নীলসাদা এয়ারবাসটা যেন রঙ মিলান্তি খেলছে পাহাড় আর হিমবাহগুলোর সঙ্গে। হিমবাহরা পাহাড়ের গা দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে দুধের ধারার মত। কোথাও বরফের মাখন প্রলেপ। আকাশের রঙমাখা নীল পাহাড়ে বরফের পাউডার।
জানলা দিয়ে এ অপূর্ব দৃশ্য বারবার দেখেও পুরনো হয় না। এ নিয়ে নিকোলাসের পাঁচবার লাদাখে আসা।
পাশের ইন্ডিয়ান সহযাত্রীটি ঝুঁকে পড়ে ছবি তুলছিল। নিকোলাস হেসে তাকে নিজের সীটটা ছেড়ে দিতেই ঠাকুমার কথা মনে পড়ে গেল,
“সবসময় সবাইকে অতটা ছেড়ে দিসনা নিক। নিজেরটাও একটু বুঝতে শেখ”।
সত্যিই সারাজীবন নিজের জমি জায়গা আঁকড়ে পড়ে রইল ঠাকুমা। গোরু বাছুর, অলিভের খেত ছেড়ে কোথাও আর বেরোল না। এখনো গ্রামের কবরখানায় নিজের ছেলের পাশেই শেষশয্যায় শুয়ে আছে ঠাকুমা।
“আর কোনো পিছুটান রইল না আমার”, একথা ভাবলেই নিকের নীল দুটি চোখ টলটলে হ্রদ হয়ে ওঠে।
ঠাকুমা বলত, “বাবার মত বড্ড মায়াজড়ানো চোখদুটো তোর। হাসিতেও সবার মন ভুলিয়ে দিস।”
আশ্চর্য আজ লেহ’র হিল ভিউ হোটেলে ঢুকতে ম্যানেজারের মুখেও একই কথা! হাত জোড় করে বলল
—জুলে মিঃ হ্যান্ডসাম। কেমন আছেন?
—জুলে, জুলে। আমাকে মনে আছে আপনার?
—আপনার ঐ নীল চোখ আর হাসিতে কি যেন একটা আছে স্যর! আপনাকে ভোলা যায় না।
—পেয়ার
হাসতে হাসতে এ’কথা বলে নিজের ঘরের দিকে গেল। দীর্ঘদিন ধরে ভারতভ্রমণ করতে করতে নিকোলাস ভাঙা ভাঙা হিন্দি বলে। ভারত, বিশেষ করে হিমালয় যে তার স্বপ্নের চারণভূমি।
আজকের দিনটা লেহতে বিশ্রাম করেই কাল সকালে আবার বেরিয়ে পড়া। লেখালেখিতে এখন একদম মন নেই নিকোলাসের। যদিও পাবলিশার বড্ড তাড়া দিচ্ছে। এই আমেরিকান পাবলিশারগুলো একেকজন ঝানু ব্যবসায়ী। নিকোলাসের আগের উপন্যাস দ্য পাথফাইন্ডার বেস্ট সেলার থাকতে থাকতে আর একটা হাতে গরম লেখার দাবি। ডিসগাস্টিং!
