ট্রেনে চাপতেই কেকা অস্থির হয়ে উঠল। বারবার চলন্ত ট্রেনের জানালার দিকে চাইছে আর বাবা-মাকে পাগল করে দিচ্ছে, “দার্জিলিং কখন আসবে, দার্জিলিং কখন আসবে?” শুধু কি তাই? গোটা ট্রেনের রাস্তায় দশ বছরের বাড়ন্ত মেয়ে খেতে, বসতে, শুতে বাবা-মাকে নাজেহাল করছে। চ্যাঁচাচ্ছে, হাত-পা ছুঁড়ছে, বকবক করেই যাচ্ছে। খাবার ভালো না লাগলে মুখের খাবার এদিক ওদিক থু থু করে ফেলছে।
দলের সবাই বিরক্ত। এই মেয়েকে নিয়ে কেউ বেড়াতে আসে! আডা়লে নিন্দে-মন্দ চলছে। “এরকম পাগল মেয়েকে নিয়ে ওদের একলা আসা উচিত ছিল। দলের সঙ্গে একেবারেই নয়।”
ট্যুর ম্যানেজারকে গিয়ে কেউ কেউ ধমকীও দিয়ে এল, “তোমরা দেখে শুনে লোকজন নিয়ে আসতে পারো না। এই মেয়ে সঙ্গে থাকলে আমাদের গোটা ট্যুরটাই নষ্ট হয়ে যাবে।” ট্যুর ম্যানেজার অসিত কাঁচুমাচু মুখ করে, হাত কচলে বলছে, “কি করব বলুন, ওঁনারা তো আগে বলেন নি এমন পাগল মেয়ের কথা। এ যাত্রায় একসঙ্গে চলুন। ওখানে গিয়ে ওদের জন্যে আলাদা গাড়ির ব্যবস্থা করে দেব।”
কেকার মা-বাবাও অপ্রস্তুত। মরমে মরে আছে বেচারীরা। অনেকদিন পর কোথাও বেড়াতে বেরিয়েও শান্তি নেই।
কেকার মা ইরা ভাবছে, “মেয়েটাতো ঠিকই ছিল ইদানিং। গুনগুন করে গান গাইছিল আজকাল। দার্জিলিঙে বেড়ানোর কথা ওকে একটু একটু করে বলা হয়েছিল। হঠাৎ কোনো খুশি আনন্দ-দুঃখের খবর কেকা নিতে পারে না। রিঅ্যাক্ট করে। কেকার ডাক্তারবাবুই বারণ করেছেন। তাই ওর বাবা রোজ সন্ধ্যেবেলা অফিস থেকে ফিরে দার্জিলিঙের উঁচু উঁচু পাহাড়ের গল্প করত মেয়েকে পাশে বসিয়ে। কেমন করে আকাশ থেকে মেঘ উড়ে উড়ে এসে ঘরের জানলা দিয়ে ঢুকে পড়ে! সারাদিন ধরে টয়ট্রেন ঝুক ঝুক করে চলে গাঁ গঞ্জ শহর, বাড়ির বাগানের বেড়ার পাশ দিয়ে। রোদমেঘ আর বৃষ্টির লুকোচুরি খেলা চলে সেখানে। স্কুলের ব্যাগ কাঁধে গোলাপি গাল ছোটছোট ছেলেমেয়েরা পাহাড়ি পথে বাড়ি ফেরে। পাহাড়ের গায়ে ফুটে থাকে লাল-হলুদ-কমলা-সাদা কতরকমের নাম না জানা ফুল! সে সব গল্প শুনে কেকার বড়বড় চোখ চকচক করে উঠত। মেঝেতে পা দাপিয়ে বলত, “আমরা দার্জিলিং যাব বাবা”। ডাক্তারবাবুও বললেন, “নিয়ে যান। ওর মাঝেমাঝে একটু চেঞ্জ দরকার। আপনাদেরও।” ডাক্তারের ভরসায় তাই সাহস করে বেরিয়ে পড়া।
তবে ট্রেনে উঠতেই ব্যাপারটা এইরকম বদলে যাবে কে জানত! কেকার বাবা মলয় ভাবছে, “নিশ্চয়ই নতুন পরিবেশ, নতুন লোকজন দেখে মাথাটা আবার খারাপ হয়েছে মেয়ের। সামলাতে পারছেনা নিজেকে। একা আসাই উচিত ছিল আমাদের।”
হতভাগ্য মা-বাপই বা আর কি করে? তাদের সহিষ্ণুতার বাঁধ মাঝেমাঝে ভেঙে যায়। নিজেদের মধ্যে অশান্তিকেও আটকাতে পারে না। মন মাঝে মাঝে বিদ্রোহ করে। অন্যসঙ্গে, নতুন পরিবেশে জীবন ডানা মেলতে চায়। তবে কার কাছে রেখে আসে এমন মেয়েকে! বিরক্তি এলেও কেকা যে তাদের নয়নের মণি!
