প্রীতি মিত্র ফার্স্ট ইয়ারে ফিলসফি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। শুধুমাত্র ডি.আরের জন্যে। প্রফেসর ডি আর কি অপমানটাই না করেছিলেন সেদিন! ভুলটা প্রীতিকে আলাদা ডেকে বলতেই পারতেন। তা না করে গোটা ক্লাসের সামনে অপমান।
কি ভুলটা করেছিল সেদিন প্রীতি? ফার্স্ট পেপার ছিল ভারতীয় দর্শন। তাতে প্রশ্ন এসেছিল আত্মা কি? বড় গোলমেলে প্রশ্ন। পন্ডিতরাই কখনো একমত হতে পারেনি এ প্রশ্নে।
মেয়েটি নিজের মত করে লিখেছিল, — “আত্মা যখন মশার মধ্যে প্রবেশ করে, তখন সে অতি ক্ষুদ্র আকার ধারণ করে। সে মশাকে বলিতেই থাকে কামড়াও। রক্ত চোষো। তাহাতেই তোমার মুক্তি। হাতির মধ্যে আত্মা প্রবেশ করিলে অত্যন্ত বৃহদাকার হয়। হাতিকে দিয়া তখন সে অনেক কাজ করিয়া লয়। মানুষের মধ্যে প্রবেশ করিলে তাহার কাজের ইয়ত্তা নেই। মানুষকে সমানে সে আদেশ দিতে থাকে, এটা খাও। ওখানে যেয়ো না। ওই কথাটা হজম করে নাও। তাকে কথা শোনাও এমন আরো কত কি। মনুষ্য অবশ্যি অতি বিটকেল প্রাণী। সে সব কথা শুনিয়াও শোনে না।
প্রীতি আরো লিখেছিল, — “আত্মা স্বাধীন হইয়াও পরের অধীন। তাহাকে কোনো জীবের শরীরে আশ্রয় করিয়াই কর্তব্য কর্ম করিতে হয়। শরীর বিনষ্ট অর্থাৎ মানুষের মৃত্যু হইলেও দুষ্টু অথবা অতৃপ্ত আত্মার সদ্গতি হয় না। তাহাকে পুনর্বার কোনো মনুষ্য অথবা মনুষ্যেতর জীবের শরীরে আবার প্রবেশ করিতে হয়।”
প্রীতির এই উত্তর প্রফেসর ডি. আর জোরে জোরে ক্লাসে পড়ে শুনিয়েছিলেন। ক্লাসের ছেলেমেয়েদের সেকি হাসি আর টিটকিরি! মেয়েটি অপমানে দু-দিন কলেজে যায় নি। শেষমেষ লজ্জায়, দুঃখে ফিলসফির ক্লাস ছেড়ে এডুকেশন নিতে বাধ্য হয়েছিল।
না প্রীতি সেদিন খুব একটা ভুল কিছুই লেখেনি। মশা আর হাতির আত্মার ছোটোবড় হওয়াটা প্রীতি অবশ্য একটু গন্ডোগোল করে ফেলেছিল এছাড়া মোটামুটি ঠিকঠাকই ছিল। তবে প্রীতি যে খুব সুশীল, ভদ্র, ভালো মেয়ে ছিল এমনটা কিন্তু বলা যায় না।
আমি কি করে এতসব জানলাম? আমি তো জানবই। আমিই যে ছিলাম প্রীতির শরীরের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা আত্মা। তবে তাকে উৎকৃষ্ট আত্মার সার্টিফিকেট কখনোই দেওয়া যায় না। প্রীতি নিজেই লিখেছিল না, মানুষ বড় বিচিত্র জীব! সে ভালো কথা শুনেও শোনে না। ঐ মেয়েটির সঙ্গেও তালমিল আমার কোনোদিনও হয়ে ওঠেনি। প্রীতি কোনদিনই নিজের আত্মাকে জাগিয়ে তুলতে পারে নি। তাই সে কোনো ভালো কাজ এ জীবনে করে নি। পড়াশোনায় ইস্তফা দিয়ে বাবা’মার অমতে সে তড়িঘড়ি বিয়ে করে। বিয়ে করে ইস্তক সে বর, শ্বশুরবাড়ির সবার জীবন ভাজা ভাজা করেছে। ছেলে একটা হয়েছে বটে তার, তবে সে ছেলেকে মানুষ করতেও সে বিশেষ কৃতিত্ব দেখায় নি। কোনোরকমে দিনগত পাপক্ষয় করে কেটে গেল তার গোটা জীবন।
সেদিনের সেই কলেজছাত্রী প্রীতির দেহ ছেড়ে আমি আপাতত মুক্ত স্বাধীন। সেই যুবতী শরীরটা পচাগলা এক বৃদ্ধার দেহ হয়ে অনেকদিন বিছানায় পড়ে ছিল। আমি সেই শরীরের অধীন থাকতে থাকতে একসময় হাঁফিয়ে উঠেছিলাম। সে এক অতি বিচ্ছিরি সসেমিরা অবস্থা। বুড়ির শরীরে কোনো সাড় নেই, অথচ মনে মনে বেঁচে থাকার ইচ্ছে প্রবল! আমি যে কি করি! মুনি ঋষিরা যাকে জীবাত্মা বলে মহান করেছেন, তার যে কি দুরবস্থা তখন! বেকার, বিচ্ছিরি দিনগুলো কেটেই চলেছে। ওদিকে বুড়ির ছেলে বৌ হাপিত্যেশ করে বসে আছে, কবে মা মরবে!
