কেন্দ্রীয় সরকারের দাবী, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সবচেয়ে খারাপ সময় পেরিয়ে এসেছে দেশ। কয়েক দিনব আগে যে ভয়ংকর পরিস্থিতি হয়েছিল সেই অবস্থা অনেকটাই কেটে গিয়েছে। বুধবার ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ-এর ডিরেক্টর জেনারেল বলরাম ভার্গব বলেছেন, দেশের অন্তত সাড়ে ৩০০ জেলায় সংক্রমণের হার ৫ শতাংশের নীচে। ১৪৫ জেলায় সংক্রমণের হার ৫ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে। তবে এখনও ২৩৯টি জেলা রয়েছে, যেখানে সংক্রমণের হার ১০ শতাংশের বেশি।
এর ঠিক পাশের ছবিটি জানাচ্ছে এই অর্থবর্ষে যে হারে দেশের জিডিপির সংকোচন হয়েছে তা বিগত চল্লিশ বছরে প্রথমবার। অবশ্য কেন্দ্রের মোদি সরকার আগেই সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ সংকোচনের মুখে পড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। করোনার প্রথম ধাক্কাতেই দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছিল। জিডিপি এক ধাক্কায় কমে গিয়েছিল ২৪ শতাংশ। তখন সংকোচন হার ছিল ৭.৪ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্বিতীয় ঢেউয়ের থাবায় ফের মুখ থুবড়ে পড়েছে অর্থনীতি। অন্যদিকে সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি-র প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক রিপোর্ট বলছে, করোনাকালে দেশে চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ১ কোটি মানুষ। আয় হ্রাস পেয়েছে ৯৭% পরিবারের।
কিন্তু দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশবাসীদের উদ্দেশে তার নিয়মিত রেডিও ভাষণে বলছেন, ভারতীয়দের ‘দুঃখ সহ্য করার ক্ষমতা কতটা’ করোনা এখন তারই পরীক্ষা নিচ্ছে। অথচ ভারত, পাকিস্তানের থেকে অনেক পরে স্বাধীন হওয়া প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ করোনা কালেও কিন্তু থেমে নেই। তাদের অর্থনীতি ক্রমেই এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশ যেভাবে আর্থিক দিক থেকে এগিয়েছে, তাতে পাকিস্তানকে পিছনে ফেলে দিয়েছে। কয়েকদিন পরে হয়তো ভারতকেও পিছনে ফেলে দেবে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন ২০৩০ সালে হয়ত বাংলাদেশ থেকে সাহায্য নিতে হবে পাকিস্তানকে। হাসিনার থেকে মোদীর শিক্ষা নেওয়া উচিত বলেও অনেকেই মন্তব্য করেছেন।
করোনা ঠেকাতে লকডাউনের প্রথম ধাক্কাতে দেশে বেকারত্বের হার বেড়েছিল ২৩ শতাং। লকডাউন ঘোষণার পর হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিককে কর্মক্ষেত্র ছেড়ে রাস্তা হেঁটে বাড়ির পথে দেখা গিয়েছিল। সেই ঘটনা যে অর্থনীতিতেও ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলতে পারে, তার আঁচ পাওয়া গেল বেকারত্বের হিসেবে। লকাডাউনের জেরে বগত বছর এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ শতাংশ। অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান বা বেকারত্বের হার নির্ধারণ হয় লেবার পার্টিসিপেশন রেট বা শ্রমিকদের কাজে অংশ নেওয়ার হার দিয়ে। সেই হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারিতে যেখানে কাজে নিযুক্ত ছিলেন ৪১ কোটি ১০ লক্ষ মানুষ। মার্চে এসে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৯ কোটি ৬০ লক্ষে।