কোনরকমে অশান্তিকে ধামাচাপা দিতে দিতে দার্জিলিং তো পৌঁছন গেল। কিন্তু মেয়ে হোটেল থেকে কোত্থাও বেরোতে চায় না। সারাদিন জানলার কাঁচে চোখ লাগিয়ে বসে থাকে। কি যে দ্যাখে সারাদিন! কুয়াশা, মেঘ, দূরের ঝাপসা পাহাড়, পাহাড়ী পথ আর বৃষ্টি? একসময় বিকেলের আলো নিভে যেতে যেতে মনখারাপের মত অন্ধকার নেমে আসে পাহাড়ে, ঘরের ভেতরে। একটা দুটো করে আলোর বিন্দু জ্বলে ওঠে পাহাড়ের গায়ে গায়ে। ইরা মেয়েকে ডেকে বলে, “কেকা, আর কি দেখবি মা বাইরে? সবই তো অন্ধকার।”
কেকা মায়ের কথা শুনে জানলার কাছ থেকে সরে আসে। চুপটি করে কিছুক্ষণ বসে থাকে। তারপর ড্রইং খাতা আর পেন্সিল নিয়ে কি যে সব আঁকিবুঁকি কাটতে থাকে! সে ছবির কোনো অর্থ ইরা-মলয় উদ্ধার করতে পারে না। কেকার এই ড্রইং খাতায় আঁকিবুঁকি করাটা অবশ্য আজকের অভ্যেস নয়। সবটাই তার খেয়াল। কখনো কখনো মন হলে অদ্ভুত সব ছবি আঁকে। কেকার ডাক্তারবাবু বলেছেন, যাই আঁকুক, ওকে বাধা দেবেন না। এতে মন অনেকটা ওর শান্ত থাকবে। তাই কেকার জিনিসপত্রের সঙ্গে খাতা আর রং পেন্সিলও সঙ্গে এসেছে।
তবে হোটেলের চারদেয়ালের মধ্যে বন্দি থাকতে থাকতে ইরা-মলয়ের প্রাণ ওষ্ঠাগত। কি সুখেই না তারা বেড়াতে এল! মাঝেমধ্যে মলয় হোটেল থেকে বেরিয়ে এদিক-সেদিক একটু হেঁটে আসে। ব্যস ঐ পর্যন্ত!
এরই মধ্যে দলের টাইগার হিল যাবার প্ল্যান চলছে। সুর্যোদয় দেখতে সকাল চারটেয় বেরিয়ে পড়তে হবে হোটেল থেকে। মে মাসের আবহাওয়াতেও টাইগার হিলে বেশ ঠান্ডা। কেকার বাবা-মা ধরেই নিয়েছে এই অপরূপ দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য তাদের নেই। তবু দেখা যাক মেয়ের মতিগতি!
পরদিন শেষরাতে ওয়েক-আপ কল বাজল ঘরে ঘরে। বাবা মেয়েকে আদর করে ঘুম থেকে উঠিয়ে বলল, “মামণি তুমি যাবে টাইগার হিলে সূর্যোদয় দেখতে? আশ্চর্য! অবাধ্য মেয়ে তখন কেমন করে রাজি হয়ে গেল। ধড়মড় করে বিছানা থেকে উঠে পড়ল। তাড়াতাড়ি গরমজামা কাপড় পরে একেবারে রেডি। অন্য সহযাত্রীরাও তৈরি। গাড়িতে ওঠার সময় অনেকেরই মনে অসন্তোষ, মুখে বিরক্তি। এ মেয়েও যাচ্ছে! স্বর্গীয় দৃশ্য দেখার সমস্ত আনন্দটাই না মাটি করে দেয় এ পাগল!
দার্জিলিং শহর থেকে এগারো কিলোমিটার পথ পেরিয়ে টাইগার হিল। চাপচাপ অন্ধকারে, কুয়াশায় পাহাড়ী পথে গাড়ি চলেছে খুব সন্তর্পনে, ধীরে ধীরে। ইরা-মলয়দের গাড়ির পেছনেও লম্বা লাইন। তবে মেয়ে কেমন চুপটি করে বসে আছে। যেন ধৈর্যের পরীক্ষা দিচ্ছে। আজ অদ্ভুতভাবে সে ধীর, স্থির। কে জানে কোন মগ্নতায় ডুবে আছে!
