শুনো যাদবাইন:—
“কাহে করেলু গুমান গোরী শাওনমেঁ
কাহে করেলু গুমান গোরী শাওনমেঁ
ছায়ী ঘটা ঘনঘোর, বিজলী চমকে চহু ঔর
পড়ে বুন্দন হো,পড়ে বুন্দন ফুহার শাওন মেঁ
অবহী আইহে শাঁওরিয়া, বংশী ধরহি অধরওয়া,
টুট জাইহে তোহরা মান গোরী শাওনমেঁ
টুট জাইহে তোহরা মান গোরী শাওনমেঁ
কাহে করেলু গুমান গোরী শাওনমেঁ …”
কাজরীর তালে তালে সুমন, জ্যোতি, মীরা, সুগন্ধি, সঙ্গীতাদের সবুজ কাঁচের চুড়ি রিনিঝিনি বাজছিল। তাদের মাথার টিকলি, কানের ঝুমকো দুলে দুলে উঠল। দ্রিমি দ্রিমি ঢোলকের বোল বাজল ভারতী সিংয়ের বলিষ্ঠ দুটি হাতে। মধুবন ক্লাবের ‘শাওন উৎসবে’ কাজরী গাইয়েদের জমকালো শাড়িপরা শরীরে তখন গানের মাদকতা। কাজল নয়নে অন্তরঙ্গ হবার ইশারা। লিপস্টিকরঞ্জিত ঠোঁটে মোহিনী হাসি।
দর্শকাসনেও কেউ কেউ গানের তালে তাল দিচ্ছে। কে একজন যেন সিটি বাজাল। অত্যুৎসাহী দু-একজন কোমর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নাচতে শুরু করে দিল।
গানের ভাব সবাইকে একভাবে ছুঁয়ে যায় না। একই গানে কেউ উচ্ছল হয়। কারোর চোখের জল বাঁধ মানে না। যাদবাঈনকে উদ্দেশ্য করা এই মান ভাঙানোর গানে আরেক যাদবিনী সুনীতার দুঃখ উথলে উঠল। মন্দিরার মনে পড়ল রবিঠাকুরকে, “সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে…”।
সুনীতার পাশে বসে তার হাতটা ধরে মন্দিরা বলল, “রো মৎ ভাবিজী। অর কিতনা রোওগে তুম”।
মন্দিরার সমবেদনায়, স্পর্শে র্ফুঁপিয়ে উঠলো সুনীতা। তার যে পিয়া গ্যয়ে পরদেশ! অব শাওন বীতা যায়, অওর মন ভি ঘাবড়ায়।
আকাশে মনকেমনের কালোমেঘ দেখা দিলে মির্জাপুর-বারাণসীর গাঁও কি গোরীরা একসময় কাজরী গাইত। ভালোবাসার মানুষের অদর্শনে যে বেদনা বৃষ্টি হয়ে বুকের মধ্যে ঝ’রে পড়ে, তাই গান হয়ে ওঠে। তাই কাজরী মূলতঃ বিরহব্যথার সঙ্গীত। রাধাকৃষ্ণের মিলন-বিরহ, মান-অভিমানের পালাগান। বর্ষার ভিজেমাটির গন্ধমাখা দেহাতী ভাষায়। মিঠে সুরে।
কাজরীর এই ভাব, সুর আর সহজিয়া কথার মায়ায় ভুলেছেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পীরাও। তাই এ গান কখনো কখনো জাতে উঠেছে। আবার অযোগ্যের হাতে পড়ে চটুল-শরীরী আবেদনে হারিয়েছে তার সহজসরল মাধুর্য।
সুনীতার মনে পড়ছে, তার মাঈ বিমলা কুমারী ভোজপুরীতে বড় সুরেলা কাজরী গাইত। মায়ের কোল ঘেঁসে বসে ছোট্ট সোনু জানলা দিয়ে বৃষ্টি দেখত আর কাজরী শুনত, “অরে রামা রিমঝিম বরষে পনিয়া/ঝুমে হরি রাধারানিয়া”। কখনো কখনো আদর করে , রাধারানীর বদলে বলত ‘সোনুরানিয়া’।