করোনার জেরে গত বছর এপ্রিল থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত দেশে কাজ হারিয়েছিল মোট ১ কোটি ৮০ লক্ষ বেতনভুক কর্মী। তার মধ্যে শুধু জুলাইয়ে চাকরি খুইয়েছিল ৫০ লক্ষ মানুষ। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে যে আরও অনেক বেশি মাসুল দিতে হবে সে কথা বলাই বাহুল্য। কিন্তু ভয়ঙ্কর অবস্থাটা কি কোনওভাবেই এড়ানো যেত না? যেত যদি কেন্দ্র সরকার প্রথম ঢেউয়ের থেকে শিক্ষা নিয়ে তৈরি থাকত। প্রথম ঢেউ বহু জীবন ও জীবিকা কেড়েছিল। দরিদ্রের তালিকায় অন্তত সাড়ে সাত কোটি মানুষের নাম নথিভুক্ত হয়েছিল। তারপরও দোকানপাট বাজার খুলতে একটা আশার আলোও দেখা দিয়েছিল। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউ যে আছড়ে পড়বে সেকথা জেনেও মোদি ও তার সরকার তৈরি থাকার বদলে ভাষণ আর লাগামহীন আচরণে প্রমাণ করতে চাইল যে তারা দেশ থেকে কোভিড বিদায় করেছেন।
কুম্ভ নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আগ বাড়িয়ে বলে দিয়েছিলেন এই মেলা কোনও ভাবেই বন্ধ করা তো সম্ভব নয়ই, এমনকি, কোনও ভাবেই কাটছাঁট করাও উচিত নয়। বাংলা-সহ অন্যান্য ভোট রাজ্যে কেন্দ্রীয় নেতা মন্ত্রীদের নিত্য যাতায়াত যেভাবে বেড়ে গেল রাজনৈতিক প্রচারে অংশগ্রহণকারীদের মাস্ক ছাড়া যেভাবে অবাধ বিচরণ বেড়ে গেল, তাতে যারা প্রশ্ন তুললেন তাঁদের প্রশ্নের উপরেই প্রশ্নচিহ্ন বসে গিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী বলেন তিনি মহাভারতের যুদ্ধে কোভিডকে পরাস্ত করেছেন, তাঁর মন্ত্রীসান্ত্রীরা বলেন কোভিডকে তারা বগলে রেখেছেন। কিন্তু কুম্ভ শেষে বিভিন্ন রাজ্যে ফেরা পুণ্যার্থীরা যে কোভিড ছড়িয়েছেন তা নিয়ে যেমন কোনও সংশয় নেই, একই ভাবে ভোটের শেষে এই বাংলাতেও বেড়েছে সংক্রমণ ও মৃত্যু। তার থেকেও বড় প্রশ্ন এখন কি হবে?
চরম দারিদ্রতা, বেকারত্ব, কর্মহীনতা বাড়তে বাড়তে কোথায় গিয়ে শেষ পর্যন্ত থামবে জানা নেই। অথচ কী ভাবে সরকার এই আঘাতের মোকাবেলা করবে সেটা জানা বোঝা যাচ্ছেনা। সরকারের কাছ থেকে এখনও কোনও ইঙ্গিতও মিলছে না। শুধু এটা বোঝা যাচ্ছে যে সরকারের কাছেও বিষয়টা স্পষ্ট নয়। এটা মানুষ ধীরে হলেও বুঝতে পেরেছেন। লক ডাউন কয়েকদিন পরে উঠে যাবে কিন্তু তারপর? করোনার দ্বিতীয় ছোবলে নীল হয়ে যাওয়া দেহটাকে কি আর নতুন রক্ত দিয়ে জীবন্ত করা যাবে? এই সরকারের যে কোনও সদিচ্ছা নেই তা তারা নিজেরাই স্পষ্ট করে দিয়েছে। কিন্তু এখনও ২০২৪ পর্যন্ত তাদের আয়ুষ্কাল, দেশের শিল্প-বানিজ্য-অর্থ যেভাবে ভেঙে পড়তে শুরু করেছে তা সামাল দিতে কেন্দ্র এখনো কোনও পরিকল্পনার কথা ভাবেনি। আদৌ সে ভাবছে কিনা বা ভাববে কিনা তাও জানা যায় নি।
তিন দশক আগে যে দেশটি স্বাধীন হয়েছে তাকে দেখে মোদি শিখুক, কিন্তু শিখতে গেলেও তো বিদ্যে লাগে…বিড়াল দিয়ে
কি হালচাষ হয়? অতএব।
করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের পর দেশের মানুষকে মোদি আর তার সরকারের জন্য অনেক মাসুল দিতে হবে। সবে নাটকের
শুরু এখনও অনেক দৃশ্য বাকি আছে, তার মধ্যে যে কত কিছু ঘটবে তা কল্পনার বাইরে।
দেশের দারিদ্রতা, বেকারত্ব, কর্মহীনতা- এসব আছে নাকি, মোদি আর তার লোকজন তো সেসব জয় করে ফেলেছে,
যেভাবে বাংলা জয় করে ফেলেছে সেই পথেই। তবে করুণ পরিণতি যদি আমরা না চাই তাহলে ওই আবর্জনা মানে বিজেপি
বা আরএসএস এখুনি সাফ করতে হবে শিকড় সমেত।
আপনার বক্তব্য অনুযায়ী ভারতবাসীর সামনে অন্ধকার ছাড়া আর কোনও আলোকরেখা নেই। এই অবস্থার ব্জন্য একমাত্র
দায়ী দেশের প্রধানমন্ত্রী মোদি। এটা তো কোনও নতুন কথা নয়। যে জনগণ মোদিকে নির্বাচন করেছেন, পুজো করেছেন বা
এখনো করছেন তাদের তিলে তিলে মৃত্যু কে আটকাবে, মোদি?