| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় : বাংলা ছোটগল্পের অবিসংবাদী সব্যসাচী (প্রথম পর্ব) : স্বপনকুমার মণ্ডল

Reporter
স্বপনকুমার মণ্ডল / ২৪২১ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ৬ নভেম্বর, ২০২১

রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার অভিমুখ যেভাবে আধুনিক কবিতায় সরব হয়ে উঠেছিল, ছোটগল্পে তা লক্ষ করা যায় না। সেদিক থেকে কবিতার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছায়ামুক্ত কায়া রচনার যে প্রয়াস চলেছিল, ছোটগল্পের ক্ষেত্রে তার পরিচয় প্রকট হয়ে ওঠেনি। বাংলা ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথকে সযত্নে এড়িয়ে যাওয়ার আয়োজন ছিল না, তা নিয়ে বিদেশি গল্পকারদের গুরুপদে বসানোর তাগিদও তাতে আন্তরিক হয়ে ওঠেনি। আসলে তার প্রয়োজনও ছিল না। কল্লোলীয় রবীন্দ্রবিরোধিতায় দারিদ্র ও যৌনতায় অধিক গুরুত্ব আরোপ করে বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রনাথকে এড়ানো সম্ভব না হলেও ছোটগল্পে তাঁর সমান্তরাল যাত্রাই সময়ান্তরে অভিযানে সামিল হয়েছে। সেক্ষেত্রে বাংলা ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথের অপ্রতিদ্বন্দ্বী মানসিকতা সংঘাতের আধার হয়ে ওঠেনি, বরং বিকল্প পন্থায় স্বকীয় পথেই তার নতুন দিগন্ত প্রসারিত হয়েছে। প্রেমেন্দ্র মিত্র, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, সুবোধ ঘোষ, জগদীশ গুপ্ত প্রমুখ গল্পকারদের গল্পবিশ্ব বাংলা ছোটগল্পের প্রবাহকেই নানাভাবে বিস্তৃত করেছে। বিষয় ও আঙ্গিকের অভিনব আয়োজনই নয়, সময়ের অনুবাদেও বাংলা ছোটগল্পের বনেদি ভূমিকা ক্রমশ বিচিত্র পথে বিস্তার লাভ করে, প্রয়োজনও মেটায়। রবীন্দ্রোত্তর আধুনিক বাংলা সাহিত্যে ছোঠগল্পের বহুমুখী বিস্তারই তার বনেদি আভিজাত্যকে সম্প্রসারিত করেছে। বাংলা ছোটগল্পের সেই প্রবাহে নরেন্দ্রনাথ মিত্র (১৯১৭-১৯৭৫) ও নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় (১৯১৮-১৯৭০) দুজনেই অনন্য প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। শেষোক্ত জন তো শুধু ছোটগল্প রচনাতেই নয়, তার শিল্পরূপের তাত্ত্বিক সমালোচক রূপেও তাঁর অবিসংবাদিত ভূমিকা বর্তমান। অন্যদিকে ছোটগল্পকার হিসাবে তিনি লক্ষ্যভেদী অর্জুন নন, অতুলনীয় সব্যসাচী। সব মিলিয়ে বাংলা ছোটগল্প ও তার পরিচয়ে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের অবদান অনন্য, অসাধারণ। তাঁর মধ্যে অধ্যাপক, গবেষক, সমালোচক ও কবি-সাহিত্যিকের অপূর্ব সমন্বয় লক্ষ করা যায়। ছোটগল্পকার হিসাবে তাঁর অসামান্য ভূমিকা অনতিবিলম্বে ছড়িয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, ছোটগল্পে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের শিল্পীসুলভ পরিচয় ক্রমশ উৎকর্ষে মুখর হয়ে উঠেছে। তাঁর মানবিক মুখে কোনোরকম মত বা আদর্শ এঁটে বসেনি, স্বকীয় পথেই হেঁটেছেন আজীবন। এজন্য প্রথমে তাঁর গল্পে আসার প্রেক্ষাপটটি জেনে নেওয়া জরুরি মনে হয়।

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের বাহান্ন বছরের জীবনও ঘটনাবহুল ও বৈচিত্রময়। তিনি জন্মেছেন তৎকালীন দিনাজপুরের বালিয়াডিঙিতে। আদি নিবাস ছিল বরিশাল জেলার নলচিরার বাসুদেব পাড়ায়। পিতা প্রমথনাথ পুলিশের আধিকারিক ছিলেন। তিনি ছোটবেলাতেই মাকে হারান। আদর্শের কারণে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে প্রমথনাথের চাকরি চলে যায়। তাঁর দাদা শেখর গঙ্গোপাধ্যায় সক্রিয় বিপ্লবী রাজনীতি করতেন। স্বাভাবিক ভাবেই নারায়ণ তাঁর অবিন্যস্ত জীবনেও আদর্শের আলোয় নিজেকে গড়ে তোলার অবকাশ পেয়েছিলেন। পিতৃদত্ত নাম তাঁর তারকনাথ। স্বপরিকল্পিত নারায়ণ নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন। এছাড়া সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় সুনন্দ নামেও জার্নাল লিখেছেন। অন্যদিকে তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায় থেকে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় হয়ে ওঠার নেপথ্যে তাঁর আদর্শায়িত পারিবারিক জীবনের পরিচয় নানাভাবে উঠে এসেছে। ছোটগল্পের আধারেও তাঁর আত্মজৈবনিক পরিচয় বর্তমান। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গল্প ‘হাড়’-এর গল্পকথকের বাবার নামও প্রমথ। শুধু তাই নয়, আদর্শ পিতার চাকরি ছাড়ার কথাও সেখানে দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন গল্পকার। চাকরির সুপারিশপ্রার্থী গল্পকথককে তাঁর বাবার ক্লাসফ্রেণ্ড রায়বাহাদুর এইচ্‌ এল চ্যাটার্জি মুগ্ধতার সঙ্গে সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন : ‘তোমার বাবা যখন রেজিগ্‌নেশন দেয় সে খবর আমি পেয়েছিলাম। ছোটবেলা থেকেই ও স্পিরিটেড, অন্যায় কখনও সইতে পারত না। নইলে এত সহজে অমন চাকরি ছেড়ে দিলে। অ্যান্‌ এক্সসেপশনাল বয় হি ওয়াজ্‌ !’ অন্যদিকে দাদার দৌলতে বেআইনি কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসাই শুধু নয়, দাদার সঙ্গে বিপ্লবী যুগান্তর পার্টির একটি গ্রুপেও যোগ দিয়েছিলেন তারকনাথ। ১৯৩০-এ সত্যাগ্রহ আন্দোলনে সামিল হয়ে শেখর গঙ্গোপাধ্যায় যখন জেলে গিয়েছিলেন, তখন তিনি স্কুলের ছাত্র। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ১৯৩৩-এ তারকনাথ দিনাজপুর জেলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাশ করেন। সেই অগ্নিক্ষরা সময়েই তাঁর ভবিষতে লেখনীকে হাতিয়ার করে তোলার স্বপ্ন জেগে ওঠে। অচিরেই তার প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। জীবনে অভিজ্ঞতার ভাঁড়ার যত পূর্ণ হতে থাকে, ততই তাঁর মধ্যে সাহিত্যের মাধ্যমে প্রতিবাদী চেতনার আকাশে মেঘ জমতে থাকে। অচিরেই সেই মেঘ থেকে বৃষ্টি শুরু হয়। ১৯৬২-তে চীন-ভারত যুদ্ধের পরিসরে সাহিত্যে রাজনীতির যোগ নিয়ে ‘দেশ’ পত্রিকার আহ্বানে সাড়া দিয়ে লেখা ‘শিল্পীর স্বাধীনতা’(১৩৬৯-এর ২০ পৌষ) প্রবন্ধে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ে সেকথা অকপটে জানিয়েছেন : ‘বাংলাদেশের আরো অনেক লেখকের মতোই আমিও প্রথম কলম ধরেছিলাম ভারতবর্ষের দুঃসহ অগ্নিযন্ত্রণার মধ্যে। আমি তখন স্কুলের ছাত্র। ত্রিশ সালের সত্যাগ্রহ দেখেছি, দেখেছি চট্টগ্রামের বোমা বিস্ফোরণ। পড়েছি রবীন্দ্রনাথের নৈবেদ্য, নজরুলের কবিতা, বাজেয়াপ্ত ‘দেশের ডাক’, ‘ফাঁসীর সত্যেন’…সেদিনের বালকমনে তখন একটিমাত্র সংকল্পই আগুনের অক্ষরে লেখা হয়ে গিয়েছিল। যদি কলম ধরতে হয়, তবে তা, দেশের জন্য; যদি লিখতে হয় তবে তা স্বাধীনতার সংগ্রামকে এগিয়ে দেবার জন্য।’ অবশ্য দেশের স্বাধীনতার চেয়ে মানুষের স্বাধীনতাই নারায়ণের সাহিত্যে প্রাধান্য লাভ করে। শুধু তাই নয়, শোষিত-শাসিত মানুষের মুক্তিচেতনায় ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ-প্রতিবাদও তাতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সেখানে তাঁর কমিউনিস্ট আদর্শের পরিচয়ও দুর্লভ নয়।

অন্যদিকে ‘শিল্পীর স্বাধীনতা’ প্রবন্ধে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় কোনোভাবেই কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন বলে যেভাবে নিজের বক্তব্য সুস্পষ্ট করে তুলেছেন, তার মধ্যে স্ববিরোধিতা বর্তমান। প্রসঙ্গত স্মরণীয়, ‘শিল্পীর স্বাধীনতা’ প্রবন্ধের বক্তব্যের জন্য তাঁকে বামপন্থীদের কাছে বিরাগভাজন হতে হয়েছিল। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য : ‘আমি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য নই, কোনোদিন ছিলামও না। যতদূর জানি কমিউনিস্ট হতে গেলে এই চিন্তাধারার সঙ্গে সম্পূর্ণ পরিচিত হতে হয়, সক্রিয়ভাবে তার কর্মধারায় অংশীদার হতে হয়, অনেক দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়। আমি পেশায় অধ্যাপক, সুতরাং একটা স্বাভাবিক কৌতূহলেই আমরা দশটি জিনিসের সঙ্গে কমিউনিজম্‌ সম্পর্কেও কিছু পড়াশোনা করেছি—কিন্তু তা নিতান্তই সামান্য। এই আদর্শের কর্মপদ্ধতির সঙ্গে আমার কোনো যোগ নেই। অতএব কমিউনিস্ট লেখক হওয়ার গৌরব বা অগৌরবের যাই বলুন—আমার পক্ষে তা’ ‘অর্জন করা সম্ভব হয়নি।’ অথচ প্রবন্ধটিতেই নারায়ণের কমিউনিস্টসুলভ মনোভাবের পরিচয় উঠে এসেছে। তাঁর কথায় : ‘সেদিনের সেই অসহ্য আত্মগ্লানি আর যন্ত্রণার মধ্যে সমস্ত বাঙালির সঙ্গে আমিও গর্জন করে উঠেছি, ‘যুগান্তরে’ লিখেছি ‘নক্রচরিত’, ‘আনন্দবাজারে’ লিখেছি ‘দুঃশাসন’, ‘দেশে’ লিখেছি ‘পুষ্করা’ আর ‘ভাঙা চশমা’। আরো অনেক গল্প—কিছু কিছু উপন্যাস।’ সেদিক থেকে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় নিজেকে কমিউনিস্ট বলতে অস্বীকার করলেও কমিউনিস্ট আদর্শের প্রতি তাঁর তীব্র অনুরাগকে অস্বীকার করা যায় না। ‘প্রগতি লেখক সংঘ’-এর সঙ্গে তাঁর সক্রিয় যোগ ছিল। তাছাড়া তাঁর বামপন্থী পত্রিকার পৃষ্ঠপোষকতা থেকে পার্টিকর্মীদের মার্কসবাদ, লেনিনবাদে শিক্ষা দেওয়ার কথাও জানা যায়। অন্যদিকে ১৯৬২-তে চীনের ভারত আক্রমণে সংবেদনশীল সাহিত্যিক মানসে স্বাভাবিক ভাবেই কমিউনিস্ট সম্পর্কে সাময়িক ভাবে বিরূপ মানসিকতা জেগে ওঠা অস্বাভাবিক নয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ‘শিল্পীর স্বাধীনতা’তেই রয়েছে তাঁর অমোঘ উচ্চারণ ‘যে কোনো রাজনীতিক মতবাদের প্রত্যক্ষ প্রয়োগফল এবং দেশের প্রসঙ্গে তাঁর শুভাশুভের প্রেক্ষিতেই মাত্র তাকে গ্রহণ বা বর্জন করবো। মানুষের জন্যই রাজনীতি, রাজনীতির জন্য মানুষ নয়। যেখানে দেখবো দেশের কল্যাণ, দেখবো শুভচেতনা—তাকে সানন্দে স্বীকার করবো। নিছক মতবাদের রুদ্ধ প্রাচীরে শিল্প ব্যক্তিত্বকে আমি বিসর্জন দিতে প্রস্তুত নই।’ শুধু তাই নয়, চীনের পরদেশ আক্রমণের মধ্যে তাঁর চেনা কমিউনিজমের ধারণাই বদলে গিয়েছিল, তাও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন নারায়ণ। তাঁর তীব্র ধিক্কারও সেখানে ঝরে পড়েছে : ‘আজ দেখছি কমিউনিজম চৈনিক পররাজ্য লোলুপতা, বিশ্বাসঘাতকতা এবং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিষাক্ত বীজে পরিণত হয়েছে। এই কমিউনিজম আমার শত্রু, সমস্ত মানবতার শত্রু। আমার লেখায় তার বিরুদ্ধে ধিক্কার সহস্র কণ্ঠে ফেটে পড়ুক।’ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সংবেদী চিত্তে সাময়িক আঘাতও অসহনীয় হয়ে ওঠে। এজন্য তার বিরোধিতায় তীব্র প্রতিবাদও ধ্বনিত হয়। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও তা লক্ষণীয়। অথচ তাঁর লেখকসত্তার মধ্যে কমিউনিস্টসুলভ শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামী চেতনা বর্তমান, সেকথাও ‘শিল্পীর স্বাধীনতা’য় উঠে এসেছে। তাঁর কথায়, ‘আমি বাঙালি আর ভারতবাসীর কথা লিখব—লিখবো তাদের দুঃখের কাহিনী, বেদনার রূপ, সংগ্রামের ইতিহাস।’ সেকথা নারায়ণ সাহিত্যজীবনের সূচনা থেকেই লিখে এসেছেন। ছোটগল্পের ক্ষেত্রে তার পরিচয় প্রকাশমুখর। লিখতেও তিনি স্বচ্ছন্দ ছিলেন। লিখেওছেন অজস্র। রবীন্দ্রনাথ যেখানে পঞ্চাশ বছরে(১৮৯১-১৯৪১) ৮৭টি(‘গল্পগুচ্ছ’-এর তিন খণ্ডে ৮৪টি ও ‘তিনসঙ্গী’র ৩টি মিলিয়ে) ছোটগল্প লিখেছেন, নারায়ণের গল্পের সংখ্যা সেখানে আঠাশ বছরেই(১৯৪২-১৯৭০) শুধু রচনাবলিতেই ১২২টি। উপন্যাসের পাশাপাশি সমানতালে গল্প লিখে গিয়েছেন তিনি। সেখানে তাঁর ব্যক্তিসত্তার বহুমুখী বিস্তার যেমন নিবিড়তা লাভ করে, লেখকসত্তার বৈচিত্র তেমনই নানাভাবে প্রকাশিত হয়। অন্যদিকে ‘শিল্পীর স্বাধীনতা’য় নারায়ণের ‘কমিউনিস্ট লেখক’ না হওয়ার কথাকেও অস্বীকার করা যায় না। তাঁর গল্পের বিস্তৃত পরিসরেই তা সুস্পষ্ট।

আসলে ছোটগল্পের ক্ষেত্রে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় কমিউনিস্ট মতবাদপুষ্ট গল্পকার হয়ে না উঠলেও তাঁর সাহিত্যে নানাভাবে বৈষম্যপীড়িত অসহায় মানুষের কথাই শুধু নয়, তার উত্তরণের সমস্যা ও সম্ভাবনাও উঠে এসেছে। আবার তার প্রকাশে মার্কসবাদী আদর্শে প্রচার ও আন্দোলন নীতিও (Agitation and Propaganda সংক্ষেপে Agitprop) নেই, রোমান্টিক চেতনাও আন্তরিক হয়ে উঠেছে। সাহিত্যিক হিসাবে তিনি যে রোমান্টিক গোত্রের শিল্পী তা তাঁর সাহিত্যভাবনার মধ্যেই প্রতীয়মান। সেখানে মার্কসবাদী সাহিত্যের বস্তুতান্ত্রিক প্রকাশের চেয়ে মননের বাস্তবতা অনেকবেশি আবেদনক্ষম। শুধু মননের আবেদনই নয়, তাতে সামাজিক দায়কেও তিনি অস্বীকার করেননি। স্বাভাবিক ভাবেই তাতে তাঁর Ideology-তে ভাবাদর্শের প্রাধান্যের কথা উঠে এসেছে। তাঁর ‘কোরক সাহিত্য পত্রিকা’য় প্রকাশিত(১৯৯২) ‘সাহিত্য ও আদর্শ’ প্রবন্ধে তার পরিচয় বর্তমান। সেখানে মানুষের দুর্জয় প্রকৃতিতেই নির্মম বাস্তবতাকে জয়ের স্বপ্ন আন্তরিক হয়ে ওঠে। নারায়ণ উক্ত প্রবন্ধে জানিয়েছেন : ‘সব চাইতে রহস্যজনক ব্যাপার এই যে, যত বড় Realist-ই হোক না কেন, মানুষের মাঝখানে চিরকালের স্বপ্ন ঘুমিয়ে আছে। সে চির যাত্রিক।’ সেই স্বপ্নচারী মানুষের মনেই উত্তরণের দিশা খুঁজে ফিরেছেন নারায়ণ। ভাবাদর্শের মধ্যে বৈষম্যপীড়িত মানুষের প্রতি সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা তাই তাঁর গল্পে স্বাভাবিক ভাবেই উঠে এসেছে। তাঁর ‘সাহিত্যে ছোটগল্প’-এও সে বিষয়ে প্রশ্নের অবতারণা করে প্রসঙ্গক্রমে তিনি জানিয়েছেন, ‘ইতিহাসই নির্ধারণ করুক—ভবিষ্যতের ছোটগল্প কোন লক্ষ্যকে বেছে নেবে। মনের জগৎকে সে তন্ন তন্ন করেই সন্ধান করুক—কিন্তু সামাজিক দায়িত্বও কি তার থাকবে না ?’ সেই ‘সামাজিক দায়িত্ব’-এই নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ছোটগল্পে স্বাভাবিক ভাবেই ‘কমিউনিস্ট লেখক’-এর ছায়ায় তাঁর কায়া মনে হতে পারে। অথচ তার মধ্যে তাঁর মানবতাবাদী লেখকের ছায়াই বর্তমান, মার্কসবাদী সাহিত্যিকের কায়া আন্তরিক হয়ে ওঠেনি। সেদিক থেকে তাঁর গল্পে সময়ের ফটোকপি নেই, স্বরচিত সত্যসুন্দরের ছবিই উঠে এসেছে। আর তাতেই সময়ের স্বকীয় অনুবাদই লক্ষ করা যায়। সেক্ষেত্রেই মার্কসবাদী আদর্শে দীক্ষিত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের পার্থক্য সহজবোধ্য হয়ে ওঠে। মানিক যেখানে শোষণ-শাসনের আধারে মানুষের মধ্যে সাদা-কালোর ভেদ স্পষ্ট করে তুলেছেন, নারায়ণ সেখানে সুন্দর ও কুৎসিত দুদিকেই ‘চোখ রাখা ভাল’ মনে করতেন । দুজনের গল্পেই সময়ের অনুবাদ আন্তরিক হয়ে উঠেছে। অথচ দুজনের গল্পই স্বতন্ত্র প্রকৃতির। চল্লিশের দুঃসময়ের খরায় শুধু খাদ্যের অভাব নয়, বস্ত্রের সংকটও তীব্র আকার ধারণ করে। ১৯৪৪-এর বস্ত্রসংকটের প্রেক্ষাপটে মানিক লেখেন ‘দুঃশাসনীয়’। একই বিষয়ে নারায়ণ লিখেছেন ‘দুঃশাসন’। প্রথম গল্পটি যেখানে বাংলার জনজীবনে বিশেষ করে নারীর লজ্জানিবারণের মতো বস্ত্রের অভাবজনিত তীব্র সংকটে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণে উদ্গ্রীব দুঃশাসনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, অন্যটি সেখানে গল্পকারের স্বকীয় বিশেষত্বে ‘দুঃশাসনের রক্তপান’ যাত্রাপালার অভিনয় দেখে কাপড়ের আড়তদারের মানসিকতা পরিবর্তনের মধ্যে প্রতিতুলনার অবকাশে একালের দুঃশাসনের পরিচয়কে নিবিড় করে তোলে। সেক্ষেত্রে মানিক শিরোনামে প্রতিতুলনার ইঙ্গিত দিলেও সরাসরি আঘাতে সক্রিয় হয়েছেন। তাঁর গল্পটিতে হাতিপুর গ্রামের বস্ত্রসংকটের হাহাকার আনোয়ারের স্ত্রী রাবেয়ার পুকুরের জলের তলে নীরবে আত্মহত্যার আবেদনেই মুখর হয়ে ওঠে। অন্যদিকে নারায়ণ সরাসরি শিরোনাম দিলেও প্রতিতুলনার মাধ্যমে তাঁর লক্ষ্যে উপনীত হয়েছেন। সেখানে গ্রামের মানুষের সমষ্টিচেতনায় তীব্র অভিঘাত নেমে আসে। পাঠকও তার মর্মসহচরী হয়ে ওঠে অজান্তেই। জগদীশ ভট্টাচার্য ‘নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠগল্প’-এর ভূমিকায়(শ্রাবণ ১৩৫৬) প্রসঙ্গক্রমে গল্পটি সম্পর্কে জানিয়েছেন : ‘দ্রৌপদীর বস্ত্রহারী দুঃশাসনের নিধন-প্রসঙ্গ অবলম্বনে রচিত যাত্রার অভিনয়-বর্ণনার মধ্য দিয়ে শুধু দেবীদাসের মানসপ্রতিক্রিয়াই নয়, পাঠকের মনেও এর ফলশ্রুতি অনিবার্য হয়ে উঠেছে।’ সেদিক থেকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদর্শবাদী পরশুরাম বা লক্ষ্যভেদী অর্জুন কোনো ভূমিকাই নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্পে লক্ষ করা যায় না। তাঁর গল্পকারসত্তার মধ্যে বহুমুখী ব্যক্তিত্বের পরিচয় যেমন উঠে এসেছে, তেমনই তার প্রকাশেও বিচিত্র বিষয়ের বিস্তৃতি আন্তরিক হয়ে উঠেছে। এজন্য তাঁর গল্পের আলোচনার পূর্বে তাঁর বহুধাব্যাপ্ত প্রতিভার প্রতি দৃষ্টি প্রদান জরুরি হয়ে ওঠে। (চলবে)

লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev