ঢাকের গুড়ুগুড়ু মাদলের দ্রিমিদ্রিমি আর সানাইয়ের পোঁ শুনে লাঠিহাতে বুড়ো, বাচ্চা কাঁখে মা, দামাল ছেলে, ঘরে ফেরা হাটুরে, ভবঘুরে সব একে একে চরকডাঙার মাঠে জড়ো হল।
শেষ চৈত্রের রুখাশুখা ঘূর্ণী হাওয়ায় এখন পাতাঝরার দীর্ঘশ্বাস।
শিমূল-পলাশের রঙবাহারি দেখনদারি কবেই শেষ হয়েছে। ক্রমশ পাহাড় তেতে উঠছে।মাটি ফাটছে।
এরই মধ্যে কালবৈশাখির ঝোড়ো বাতাস কখনো কখনো দু-এক পশলা বৃষ্টি আনে। পুরুলিয়ার তৃষ্ণার্ত লালমাটি যেমন করে বৃষ্টির শেষ জলবিন্দুটুকু শুষে নেয়, তেমনি করে পুরুলিয়ার গাঁ-গঞ্জের সাদামাটা মানুষগুলো একসময় পরব, মেলা, নাচগানের সবটুকু আনন্দ চেটেপুটে নিত। এখন মোবাইল আর টিভির কল্যাণে তাতে ভাটার টান। কিন্তু তাতে কি? নাচের নেশা যে গগন কালিন্দির রক্তে! সে নিজে আর তার দলের নাটুয়াদের কোনোরকম গাফিলতি বরদাস্ত করে না। বছরে তিনমাস পালা চলে। বাকি ন-মাস কঠোর অনুশীলন।
গগন কালিন্দি তার বড়বাবার আমল থেকে শুনে আসছে, “নাটুয়ারা আজকের লয় বাপ। মহাদেবের বিহার দিন এ লাচ করেছিল বট্যে নন্দী-ভিড়িঙ্গি আর সব স্যাঙাতরা”, একথা বলে কপালে দু-হাত ছোঁয়াতো গগনের বড়বাবা কালিরাম।
আজ চৈত্র সংক্রান্তির দিনে খাড়া আর ফরি (ঢাল)-র ঝনঝনানিতে বন্দিত হলেন স্বয়ং নটভৈরব, মাতা পার্বতী। আজই যে তাঁদের বিয়ের রাত! মিলনোৎসব।
আজ চড়কের দিনে রতন বাউড়ীর সানাইয়ের সুরে যেন বিয়েবাড়ির আনন্দলহরী। হলুদখেড়ি তালে ধামসা আর ঢাক বেজে উঠতেই রুক্ষ শুষ্ক জঙ্গলমহলের লালমাটিতে রসের সঞ্চার হল। মাথায় কলগা, কালো-চ্যাটালো বুকে সাদা রঙের আঁকিবুকি, মণিবন্ধে ঝলমলে রঙিন ফিতে পরে ঘূর্ণিনাচনে মাতল নাটুয়ার নর্তকরা। বীররস জেগে উঠল তাদের পুরুষ্টু পেশীতে।
এখন টানা তিনমাস পুরুলিয়ার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ঘুরে ঘুরে নাচ দেখাবে গগন কালিন্দির নাটুয়ার দল। পেট ভরে ক-দিন মাংসভাত খেতে পাবে আধাপেটা, অন্ত্যজ, নাটুয়া শিল্পীরা। হাতে নগদ কিছু পয়সা আসবে। ভাগ্য ভালো থাকলে দিশীর সঙ্গে এক-আধটা বিলিতি বোতলও জুটে যেতে পারে।
“ছোটুটা সবথিক্যা সোন্দর লাচে বট্যেক।” মূল নর্তক গগন কালিন্দি আজকাল ছোটুকেই এগিয়ে দেয় দলে। এনিয়ে তার বড় গর্ব আর অহংকার। তালে তালে পরপর তিনচারটে ডিগবাজি খেয়ে, কসরত করতে তার এতটুকু আটকায় না। মাথায়, কাঁধে, কোমরে, কাঁকালে আটদশটা ছেলেপিলে একসঙ্গে নিয়ে সে অনায়াসে নাচতে পারে। গগন আদর করে বলে, “ছোটু বাপ আমার, মোর বাদ ত্যুর পালি। তুই মোর আশা-ভরসা”।
