দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আবহে দুর্ভীক্ষপীড়িত দেশে কণ্ট্রোল ও কালোবাজারে বিপর্যস্ত জনজীবনে বেঁচে থাকার লড়াইয়ের মধ্যেও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের প্রবাহেই সর্বস্ব হারিয়েও একজন গ্রামের মাইনার স্কুলের হেডমাস্টার আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখার প্রাণপণ প্রয়াসের সামনে পড়ে মফঃস্বল শহরের ষাট টাকা মাইনের শিক্ষকতা থেকে বেশি মাইনের অস্থায়ী সাব ডেপুটি গ্রেডের হাকিমের আত্মসমালোচনাই ‘ভাঙা-চশমা’ গল্পে নিবিড় হয়ে উঠেছে। একদিকে কম মাইনের জন্য হীনমন্যতাবোধে পীড়িত শিক্ষক, অন্যদিকে স্কুলের অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার পরেও পুনরায় স্কুলের স্বপ্নে বিভোর হওয়া হেডমাস্টার সাধারণের চোখে পাগল। সেই হেডমাস্টারের কাচ ভাঙা চশমার ভিতরে দুটি অপ্রকৃতিস্থ চোখে স্কুলের স্বপ্ন জেগে আছে। এজন্য দিনরাত এক হয়ে ওঠে। নতুন করে স্কুল খোলার আশায় রাতেই হাকিমকে স্কুল পরিদর্শনে নিয়ে যেতে তিনি নাছোড় হয়ে ওঠেন। হাকিমের দাম্পত্যের সুখস্বপ্নের আচ্ছন্নতায় সেই হেডমাস্টার ক্রমশ দুঃস্বপ্ন হয়ে ওঠে। অবশেষে পরিদর্শনে হাকিমের আত্মদর্শন হয়ে যায়। দুর্ভীক্ষের গ্রাসে সর্বস্বান্ত হয়েও কঙ্কালসার স্কুল আঁকড়ে থাকা হেডমাস্টার তাঁর শিক্ষকতার যোগ্যতা দিতে কবাটশূন্য জানালার দিকে তাকিয়ে ইংরেজির ক্লাস শুরু করেন। সারাজীবন তিল তিল করে গড়ে তোলা স্কুলটি ঘিরেই তাঁর স্বপ্ন আবর্তিত হয়েছিল। স্ত্রীর হারের টাকায় স্কুলের চালা উঠিয়ে ছেলেদের লেখাপড়া শিখিয়ে হেডমাস্টার হতে চেয়েছিলেন তিনি। সেই হেডমাস্টারের ‘দরদভরা গলা’য় ইংরেজি ক্লাসের গভীর তন্ময়তা অস্থায়ী হাকিমকে জাগিয়ে তোলে। সংযত হতে না পেরে পলায়নের পথ প্রশস্ত হয়ে ওঠে। গল্পকথক নিজেই সেই হাকিম। ‘চোরের মতো’ পালানোর পথেই তার মনে হয় : ‘মনে হল বিদ্যার এই তীর্থে আমার থাকবার অধিকার নেই—আমার ছোঁয়াতেও এখানকার সব কিছু শুচিতা মলিন হয়ে যাবে। আমি ব্রতচ্যুত, লোভী, স্বার্থপর।’ শুধু তাই নয়, আত্মসমালোচনায় গল্পকথকের মধ্যেও গল্পকারের নির্মোহ অথচ অকরুণ দৃষ্টি প্রতিফলিত হয়েছে গল্পের শেষ বাক্যে, ‘হেডমাস্টারের মন্ত্র-উচ্চারণের মতো টানা কণ্ঠস্বর দূরে অস্ফষ্ট হয়ে এল, আর নদীর ওপারে কাশবনের মধ্যে তারস্বরে চীৎকার করে উঠল শেয়াল।’ দেশের যুদ্ধবিধ্বস্ত দুর্ভীক্ষপীড়িত আবহে আদর্শের ভাষা মিলিয়ে যায়, জেগে ওঠে পাশবিক ঐকতান। সেখানে নারায়ণের লেখনী তুলির পরশে ছবি আঁকে, আত্মসমালোচনায় ভাষা জুগিয়ে চলে। সেখানে তাঁর লক্ষ্যে স্বরচিত আদর্শই প্রতিফলিত। মহৎ বিশ্বাসে উপন্যাসের জন্ম আর অবিশ্বাস থেকে ছোটগল্পের। নারায়ণ তাঁর ‘সাহিত্যে ছোট গল্প’-এ তার বিশদ আলোচনাও করেছেন। তাঁর কথায়, ‘আধুনিক ছোট গল্প হল যন্ত্রণার ফসল।’ সেক্ষেত্রে ছোটগল্পের সমাপ্তিতেও গল্পকার লক্ষ্যভেদী প্রয়াস বর্তমান। নারায়ণের কথায় : ‘সে একাঘ্নী বাণ। স্থির লক্ষ্যে, বিদ্যুৎগতিতে, একটি ভাবপরিণামকে মর্মঘাতীরূপে বিদ্ধ করতে পারলেই তার কর্তব্য শেষ—তার গঠনের ইতরবিশেষে খুব বেশি কিছু আসে যায় না।’ সেদিক থেকে ‘মর্মঘাতী’ ভাষায় নারায়ণের লেখনীর ক্ষমাহীন বাক্যবাণ সর্বদা সচল ও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সেখানে শোষক-শাসকের বিচিত্র রূপের পরিচয়ে তাঁর বহুমুখী বিস্তার লক্ষ করা যায়। প্রচলিত মত বা পথের ছকবন্দি নয়, বরং বিচিত্র ভাবে বহুরূপী শোষক-শাসকের পরিচয়কেও তিনি নিবিড় করে তুলেছেন। ‘একটি শত্রুর কাহিনী’ তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
দেশের পরাধীনতায় ইংরেজদের শোষক-শাসক মূর্তিটি এদেশীয় মানসে স্বাভাবিক ভাবেই জেগে ছিল এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও তা সমানসচল। অথচ বিদেশিদের শত্রুতার পাশে আন্তরিক মিত্রতাও ছিল, স্বদেশীয়দের মধ্যে ঘোর শত্রুও বর্তমান। আর তা নিয়ে লেখা ‘একটি শত্রুর কাহিনী’ গল্পটিতে আসলে আমাদের শত্রুমিত্রের মূল্যায়নের সরলীকরণের প্রতিই গল্পকার আঘাত হেনেছেন। এদেশের ‘প্যাগান আর হিদেনগুলো’র মধ্যে খ্রীস্টধর্মের প্রচারে এসে কুড়ি বছর কাটিয়ে দিয়েও পাদ্রী ডোনাল্ড্স্ প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। অন্যদিকে রোগব্যাধিতে জর্জরিত হয়ে অকালবৃদ্ধ হয়ে পড়েছে। ধুলো-কাদাময় কাঁকড়বিছানো দেশটির প্রতি ভালোবাসা তো জন্মায়নি, উল্টে ব্যর্থতায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছে। তুরী, মুণ্ডা আর সাঁওতাল অধ্যুষিত এলাকায় তার শিষ্য বলতে ডোঙা সাঁওতাল যার পরিবর্তিত নাম জোসেফ ইমানুয়েল, লোকে ডাকে জোসেফ ডোঙা। যতই সে ‘ডোঙা’র লেজুর বাদ দিতে চায়, ততই লোকের মনে তা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। ছোট ছেলেদের দলের মুখে ‘ডোঙা ডোঙা, ঠোঙা ঠোঙা’র চীৎকার তার কাছে দুঃস্বপ্ন মনে হয়। সে আপাদমস্তক বিদেশি পাদ্রী হতে চায়। অন্যদিকে ডোনাল্ডের সংকটে তার কাজে সহায়তা করতে আসে পাদ্রী হ্যান্স। জাতে জার্মান, বয়েস তেইশ-চব্বিশ। পাদ্রীর পোশাকটি তার ছদ্মবেশ মনে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্রটি ভারতকে ভালোবেসেছিল ম্যাক্সমুলারের বই পড়ে। এদেশ প্রত্যক্ষ করে যত দেখে ততই আরও বিমুগ্ধ হয় যা ডোনাল্ডের পক্ষে তিক্ততায় বিরূপ হয়ে ওঠে। দুদিনেই হান্স এদেশের আপন হয়ে ওঠে, আত্মীয় বোধ করে। এতে ডোনাল্ডের সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও তলানিতে যায়। হ্যান্স যত পুতুলপূজার দেশের লোক হয়ে ওঠে, ততই ক্রুশের আশ্রয়হীনতা অনিবার্য হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জার্মান