| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় : বাংলা ছোটগল্পের অবিসংবাদী সব্যসাচী (দ্বিতীয় পর্ব) : স্বপনকুমার মণ্ডল

Reporter
স্বপনকুমার মণ্ডল / ৩৩২২ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২১

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় শুধু সংবেদনশীল মনের অধিকারী ছিলেন না, ছাত্র হিসাবেও ছিলেন কৃতী। শুধু তাই নয়, তাঁর সাহিত্যানুরাগও ছিল সহজাত। ছাত্রজীবনেই তাঁর সাহিত্যচর্চা শুরু হয়েছিল। ১৯৩৩-এ প্রবেশিকায় পাশ করে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে আই এ ভর্তি হন। ১৯৩৪-এ তাঁর কবিতা ‘নমস্কার’ ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৩৫-এ রাজনৈতিক কারণে আই এ পরীক্ষা দিতে না পেরে বরিশাল এসে ব্রজমোহন কলেজে আই এ দ্বিতীয় বার্ষিকীতে ভর্তি হন। সেবছরই নারায়ণের প্রথম ছোটগল্প ‘নিশীথের মায়া’ ‘দেশ’-এ বেরয়। সেটি যে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘খড়্গ’ গল্পের ছায়ায় লিখেছিলেন, তা তিনি নিজেই জানিয়েছেন(‘দেশ’, সাহিত্য সংখ্যা,১৩৭৬)। অন্যদিকে সময় যত এগিয়েছে, তাঁর বহুমুখী প্রতিভাও ততই বিস্তার লাভ করেছে। ১৯৩৬-এ ব্রজমোহন কলেজ থেকে আই এ এবং পরে বি এ পাশ করে ১৯৩৯-এ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা নিয়ে এম এ-তে ভর্তি হয়ে ১৯৪১-এ প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে উত্তীর্ণ হন। অন্যদিকে তার মাঝে ১৯৩৯-এ বিষ্ণুপদ ভট্টাচার্যের সঙ্গে যৌথভাবে ‘জোনাকি’ নামে একটি কবিতা-সংকলন প্রকাশিত হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় অচিরেই কাব্যচর্চা থেমে গেলেও তাঁর কবিপ্রকৃতি সৃজনবিশ্বে সবুজ হয়ে উঠেছে। ছোটগল্পে তার পরিচয় নানাভাবে উঠে এসেছে। তাঁর গল্পকথকের পরিচয়েও তার স্বাভাবিক বিচরণ। তাঁর বিখ্যাত গল্প ‘টোপ’-এর গল্পকথক স্বকীয় কবিপ্রতিভার অব্যর্থ সাফল্যে অভিভূত। রামগঙ্গা এস্টেটের রাজাবাহাদুর এন আর চৌধুরীকে ‘ঈশ্বর গুপ্তের অনুপ্রাস চুরি করে’ লেখা প্রশস্তি রচনা করে পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, মিথ্যে বিশেষণগুলোও উপহারের প্রাচুর্যে ও তার আভিজাত্যে সেই কথকের মনান্তরও গল্পকার ধরিয়ে দিয়েছেন : ‘নিছক কবিতা মেলাবার জন্যে যে বিশেষণগুলো ব্যবহার করেছিলাম, এখন সেগুলোকেই মন প্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করতে শুরু করেছি।’ কবিমানসের এই পরিবর্তনের মধ্যেই গল্পকারের সুগভীর কবিদৃষ্টিই পথের আলো হয়ে ওঠে। নারায়ণের গল্পের কাব্যিক ভাষা বা রোমান্টিক চেতনাতেই নয়, বিষয়ের অন্তরে আলোর প্রতিফলনেও কবিদৃষ্টির পরিচয় মেলে। অন্যদিকে ছাত্রজীবনের পর তাঁর কর্মজীবনে অধ্যাপনার প্রসারিত পরিসরে সাহিত্যচর্চা গতি লাভ করে। ১৯৪১-এই তিনি রীতিমতো ঔপন্যাসিক হয়ে ওঠেন। তিন খণ্ডে প্রকাশিত(প্রথম খণ্ড-১৯৪২,দ্বিতীয় খণ্ড-১৯৪৫ ও তৃতীয় খণ্ড-১৯৪৬) তাঁর ‘উপনিবেশ’ উপন্যাসটি এম এ-তে পড়ার সময়েই লিখতে শুরু করেছিলেন। অন্যদিকে ১৯৪২-এ জলপাইগুড়ির আনন্দচন্দ্র কলেজের পর ১৯৪৫-এ কলকাতায় সিটি কলেজে অধ্যাপনা করে ১৯৫৬-তে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে কনিষ্ঠ অধ্যাপক হিসাবে যোগ দিয়ে ক্রমশ তিনি প্রবাদপ্রতিম অধ্যাপকে পরিণত হন। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের অধ্যাপনা জীবনের সূচনা থেকে তাঁর ছোটগল্পকার পরিচিতিও ছড়িয়ে পড়ে। বছরতিনেকের মধ্যেই তাঁর ছোটগল্পের প্রাচুর্য লক্ষণীয়। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৬-এর মধ্যেই তাঁর অধিকাংশ সেরা গল্পগুলো প্রকাশিত হয়। যেমন, ‘বীতংস’, ‘হাড়’, ‘দুঃশাসন’, ‘নক্রচরিত’, ‘পুষ্করা’, ‘টোপ’, ‘ভাঙা চশমা’, ‘একটি শত্রুর কাহিনী’, ‘ইতিহাস’, ‘সৈনিক’ প্রভৃতি। একবছরেই(১৯৪৫-৪৬)) চারটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। যথা, ‘বীতংস’(নববর্ষ ১৩৫২), ‘ভাঙাবন্দর’(ভাদ্র ১৩৫২), ‘বন-জ্যোতস্না’(১৩৫২) ও ‘দুঃশাসন’(১৩৫২) প্রভৃতি।  অন্যদিকে গল্পে তাঁর জোয়ার আসে পরের দশকগুলিতেও। একের পর এক গল্পের বই প্রকাশিত হয়।  পঞ্চাশের দশকে ‘শ্বেতকমল’(১৯৫৪), ‘গন্ধরাজ’(১৯৫৫) ও ‘ঊর্বশী’(১৯৫৭) প্রভৃতি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। আবার ষাটের দশকেই পাই ‘একজিবিশন’(১৯৬১), ‘ছায়াতরী’(১৯৬৬), ‘বনজ্যোৎস্না’(১৯৬৯)। তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয় ‘ঘুর্ণি’(১৯৭১)। পরে আরও প্রকাশিত হয় । এভাবে অজস্র গল্পের মধ্যে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের বহুধাবিস্তৃত ব্যক্তিত্বের আলোয় তাঁর লেখকসত্তার বৈচিত্র নানাভাবে উঠে আসে। সেখানে ছাত্র, কবি-সাহিত্যিক, অধ্যাপক, গবেষক, সমালোচক প্রভৃতির সমন্বয় স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। শিল্পীর সঙ্গে গবেষক ও সমালোচকের ত্রিবেণী সঙ্গমে নারায়ণের ছোটগল্প স্বাভাবিক ভাবেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার পথ বেয়ে বহুমাত্রিক চেতনায় বিস্তার লাভ করে। বিচিত্র পরিসরে বেড়ে ওঠা, গড়ে তোলা জীবনের আধারে বিস্তৃত পরিমণ্ডলে যেমন তাঁর গল্পের পটভূমি ছড়িয়ে পড়ে, তেমনই তাঁর ছোটগল্পে ব্যক্তিগত জীবনের নানা পরত নানা প্রসঙ্গে-অনুষঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে ছোটগল্পের লেখক থেকে তার গবেষক-সমালোচকের ভূমিকায় তাঁর অনন্য প্রকৃতি সবুজ সজীবতা লাভ করে।

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ক্রমশ ছোটগল্পের পরিসরে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছেন। ১৯৫৬-তে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে পেশাগত কারণেই সাহিত্যে ছোটগল্প নিয়ে গবেষণা করেছেন, ১৯৬০-এ লাভ করেন ডি ফিল ডিগ্রি। সেই গবেষণার ফসল তাঁর ‘ক্ষীণকায়’ ‘সাহিত্যে ছোটগল্প’(১৯৫৬) বইটিকে আরও সমৃদ্ধ সম্পদশালী করে তোলে। তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ছোটগল্পকে নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রথম গবেষণা করেন এবং বাংলা গবেষণার ধারায় একটি অনন্যসাধারণ ফসলটি উপহার তুলে দেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সেই