“ঐতিহাসিক চন্দন মিত্রের এই আকস্মিক মৃত্যুকে আমরা কিছুতেই স্বীকার করে নিতে পারছিনা। তাঁর এই অকালপ্রয়াণে আমরা মর্মাহত। প্রাচীন গ্রীসের ইতিহাসনিবদ্ধ তাঁর গবেষণা এবং নিবিড় বিশ্লেষণ আমাদের প্রতিনিয়ত ঋদ্ধ করত। এক নতুন দিগন্ত যেন উদ্ভাসিত হচ্ছিল পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার ইতিহাসে। আমরা অতীতের আলোয় দেখছিলাম বর্তমানকে। তাঁর এই ধারাবাহিক কার্যপ্রক্রিয়াকে আমরা কিছুতেই রুদ্ধ হতে দিতে পারি না। তাই এই কার্যভার তুলে দিলাম অধ্যাপক মিত্রের সুযোগ্যা শিষ্যা এবং প্রিয়তমা পত্নী শ্রীমতী অর্পিতার হাতে।” এই কথা বলে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষ করলেন প্রিনস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে চন্দন মিত্রের সতীর্থ মিস্টার কার্লে।
এরপরে নীরবতা পালন। অভিজাত পাঁচতারা হোটেলের শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ব্যাঙ্কোয়েট হলে যেন শোকের শীতলহর। দেশবিদেশের জ্ঞানীগুণী মানুষরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন অত্যন্ত মৃদুস্বরে। সবারই কণ্ঠে আক্ষেপের সুর। এত তাড়াতাড়ি ড. মিত্রকে যেতে হল কেন? আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অধ্যাপক-গবেষক চন্দন মিত্রের স্ত্রী অর্পিতা বসে আছেন একদম সামনের সারিতে। সমস্ত অনুষ্ঠানের আয়োজন প্রায় তিনি একা হাতে করেছেন। শোকগ্রস্ত হলেও তিনি বিহ্বল নন। কঠিন উপাসনার ব্রতে উৎসর্গীকৃত এক প্রাণ। যেন এক তপস্বিনী তিনি!
স্বামী চন্দন সবসময় তাঁর আদরের অপুকে সাদাশাড়িতে দেখতে ভালো বাসতেন। আজও অর্পিতার পরণে গতবছরের পুজোয় চন্দনের কিনে দেওয়া সাদা মালঞ্চ জামদানি। কোনরকমে জড়ানো এলোচুলের হাতখোঁপা যেন যেকোনো মুহূর্তে তার বন্ধন খুলে সমুদ্রের ঢেউয়ের মত আছড়ে পড়বে অর্পিতার পিঠময়। শোক এক অন্যরকম পবিত্রতা দিয়েছে অর্পিতার শরীরকে।
চন্দন চলে যাবার পর অর্পিতা ক’দিন নিজের পরিবারের সঙ্গে থাকতে চেয়েছিলেন। নিউ জার্সি থেকে তাই কোলকাতায় উড়ে আসা। কোলকাতায় চন্দনের শোকসভা করা নিয়ে অর্পিতার সংশয় ছিল। বিদেশী অতিথিরা আসতে চাইবেন তো? কিন্তু কি আশ্চর্য! প্রায় কেউ তাঁকে নিরাশ করেন নি। চন্দনের সতীর্থরা প্রায় সবাই সাগ্রহে যোগ দিয়েছেন এই গুণী, বন্ধুবৎসল মানুষটিকে শ্রদ্ধা জানাতে।
অর্পিতা চান চন্দনের কাজের ধারাটি যেন থেমে না থাকে। তাঁর গবেষণার কথা যেন ছড়িয়ে পড়ে দিকে দিকে। সেজন্যেই এই শোকসভার আয়োজন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়, জার্ণালে চন্দন মিত্রের প্রবন্ধ নিয়মিত প্রকাশিত হত। গবেষণার কাজে ব্যস্ত থাকায় চন্দন ছাত্রদের ততটা সময় দিতে পারতেন না। কিন্তু ইউনিভার্সিটির পরিচালনমন্ডলী কখনোই তার প্রতি বিরূপ হয় নি। বরং উৎসাহ দেখিয়েছে। অর্পিতাও ছায়াসঙ্গী হয়ে থেকেছে চন্দনের। তারই মধ্যে সামলেছে সংসার, কলেজের পড়ানো।
চন্দন বারবার বলত, “সময় বড় অল্প অপু, কাজের পরিধি বিশাল! আমাদের সময় নষ্ট করা চলবে না”। অর্পিতা মৃদু হেসে ঘাড় হেলিয়েছে শুধু। কখনো নীরবে কাজ করে গেছে স্বামীর পাশে থেকে।
চন্দনের গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল সার্কোফেগাস বা পাথরের অলঙ্কৃত কফিন। গ্রীকভাষায় এই শব্দটির অর্থ মাংসখাদক তোরঙ্গ। চুনাপাথরে তৈরি অপূর্ব সুষমামন্ডিত এই শবাধারগুলি প্রাচীন রোম, গ্রিস এবং মিশরে ব্যবহার করা হত। চন্দন উল্লসিত হয়ে বলত, “দেখো, দেখো অপু মৃত্যুকেও যে কত শোভন-সুন্দর রূপ দেওয়া যায়, তা এই মানুষগুলো জানত। কি অপরূপ, সূক্ষ্ম এর কারুকার্য! আর কতটা বিজ্ঞানমনস্ক ছিল এরা! প্রতিটি পাথরের গুণাগুণ জেনে পরখ করত। এই কফিন গুলি এক বিশেষ ধরনের চুনাপাথরে তৈরি। এর রাসায়নিক উপাদান খুব তাড়াতাড়ি মানুষের শবকে বিনষ্ট করতে পারে।”
কাজপাগল এই মানুষটি সার্কোফেগাসের সন্ধানে ঘুরে বেড়াতেন এক ম্যুজিয়াম থেকে আরেক ম্যুজিয়াম। ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতেন পুরনো কবরখানায়। রাতজেগে লিখতেন তাঁর অভিজ্ঞতার কথা। উত্তেজিত হয়ে সেসব কথা শোনাতেন প্রথমে তাঁর স্ত্রীকে তারপর ছাত্রদের। মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনত সবাই ডা. চন্দন মিত্রের কথা।
জানো অপু, “এই সার্কোফেগাস থেকেই সার্কোফাগি কথাটা এল। সার্কোফাগি এক অদ্ভুত সুন্দর অলঙ্করণের নাম হয়ে গেল। যা খোদিত হত পাথরের কফিনে। বিখ্যাত মানুষদের জীবন, তার কর্মকান্ড পাথরের গায়ে ফুটিয়ে তুলতেন শিল্পীরা। এই কফিনের খোঁজ করতে করতে কত ইতিহাস যে স্পষ্ট হয়ে উঠছে তা আমি বলে বোঝাতে পারব না তোমায়”, চোখ জ্বলজ্বল করে উঠত চন্দনের। চিরচেনা মানুষটাকে যেন চিনে উঠতে পারত না অর্পিতা।
সার্কোফাগাসের খোঁজ চন্দন পেয়েছিলেন তামিলনাড়ুর এক অখ্যাত গ্রামেও। নিউ জার্সি থেকে প্রায় তড়িঘড়ি অপুকে নিয়ে দৌড়ে এসেছিলেন সেখানে। প্রায় দু-হাজার বছরের পুরনো এক অলঙ্কৃত কফিন মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেছে সেখানে। সেটি দেখতে পেয়ে চন্দনের ছেলেমানুষের মত সে কি উল্লাস!
নাওয়া খাওয়া ভুলে এই মানুষটা মৃত্যু উপত্যকায় ঘুরতে ঘুরতে কি নিজের মৃত্যুকে কি এত তাড়াতাড়ি আলিঙ্গন করে নিল? এর কারণ খুঁজে পায়নি অর্পিতা। ডাক্তাররাও সদুত্তর দিতে পারেন নি। প্রথমে হাতের আঙুল কাঁপতে শুরু করল চন্দনের, তারপর আস্তে আস্তে সারা শরীর। বিখ্যাত স্নায়ুবিশেষজ্ঞদের চেম্বার, হাসপাতাল, পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা গেল চন্দন গিলান বার্রে সিনড্রোমে আক্রান্ত। জটিল এই স্নায়ুরোগটি খুব দ্রুত তার প্রভাব বিস্তার করে মানুষের শরীরে। আয়ুষ্কাল সীমিত হয়ে যায়।
চন্দনের ফীল্ডওয়ার্ক প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। বাড়িতে কোনোরকমে কাজ করত। মেল, লেখালেখির কাজ টাইপ করত অর্পিতা, চন্দনের নির্দেশে। প্রায় ছ’ফুট লম্বা, টগবগে মানুষটা ধীরে ধীরে তার শরীরের সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলল।
“অপু, একে কি বেঁচে থাকা বলে? কতদিন, আর কতদিন এ যন্ত্রণা আমাকে বয়ে বেড়াতে হবে?”
অর্পিতা নীরবে চোখের জল ফেলত। মানুষটাকে মিথ্যে সান্ত্বনা দিয়েও যে কোনো লাভ নেই! এ রোগের আদিঅন্ত সবটাই যে জানা চন্দনের।
এরমধ্যে কখন যেন অর্পিতার অগোচরে চন্দন গোপনে যোগাযোগ করেছিল সুইজারল্যান্ডের একটি বিখ্যাত সংস্থার সঙ্গে। তারা নাকি স্বেচ্ছামৃত্যুর একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেছে। বেদনাহীন স্বেচ্ছামৃত্যু। যার নাম ‘সারকো’, গ্রীক সার্কোফেগাস শব্দটি থেকেই নেওয়া হয়েছে। নীলাভ, স্বচ্ছ-সুন্দর সারকো কফিনের মধ্যে শুয়ে মরণাকাঙ্ক্ষী মানুষ নিজে নিজেই একটি বোতাম টিপলেই তরল নাইট্রোজেন গ্যাসায়িত হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবে।
এ খবর জানতে পারার পর অর্পিতা কি বাধা দেয়নি চন্দনকে? অনেক অনুরোধ, উপরোধ, কান্নাকাটির উত্তরে চন্দনের একটিই কথা, “আমাকে শান্তিতে মরতে দাও অপু, আমার প্রিয় সার্কোফেগাসের সঙ্গে। কেমন সুন্দর, যন্ত্রণাহীন মৃত্যু বলোতো! এ মরণ আমি চাইব নাতো, আর কে চাইবে বলো?”
সব পথ পরিষ্কার রেখেছিল চন্দন। শুধুমাত্র সহমতিপত্রে অর্পিতার স্বাক্ষরটুকু বাকি ছিল। স্বামীর ইচ্ছামৃত্যুর সে আদেশটুকুও অমান্য করেনি অর্পিতা।
শোকসভার শেষে সব অতিথিরা যখন একে একে বিদায় নিচ্ছেন, চুপ করে খানিকক্ষণ বসে রইলেন অর্পিতা। সামনে তার অনেক কাজ। মনে পড়ছে চন্দনের শেষ কিছু কথা, “আমার কাজ যেন বন্ধ কোরো না অপু, এই কাজের মধ্যেই আমি অনন্তকাল বেঁচে থাকব “।
শান্ত, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ অর্পিতাকে স্বামীর এ শেষ অনুরোধ রাখতেই হবে। ভীড়ের মধ্যে একলা হয়ে যাওয়া চন্দনের অপু মনে মনে আওড়াতে থাকে সাদাত হোসেইনের লেখা, চন্দনের প্রিয় কবিতার পংক্তি, —
“আমাকে যেতে হবে বলে চলে যাই
তোমার উঠোনে থাকে দখিনা ক’ঘর
তোমার দু’চোখে লেখা বিরহ সমর
আহত পাখির ডানা কী বেদনা ফেলে
উড়ে উড়ে পুড়ে যায়, থাকে না খবর!
আমাকে যেতে হবে তাই-
জীবনের সব মায়াবন, জমা রেখে
আমি ফিরে যাই।”
আহা! ভারী ভালো লিখলেন !
খুব খুশি হলাম। ভালোবাসা নেবেন।
anyorokom…bhalo laglo
খুশি হলাম। ভালোবাসা জানাই।