ইংল্যান্ডের শত্রু। অতএব হ্যান্সকে শত্রু সাব্যস্ত করা সহজ হয়ে ওঠে। শিবের গাজন মেলায় শিবনৃত্যে মশগুল অবস্থায় সে বন্দি হয়। তার মূলে যে পাদ্রী ডোনাল্ড ও জোসেফ ডোঙা রয়েছে, তাও বুঝতে তার অসুবিধা হয় না। এইসময় ইংল্যান্ডের জয়ের জন্য কালীপূজা হচ্ছিল। সেই কালীমূর্তির মুণ্ডুকে ফ্লাক্সের আঘাতে চুরমার করে তার জবাব দেয় হান্স। তার কথায়, ‘নাউ আই অ্যাম এ ট্রু এনিমি অ্যান্ড এ ট্রু য়ুরোপীয়ান।’ পুতুল পূজার দেশটিকে ঘৃণা করেই এদেশে খ্রীষ্টধর্ম প্রচার, এদেশকে পরাধীন রেখে শোষণ-শাসন করে ইংল্যাণ্ডের শ্রীবৃদ্ধি। সেই দেশের যুদ্ধজয়ের জন্য এদেশের কালীপূজার আয়োজন। সেই মূর্তিকে ভাঙার মধ্যেও হ্যান্স ভারতের শত্রু নয়, মিত্রের উপযুক্ত কাজই করেছে। সেজন্য তার উক্তির অব্যবহিত বাক্যেই প্রশ্ন উঠে আসে, ‘অ্যাম আই নট ?’ সেক্ষেত্রে দেশের শত্রুর পরিচয়ে গল্পটির অনন্যতা সুদূরপ্রসারী প্রাসঙ্গিকতা লাভ করে। একইভাবেই আধুনিক সভ্যতাগর্বী চেতনাতেও নারায়ণের একাঘ্নী বাণ লক্ষ্যভেদী হয়ে উঠেছে। ‘সৈনিক’ গল্পেই তার পরিচয় বর্তমান।
বরেন্দ্রভূমির কুমারদহ গ্রামের দেবীকোট রাজবংশের উত্তরপুরুষ চন্দ্রচৌধুরীর বাহন নীলবাহাদুর নামক বৃদ্ধ হাতির সৈনিক হয়ে উঠার গল্পটিতে নতুন যুগের আগমনে পুরনো ঐতিহ্যও বাতিল হয়ে পড়ে। চন্দ্রচৌধুরীর মৃত্যুর পরে তাঁর উত্তরসূরী ইতিহাসে এম এ ইন্দ্র চৌধুরীর নতুন বাহন বেবি অস্টিন হওয়ায় নীলবাহাদুরের প্রতি বিরূপতা আরও তীব্র আকার ধারণ করে। প্রয়োজন কমলে আদরও কমে যায়। আর তা নিঃস্ব হয়ে পড়লে তা বোঝা মনে হয়। সেদিক থেকে নীলবাহাদুর ইন্দ্র চৌধুরীর কাছে অসহ্য হয়ে ওঠে। তার আগে পালগ্রামের অনুর্বর অহল্যাভূমিতে বসতি গড়ে তোলা যাযাবর সাঁওতালদের মাদলের ধ্বনিতে হাতিটি তার অরণ্যের পরশ পেয়েছিল। সেখানে অরণ্য মানুষ আর অরণ্য পশুর মধ্যে সখ্যতাও গড়ে ওঠে। যেখানে বাঘ আর ডাকাতের ভয়ে লোকে চলাচল করত না, সেখানে জনবসতি গড়ে ওঠে, ফসলে ফলে। এজন্য সাঁওতালদের চন্দ্র চৌধুরীরও মনে ধরে, খাজনাও মুকুব করে দেন। অথচ ইন্দ্র চৌধুরীর ঐতিহাসিক দৃষ্টি পড়ে পালগাঁয়ের টিলায়। সেই টিলার খননের জন্য তিনি মেতে উঠে সাঁওতালদের তাড়িয়ে দেওয়ার আয়োজনে ঘৃণার পাত্র হয়ে ওঠে নীলবাহাদুরকেই সৈনিক করে তোলেন। তিন দিন অনাহারে রেখে তাকে আদিম হিংস্রতায় খেপিয়ে তোলে তারই হার্দিক সম্পর্কে বিজড়িত সাঁওতালদের বিরুদ্ধে। তাদের ছোড়া বিষাক্ত তীরেই নীলবাহাদুর বিদ্ধ হয়, প্রাণত্যাগ করে। মৃত্যুর আগে বেবি অস্টিনটিকেও পিষে ভেঙে ফেলে সে। নীলবাহাদুরের ইন্দ্র চৌধুরীর অমানবিকতাকে আঘাত করতে না পারলেও নিজে প্রিয় সাঁওতালদের তীরে ক্ষতবিক্ষত হয়েও যান্ত্রিক জানোয়ারকে বিরাট শরীর দিয়েই পিষে মেরেছে। সে যে আদ্যিকালের সংশপ্তক। গল্পকার নীলবাহাদুরের মাধ্যমে নতুন