লাইব্রেরীর লিডিংরুমে, বৈষ্ণব পদাবলীর পাতায় সে দু্ঃখ টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে মিলিয়ে যায়। শব্দেরা আরো গভীর ভাবে অধিকার করে পূর্ণিমার চেতনাকে।
বাপু ততদিনে শয্যা নিয়েছে। অধ্যাপকেরা পিতৃস্নেহে মেডেল পাওয়া মেধাবী ছাত্রীর মাথায় হাত রেখে বলেন,” পড়া না বুঝলে, বইয়ের দরকার হলে আমাদের কাছে এসো মা!”
রবিঠাকুর শেখান, “আমারে তুমি অশেষ করেছ, এমনি লীলা তব/ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছ জীবন নব নব”।
বাপু চলে যায় সেই আলোকিত ইন্দুর মুখের দিকে তাকিয়ে। কান্নায় ভেঙে পড়া, ঘোমটা টানা মাঈকে জড়িয়ে ধরে তার বাচ্চী বলে, “মা আমি তো রয়েছি তোমার জন্যে।”
লাবণ্যের দেওয়া ঋষিকবির একটি ছবি পূর্ণিমা ঘরে টাঙিয়ে রেখেছে। সকালে উঠে তাঁরই সামনে দাঁড়িয়ে মনে মনে প্রণাম করে বলে “তোমার পতাকা যারে দাও, তারে দাও বহিবার শক্তি”।
জীবনদেবতা সদয় হন। ইস্কুলের সেক্রেটারি নিজে বাড়িতে এসে চাকরি দেন, “তুমি তোমার বিদ্যালয়ের ঋণ শোধ কর মা। মা’কেও তো তোমায়ই দেখতে হবে!” তখনও বি.এ পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়নি।
বাচ্চীদের ঘরের চালে নতুন টালি বসে। মেয়েদের ইস্কুলে বাংলার নতুন দিদিমণি পূর্ণিমা ক্লাসে ঢোকে। তার ঘন চুল টানটান করে খোঁপায় বাঁধা। নিদাগ সাদাশাড়ি কাঁধে লাবণ্যের দেওয়া ব্রোচে আটকানো। সাদা জামার হাতায় ফুল তোলা। চলায় আত্মপ্রত্যয়। সুন্দর মুখে তারুণ্য আর জ্ঞানের দীপ্তি। আলো ছড়িয়ে যায় নবম শ্রেণীর ক্লাসে। সে আলোয় আলোকিত হয় গৌরী, নমিতা, গায়ত্রী, কল্যাণী, আরতি, পুষ্পলতা এমনি আরো কত কত মেয়ে!
Amader dekha manush gulo ke Tumi ki sundor kore abar jibonto kore tulcho . Erokom kore r o onek ke chokher samne dekhte chai.
খুব খুশি হলাম তুমি পড়ে ভালোলাগা জানালে বলে
বাকরূদ্ধ..!!!!!
কী অসাধারণ উত্তরণ ও জীবন নির্মাণের গল্প..! সাথে দেহাতী জীবন-ছবির স্তরে স্তরে বাস্তব অনন্য বর্ণন…!! বড় মধুর ও সুন্দর লাগলো…!!!
তোমার এই ভালোলাগাকে সম্মান জানাই। ভালোবাসাও।