ডোমেদের বাপ-মরা এই ছেলেটাকেই কোন ছোটবেলায় বুকে তুলে নিয়েছিল গগন। নিঃসন্তান মালতীর কোলে তাকে দিয়ে বলেছিল, “পাল ক্যেনে মালতী উকে আদরে সোহাগে। এই তুর ছেল্যা হবে অ্যাকদিন বট্যেক।”
একমাথা ঝাঁকড়া চুল, বড় বড় চোখ, কষ্টিপাথরের মত কালো, সুঠাম চেহারার ছোটুকে দেখে আজকাল চোখ ফেরাতে পারে না গগন।
নিজে হাতে গড়ে পিঠে মানুষ করেছে তাকে। অতি যত্ন করে ঢোলের চৈতালী, ধুমসি, হলুদখেড়ি, ছয়ালি বোলের সাথে তাকে পা মেলাতে শিখিয়েছে। মালতীও নিজে আধপেটা খেয়ে ছোটুর পাতে তুলেছে গরীবের খুদকুঁড়ো। বলেছে, “খা বাপ, তুকে বড় হত্যে হবেক লাই? না খ্যালে তু লাচবি ক্যামনে”। জোনাকজ্বলা আঁধার রাতে গগন-মালতী ঘরের দাওয়ায় বসে ছোটুকে শুনিয়েছে নাটুয়াদের ইতিহাস। “কোন বাপ পিতাম্মোর কাল থিক্যা এ লাচ মোদের রক্তে রে ছোটু! ছৌ লাচের বাপ যে বট্যেক নাটুয়া। ছাড়বক নাই, ছাড়বক নাই মুদের ধান, মুদের মান …এ কথাটো কুনোদিন ভ্যুলবিক নাই ছোটু”।
বাধ্য শিষ্যের মত খুব তাড়াতাড়ি ছোটু শিখে নিয়েছে নাচের সব ছন্দ, কলাকৌশল। তার চওড়া কাঁধে সে আজকাল হাল, জোয়াল, মই গোরুরগাড়ির চাকা নিয়ে স্বচ্ছন্দে নাচতে পারে।
তবে ছোটুর আজকাল কেমন জানি একটু উড়ুউড়ু আনমনা ভাব। দলের কারোর সঙ্গে সে বিশেষ কথা কয় না। “ক্যানে?” গগনের যেন কেমনপারা লাগে! সে ভাবে, বয়সের ধম্মো। জোয়ান ব্যাটা তার। তাই মন উদাস হইছে। শরীরমনের সঙ্গী চাই। অখন বিয়া দিত্যে হইব্যেক ছেল্যাটার”।
চড়কডাঙার মাঠের মেলায় নাচের গোটা দলের মধ্যে থেকে দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে ছোটু। বাপের কাছে শেখা নিত্যনতুন কসরত দেখিয়ে হাততালি কুড়িয়েছে। টিভি থিক্যাও লোক আইছিল। পটাপট ফোটু খিচিংল তারা। কথা বলতে চায় তারা গগনের সঙ্গে। গগন ছোটুকে এগিয়ে দিল, “তু কথা বল ক্যানে”। গর্বে-আনন্দে ইস্কুলবাড়ির খড়ের বিছানায় নিশ্চিন্তে ঘুমোল সে রাতে গগন। আর তার চিন্তা নেই। ছোটু তার দলের হাল ধরবে। ছ’-সাতশো বছরের পুরনো নাচের ধারা নাটুয়া। সে নাচ রয়ে যাবে নতুন প্রজন্মের হাত ধরে। সুখস্বপ্নে বিভোর হল গগন।
মদের খোয়াড়ে সকালবেলা তাদের সকলের ঘুম ভাঙলো একটু দেরিতে। গগন তখনও শুয়ে। আনন্দে কাল তরল পানীয় একটু বেশিই পেটে গেছে কিনা!