সময়ে বিদেশি ছোটগল্পের বই সুলভ ছিল না। সেগুলি আনিয়ে বিশ্বের ছোটগল্পের পরিসরকে গবেষণাসূত্রে যেভাবে নারায়ণ নিবিড় করে তুলেছেন, তা তাঁর বইটির বহুল সমাদরে ও অদ্বিতীয় অস্তিত্বেই প্রতীয়মান। অন্যদিকে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ছোটগল্প নিয়ে আরও স্মরণীয় কাজ করেছেন। ‘বাংলা গল্প বিচিত্রা’(১৯৫৮) ও ‘ছোটগল্পের সীমারেখা’(১৯৭০) ব্যতীত ‘সাহিত্য ও সাহিত্যিক’(১৯৫৬), ‘কথাকোবিদ রবীন্দ্রনাথ’(১৯৬৬) প্রভৃতি বই তাঁর স্বকীয় প্রতিভার স্বাক্ষরবাহী। অন্যদিকে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ও রথীন্দ্রনাথ রায় যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পত্র হিসাবে কথাসাহিত্যের সূচনা করেন। দুজনেই ছোটগল্প নিয়ে গ্রন্থরচনা করে ছোটগল্পের বুনিয়াদী চেতনাকে প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে ছড়িয়ে দিয়েছেন। সেই রথীন্দ্রনাথ রায়ই তাঁর ‘ছোটগল্পের কথা’(সেপ্টেম্বর,১৯৫৯) বইটির ‘নিবেদন’-এ জানিয়েছেন : ‘অগ্রজপ্রতিম নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সাহিত্যে ছোটগল্প’ গ্রন্থটি আমাকে সবচেয়ে বেশী প্রেরণা দিয়েছে। এর আগে পত্র-পত্রিকায় বা কোনো কোনো গ্রন্থে ছোটগল্প সম্পর্কে কিছু কিছু বিক্ষিপ্ত আলোচনা চোখে পড়েছে। কিন্তু শ্রীযুক্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের গ্রন্থটিই বাঙলা ভাষায় ছোটগল্প সম্পর্কে সামগ্রিক আলোচনার সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রয়াস। ছোটগল্পের রূপ ও রীতি সম্পর্কেও এর আগে বাঙলায় তেমন আলোচনা হয় নি। শ্রীযুক্ত গঙ্গোপাধ্যায় নিজে একজন লব্ধপ্রতিষ্টিত কথাসাহিত্যিক, তাই তাঁর সমালোচনাগ্রন্থ শুধু পঠিতবিদ্যার তালিকায় পরিণত হয় নি—ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলিকেও তিনি কাজে লাগিয়েছেন।’ নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই ব্যক্তিগত জীবনের বিচিত্র প্রকৃতির অভিজ্ঞতা যেমন তাঁকে ক্রমশ ঋদ্ধ করেছে, তেমনই তা তাঁর ছোটগল্পের শিল্পরূপে বৈচিত্রের পাশাপাশি তাঁকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে। সেখানে বাংলা ছোটগল্পকার হিসাবে যেমন, তেমনই তার বিশেষজ্ঞ হিসাবেও সমান জনপ্রিয়তা তাঁর স্বনামধন্য পরিচিতিতেই সহজবোধ্য হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞ হিসাবে আত্মপ্রতিষ্ঠার পূর্বেই নারায়ণ ছোটগল্পের যশস্বী শিল্পী হয়েছেন। সেখানে বিশেষজ্ঞ হিসাবে আত্মপ্রতিষ্ঠার পরেও দুই ধারা সমান তালে চলেছে তাঁর। সেক্ষেত্রে তিনি বাংলা সাহিত্যে অতুলনীয় সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব। ব্যাকরণ জানলেই যেমন ভাষা প্রকাশে প্রতিষ্ঠা মেলে না, তেমনই ভাষায় দক্ষতা থাকলেই ব্যাকরণ জ্ঞানে পারদর্শিতা মেনে না। সেদিক থেকে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের বহুমুখী প্রতিভার অনন্যতা ছোটগল্পের ক্ষুদ্র পরিসরেই মহীরূহ হয়ে উঠেছে। দিন যত এগিয়েছে, তিনি ততই নিজেকে ছাড়িয়ে গিয়েছেন। সেখানে ছোটগল্পের সৃষ্টি ও সমালোচনার দুই স্বতন্ত্র ধারাকেই সমান পারদর্শিতায় তাঁর একমেবাদ্বিতীয়ম ভূমিকা অনন্য নিদর্শন হয়ে উঠেছে। অথচ সেখানে নারায়ণের স্বচ্ছন্দ বিচরণে কোনো মত-আদর্শকে আঁকড়ে থাকার বাতিক নেই, নেই সব্যসাচী প্রমাণের উগ্রতা। আপনার বিস্তারেই তিনি এগিয়ে চলেছেন। অথচ সেখানেও তাঁর স্বকীয় প্রতিভার পরিচয় ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতার আলোয় বর্ণরঙিন হয়ে ওঠে।