যুগের মানবিক মুখোশে পাশবিক বিকারকেই সমূলে উৎপাটন করেছেন। সেখানে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘আদরিণী’র আত্মিক দরদ নয়, বরং নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ‘সৈনিক’-এ সভ্যতাগর্বী মানুষের মানবিক সংকটকেই প্রকট করে তুলেছেন। সময়ের পরতে পরতে শোষণ-শাসনের রূপ-রঙ পাল্টে যায়, মূল্যবোধের অবক্ষয় তীব্র হয়ে ওঠে।
আধুনিক পরিসরে বিত্তের আরাধনায় চিত্তের সংকীর্ণতা গতি লাভ করে। পণ্যায়ণের পৃথিবীতে বিপন্ন মানবতাবোধ। সেখানে সেবা মিলে যায় পরিষেবায়, সর্বত্র ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ক। সেই দুঃসময়ে এদেশেও তার বিস্তার ঘটে। অভাব-অনটনে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটে। জেগে ওঠে মুনফালোভী ব্যবসায়ীর পৈশাচিক দৃষ্টি। ‘তীর্থযাত্রী’ গল্পের নরোত্তম ঠাকুর তারই প্রতিনিধি। অনাহারক্লিষ্ট বাংলায় অসহায়তার সুযোগে তেরো থেকে ত্রিশ বছর বয়সী মেয়েদের তীর্থযাত্রার লোভ দেখিয়ে তাদের পাচারের অসাধু ব্যবসায় নরোত্তমের ভণ্ডামির শেষ নেই। মেয়েদের পুণ্যবোধের আধারেই তার ভোগ্যপণ্যের চেতনা বিস্তার লাভ করে। অবশ্য সেই নরাধমের উদ্দেশ্য সফল হয় না। নৌকা থামিয়ে মুসলান পাইকার গোলাম মহম্মদের হাতে ঘরে ফেরার জন্য কান্নাকাটি করা কমবয়সী মেয়ে সুখীকে তুলে দিয়ে এসে সে কুমীরে নিয়ে যাওয়ার গল্প ফাঁদলেও নৌকার প্রধান মাঝি ফরিদের কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে। সে নরোত্তমের ব্যবসার সবই জানত। কুমীরের গল্প শুনেই ফরিদ তার লগির ধারালো খোঁচায় নরোত্তমের চোখে আঘাত করে। শুধু নরোত্তমেই নয়, সেই খোঁচা মূল্যবোধের ক্ষরণেও পাঠকমনে এসে লাগে। ফরিদের প্রতিবাদেই মানবতীর্থের পরিচয় উঠে আসে। নরোত্তমের ভয়ঙ্কর মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে ফরিদ বলে ওঠে : ‘এতখানি সহ্য হয় না ঠাকুরমশাই। না খেয়ে মরে তো মরুক, তবু গাঁয়ের মেয়ে গাঁয়েই ফিরিয়ে নিয়ে যাবো।’ অন্যদিকে নরোত্তমের ফাঁদা গল্পের সেই কুমীরই জীবন্ত হয়ে তাকেই ধরবার আয়োজনে গল্পকারের ক্ষমাহীন প্রকৃতি সবুজ হলেও আরোপিত মনে হয়। অবশ্য ফরিদের প্রতিবাদের মধ্যেই গল্পটির আবেদন লক্ষ্যভেদী হয়ে উঠেছে। সেদিক থেকে সময়ের অনুবাদে নারায়ণের গল্প শুধু অনুবাদই হয়েই থাকেনি, সামাজিক দায়বদ্ধতার উত্তরণের দিশাতেও সমান সক্রিয় থেকেছে। মানসিক আতঙ্কের জাগরণ থেকে প্রতিবাদের সক্রিয়তায় নারায়ণের গল্পগুলি সাময়িকতার গণ্ডিকে অনায়াসেই অতিক্রম করে চিরন্তন আবেদনে সামিল হয়েছে। সময়ের অনুবাদই তার উত্তরণের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে রেখেছে যা ছোটগল্পের সাময়িক মানচিত্রকে মনচিত্রে সংলগ্ন করে রাখে।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।