হঠাৎ ছেলেদের চেঁচামেঁচিতে সে ধরমড়িয়ে উঠে বসল। কি হল, কি হল? সকাল থেকে ছোটু নাকি নিখোঁজ। ইস্কুলবাড়িতে নাই। মাঠে প্রাতঃকৃত্য করতেও দেখা যায় নি। চড়কডাঙার ভাঙা মেলায় নাই। গগন পাগলপারা হয়ে দৌড়ে বেড়ায়। খুঁজে বেড়ায় ছেলেকে এদিক ওদিক। “কুথা প্যলাইলি বাপ মোর? কুনখানে? মুকে না ব্যলি কুথা গ্যলি? ফিরে আয় ক্যেনে….”
ছেলের অদর্শনে বুক চাপড়াতে থাকে গগন। অনেক আশা নিয়ে সে যে পরের ছেলেকে গড়েপিঠে মানুষ করেছিল। সেই যে তাদের নাটুয়া নাচকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। দরিদ্র, নিরক্ষর নৃত্যশিল্পী নাচ নিয়েই যে বেঁচে আছে! এছাড়া আর তো কোনো কামকাজ সে কিছুই জানে না।
গগন কালিন্দি ছুটে যায় থানায়। রিপোর্ট লেখায়। দারোগাবাবুর হাতেপায়ে ধরে। দলের লোকও খুঁজতে থাকে এদিক সেদিক। কোথায় ছোটু! চৈত্রের উদাসী রুক্ষ হাওয়ায় মিশে যায় গগনের বুকফাটা কান্না। পাহাড়ের কঠিন পাথরে প্রতিধ্বনিত হয়ে তা ফিরে আসে।
আর নাচে মন নেই তার। নিখোঁজ ছেলের শোকে শরীর-মন দুইই গেছে। দল ভেঙেছে। নেচেগেয়ে সামান্য রোজগারের পথও বন্ধ হয়েছে। মালতী তাই রায়বাবুদের বাড়িতে ঠিকে ঝিয়ের কাজ ধরেছে। কোনরকমে দিন চলে যায় তাদের।
ছোটু যেন ভোজবাজির মত মিলিয়ে গেল এ পৃত্থিম্মী থিক্যে। বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই আস্তে আস্তে মরে যাচ্ছে গগনের। এ অন্ধকার দিনগুলো গুণতে গুণতে একদিন হঠাৎ শীতের সকালে রোদ ঝলমলিয়ে ওঠে গগনের ভাঙা কুঁড়েঘরে। মালতী রায়বাবুদের বাড়িতে খবর পেয়েছে ছোটু নাকি আজ টিভিতে নাচ দেখাবে। সে ছুটতে ছুটতে, হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বলে, “শুনছ ক্যানে ছোটুর বাপ। মুদের ছোটু আজ টিভিতে লাচবে গো। তুমি দিখব্যা নাই?”