রাস্তায় যেতে যেতে মলয়ের মনে পড়ল, আজ পঁচিশে বৈশাখ। মলয় কোথাও পড়েছিল রবীন্দ্রনাথ বহুবার দার্জিলিঙে এলেও টাইগার হিলে সূর্যোদয় দেখতে পান নি। এ সৌভাগ্য যদি তাদেরও না হয়! মেয়েকে তখন সামলানো যাবে তো!
যদিও কাল থেকে আকাশ পরিষ্কার ঝকঝকে। হোটেলের রিশেপসানের ছেলেটি অভয় দিয়ে বলল, “চলে যান। কাল সানরাইজ নিশ্চয়ই দেখতে পাবেন”।
টাইগার হিল পৌঁছে মলয়রা দেখে ভীড়েভীড়াক্কার। সবাই এক এক মুহূর্ত গুনছে। কখন আসবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। দেশি, বিদেশি মানুষ ক্যামেরায় চোখ রেখে রেডি হয়ে আছে সেই স্বর্গীয় দৃশ্য বন্দি করে রাখবে। মোবাইল তখন স্বপ্নেরও অগোচর।
সবার অপেক্ষার অবসানে ধীরে ধীরে একটি সোনার রেখা ফুটে উঠল আকাশে। সেই আলো ছড়িয়ে পড়ল তুষারধবল হিমালয়ের শিখরে শিখরে। তুষার মৌলি বদলে গেল রাজাধিরাজের স্বর্ণ কিরীটে। আকাশে তখন রঙের বিচ্ছুরণ। নীল, সাদা, লাল, কমলা, সোনালী রঙ বারে বারে পট পরিবর্তন করছে। জবাকুসুমসঙ্কাশং বালার্ক কাঞ্চনজঙ্ঘাকে আলিঙ্গন করে প্রস্ফুটিত হচ্ছে। শুরু হচ্ছে একটি নতুন দিনের। বিশ্ব চরাচরের এই আলোর উৎসবে, পঁচিশে বৈশাখের পুণ্যপ্রভাতে সেই অপ্রকৃতিস্থ মেয়েটি হঠাৎ দু-হাত সামনে মেলে ধরে গলা ছেড়ে গেয়ে উঠল,
“আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও।
আপনাকে এই লুকিয়ে-রাখা ধুলার ঢাকা ধুইয়ে দাও ।
যে জন আমার মাঝে জড়িয়ে আছে ঘুমের জালে
আজ এই সকালে ধীরে ধীরে তার কপালে
এই অরুণ আলোর সোনার-কাঠি ছুঁইয়ে দাও।
বিশ্বহৃদয়-হতে-ধাওয়া আলোয়-পাগল প্রভাত হাওয়া,
সেই হাওয়াতে হৃদয় আমার নুইয়ে দাও ॥
আজ নিখিলের আনন্দধারায় ধুইয়ে দাও,
মনের কোণের সব দীনতা মলিনতা ধুইয়ে দাও।”
সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। মলয় আর ইরা হতবাক! কেকা গান শুনতে খুবই ভালোবাসে। তার জন্যে সারাক্ষণ মৃদু স্বরে ঘরে গান বেজেই চলে ক্যাসেটে-সিডিতে। কেকা মাঝে মাঝে গুনগুন করলে বোঝা যায় তার গলায় সুর আছে। কিন্তু খেয়ালি মেয়ে কখনো গলা ছেড়ে পুরো গান গায় না। নিখুঁত সুরে-তালে এমন গান মেয়ে কোথা থেকে শিখল! তাদের চোখের জল আর বাধা মানছে না।
আলো আর সুরের এই অপার্থিব মায়ায় স্তম্ভিত হয়ে গেল দেশিবিদেশি সমস্ত পর্যটক। সহযাত্রীদের যত অসন্তোষ, ইরা-মলয়ের সব আশঙ্কা ম্লান করে দিয়ে সে গান ধ্বনিত হতে লাগল পাহাড়ে পাহাড়ে, আলোর ঝর্ণাধারায়…
খুব ভালো লাগলো।
ধন্যবাদ। খুব খুশি হলাম।????
কী যে যাদু আমাদের ‘ঠাকুরের’ মন্ত্রে…! অসম্ভব সুন্দর বর্ণনা হিমালয়ের…!! খুব ভাল লাগলো…!!!
আমাদের ত্রাণ,আমাদের প্রাণ ঐ মন্ত্রে।
ভালোবাসা জেনো জয়া।
ভালো লাগলো নন্দিনী দি
খুব খুশি হলাম। ভালো থেকো