রাত থেকেই চাপা উত্তেজনায় অতুল ছটফট করছে। ঘুম আসেনি। তিনবার জল খেতে উঠল। দু-বার বাথরুম গেল। বৌ মীনাক্ষী ঘুম জড়ানো স্বরেই একবার কথা শোনালো, “কি যে সারারাত এপাশ ওপাশ করো! গরমের জ্বালায় একেই ঘুমের জো নেই। তারপরে তুমি!”
অতুল চুপ করে থাকে। মীনাক্ষীকে সে প্রায় কখনোই কিছু বলে না। আজও বলল না। মীনাক্ষী তার ভাঙা ঘরে চাঁদের আলো। সহায়সম্বলহীন অনাথ অতুলের ভালোবাসার একমাত্র আশ্রয়। দু-বছর হল তাদের বিয়ে হয়েছে। তার আগে দুবছরের ভাব-ভালোবাসা। বিয়েটা অবশ্য সহজ ছিলনা।
মীনাক্ষী মিত্তির বাড়ির আদরের দুলালী। সুন্দরী, শিক্ষিতা। ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। স্বেচ্ছায় চালচুলোহীন, সামান্য মাইনের চাকুরে অতুলকে বিয়ে করে বসল। ‘তিনভুবনের পারে’র পুনরাবৃত্তি ঘটল যেন। পাড়ার লোক, মীনাক্ষীর আত্মীয় পরিজন ছি-ছি করল। ঠেশ মেরে কথা বলতেও ছাড়লনা। “কি মেয়ের, কি বরই না জুটল! মেয়েকে আটকাতে পারল না ওরা?”
জুতোর কারখানায় চাকরি করা অতুলের না আছে রূপ না গুণ। তবু প্রেমটা হয়ে গেল। মীনাক্ষীদের পাড়ায় কখনো কখনো আড্ডা মারতে আসত অতুল। সেখানেই কখন চারচক্ষুর মিলন। ফোনাফুনি। পার্কে-রেস্টুরান্টে-সিনেমায় ঘোরা। তারপর একদিন বাড়ির অমতে একবস্ত্রে বেরিয়ে এল মীনাক্ষী। রেজিস্ট্রি বিয়ে সারল ওরা। বাপের বাড়ির সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য আরাম ছেড়ে মীনাক্ষী উঠে এল অতুলের ভাড়া করা দুকামরার ঘরে।
আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে এরকম অসম বিয়ে কিছুতেই সফল হয় না। কিন্তু মীনাক্ষী-অতুল পেরেছে। টাকাপয়সার অভাব থাকলেও ভালোবাসা, পারস্পরিক বোঝাপড়া, সম্মানের অভাব নেই তাদের সংসারে।
বিয়ের আগে মীনাক্ষীর বাড়িতে সাদাকালো বাংলা সিনেমার মত প্রচুর ডায়লগ ছোঁড়াছুঁড়ি হয়েছে।
—তুই কি দেখে ঐরকম একটা ছেলের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লি?
—এ বিয়ে টিকবে না তোদের, আমি বলে দিচ্ছি।
—মিত্রবাড়ির সম্মান এভাবে তুই এভাবে নষ্ট করতে পারলি?
—পড়াশোনাটাতো আগে শেষ কর।
এছাড়াও ছিল জাঁদরেল বাবার গম্ভীর থমথমে মুখ। চোখে আঁচল চাপা দিয়ে মায়ের কান্না। দাদাদের হুমকি। দিদিদের উপদেশ। বৌদিদের চাপা হাসি।
মীনাক্ষী এসবকিছু উপেক্ষা করেছে। নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকেই বিয়েটা করেছে। না, বাপেরবাড়ির দরজা অবশ্য তার জন্যে বন্ধ হয়নি। সে একলাই সেখানে আসে যায়। থাকেনা। এই দু-বছরে মীনাক্ষীর মা গয়নাগাঁটি টাকাপয়সা দিতে চেয়েছেন অনেকবার। মীনাক্ষী হেসে এড়িয়ে গেছে, “না মা, প্রয়োজন হলে ঠিক চেয়ে নেব”। মীনুর গরীব বর সবসময় তার এই চারিত্রিক দৃঢ়তাকে সম্মান করে।
এই জৈষ্ঠ্যমাসে মীনাক্ষীদের বাড়িতে জামাই ষষ্ঠীর খুব ঘটাপটা। দুই জামাই প্রায় প্রতিবারই নেমন্তন্ন রক্ষা করেন। খাওয়াদাওয়ার এলাহী আয়োজন। এক জামাইয়ের চিংড়ির মালাইকারি, দই, মাছ পছন্দ তো মেজ জামাই ভালোবাসে পোলাও মাংস। দুজনেরই মান রাখা হয়। এছাড়াও শুক্তো, ডাল, পাঁচভাজা, পায়েস, দই, মিষ্টির নিয়ম পালন তো হবেই।
