নারায়ণের সংবেদী চেতনায় তাঁর ছোটগল্পে সময়ের প্রতিফলন স্বাভাবিক ভাবেই নিবিড়তা লাভ করে। সেখানে ছোটগল্পের দিগন্তবিস্তারী প্রকৃতি। কত বিষয়ই সময়ের তপ্ত আবহাওয়ায় আবেদনমুখর হয়ে উঠেছে, তার ইয়ত্তা নেই। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা (‘ইজ্জত’), দেশবিভাগের বেদনা (‘তিতির’ ও ‘সীমান্ত’), উদ্বাস্তু সমস্যা (‘বাইশে শ্রাবণ’, ‘শ্বেতকমল’, ‘শুভক্ষণ’, ‘মধুবন্তী), বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন (‘নতুন গান’), তেভাগা-তেলেঙ্গানার কৃষক আন্দোলন (‘বন্দুক’) প্রভৃতির সাময়িক প্রতিচ্ছবি নারায়ণের গল্পে আবেদনক্ষম হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, তাঁর বিচিত্র প্রকৃতির গল্পের ভাণ্ডারে বিষয়-আঙ্গিকেরও অভাব নেই। বহুমাত্রিক তার আবেদন, বহুব্যাপ্ত তার পরিসর। আলোচিত গল্পের বাইরেও তাঁর অসংখ্য গল্প বিষয়গৌরবে উল্লেখের দাবি রাখে। শ্রেণিবৈষম্যমূলক শোষণ (‘তৃণ’, ‘ভোগবতী’, ‘ডিম’), মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্বমুখর জটিল-কুটিল রূপ (‘দুর্ঘটনা’, ‘ফলশ্রুতি’, ‘আত্মহত্যা’, ‘হরিণের রঙ’, ‘একজিবিশন’, ‘আত্মহত্যা’, ‘বনতুলসী’), প্রেম ও রোমান্স (‘বন-জ্যোৎস্না’, ‘কনে-দেখা আলো’, ‘জান্তব’, ‘ঘাসবন’), ইতিহাস (‘একটি অমর রাত্রি’, ‘উস্তাদ মেহের খাঁ’), মনুষ্যেতর প্রাণী (‘লালঘোড়া’,’সৈনিক’) প্রভৃতি নানা বিষয়েই নারায়ণের অবাধ বিস্তার। আবার গল্পকার নারায়ণের আঙ্গিকেও বৈচিত্র্য বর্তমান। চিঠি (‘শুভক্ষণ’, ‘একটি চিঠি’, ‘মাননীয় পরীক্ষক মহাশয়’), ভাষণ (‘শ্রীযুক্ত গোপীবল্লভ কুণ্ডু’, ‘কালপুরুষ’) বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আন্তরিক প্রকাশ (‘হাড়’, ‘টোপ’, ‘লালঘোড়া’ ‘ডিনার’) প্রভৃতি বিচিত্র আঙ্গিকের ব্যবহার লক্ষণীয়। অন্যদিকে ভাষার ক্ষেত্রেও গল্পকারের কাব্যিক প্রকাশ সহজাত। সেখানের গদ্যের ঋজু চলনের মধ্যেই কাব্যিক দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ে। এবিষয়ে নারায়ণ যা বিশ্বাস করতেন, তাঁর সৃষ্টিতে তারই প্রকাশ করেছেন।
‘ছোটগল্পের সীমারেখা’য় তিনি জানিয়েছেন : ‘কবিতাকে ছাড়িয়ে যেমন করে ভাবের মুক্তি ঘটে যায় সংগীতের অসীমে, গল্পও সেইভাবে তার বস্তুভার থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে যায় কবিতার প্রমুক্ত অঙ্গনে। গল্প মাটিতে দাঁড়িয়ে দৃষ্টি মেলে দেয় আকাশের নক্ষত্রলোকে, কবিতা সেই আকাশেই উদ্বারিত হয়ে যায়।’ নারায়ণের গল্পেও তার পরিচয় বিদ্যমান। অথচ তাঁর গল্পের কাব্যিক প্রকাশে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব নেই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গল্পের প্রয়োজনে যে স্বরচিত ভাষা গড়ে তুলেছিলেন, তাতে কাব্যিক প্রকাশ নানাভাবেই স্বমূর্তি ধারণ করেছে। সেখানে নারায়ণের গল্পের ভাষায় ভাবের ব্যঞ্জনায় কাব্যিক দ্যুতি বহুমাত্রিক হয়ে উঠলেও রবীন্দ্রনাথের মতো কাব্যিক প্রকাশ নেই। আসলে রবীন্দ্রনাথের ভাষার সঙ্গেই কাব্যিক প্রকাশ যেভাবে বিজড়িত, নারায়ণের ভাবের মাধ্যমে ভাষায় তার আগমন। একের আত্মিক প্রকাশ, অন্যের প্রকাশে আত্মিক্কতার যোগসাধনের প্রয়াস। নারায়ণের ছোটগল্পের ধারণার মধ্যেই তা প্রতীয়মান।
ছোটগল্পের শিল্পরূপ নিয়ে নারায়ণের তন্বিষ্ট চিন্তাভাবনা তাঁর শিল্পিসত্তা থেকে গবেষক-সমালোচক সত্তায় প্রকট হয়ে উঠেছে। প্রকাশের বহুমাত্রিক চেতনায় ছোটগল্পের সাময়িক আবেদন গল্পকারের মানসগঠনের সঙ্গে অন্বিত। সেখানে ছোটগল্পের সাময়িক আবেদনই চিরন্তনতা লাভে নন্দিত হওয়ার অবকাশ পায়। নারায়ণের কথাতেই তা উঠে এসে এসেছে। ‘ছোটগল্পের সীমারেখা’য় তিনি জানিয়েছেন : ‘ছোটগল্প গড়ে উঠেছে দুটি জিনিসের মিশ্রণে। লেখকের নিজস্ব একটি জগৎ-জীবন মানববোধ আছেই—profound হোক আর নাই-হোক, তা-ই হল তাঁর দর্শন। আর জীবন থেকে নিজস্ব প্রবণতা-অনুযায়ী যেসব উপকরণ তিনি আহরণ করে নিচ্ছেন, তারা সেই দর্শনের দ্বারা বিরঞ্জিত হয়ে শিল্প হয়ে উঠেছে। তাই একালের ভালো গল্প কেবল কৌতূহল-সৃষ্টির জন্যে ঘটনা নির্মাণ করছে না, কোনো বিশেষ বক্তব্য প্রচারের জন্য গল্পকে বাহন করছে না (বক্তব্য তো লেখকের জীবন-দৃষ্টি থেকে স্বয়ং প্রকটিত হবে), আসলে তার একটিমাত্রই প্রবণতা। তা বস্তুনির্ভর হয়েও বাস্তবাতীত, তা দুরাচারী, তা প্রতীকী।’ নারায়ণের গল্পেই সেই ‘প্রবণতা’ই প্রকট রূপ লাভ করেছে। দেখা সেখানে শুধু চোখের পলকে দেখা নয়, খুঁটে খুঁটে নিবিড়ভাবে দেখা বা লক্ষ করা। আর তা দেখানোর জন্যই শিল্পকৌশলের সক্রিয় আয়োজন।

এজন্য নারায়ণের গল্পের উপস্থাপনাপ্রকৌশলে নাটকীয়তার সমাবেশ, সংলাপের প্রাচুর্য, মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্বের অবাধ বিচরণ, ঘটনার আকস্মিকতা, উপমা-রূপকের বিস্তার এবং লক্ষ্যভেদী গতি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে নিজস্ব প্রবণতা অনুযায়ী গ্রহণের মাত্রায় প্রকাশিত শিল্পরূপের বৈচিত্র যেমন স্বাভাবিক, তার আবেদনের গ্রহণযোগ্যতাও প্রত্যাশিত। সেখানে গল্পকারের মনের শিল্পরূপে প্রস্ফুটিত চেতনার সৌরভ যেমন বাঞ্ছনীয়, তেমনই তা বিশ্বস্ত হয়ে ওঠাটাও জরুরি। অনেকক্ষেত্রে গল্পকারের স্বরচিত শিল্পরূপে সেই বাস্তবতা বিষয়ে বিশ্বস্ততার অভাব স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে আরোপিত চেতনায় রসক্ষরণ ব্যাহত হয়। শুধু তাই নয়, গল্পের সমাপ্তিতে ‘একাঘ্নী বাণ’ও লক্ষ্যভেদ করে না। লেখকের কল্পনাবিশ্বে তা সত্য হলেই হয় না, শিল্পরূপেও তা বিশ্বস্ত হয়ে ওঠা চাই। নারায়ণের গল্পেও তার পরিচয় বর্তমান। তিনিও সেবিষয়ে প্রখর আত্মসচেতন ছিলেন বলেই মনে হয়।