হরিয়ালী তীজে গুজিয়া বানাতে বানাতে বিমলা গুনগুন করত, “তুমকো আনে মে, তুমকো বুলানে মে কোই বরষ বীত গ্যয়ে সজনা”।
আজকের গানে প্রিয়বিরহকে ছাপিয়ে উঠেছে মানিনীর মান। বৃষ্টি ভেজা আঁধাররাতে সেই বাঁশুরিয়া এসে মানিনীর মানভঞ্জন করবে। রূপসীর রূপের অহংকার ধুয়ে যাবে ভালোবাসার স্রোতে। আত্মনিবেদনের অশ্রুজলে।
গানের কথার তাল মেলাতে প্রকৃতিও যেন সেজে উঠেছে বর্ষার বেশে। কালো মেঘের ছায়ায় বাইরে ঘনঘোর অন্ধকার। সিদ্ধিবাবা পাহাড়চূড়ায় শিবঠাকুর ভিজছেন। হাঁসদেও নদী পাহাড় থেকে দুর্দান্ত গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে জলপ্রপাত হয়ে। তার পোশাকি নাম অমৃতধারা।
সিরোহির হনুমান মন্দিরের দরজায় পায়েরপাতা ডোবানো জল।
মধ্যপ্রদেশ-ছত্তীশগঢ় সীমানার হাঁসদেও কোলিয়ারির ছোটো ছোটো কয়লাখনিতে জল ভর্তি। অবিরাম বৃষ্টিতে বড় গাছ ভেঙে পড়েছে। ইঞ্জিনিয়ারদের কাজে যুদ্ধক্ষেত্রের ব্যস্ততা এসময়। গামবুট আর রেনকোট পরে দিনরাতের মেহনত। পাম্পগুলো কাজ করতে করতে প্রায়ই দেহ রাখছে। ম্যাডামজীরা আর বাড়িতে একলা বসে কি করে! তাই প্রতি বছর এই ঘ্যানঘেনে বৃষ্টির একঘেয়ে দিন কাটাতে কোলিয়ারির শ্রাবণ উৎসব!
শাওন ফাংশান প্রায় শেষ হতে চলল। মন্দিরা তাড়া দিল সুনীতাকে। “চলো ভাবী, এবার খেয়ে নিই। অনুষ্ঠান শেষ হবার পর বড্ড হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। জি.এম ভাবি তো বলেইছেন যার যখন ইচ্ছে তখন সে এসে লাঞ্চ নিয়ে নেবে।”
“তু যা। মেরা মন নহী হ্যায়”।
“কিছু একটু মুখে দেবে চলো ভাবী। তোমার মনপসন্দ সত্যু ভরকে কচৌরী অর রাবড়ি-অমৃতি ভি বনা হ্যায়”। মন্দিরা সাধতে লাগল সুনীতাকে। এটা নতুন নয়। তাদের বন্ধুত্ব গাঢ় হবার পর থেকে এমন অনেকবার সুনীতাকে সাধতে হয়েছে মন্দিরার।
সে নিজে হাসিখুশি, মিশুকে মেয়ে। বেশিক্ষণ কারোর ওপর রাগ করে থাকতেই পারে না। চারবছর আগে যখন এই রাজনগর কলোনীতে থাকতে এল, তখন প্রায় নিজে যেচেই সবার সঙ্গে আলাপ করেছে।
তাদের এই কলোনীর প্রায় প্রত্যেকের বাংলো বিশাল বিশাল। মোটা দেওয়াল। উঁচু সীলিং। বাংলোর বাগানে শাল, মহুয়া, হর্তুকীর বড় বড় গাছ। একমাত্র মেয়েকে হোস্টেলে পাঠিয়ে মন্দিরার প্রাণ এই নতুন জায়গায় এসে বড় কাঁদত। বরকে কপট রাগ দেখিয়ে বলত, “এ কোথায় নিয়ে ফেললে আমায়? তুমি ডিউটি চলে যাবার পর এ বাড়িতে আমাকে কেউ মেরে ফেলে রাখলেও তুমি টেরটি পাবে না”।