“মুদের ছোটু? টিভিতে লাচবে? টিভিতে পৌঁছে গেল ক্যামনে? এত্ত বড় হইছে ছোটু? এত্তদিন তার কোনো খবর লাই গ্য? সিধা টিভিতে! দিখব দিখব, জরুর দিখব ছোটুর মা।” বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে পড়ে গগন। ছেলে বেঁচে আছে তার! টিভিতে নাচছে!” “কত্ত বড় কুথা গ্য”, আশায় বুক বাঁধে গগন নাটুয়া। সন্ধ্যের বাতি জ্বলতে না জ্বলতেই হাজির হয় রায়বাবুদের বসার ঘরে। টিভির সামনে।
রিয়ালিটি শোয়ের নাচের আসরে, হাজার হাজার লোকের সামনে, কৃত্রিম আলোয় ঝলমল করছে তার ছোটু।
কিন্তু এ কি! নাচের শুরুতে কোথায় গেল সেই বন্দনা গান, —
“ও যে আদিমাতা স্থিতিধরা বসুমতী
আর মাটি হতে যেন সবের উৎপত্তি
অগতির গতি সর্বজীবের গতি
ভোলার ভোলা মহেশ্বরী মা
নমামি শঙ্করী।”
এই তো আদিসৃষ্টির সারকথা। পুরুষ আর প্রকৃতির মিলনের গান। এ গান ভুলে কেমন করে নাটুয়া শুরু করল ছোটু?
পরনে মালকোঁচা মারা হেঁটোধুতি কোথায়? তার বদলে ঝলমলে টাইট প্যান্ট! ঊর্ধাঙ্গ অনাবৃত হলেও তাতে নেই ছাইয়ের অলকাতিলকা।
গগনের শেখানো নাচের কায়দায় ডিগবাজি খাচ্ছে বটে ছোটু। কসরত করছে। বিশাল স্টেজের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত ছুটে বেড়াচ্ছে। আগুন নিয়ে খেলা করছে।
দর্শকরা হাততালিতে ফেটে পড়ছে । বিচারকরা ছোটুর নৃত্যধারায় উল্লসিত। কোঁদা পাথরের মত শরীরের সিক্সপ্যাকের প্রশংসায় মুখর।
কিন্তু এ কোন বিলেতি বাজনায় নাচছে ছোটু! কান ঝালাপালা করা বাজনায নেই সানাইয়ের মিঠে সুর। না বাজছে ঢোল আর ধামসার মেঠো তাল। এ কোন নাচ? এখানে পুরুল্যা নেই। রুখামাটির ডাক নেই। শিমুল-পলাশের রঙ নেই। মহুয়ার মাতালপানা গন্ধ নেই। জীবনের কোনো গল্প নেই। নাটুয়াই নেই এ নাচে। সমস্ত কিছুই যেন হারিয়ে গেছে। ছোটু যেমন হারিয়েছে গগনের জীবন থেকে!
গগনের কমজোরী নজর এসব আর সইতে পারে না। সে চোখ বন্ধ করে বসে থাকে কিছুক্ষণ। তাঁর মাথা টলমল করে। চোখে জল। বুকের মধ্যে সাঁই সাঁই শব্দ। সে টলতে টলতে বাড়ির পথ ধরে। তখন শীতের কুয়াশা বিষণ্ণতার চাদর বিছিয়ে ঢেকে দিয়েছে চাঁদ, পথঘাট, সমস্ত বনভূমি। কাছেদূরে কিছুই ঠাওর করা যায় না। রাতের নিস্তব্ধতায় বোবা কান্না গুমরে উঠছে।
সেই মেঠোপথের নিকষ অন্ধকারে একলা হাতড়ে যেতে যেতে গগন নাটুয়া পাগলের মত চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো, “এ তু কি করলি রে ছোটু বাপ আমার! সব ডুবায়ে দিলি! সব ভাসায়ে দিলি! আমার প্রাণ, মান সব গ্যালো গ্য। সব গ্যালো। সব গ্যালো….”।
আসাধারণ….!!!!! গল্পটা এতটাই অসাধারন মানসপটে ভেসে এলো আর এক বিজিত নায়ক। গগনের বুক ফাঁটা কান্না আর পুরুলিয়ার প্রকৃতির অনবদ্য বর্ণনা মনে করালো বিভূতিভূষনকে…আর সেই গরীব হৃতসর্বস্ব অনার্য রাজা “দবরু পান্না”-কে…!!
ধন্যবাদ জয়া। তোমার এত সুন্দর পাঠপ্রতিক্রিয়া আমাকে আপ্লুত করল।