“হমন কাঁহা যাঁউ রে। তু উঠ। উঠ যা মেরে বাপ। দেখ কতক বরষে পানি। খেতি বরবাদ হোথে। বিনা ধান কা হমন ক্যয়সে বাঁচু রে। ঘর কি নানকুন সব মর যাহী রে….”
কোরবা সদর হাসপাতালের জেনারেল ওয়ার্ডের দেওয়ালে মাথা ঠুকতে ঠুকতে চেইনবাঈ আর্তনাদ করছিল। মেঝেতে লাল কম্বলের ওপর প্রায় নিথর পড়ে আছে তার ছেলে ছকুলাল। মুখের চারপাশে দু-একটা মাছি ভনভন করে উড়ছে। একটা কালো কুচকুচে বেড়াল, সাক্ষাৎ মৃত্যুদূতের মত ঘুরে বেড়ায় গোটা চৌহদ্দি। ছকুলালের বৌ মিথিলার ঘোমটার আড়ালে একঘেয়ে সুরটানা গোঙানিতে শব্দরা অস্ফূট। পুঁটলির মত শরীর থেকে দুটো হাত বা’র করে মাঝেমাঝে স্বামীর মুখের ওপর থেকে মাছি তাড়াচ্ছে।
একটি বয়স্ক নার্স ওয়ার্ডে ঢুকতেই চেইনবাঈ তার পায়ে পড়ল। “ও ডক্টরিন দিদি বঁচা লো মোর বাবুকো। একইঠান বাচ্চা মোর। ওকর বিনা ক্যয়া খায়িস ঘরকা লইকামন”।
মোটাসোটা, রাশভারি সিস্টার মীনা প্রতিদিন জীবনমৃত্যুর লীলা দেখতে দেখতে ঈশ্বরের মতই উদাসীন। খেঁকিয়ে উঠে বলল, “চুপ কর ডোকরি। চেঁচিও না। অন্যরোগীদের অসুবিধে হচ্ছে”।
প্রতিবছর বর্ষায় ছত্তীশগঢ়ের গাঁগঞ্জে নাগদেবতার বলির সংখ্যা এমন বেড়েই চলেছে। আদিম অরণ্যের গর্ভে ঢুকে পড়ছে কয়লাখনি, শহর। অরণ্যে যাদের অধিকার, তারা কোথায় যায়!? গৃহস্থের ঘরে, চাষের খেতে তাদের নাচার বসবাস। কোন দূরদরাজ পাহাড়জঙ্গল থেকে সাপে কামড়ানো রোগী হাসপাতালে আসার সময়টুকু পায় না। বৈগার ঝাড়ফুঁক এ মৃত্যুমিছিলকে আরো বাড়িয়ে দেয়। হাসপাতালে অ্যান্টিভেনাম অপ্রতুল। স্টোর থেকে যে কোথায় চলে যায় তার কোনো হদিশ পাওয়া যায় না। মীনাদের কিচ্ছু করার নেই। রাগ আরো বাড়তেই থাকে।
ছকুলালের বাঁচার আশা বড় ক্ষীণ। ঘুমন্ত মানুষটার কানে জাত সাপ ছোবল মেরেছিল। বৈগা এসে ঝাড়ফুঁক করে আরো খানিকটা দেরী করে দিয়েছে।
মীনা বুঝে উঠতে পারে না এ বুড়ি ছেলের জন্যে বিলাপ করছে না এবছর চাষবাস হল না বলে দুঃখ করছে। হয়তো অপোগন্ড ছেলেপুলে আছে বেশ কয়েকটা! সংসারের সর্বগ্রাসী খিদে সামলাতো মেঝেতে পড়ে থাকা ঐ মরণাপন্ন আদিবাসী ছেলেটি। চেঁচামেচি করে নীনার মনটা খারাপ হয়ে যায়।
ছকুলাল শেষ পর্যন্ত বাঁচে নি। হাসপাতাল-শোক সামলাতে সামলাতে পেরিয়ে গেছে ধান রোপণের অনেকটা সময়। চেইনবাঈয়ের কপালে চিন্তার ভাঁজ গাঢ় হচ্ছে। সারাবছর এতবড় সংসার চলবে কি করে?
বড় নাতি অজিত। সা জোয়ান ছেলের কামবুতায় মন নেই। খেতিবাড়ি করে সংসারের হাল সেই ধরতে পারত! সারাদিন কি যে করে কে জানে!”
একদিন সকালে ফটফটিয়া চেপে অজিত বাড়ি এল। একদম নয়া।
“তু খরিদি একর? পয়সা কাঁহা মিলিস রে?”
“কেন সাপে কেটে মরলে সরকার পয়সা দেয় জানিস না?”
“কত টাকা পেলি”?
“দেড়লাখ !”
আদুল গায়ের, মোটা লুগরা পরা চেইনবাঈ চমকে ওঠে। হাতের আঙুল গুনেও হিসেব করতে পারে না টাকার অংক। এতটাকা তার বাপঠাকুরদা চোদ্দপুরুষ কেউ দেখেনি যে!
“বাপমরার টাকা দিয়ে তুই ফটফটিয়ার ধোঁয়া ছাড়বি বাপ!
একটুকরো জমি কিনলি না? তোর বাপের কলজেটা ঠান্ডা হত!
এ তুই কি করলি রে, বাপের মরণের টাকা বরবাদ করলি….”
দেওয়ালে আবার মাথা ঠোকে চেইনবাঈ।
পুত্রশোক আবার নতুন করে ফিরে আসে।
তার সমস্ত আশাভরসা ফটফটিয়ার কলূষিত ধোঁওয়ার মত গলগল করে উড়ে যায়।
শহর গ্রামকে ধীরে ধীরে গ্রাস করতে থাকে।