বাগানের একদিকে একটু ফাঁকা জমি ছিল, সেখানেই আগাছা পরিষ্কার করাল মন্দিরা। তারপর নিজের মনের মত ফুলগাছ লাগাতে শুরু করল। বাগান নিয়েই মেতে থাকত সারাদিন। প্রাণের তাগিদে মিশতেও শুরু করল প্রতিবেশীদের সঙ্গে।
মন্দিরার বাংলোর উল্টো দিকের বাড়ির দেয়ালের নামের ফলকে লেখা আছে এম.এস. যাদব, মাইনিং। বাংলোর গেটে মাঝে মাঝে এসে দাঁড়ায় মিসেস যাদব। বেশ লম্বা। টকটকে গায়ের রঙ। চোখ-নাক-মুখে যেন গ্রীক পুরাণের দেবীর সৌন্দর্য। ওকে প্রথম দেখার পর মন্দিরা নিজেকে একটু মেপে নিয়েছিল ওর পাশে পুতুল মনে হয়েছিল ছোটখাটো মন্দিরার।
কলোনীর কারোর সঙ্গে মিসেস যাদবের বিশেষ বন্ধুত্ব আছে বলে মনে হত না। একদিন তাদের চোখাচোখি হল। তারপর হাসি বিনিময়। দ্বিতীয় দিনেই মন্দিরা মিসেস যাদবকে বাড়িতে ডাকল, “আইয়ে না ভাবী। এক সাথ চায়ে পীতে হ্যায়”।
মিসেস যাদব নিরাশ করেনি মন্দিরাকে। মন্দিরা ওর জন্যে বেশি করে দুধ চিনি দিয়ে কড়া চা বানাল। সঙ্গে নিজের হাতে করা কেক আর নিমকি। মন্দিরা নিজে অবশ্য পাতলা লিকারের, কম মিষ্টি দেওয়া দার্জিলিং চা পছন্দ করে।
অতিথি কেক খেল না। সে নিরামিষাশী। তবে স্বামী মাছ মাংস ভালোবাসে। পানীয়র সঙ্গে পানাহারে তার এসব চাইই। সুনীতার পরিবারে এসব খাওয়ার চল না থাকলেও স্বামীর জন্যে সে বানিয়ে দেয়।
সুনীতা মন্দিরার চা আর পাতলা মুচমুচে নিমকির খুব প্রশংসা করল। চায়ে চুমুক দেবার আওয়াজেই সে তৃপ্তি বোঝা গেল। মন্দিরার লিকার চা নিয়ে আগ্রহ দেখিয়ে প্রশ্ন করল, “আচ্ছা, আপ কালী চায়ে পীতে হো?”
মন্দিরাও খুঁটিয়ে দেখছিল তার পড়োশিনীকে। কথায় তার দেহাতি টান আছে। সম্ভবতঃ ভোজপুরি। সাজপোশাক কলোনির অন্যান্য ম্যাডামজীদের সঙ্গে বিশেষ খাপ খায় না। পরনে সামনে আঁচল করা রঙচঙে ফুলছাপ শাড়ি। হাতভর্তি কাঁচের চুড়ি। সিঁথেয় চওড়া করে মেটে সিঁদুর। কপালে চুমকি-পাথর বসানো বিন্দি। বাঁশির মত টিকোলো নাকে একটি ছোট্ট হিরের নাকছাবি, “কে কার অলঙ্কারে”র মত শোভা দিচ্ছে।
বন্ধুত্ব গাঢ় হতে লাগল তাদের। যাদবাঈনের পছন্দের ঘনদুধের ওপর জমে থাকা মালাইয়ের মত। গোপ-যাদবদের মেয়ে সুনীতা কথায় দুধ-দই-ঘিউয়ের উপমা দেয়!