সব ফুলে মালা হয় না, আবার সব ফুল পুজোতেও লাগে না। সব গল্প উপাদেয় হয় না, সবগুলির আবেদনও থাকে না। আবার সবার আবেদন প্রকৃতিও একরকম হয় না। এজন্য নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ভালো-মন্দ মিশিয়েই গল্পবিশ্বকে আপন করার পক্ষপাতী। ‘সাহিত্যে ছোটগল্প’-এ এবিষয়ে তিনি স্পষ্টবাক্মূর্তি। বইটির শেষে এবিষয়ে আলোচনাও করেছেন। তাঁর অমোঘ উচ্চারণ : ‘পৃথিবীর দিকে দিকে দেশে দেশে আজ শত-সহস্র ছোট গল্প রচিত হচ্ছে। কিন্তু তাদের মাত্র কয়েকটিই আমাদের সংজ্ঞা ও সূত্র অনুযায়ী প্রথম শ্রেণীর শিল্প হিসেবে কৃতিত্ব দাবি করতে পারে। তার জন্য অবশ্যই ক্ষুণ্ণ হওয়ার কোনো কারণ নেই। ….যে কোনো মহান্ সৃষ্টিই ‘কোটিকে গুটিক’—তারা সাধারণ ধর্মের ব্যতিক্রম। সেইজন্যই আমরা ‘সু-গল্প’ পেলেই খুশি হব—‘মন্দ নয় গল্পে’ও আপত্তি করব না।’ ছোটগল্প নিয়ে নারায়ণের গভীর মনীষাই তাঁকে আজীবন সৃষ্টিশীল রেখেছিল। লিখেওছেন অজস্র। ‘মহান সৃষ্টি’র না হলেও ‘সু-গল্প’-এর স্বপ্ন নিয়ে। সে স্বপ্ন যে তাঁর অসফল হয়নি, বিচিত্র প্রকৃতির গল্পেই তা প্রতীয়মান। অন্যদিকে বাংলা ছোটগল্পের ভগীরথ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সগৌরবে স্মরণ করেছেন।
তাঁর কথায় (‘সাহিত্যে ছোটগল্প’), ‘ঐতিহাসিক ভাবে না হোক, সাহিত্যিকভাবে বাংলাদেশে আধুনিক ছোট গল্পের প্রবর্তক রবীন্দ্রনাথ। তাঁর অনেক ক’টি গল্পই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কথা-সম্ভারের সঙ্গে সমমর্যাদা দাবি করতে পারে।’ শুধু তাই নয়, বাংলা উপন্যাসের দৈন্যও তার ছোটগল্প মিটিয়ে দিয়েছে বলে তাঁর ধারণা। সেক্ষেত্রে তাঁর সমকালীন ছোটগল্পকারদের ফসল তাতে আবেদনক্ষম। আর সেখানেই নারায়ণের গল্পের স্বতন্ত্র প্রবাহ দ্রুততার সঙ্গেই সমুদ্রগামী নদী হয়ে উঠেছে। সেই নদীর দুইধারে সৃষ্টির সোনালি ফসল কত ভাবেই না সময়ের নামাবলি পরে সময়ান্তরে নিয়ে চলে, তার ইয়ত্তা নেই। নারায়ণের বহুধাব্যাপ্ত ব্যক্তিত্বের পরশে তার বর্ণরঙিন আলো আজও বিস্ময় জাগায়, ভাবিয়ে তোলে, মানসলোককে উদ্দীপ্ত করে। অন্যদিকে ছোটগল্পকে দেখার চোখও গড়ে তোলায় তাঁর অবিসংবাদিত ভূমিকাও অনস্বীকার্য। স্বাভাবিক ভাবেই বাংলা ছোটগল্পের সঙ্গে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের শিল্পী থেকে শিল্পের গবেষক-সমালোচকের অপূর্ব সংযোগ শুধু বাঙালিমানসে সেতু হয়ে ওঠেনি, মর্মসহচরীও করে তুলেছে। যেখানে জীবনের গল্পে জীবনকেই নতুন করে চেনায়, জীবনের ফাঁকেই তার ফাঁকি উঠে আসে, ফাঁকিতে ফাঁকটাই ভাবিয়ে তোলে। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় যে নিছক গল্প লিখতে চাননি, ভাবাতেই চেয়েছিলেন আমাদের!
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।
কভারের ছবি নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ও তাঁর সৃষ্ট চরিত্রের আসল মানুষ পটলডাঙার টেনিদা।