বুড়ি ওরফে প্রীতি শেষ পর্যন্ত মরল। আমি তার শরীর থেকে বেরিয়ে এখন এদিক ওদিক একটু হাওয়া খাচ্ছি। চারদিক ঘুরে ঘুরে দেখছি। একটু আধটু ভয় দেখাচ্ছি বাড়ির লোকেদের।দুমদাম বাসন ফেলছি। জানলা কপাট দড়াম দড়াম বন্ধ করছি। যতই হোক দুষ্টু আত্মা তো!
বুড়ির ছেলের বৌ ভয়ে ভয়ে বলছে, “মায়ের সংসারের ওপর বড্ড টান ছিল তো! তাই বোধহয় মায়া কাটাতে পারেনি গো! আশেপাশে ঘুরঘুর করছে। শ্রাদ্ধটা ভালো করে করো গো। পুরুতমশাই বললেন মা নাকি ত্রিপাদ দোষ পেয়েছেন। বাড়িতে তুলসী দিতে হবে!”
আমি জানি এরপরে প্রীতির ছেলেবৌ তার ঘটা করে শ্রাদ্ধ করবে। লোকজন গান্ডেপিন্ডে গিলবে আর আমাকে চাল, কলা, তিল মাখা মন্ড খেতে ডাকবে। আমার বয়েই গেছে ঐসব অখাদ্য খেতে। আমি এখন চপকাটলেট, মন্ডামেঠাই যা খুশি খেতে পারি। এমন কি পিৎসা, বার্গার, পাস্তা, সুশি কি সব বলেনা, সেসব ট্রাই করতে পারি। ওসব তো কোনো জন্মেই খাওয়া হয় নি। শুধু নামই শুনেছি বুড়ির ছেলেবৌয়ের মুখে।
বুড়ির ছেলে-বৌ বলাবলি করছে শুনলাম, খুব তাড়াতাড়ি তারা নাকি গয়ায় গিয়ে পিন্ডদান করবে। কিন্তু তাতে আমার কিই বা হবে! হেড অফিস থেকে খবর এসেছে, আমি প্রীতিকে দিয়ে তার এত বড় গোটা জীবনে কোনো ভালো কাজ করাতে পারিনি। আমার তাই মুক্তি নেই। আমাকে আবার কোনো শরীরে প্রবেশ করতে হবে!
আবার আমি কোন শরীর ধারণ করব আমি জানি না। কিন্তু আবার তো সেই শরীর নামে খোলসটার মধ্যেই আমাকে ঢুকতে হবে!
বড় বিপদে পড়লাম আমি। আবার সেই শরীরের আধার খোঁজা? দেহ মন মাথার তাল মিলিয়ে চলা!
কোথায় যে যাই! কোন দেশে, কোন সমাজে? এর মধ্যে নাকি একবার আমাকে স্বর্গে ঘুরে আসতে হবে। বেশিদিন থাকতে দেওয়া হবেনা। শুধুই ভালো জিনিস একবার দেখিয়ে, যাও এবার কেটে পড়ো! কি জ্বালা রে বাবা!
আবার নরক দর্শনও আছে! সে তো ভয়ঙ্কর! সেসব কথা ভেবে ভয়ে সিঁটকে আছি আমি।
আপাতত খোঁজ চলছে কোথায় আমাকে প্লেস করা যায়!
যতদিন না আবার কোনো দেহখাঁচার মধ্যে ঢুকছি, ততদিন না হয় একটু নিজের মত করে বাঁচি। আবার কবে এমন সুবর্ণ সুযোগ হবে জানি না! ততক্ষণ আনন্দে বন্ধনহীন, মুক্ত হাওয়ায় ভেসে বেড়াই। এ পৃথিবীর ধুলোমাটি মাখি। আগুনের পরশমণি মাথায় নিয়ে স্বপ্ন দেখি আগামীর। বৃষ্টির সঙ্গে ঝ’রে পড়ি শুকনো মাটিতে। নদীর জলে মিশে পথ চলি অবিরাম। আকাশে আকাশে খুঁজে বেড়াই আমার মুক্তির ঠিকানা।
Khub bhalo laglo pore….
খুব খুশি হলাম????
দারুণ মজার… ????????
ধন্যবাদ ????♥️
খুব অন্যরকম লেখা !
ভালো লাগলো ????