অন্যদিকে সময়ের অনুবাদক হিসাবে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ছোটগল্পে প্রথম থেকেই আত্মসচেতন শিল্পী। সেক্ষেত্রে সময়ের দাবির মধ্যে তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতা নানাভাবেই উঠে এসেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, স্বাধীনতা আন্দোলন, দুর্ভীক্ষ ও বস্ত্রসংকটকালে দেশজুড়ে মুনাফা শিকারী ব্যবসায়ী ও মজুতদার ও অমানবিক প্রশাসনের দানবীয় প্রতাপে শোষিত-শাসিত মানুষের সর্বস্বান্ত প্রকৃতিকে অনুবাদের মাধ্যমে সবুজ করে তুলেছেন নারায়ণ। সেই দুর্বিষহ দুঃসময়ের বাস্তব অভিজ্ঞতার শরিক তিনি। সেখানে তেভাগা আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশভাগের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ থেকে উদ্বাস্তু সমস্যা সবই তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় সংবেদী মানসচেতনায় অনুবাদিত হয়েছে। সেক্ষেত্রে দুঃসময়ই অমানবিক শোষণ-শাসনের সুসময়,তার প্রতিচ্ছবি নানাভাবে উঠে এসেছে। তাতে মানুষের দুঃখকষ্ট, অভাব-অনটনই ব্যবসায়িক মুনাফার শিকার হয়ে ওঠে। নারায়ণের গল্পে তার বাস্তব প্রতিচ্ছবি নানাভাবেই উঠে এসেছে। শুধু তাই নয়, সেক্ষেত্রে তাঁর লেখনী শিল্পীর তুলিতেই নিঃশেষ হয়ে যায়নি, প্রতিবাদী চেতনায় মুক্তির আকাশও দেখানোর ভাষ্য রচনা করেছে। নারায়ণ তাঁর অনুবাদে সংকটকেই তুলে ধরেননি, তা থেকে উত্তরণের দিশাও দেখিয়েছেন, আবার আত্মসমালোচনার মুখোমুখিও করেছেন। ‘নক্রচরিত’, ‘দুঃশাসন’, ‘পুষ্করা’, ‘ভাঙা চশমা’, ‘হাড়’ প্রভৃতি গল্পে তার পরিচয় বর্তমান। দুঃসময়ের ছবি তুলে ধরতে গিয়ে গল্পকার শুধু সমস্যার শাখাপ্রশাখাকে দেখাননি, মূলেও প্রবেশ করেছেন। এজন্য মার্কসীয় শ্রেণিচেতনায় শোষক-শাসকের সঙ্গে শোষিত-শাসিতের ছকবন্দি পথে হাঁটেননি, সাদা-কালোর সরল বিভাজনও করেননি। বরং সেই শোষণ-শাসনের বহুমাত্রিক পরিচয়কে প্রতিতুলনার পরিসরে আত্মসমীক্ষার অবকাশকেও নিবিড় করে তুলেছেন।
সময়ের সঙ্গে শোষক-শাসকের প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়, কিন্তু শোষণ-শাসন একই থাকে। জমিদারী-মহাজনী প্রথার জায়গায় ব্যবসায়ী, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব শ্রীবৃদ্ধি লাভ করে। সেক্ষেত্রে শোষণ-শাসনের ক্ষেত্রও প্রসারিত হয়, শোষক-শাসকের চরিত্রেও আসে বৈচিত্র। ‘নক্রচরিত’-এ গোলাপাড়া হাটের মহাজন একইসঙ্গে আড়তদার, ব্যবসায়ী ও ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট নিশিকান্ত কর্মকারের শোষণ-শাসনের ভয়ঙ্কর প্রকৃতি ও অমানবিক ভণ্ড চরিত্র নক্র তথা কুমির থেকে গলিত গরুর দেহ আগলে ঘেয়ো কুকুরে পরিণত হয়েছে। অথচ নিশিকান্তের বিলিতি লোহার সিন্দুক ভর্তি ডাকাতির ওপরে বাটপাড়ি করা সোনাদানা-ধনদৌলত, ঘোলাভরা ধান উপচীয়মান, আটশ মণ চালের বর্ষায় জলে মণপঞ্চাশেক নষ্ট হয়ে গেছে। অথচ ভিক্ষে করেও খেতে না পেয়ে গ্রামের মতি পালের মৃত্যু হয়েছে, তার স্ত্রীও গলায় দড়ি দিয়েছে। এদিকে অষ্টপ্রহর হরিকীর্তনে মজে থাকা নিশিকান্তের সেকথায় কোনো হেলদোল নেই, বরং বিরক্ত হয়। তার খোঁজ নিতেও অনীহা, আপদ মনে হয়। চৌকিদারও আরও খবর দেয় : ‘শুধু এই একটি বাড়িই নয়, বাবু। এরকম চললে দুমাসে গ্রাম উজাড় হয়ে যাবে। যে আগুন চারদিকে জ্বলছে, কারো রেহাই পাবার জো আছে ! দেখুন না, দু তিন দিনের মধ্যে আরও পাঁচ সাতটা মরার খবর–‘ কথা শোনার ধৈর্য না থাকায় নিশিকান্ত তাকে থামিয়ে দিয়ে মরণশীল মানুষের কথা ফলাও করে বলে। অথচ তাতেও ভণ্ড ধার্মিকের স্বস্তি মেলে না। নিশিকান্তের মনে বাঁশঝাড়ে ভেতর থেকে অসংখ্য মৃতের ছায়ামূর্তি এগিয়ে আসে। এভাবে শোষক-শাসকের মধ্যে ভাবান্তর ঘটানোর মধ্যে গল্পকার তাঁর মূল লক্ষ্যে পৌঁছে যান। মানুষের প্রতি অমানবিক নিষ্ঠুরতা ও উদাসীন নির্মমতায় প্রতিবাদী কণ্ঠ যেখানে নীরবতা পালন করে, সেখানে যেমন শোষণ-শাসন অপ্রতিরোধ্য মনে হয়, তেমনই শাসক-শোষকের মনেই ভয় ও উৎকণ্ঠার আতঙ্ক জাগিয়ে তোলার অবকাশ সক্রিয় হয়ে ওঠে। নারায়ণের গল্পে তার পরিচয় নানাভাবেই উঠে এসেছে।
দুরাচারী শয়তানের যেমন ছলের অভাব হয় না, তেমনই তার পাপবোধ বা ন্যায়বোধের মানসিক দ্বন্দ্ব কতটা স্বাভাবিক, তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থেকেই যায়। অন্যদিকে শোষক-শাসকের বিরোধিতার অভাববোধে তার মনেই ভয়ার্ত স্মৃতি কল্পনায় বা জাগিয়ে তোলার মধ্যে তার অমানবিক প্রকৃতিতে পৈশাচিক আবহ থেকে পাশাবিক প্রবৃত্তিকে নিবিড় করে তুলেছেন গল্পকার। পচা চালের গন্ধের মধ্যে মতি পালের বৌয়ের মৃত্যুদৃশ্য বয়ে বেড়ানো নিশিকান্তের পাশবিক স্মৃতি জাগিয়ে গল্পটি শেষ হয়েছে : ‘শিবপুরের হাট থেকে সে ফিরছিল। চোখে পড়েছিল—মাঠের মাঝখানে একটা গলিত গোরুর দেহ আগলে বসে আছে একটা ঘেয়ো কুকুর ; চারদিক থেকে শকুনেরা উড়ে উড়ে সেই মড়াটাকে ঠোকর মারবার চেষ্টা করছে, আর কুকুরটা অস্বাভাবিক প্রচণ্ড চিৎকার করে ক্ষুধার্ত শকুনগুলোকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।’ যে নিশিকান্ত কর্মকার ডাকাতি করা ধনসম্পত্তি সামান্য টাকায় হস্তগত করে, নিজের সেবাদাসী বিশাখাকে দিয়ে ইব্রাহিম দারোগাকে হাত করে নেয়, ধনের ক্ষুধায় যার রাত্রে ঘুম হয় না, নিজের ইমেজ গড়ে তোলার জন্য হরিকীর্তনের আয়োজন করে, তার চরিত্রের নিপুণতায় লেখকের ক্ষমাহীন দৃষ্টি আপনাতেই পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তার ‘শকুনের মতো চোখদুটো’তেই নয়, গল্পকার কৌশলে আত্মসমীক্ষায় অবকাশে তার আত্মপ্রকৃতিতেও হিংস্র ঘৃণ্য পশুকে আন্তরিক করে তুলেছেন। একই ভাবে ‘দুঃশাসন’ গল্পের কাপড়ের আড়তদার দেবীদাসের পরিচয় উঠে আসে। আলোতে কালো আরও ফুটে ওঠার মতো দেবীদাসের শোষক-শাসক মূর্তিটি তার ভাইপো দরদী মনের অধিকারী গৌরদাসের পাশেই তুলে ধরা হয়েছে। সেখানেও থানাকে হাত করে ব্যবসা চলে। বস্ত্রসংকটের হাহাকারে গ্রামে যখন দিনেই অন্ধকার নেমে আসার জোগাড়, তখন থানার যাত্রা আয়োজনের আলো চোখ ধাঁধিয়ে যায়। বৈপরীত্যের সঙ্গে প্রতিতুলনার মাধ্যমে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্পের অভিমুখ লক্ষ্যভেদী হয়ে ওঠে। রক্তাল্পতায় ভোগা জীর্ণ দেহটির মতো গ্রামটির মধ্যে গৌরদাসের মনে সাদা বাড়ির মধ্যে হাড় জেগে ওঠে, রক্তে রাঙা লাল থানার বাড়িটায় যাত্রার আলোর প্রাচুর্য চোখ জ্বলসে ওঠে। অথচ কেরোসিনের অভাবে অন্ধকারে তলিয়ে গেছে গ্রামটি, আদিমতা ঘিরে ধরেছে, সাপে কাটে, শেয়ালে কামড়ায়। আবার কাপড়ের অভাবে দিনে ঘর থেকে না বেরানো মেয়েরা রাতের অন্ধকারের সুযোগে বাইরে আসে। সেই আলোহীন অন্ধকার পরিমণ্ডলে থানার দারোগাবাবু শচীকান্তের যাত্রার আয়োজন। আসলে সেই আয়োজনের মধ্যেই গল্পকারের প্রয়োজন আরও নিবিড় হয়ে ওঠে। পালার নাম ‘দুঃশাসনের রক্তপান’। সেখানে আধুনিক দুঃশাসনের আত্মসমীক্ষার অবকাশ নিবিড় হয়ে ওঠে। সেই যাত্রাই দেবীদাসকে মানসিক অভিযানে সামিল করে। যাত্রা শুনে ফেরার পথে মুচিপাড়ায় লক্ষণ মুচির খোঁজে গিয়ে কঙ্কালসার বাড়িঘরের বীভৎস ছবিই শুধু নয়, অমানবিক দৃশ্যও চোখে পড়ে। লোকের গলা পেয়ে একটি মেয়ে ঘাট থেকে জল নিয়ে অতিদ্রুত অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। তার শরীরে কোনো কাপড় ছিল না। গৌরদাসের মনে বাংলাকে বিবস্ত্র করার দুঃশাসনের প্রায়শ্চিত্তের কথা উঠে আসে, দেবীদাসের মনে ভয়ের আবহ। গল্পকারের ভাষায় : ‘রাত্রি জাগরণে দেবীদাসের মুখটা অদ্ভুত বিষণ্ণ আর পাণ্ডুর। ওদিকে ফসলহীন রিক্ত মাঠ। তারই ভাঙা আলের ওপর দিয়ে একদল কাজ করতে চলেছে—তাদের ধারালো হেঁসোগুলোতে সূর্যের আলো ঝিকিয়ে উঠছে। অকারণে—অত্যন্ত অকারণে বড় বেশি ভয় করতে লাগল গৌরদাসের। অমন ঝকঝকে করে কেন হেঁসোতে শান দেয় ওরা ?’ সেদিক থেকে যাত্রার আয়োজনের মাধ্যমে দেবীদাসের ভাবান্তরের অবকাশ রচনায় গল্পটি রসোর্তীণ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে নিশিকান্তের চেয়ে দেবীদাসের মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্ব অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।
নারায়ণ তাঁর গল্পে নানাভাবে সময়ের অনুবাদকে নিবিড় করেছেন। সর্বত্র তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রকাশিত হয়েছে। এজন্য শোষক-শাসকের বহুরূপী প্রকৃতিকেই সবুজ করে তোলেননি, সেইসঙ্গে মানবিক মূল্যবোধের আলোয় আত্মসমীক্ষাকেও আন্তরিক করে দেখিয়েছেন। দারিদ্রের সঙ্গে ধনীর বিলাসী আভিজাত্য উঠে এসেছে, মাটিসংলগ্ন অসহায় মানুষের সঙ্গে কল্পনায় গগনবিহারি অতিমানুষের কথাও প্রকট হয়ে উঠেছে। সেদিক থেকে সমাজের প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে উচ্চাসীন অতিমানবীয় ক্ষমতাধরের মাঝে মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত গল্পকথকের সমন্বয়ে ত্রিস্তরীয় সমাজমানসের পরিচয় উঠে আসে। এধরনের গল্প আত্মকথনের ঢঙে লেখা হওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই তার আন্তরিক আবেদন বহুমাত্রিক রূপ লাভ করে। নারায়ণের ‘টোপ’ ও ‘ভাঙা চশমা’ গল্পদুটি তার উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। প্রথমটি তাঁর সবচেয়ে সাড়াজাগানো গল্প। জগদীশ ভট্টাচার্য ‘নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ গল্প’-এ ‘গল্পটি লেখকের শক্তিমত্তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ’ বলেছেন। মানবশিশুকে টোপ বানিয়ে রামগঙ্গা এস্টেটের রাজাবাহাদুরের শিকার করা বাঘের চামড়ার জুতো উপহার পাওয়ার গল্পটির মধ্যে সমালোচক প্রচলিত ধারণার নিষ্ঠুর রসিকতা খুঁজে পেয়েছেন। সমালোচকের ভাষায়, ‘‘টোপ’ গল্পের ব্যঞ্জনায় ‘গরু মেরে জুতো দানে’র রসিকতাটি মর্মান্তিক পরিহাস হয়ে উঠেছে।’ অথচ বিষয়টি সেভাবে গল্পে উঠে আসেনি। সমাজের উচ্চবর্গের মানুষের কাছে নিম্নবর্গের মানুষের পাশবিক অস্তিত্ব থেকে মধ্যবিত্তের অসহায় ও করুণ পরিণতিই গল্পটির উপজীব্য। সভ্যতাগর্বী আধুনিকতায় মানুষের আগ্রাসী ক্ষুধায় শুধু পশুকেই শিকার করেনি, মানবিকতাকেও হত্যা করেছে। এজন্য সভ্যতা যত এগিয়েছে, মানুষে-মানুষে বৈষম্য তত বেড়েছে, ততই মূল্যবোধের অবক্ষয় তরান্বিত হয়েছে। সেখানে উচ্চনিচের ভেদাভেদ যত বেড়েছে, মধ্যবিত্তের সুবিধাবাদী অবস্থান ততই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাজাবাহাদুরের অস্বাভাবিক বিলাসী স্বেচ্ছাচারী বনেদি জীবন। বারো বছরে রাইফেল ধরেছেন, চৌদ্দ বছরেই ড্রিঙ্কে হাতে খড়ি। সেই রাজাবাহাদুরের সঙ্গে আলাপ থেকে তাঁর শিকারের সঙ্গী হয়ে ওঠায় আপ্লুত গল্পকথক কলকাতার সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত। প্রয়োজনে কবিতাচর্চা করেন, রোমাণ্টিক অনুভবে প্রকৃতিপ্রেমিক। আবার রাজন্যপ্রসাদধন্যে দ্বিচারিতায় তার জুড়ি নেই। গল্পকারও তার স্বরূপ উন্মোচনে মুখর : ‘রাজাবাহাদুরকে আমি শ্রদ্ধা করি। আর গুণগ্রাহী লোককে শ্রদ্ধা করাই তো স্বাভাবিক। বন্ধুরা বলে, মোসাহেব। কিন্তু আমি জানি ওটা নিছক গায়ের জ্বালা, আমার সৌভাগ্য ওদের ঈর্ষা। আমি পরোয়া করি না। নৌকা বাঁধতে হলে বড় গাছ দেখে বাঁধাই ভালো, অন্তত ছোটখাটো ঝড়-ঝাপটার আঘাতে সম্পূর্ণ নিরাপদ।’ অন্যদিকে উচ্চবিত্তদের প্রতি দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব না হওয়ায় তাদের প্রতি সম্ব্রম আনুগত্যে মধ্যবিত্তের আত্মসংকট যেমন বেরিয়ে পড়ে, তেমনই মোসাহেবিতে আত্মতৃপ্তি জেগে ওঠে। এজন্য রাজাবাহাদুরের আগ্রাসী শিকারে মানবশিশুকে টোপ করা নিয়ে তার কোনো উচ্চবাচ্য নেই, সেই টোপের শিকারে পাওয়া জুতোর প্রতি তার অমোঘ পরিতৃপ্তি নানাভাবে উঠে আসে গল্পে। সকালে পার্শেল আসার কথায় আনন্দ-উচ্ছ্বাসে গল্পের সূচনা, সমাপ্তিতেও তার পরিতৃপ্তির পরশ, ‘পায়ে দিয়ে একবার হেঁটে দেখলাম, যেমন নরম, তেমনি আরাম।’ শুধু তাই নয়, গল্পকার গল্পকথকের মনের কথাকেও ক্ষমাহীন ভাবে তার আগে ব্যক্ত করেছেন : ‘কীপারের একটা বেওয়ারিশ ছেলে যদি জঙ্গলে হারিয়ে গিয়ে থাকে, তা অস্বাভাবিক নয়, তাতে কারো ক্ষতি নেই। কিন্তু প্রকাণ্ড রয়্যাল বেঙ্গল মেরে ছিলেন রাজাবাহাদুর—লোককে ডেকে দেখাবার মতো।’ চারশো ফুট নীচে কপিকলে সাহায্যে শিশুকে টোপ করা হয়েছে জেনে তার রক্ত হিম হয়ে গিয়েছিল বলে গল্পকথকের দরদী মনটিই বুকে রাজাবাহাদুরের বন্দুকের নল ঠেকতেই নীরবতা পালন করে। অথচ সেই মনেই আটমাস পরে সেই দরদ উধাও, রাজাবাহাদুরের প্রতি কৃতজ্ঞতা ঝরে পড়ে। তার মনে হয়েছে, ‘সে রাত্রি এখন স্বপ্ন হয়ে যাওয়াই ভালো, কিন্তু চটিজোড়া অতি মনোরম বাস্তব।’ মধ্যবিত্তের এই পলায়ন প্রবৃত্তি নারায়ণের ‘ভাঙা-চশমা’ গল্পে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।