এটা এরা বোঝেনা যে লেখকদেরও একটু বিরাম চাই। চাই অন্তরাল, অবকাশ। নাহলে তো লেখারা একই ভাবনার ঘূর্ণিপাকে জড়িয়ে থাকে।
সংসারের একমাত্র বন্ধন ঠাকুমা চলে যাবার পর নিকোলাসের চিন্তায় যেন জড়তা এসেছে। ক্লান্ত মন বিশাল বিস্তৃত হিমালয়ের কোলে একটু আশ্রয় চায়। এবার আর তাই কোথাও ঘোরাঘুরি নয়। ইচ্ছে আছে দা হানু ভ্যালিতে কিছুদিনের নিরালা অবসর।
সকালেই হোটেল থেকে চেক আউট করে লেহ্’র কমিশনারের অফিসে সাদা চামড়ার নিকোলাসকে একগাদা প্রশ্ন। কেন যেতে চাও দা হানুতে? কতদিন থাকবে সেখানে? এত প্রশ্নবাণকে অবশ্য ঢাল করে আটকালো নিকোলাসের এক্স ফ্যাক্টর! গভীর নীল চোখ, মিষ্টি হাসি আর মধুর ব্যবহার অনুমতির ছাড়পত্র আদায় করে নিল।
নিকোলাস চলল দা হানুর পথে। প্রায় দু’শ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। লেহ্ শহর ছাড়িয়ে সামনে এগোতেই সবুজ উধাও হল। পাহাড়ে কখনো রুক্ষতার ধূসর, কখনো বৈরাগ্যের গেরুয়া রঙ। শুকনো পাথরের গায়ে মাঝেমাঝে রঙ ছড়াচ্ছে পাহাড়ি গোলাপ।
একজায়গায় পাহাড়ের পাথরগুলো নানা সাইজের ফুটবলের মত গোল গোল। কোথাও বা পাথর স্তরীভূত। কোনো কোনো জায়গায় এতটাই বিশাল এবং এলোমেলো যে মনে হয় একটু টোকা লাগলেই গড়িয়ে পড়ে নিকোলাসের গাড়ি চুরমার করে দেবে!
নীল সিন্ধুনদ সঙ্গ নিয়েছে প্রায় গোটা রাস্তায়। তিরতিরে বয়ে চলা নদীর পাশে দু’দন্ড বসে নিকোলাসের তার সঙ্গে আলাপ করতে ইচ্ছে করল। বলতে ইচ্ছে করল তার জীবনের গল্প। শঙ্কার কথা। এখনো নিকোলাস জানে না দা বা হানুতে থাকার জায়গা সে পাবে কি না! শুনেছে দা তে গেস্ট হাউস আছে। দেখা যাক।
পথশ্রমে ক্লান্ত দা গ্রামে পৌঁছতেই নিকোলাসের মনের ক্ষতে যেন আরামের প্রলেপ। এই পাহাড়ি উপত্যকায় কি নেই! সবুজ ক্ষেত, নীল নদী, তিরতিরে ঝর্ণা, মাচায় আঙুর লতা, অ্যাপ্রিকটে ভরা গাছ যেন কমলা টুনি বাল্ব দিয়ে সাজানো। সুন্দর ব্রোকপা মানুষগুলো প্রকৃতির সঙ্গে রঙ মিলিয়ে সবসময় সাজগোজ করে আছে।
অনেকটা পথ পায়ে হেঁটে, খোঁজ করতে করতে একটা হোম স্টে যোগাড় করল নিকোলাস। ছবির মত বাড়িটির একপাশে যেন জাজিম বিছানো যবের খেত, কলকলে নদী। আরেক ধারে ফুলের বাগান। একটু দূরে উঁচুতে দেখা যাচ্ছে বৌদ্ধমঠ।
হোম স্টে’র মালিক মুশা কাজ চালানোর মত হিন্দি এবং ইংরিজি দুটোই জানে। নিকোলাসের দরাদরি করার বিশেষ অভ্যেস নেই, তবু মনে হল ভাড়াটা যেন একটু বেশিই।
ঘরে ঢুকে কাঁধ থেকে ব্যাকপ্যাক নামিয়ে জানলা খুলল নিকোলাস। মন আর শরীর দুইই যেন ভারমুক্ত হল অনেকটা। হঠাৎ খসখস-টুংটাং আওয়াজ, নাম-না-জানা ফুলের গন্ধে পিছন ফিরতেই দেখে এক সবুজনয়না সুন্দরী। হাতে তার ধূমায়িত, গোলাপি রঙের গুড়গুড় চা। সোনালী চুলে অজস্র বিনুনি। মাথায় ফুলের টুপি। পাথর বসানো অদ্ভুত সব গয়নায় সুন্দরীর রূপ আরো খোলতাই হয়েছে। এক লহমায় নিকোলাসের কল্পনায় এক যাদুগরী হাতে যাদুআরক নিয়ে যেন তাকে বশ করতে এসেছে!