ছোটবেলাটা বড় আনন্দে কেটেছিল তার। গঙ্গাকিনারে তাদের সবুজ সুন্দর গাঁও। গোয়ালে শ্যামলী, ধাবলী, পাটলী গাই-বাছুর। মা বাবা ছাড়াও বাড়িতে গোসেবা করার জন্যে কত নোকরচাকর! মাঈ-বাবুজীর লাডলী ছিল সে। তারা আদর করে ডাকত, “এ সোনুউউউ। সোনপরী। সোনচিড়ইয়া”।
মন্দিরার শৈশব একেবারেই অন্যরকম। বাবার বদলীর চাকরী। তাই ছোটবেলা থেকেই শান্তিনিকেতনের আশ্রমে তার বড় হয়ে ওঠা। কলেজ জীবনও সেখানেই। বিশ্বভারতীতে। তার খাওয়া-পরা, ঘর সাজানো, বাগান করা সবেতেই শান্তিনিকেতনের সুচারু ছাপ। সুনীতা এমনটি কখনো দেখেনি। মন্দিরার সবটাই তার ভালো লাগে।
মন্দিরা কোলকাত্তা গেলে সুনীতা ভাবীর জন্যে কটন শাড়ি আনে। শীতকালে আসে নতুন গুড়ের সন্দেশ আর পাটালি। মন্দিরার হাতের পায়েস সুনীতা আর যাদব সাহেবের খুব পছন্দ।
সুনীতা মঠরি, ঘি, আচার বানালে মন্দিরার তাতে ভাগ থাকবেই। সুনীতা মন্দিরাকে সত্তু ভরকে পরাঠা, লিট্টি বানাতে শিখিয়েছে। মন্দিরার কাছে সুনীতা শিখেছে নারকেলের চন্দ্রপুলি, পাটিসাপটা বানাতে। থোড়, মোচা, শুকতো খেতে।
মন্দিরার ব্যালকনীর দোলনায় বসে চলে দুই সখির সুখদুঃখের সাতকাহন। সুনীতা বলে, “সেই কোন পুতুল খেলার বয়সে বিয়ে হয়েছিল আমার। এখন তা আর মনেই পড়েনা প্রায়। শুধু মনে পড়ে সারারাত ধরে বিয়ে হতে হতে আমি ঘুমে ঢলে পড়লাম। জানিস মন্দিরা, তোদের ভাইসাব আর আমি এক বয়সি। বিয়ে হবার পর অনেকদিন আমি মায়কেই তো ছিলাম। কুমারী মেয়ের মতই।”
মন্দিরা নড়েচড়ে বসে। এমন কথা তো সে গল্প উপন্যাসেই পড়েছে।”তারপর ভাবী কি হল?”
“বড় হবার পর গওনা হল আমার। ঢের সারা সামান নিয়ে পীহর থেকে শ্বশুরাল এলাম।”
“তখন তোমার বয়স কত ভাবী?” মন্দিরার কৌতুহলের আর শেষ নেই।
“কত আর? তেরো/চোদ্দ হবে! যাদব সাহাব তখনও তো ইস্কুলেই পড়ত। আমি,ও, আমার ছোট ছোট দেওররা একসঙ্গে গুলি ডান্ডা খেলেছি। লাট্টু ঘুরিয়েছি। পতঙ্গ উড়িয়েছি। কিন্তু সবটাই বড়দের চোখের আড়ালে”, হাসতে হাসতে সুনীতা বলে।
“বাবা, এতো বাল্যবিবাহ! পুলিশ কেস হয় নি?”
“না রে মন্দিরা। গাঁও ঘরে এখনো এমনি কত হচ্ছে! আমার বাবুজী আর শ্বশুরজী যাদব সমাজের মাথা ছিল। তাদের ওপরে কে কথা বলবে! পুলিশের সঙ্গেও খুব খাতির।”
“আর তোমার পড়াশোনা, ইস্কুল?”
“সে তো কোনকালে, শাদীর আগেই বন্ধ হয়ে গেছিল। এক আধদিন কামকাজ থেকে ফুরসৎ হত। শাশুমা ডেকে বলত, দুলহিন আজ থোড়া চৌপাই শুনা দে। ব্যস, এটুকুই”, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল সুনীতা।
“তুই বা এত পড়ালিখা করে কোন সা জজ ম্যাজিস্টর হয়েছিস? সেই তো চুলাচৌখা”।
মন্দিরা হাসে, তর্কে যায় না। সে তার স্বামীর ভালোবাসায় সীমাস্বর্গের ইন্দ্রানী হয়ে আছে। তার বিশেষ নিজের জীবন নিয়ে আক্ষেপ নেই।
সময় বয়ে চলে তার নিজের মত করে। কোলিয়ারি কলোনির নিস্তরঙ্গ জীবনে মুঠোফোন, ইন্টারনেটের প্রভাব পড়েনি, এমনটা বললে ভুল হবে। তবে সুনীতা শুধু তার ছোটো ফোনে সবুজ বোতাম টিপে ব্যাঙ্গালোরে থাকা ছেলের সঙ্গে কথা বলতে পারে। ছেলেও নাকি বড় ব্যস্ত। তার কথা বলার সময় নেই।
মন্দিরা এর মধ্যে জোর করে সুনীতাকে লেডিজ ক্লাবের মেম্বার করিয়েছে। পাশে বসিয়ে হাউজি খেলায়। ইংরিজী সংখ্যা চিনতে শিখে গেছে যাদবাঈন। মন্দিরা তার ফোনে ভাবীকে মজার ভিডিও দেখায়। দুজনে ইয়ারফোন ভাগাভাগি করে কানে গুঁজে পুরনো হিন্দি সিনেমার গান শোনে। একসঙ্গে দুজনে মনীন্দ্রগঢ় বাজারে যায়। মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার এম.এস. যাদব কখনো সিমলা, কখনো বা গোয়া বেড়াতে যান ইয়ারদোস্তের সঙ্গে। যাদবিনী স্বামীর জন্যে করা তীজব্রত, করওয়া চৌথ সব বিফলে যায়!
মন্দিরা অভিযোগ করে, “ভাবী, ভাইসাব একলা বেড়াতে যায়, তোমায় কেন নেয় না?”
সুনীতার মুখে অভিমানের কালো ছায়া। “ও নিজের বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যায়। আমি সেখানে কি করে যাব? তুই তো আছিস আমার জন্যে।”
“তাও তুমি কিছু বলবে না?”
“কি বলব? ধানবাদে কলেজে পড়ার সময় থেকেই ওর ঘর আর ঘরওয়ালীর প্রতি কোনো টান নেই। ছেলের পড়াশোনার জন্যেই না আমরা একসঙ্গে থাকতে শুরু করলাম। নাহলে তো সেই গাঁয়ে গোরুবাছুর, গোবরঘুঁটে নিয়েই আমার দিন কাটত!”
গল্প করতে করতে বিকেলের আলো ফুরিয়ে আসে। আকাশের ঈশান কোণে আষাঢ়ের কালো মেঘ জমে। মন্দিরার বরের নাকি ট্রান্সফার এসেছে। সে কথা ভাবীকে সে জানাতে পারে না।
শ্রাবণমাস পড়তেই ফা়ংশানে ব্যস্ত হয়ে পড়ে মন্দিরা। এবারে সে ভানুসিংহের পদাবলী করাচ্ছে। নিজে আছে রাধার চরিত্রে। তার নাচ, অভিনয়ের সবাই খুব প্রশংসা হচ্ছে। “হে সখি হামার দুখের নহি ওর রে”…. সুনীতাভাবীর মনোকষ্ট সে সবটা উপলব্ধি করতে পারে। নিজের প্রাণমন দিয়ে তাই সে ফুটিয়ে তোলে রাধিকার শরীরবিভঙ্গে, বেদনায়।
সুনীতার বেদনার বুঝি সত্যিই শেষ বলে কিছু নেই। রুক্মিণী বলে একটি মেয়ের সঙ্গে যাদব সাহেবের ঘনিষ্ঠতার কথা এই ছোট কলোনীতে জানতে কারো বাকি নেই। সে অল্পদিন হল জয়েন করেছে প্রোজেক্টে। ইঞ্জিনিয়ার মেয়েটি সুন্দরী তো বটেই, যথেষ্ট স্মার্ট আর সপ্রতিভ।
বৃষ্টিরও বিরাম নেই এবারের শ্রাবণে। শিফটিংয়ে আর দেরী করা যাবেনা মন্দিরাদের। ভাদ্রমাস পড়ে যাবে। অনুষ্ঠান মিটে যাবার পর অঝোরঝরা এক শ্রাবণদিনে ট্রাক এসে দাঁড়িয়েছে মন্দিরাদের গেটের সামনে। সুনীতা জানলা দিয়ে জিনিসপত্র বাঁধাছাঁদা দেখছে।তার উদাসদৃষ্টি, শূন্যমন সমস্ত ভাবনার সীমা পার করেছে। এক এক করে ছিঁড়ে যাচ্ছে সম্পর্কের সব তার। হাহাকার ছাড়া যাদবিনীর হৃদয়ে যে আর কোনো রাগই বাজে না!
প্রায় একমাস হল এম.এস. যাদব ওরফে মধুসূদন যাদব দলবল নিয়ে আমেরিকায় ট্রেনিংয়ে গেছে। সঙ্গে রুক্মিণী।
বিষাদ-বিধুর ধ্রুপদী কাজরী গানের অন্তর্লীন কান্না ই যেন কানের দরজায় করাঘাত করেই গেল .. করেই গেল ..
কি অপূর্ব লেখাটা!!!
কাজরীর বেদনাবিধুর রাগিণী যে গায়িকাকে ছুঁয়ে গেল,এও কি কম পাওয়া?