ঐ দিন জামাকাপড় দেওয়ানেওয়া হয়। মীনাক্ষীর মা সকাল সকাল স্নান সেরে নতুন কাপড় পরেন। ছেলে, মেয়ে জামাইদের জন্যে মানত থাকলে তাদের নামে ক্ষীরের পুতুল গড়ে মা ষষ্ঠীর থানে পুজো দেন। সেদিন তো শুধু জামাইষষ্ঠী নয়, অরণ্যষষ্ঠীও বটে। বট গাছ আর পাকুড়গাছ স্থাপন করা হয় গঙ্গার ধারে। ধূপদীপ জ্বালিয়ে তার পুজো করা হয়। মা উপোস করে জামাইদের হাতে বাটা তুলে দেন। সে বাটায় পাঁচফল, পান-সুপুরি সাজানো থাকে। তালপাখাকে জলে ভিজিয়ে তাতে তেল সিঁদুরের ফোঁটা দিয়ে তিনি জামাইদের ঠান্ডা বাতাস করেন। কপালে হলুদ ফোঁটা, হাতে হলুদ সুতো বেঁধে ষেঠের সন্তানদের জন্যে মঙ্গল কামনা করেন। ধানদুব্বো দিয়ে আশীর্বাদ করেন জামাইদের। শাঁখ বাজে। মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালানো হয়। গোটা বাড়িতে উৎসবের পরিবেশ। বিয়ের আগে মীনাক্ষী মায়ের ব্রতপালনে হাতে হাতে সাহায্য করত। তাই সে জামাইষষ্ঠীর সব নিয়মকানুন জানে।
বিয়ের পর মীনাক্ষী আর অতুল অবশ্য ব্রাত্য এই অনুষ্ঠানে। মীনাক্ষীর এখন মনেই থাকে না জামাই ষষ্ঠী কবে। গরমের দিনে হঠাৎ সকালবেলায় আশেপাশের বাড়ি থেকে আচমকা অনেকগুলো শাঁখের আওয়াজে সব কথা তার মনে পড়ে যায়। মনটা বিষণ্ণ হয়। তবে এখন সব দুঃখ ঢোঁক গিলে নিতে শিখেছে সে। অতুলকেও তার ভাগীদার করতে চায় না।
এবছর হঠাৎই তিনদিন আগে সন্ধ্যেবেলা মায়ের ফোন।
—অতুলকে একটু ফোনটা দে’তো।
—অতুলকে? মীনাক্ষী অবাক হল।
—হ্যাঁ বলছি তো, দে না। মায়ের গলায় আদেশের সুর।
মীনাক্ষী অতুলকে ফোনটা দিয়ে অধীর আগ্রহে অতুলের মুখের ভাব পড়ার চেষ্টা করে। বুঝতে পারে না কিছুই। সে মুখে উত্তেজনা-বিস্ময়-আনন্দ-জিজ্ঞাসা ….সব ভাবের খেলা। অতুল এবছর জামাই ষষ্ঠীর নেমন্তন্ন পেয়েছে শ্বশুরবাড়িতে। শাশুড়ি নিজে নেমন্তন্ন করেছেন অতুলকে। আনন্দের আতিশয্যে হেসে ফেলে দু-জনেই। তবে তারপর থেকেই অতুল উত্তেজনায় ছটফট করছে।
—কি করতে হবে আমায় মীনু? কিছু দিতে হবে কি আমাকে? কি কথা বলব আমি তোমাদের বাড়ির সবার সঙ্গে? আমার ভীষণ নার্ভাস লাগছে কিন্তু।”
মীনাক্ষী হেসে আশ্বস্ত করে অতুলকে। “তোমায় কিচ্ছু করতে হবে না। যা করবার মা’ই করবে। তার আগে চলো জামাই ষষ্ঠীতে পরে যাবার নতুন পাজামা-পাঞ্জাবি কিনে আনি তোমার জন্যে। মা’কে দেবার একটা শাড়ি।”
এরপরেও অতুল মীনাক্ষীকে না জানিয়ে সস্তার বিউটি পার্লারে গিয়ে মুখপালিশ করিয়ে এসেছে। চুলে শ্যাম্পু আর সামান্য ট্রিমিং। সিটি কাটস সেলুনে যত্ন করে দাড়িটাও কামিয়ে দিল। প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে বলে কথা!
জামাই ষষ্ঠীর সকালে মীনাক্ষীর কিনে দেওয়া আকাশিরঙের পাঞ্জাবি আর চোস্ত পাজামা পরল অতুল। হাতে মিষ্টির প্যাকেট আর শাশুড়ির জন্যে কেনা শাড়ি নিয়ে মীনাক্ষীর সঙ্গে সে রিক্সায় বসল। বুকের মধ্যে একরাশ চাপা উত্তেজনা, সামান্য ভয়-উদ্বেগ।
শ্বশুরবাড়ির দিকে যেতে যেতে অতুলের ছোটবেলায় দিদিমার কাছে শোনা একটা গল্প মনে পড়ে গেল। সেদিনও নাকি জামাইষষ্ঠী ছিল। সরকারী হাসপাতালের মেটার্নিটি ওয়ার্ডে সেদিন সকাল থেকে একের পর এক মেয়ে জন্মানোর খবর। গোটা দিনটায় লেবাররুমে একটিই শিশুপুত্রের জন্ম হয়েছিল। ডাক্তার, নার্স, আয়ারা খুব ঠাট্টা করে বাচ্চাটির মা’কে বলেছিল, “দ্যাখো গো, কোন বাড়ির আদরের জামাই হয়ে এলো তোমার ছেলে! আজকের দিনে এতগুলো মেয়ের মধ্যে এই একটিমাত্র ছেলে হয়েছে। আজ জামাইষষ্ঠী বলে কথা! মিষ্টি খাওয়াতে হবে কিন্তু।”
এতদিন পরে অতুল নিজের জন্মকথা মনে করে ফিক করে হেসে ফেলল। রিক্সা তখন ধীরে ধীরে অতুলের শ্বশুরবাড়ির পাড়ায় ঢুকছে।
অপুর্ব লাগলো নন্দিনীদি
খুব খুশি হলাম ♥️
কী ভালো লাগলো… !!!!
খুব খুশি হলাম ????