সম্বিত ফিরল মিহি আওয়াজে। টেবিলে চা রেখে, মাথা ঝুঁকিয়ে জুলে বলেই লজ্জায় সে পার্বতী ঝর্ণার মতই দ্রুত পায়ে চলে গেল।
হাসি পেল নিকোলাসের। এদের শব্দের ভান্ডার বড় গরীব। গুড মর্ণিং, গুড নাইট, ওয়েলকাম সবেতেই জুলে!
রাতের খাবার দিতে এসে মুশা বলল, “রাতে একটু ঠান্ডা লাগতে পারে। জানলা খুলে শোবেন না।একটা হাল্কা কম্বল দিয়ে গেলাম। কাল সকালে আমি নিজে আপনাকে গ্রাম ঘুরিয়ে দেখাব।”
খাবার সামান্যই। মাখন লাগানো যবের রুটি, সামান্য সবজি, ফাডিং বালে বা জলে সেদ্ধ করা টকমিষ্টি অ্যাপ্রিকট।
ডিনার শেষ করে নিকোলাস একটা বই একটু উল্টেপাল্টে দেখছিল। History and culture of Brokpa People. তাতে সব অদ্ভুত অদ্ভুত কথা লেখা আছে। লাদাখের এই দা হানু উপত্যকার সুন্দর মানুষগুলোর শরীরে নাকি বইছে বিশুদ্ধ আর্য রক্ত। আলেকজান্ডার ভারত বিজয় করে ফিরে যাবার সময় এ পথে তাঁর দলবলের কিছুজন রয়ে গেল। তাদের দীর্ঘ চেহারা, গোরা রং, টিকোলো নাক। অন্য লাদাখিদের থেকে আকারে বসনেভূষণে একেবারেই আলাদা। পাহাড়ি ব্রোকপারা হাসিখুশি, সরল হলেও নিজেদের নীলরক্তের শুদ্ধতা বাঁচিয়ে চলে…
ব্রোকপাদের জগত থেকে ঘুমের রাজ্যে চলে গেল নিকোলাস।
সকালে তার ঘুম ভাঙল বৌদ্ধমঠের গম্ভীর ঘন্টার শব্দে। পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সে শব্দ। লম্বা লেজঝোলা ম্যাগপাইটা শিষ দিচ্ছে কোন ভোর থেকে।
ভোররাতে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছে নিকোলাস। ঐ সবুজনয়না যবেরখেতের মাঝখানে কেশর ওলা সাদা ঘোড়ার পিঠে সওয়ার। মাথায় তার ফুলের টুপি। হাতে খাপখোলা তরোয়াল। রোদ্দুর ঠিকরে পড়ে তরোয়াল ঝলসে উঠছে। রোদের তাপে গোলাপী হয়েছে সুন্দরীর দুই গাল। খেতের মাঝেই একটু দূরে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ফিকফিক করে হাসছে নিকোলাসের বুড়ি ঠাকুমা।
ইদানিং ঠাকুমা নিকোলাসের বিয়ে দেবার জন্যে বড্ড ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। একটিই শর্ত ছিল তার। মেয়ে হতে হবে বিশুদ্ধ আর্য রক্তের। তারা নাকি বিশ্বাসঘাতিনী হয় না! নিকোলাসের কালো মা দুধের শিশুকে ফেলে পরপুরুষের সঙ্গে ঘর বেঁধেছিল। সেই অপমানে, অপবাদে নিকোলাসের বাবা একদিন প্রচুর ঘুমের ওষুধ খেয়ে…
নিকোলাস ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল। তার সামনে ধূমায়িত গোলাপি আরক হাতে সবুজনয়না যাদুগরী।
অসমাপ্ত মনে হল।
ইয়ে দিল মাঙ্গে মোর।
পাঠকদের ভালো লাগলে দ্বিতীয় পর্ব লেখা যেতে পারে ????
খুব সুন্দর..!!! “জাজিম বিছানো যবের ক্ষেত..” ????????????????????????????????