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ছোটগল্পের পরিমণ্ডল সুবিস্তৃত ও সুদূরপ্রসারী। তাঁর জন্ম-শিক্ষা থেকে কর্মজীবনে প্রায় সারা বাংলা জুড়ে ক্ষেত্র থেকে ক্ষেত্রান্তরের অভিজ্ঞতা নানাভাবে সেখানে শাখাপ্রশাখা ছড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, বাংলার বাইরেও তার অবাধ বিস্তার লক্ষ করা যায়। সেখানে দেশ-কালের গণ্ডি সহজেই অতিক্রম করে যায়। তাঁর ছোটগল্পের পটভূমিতে আঞ্চলিকতার অবকাশ নেই, বরং সার্বভৌমিক বিস্তার অভিনব আস্বাদ বয়ে আনে। বাংলা ছোটগল্পের পটভূমিকে সুবোধ ঘোষ যেভাবে বাংলার বাইরে বিস্তৃত করেছেন, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় বাংলাকেই তার বাইরে দেশ-দেশান্তরে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর গল্পের সার্বভৌমিক বিস্তারই গল্পের বাড়তি আকর্ষণ সৃষ্টি করে। প্রথম সাড়া জাগানো গল্প ‘বিতংস’ গল্পে সাঁওতাল পরগণা থেকে আসামের চাবাগানের কুলির ঠিকাদার সাধুবেশী সুন্দরলালের বিচিত্র চরিত্র বৈচিত্রময় পটভূমিকায় কৌতূহল জাগিয়ে তোলে। আবার ‘হাড়’ গল্পে পঞ্চাশের মন্বন্তরে কলকাতা মহানগরীতে বসে মনোহর পুকুর পার্কের রায়বাহাদুর এইচ এল চ্যাটার্জি ভাবছেন মিণ্ডানাও দ্বীপের কাটাবাটুর জংলী সর্দারের কাছে পাওয়া বলি দেওয়া কুমারী মেয়ের মন্ত্রসিদ্ধ হাড়ের কথা। সেই জাদুকরী হাড়ের সঙ্গে গল্পে দুর্ভীক্ষপীড়িত মানুষের কঙ্কালসারের দেহ নিয়ে কুকুর এড়িয়ে ডাস্টবিনের খাবার সংগ্রহে সক্রিয় একটি কাঠির মতো হাত-পা’র বেলুনের মতো ফোলা পেটের ছোট ছেলের আপ্রাণে চোষা হাড়ের প্রতিতুলনা স্বাভাবিক ভাবেই গল্পে অদ্ভুত শিহরণ বয়ে আনে। সেই রায়বাহাদুরের মতো ‘হাড় ওরা পেয়েছে, কেবল মন্ত্র পাওয়াটাই বাকী’ও পাঠকের বুঝতে বাকি থাকে না। এভাবে বিচিত্র পটভূমিকায় নারায়ণের গল্প স্বচ্ছন্দ বিচরণ করে। টেরাইয়ের প্রাগৈতিহাসিক হিংস্রতা (‘টোপ’), নাগাধিরাজের আদিম গুহা (‘জান্তব’), ডুয়ার্সের জলঢাকা নদীর তীর (‘বন-জ্যোৎস্না’), বরেন্দ্রভূমির রাজা-প্রজার দ্বন্দ্ব (‘সৈনিক’) কত বিচিত্র পটভূমি গল্পে উঠে এসেছে, তার ইয়ত্তা নেই। পদ্মা-মেঘনা-কালাবদর-আড়িষলখাঁ থেকে আত্রাই-মহানন্দা-কাঞ্চন নদীর কূলে কূলে গল্পকার নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের অবাধ বিস্তার। শুধু তাই নয়, একই গল্পে একাধিক পটভূমির ঐতিহাসিক যোগসূত্র ছড়িয়ে পড়ে। যেমন, ‘ইতিহাস’ গল্পে। সেখানে জালিয়ানওয়ালা, সেবাগ্রাম, কর্ণফুলির তীর, বুড়িবালামের অরণ্য মেদিনীপুরের রাঙামাটি সবই একসূত্রে গাঁথা হয়ে যায়। আবার ‘রেকর্ড’ গল্পে চোরাবাজার থেকে কেনা পুরনো একটি রেকর্ডের গানের উৎস নিয়ে রহস্য যত ঘনীভূত হয়, ততই তার তৃতীয় নেত্র জেগে ওঠে।

আসামের খাসিয়াদের গান-নাচের উচ্ছ্বাস, ব্রহ্মপুত্রের ডাক, বুনো হাতির গর্জন, নাগাদের ঢাকের আওয়াজ, পুরুলিয়ার ছৌনাচের সঙ্গত, বিয়াল্লিশের আগস্টে পুলিশের বুলেটের শব্দকে ছাপিয়ে ওঠা বালুরঘাটের সাঁওতালি গ্রামের নাগরা-টিকারার বোল সবই উঠে আসে। বহুবিস্তারী চেতনার সূত্রে গল্পও এগিয়ে চলে। সেখানে রেকর্ডে গানের উৎসই কৌতূহল জাগিয়ে রাখে, দেশ হতে দেশান্তরের তার হদিশ চলে। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের বহুমুখী ব্যক্তিত্বের ঐক্যসূত্রও যে তাঁর গল্পের অসাধারণ পরিণতি লাভে সক্রিয় হয়েছিল, তা ‘রেকর্ড’ গল্পেই প্রতীয়মান। গল্পকথক অধ্যাপক, তার স্ত্রী করুণাও কলেজের অধ্যাপিকা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী আশা দেবীও কলেজের অধ্যাপিকা ছিলেন। অন্যদিকে গবেষক দৃষ্টির প্রসারতায় গল্প এগিয়ে চলে। অথচ সেই গবেষণার ফলে স্বস্তি মেলে না। করুণার সহপাঠিনী আইভি বিদেশ থেকে গানের উপরে ডক্টরেট করে ফেরা। আইভির মনে হয় গানটি সুইজারল্যান্ডের বিয়ের গান। অবশ্য তা নিয়েও তার সন্দেহ আছে। এনিয়ে করুণাও আইভির ডক্টরেট নিয়ে কটাক্ষ করে।  তাতে সমস্যা সমাধান না হওয়ায় গল্পকথকের অস্বস্তি বেড়েই চলে। মধ্যরাত্রে মার্কাস স্কোয়ারের সার্কাসের তাঁবু থেকে বাঘের গর্জন থেকেও তার রেকর্ডের গানের উৎস মনে জাগে। শেষে ভূপর্যটকের কথায় তার সমাধান মেলে। জার্মানে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনে রেকর্ড করা গানের রেকর্ড সেটি। অথচ সেখানেই গল্প শেষ হয় না। পটভূমির যোগসূত্রে নয়, নারায়ণের গল্পের স্বতন্ত্র ঐক্যসূত্রে। সেই মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করা হলেও তাদের আসল রেকর্ড কীভাবে কলকাতার চোরাবাজারের এল, তা নিয়ে ঘোর না কাটতেই বাইরে ছাত্রদের শোভাযাত্রা ক্রমশ প্রবল হয়ে বন্যার আকার ধারণ করে, লাঠি-টিয়ার গ্যাস চলে। তার মধ্যেই গল্পকথক আবার সেই রেকর্ডের উৎস খুঁজে পান। এভাবে বহুমাত্রিক চেতনায় অধ্যাপক-গবেষক ও সমালোচকের চেতনার সংবেদী কবিচিত্তের প্রসারিত দৃষ্টিতে একসূত্রে মালাগাঁথার অনন্যতায় নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের বহুধাব্যাপ্ত ব্যক্তিত্বই তাঁর শিল্পীসত্তাকে উৎকর্ষমুখর পরিণতি দান করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯৫৯-এর ৩১ আগস্টে খাদ্য আন্দোলনকারীদের উপরে পুলিশের নির্মম দমনপীড়নের বিরুদ্ধে বামপন্থী ছাত্র-সংগঠন পরের দিন ১ সেপ্টেম্বর ধর্মঘট ডেকেছিল। সেই লক্ষ্যেই ছাত্রদের শোভাযাত্রা। তখন নারায়ণ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। আর ‘রেকর্ড’ গল্পটি প্রকাশিত হয় ১৩৬৬-এর আশ্বিনে, ‘কমল’ পত্রিকায়। সেটি ‘শুভক্ষণ’(১৯৬০) গল্পগ্রন্থে সংকলিত। অর্থাৎ ‘রেকর্ড’ গল্পটি সেই সময়ের রেকর্ড হয়ে উঠেছে।

লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।

কভার ছবি নবেন্দু ঘোষ, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev