দেশের কোনও হাসপাতালেই রোগীর জন্য জায়গা নেই, অক্সিজেনের অভাব লেগেই আছে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বারাণসীর চিকিৎসকদের সঙ্গে ভিডিয়ো কনফারেন্সে বলেছেন, টিকাকরণ সকলের দায়িত্ব। প্রশ্ন, সকলের দায়িত্ব বলতে প্রধানমন্ত্রী কী বোঝাতে চাইছেন? সকলে মিলে টিকা তৈরি করবে? নাকি একজন আরেক জনের জন্য টিকা জোগাড় করবে? আসলে প্রধানমন্ত্রী সকলের দায়িত্ব বলে নিজের দায় এড়াচ্ছেন। এসিকে টিকাকরণের সার্টিফিকিটে তাঁর নিজের ছবি দিতে হবে। ছত্তীসগঢ়, ঝাড়খণ্ড সরকার ঠিক করেছে, ১৮-৪৪ বছর বয়সিদের জন্য টিকা যখন রাজ্যই কিনবে, তখন সেই সার্টিফিকেটে প্রধানমন্ত্রী নয় মুখ্যমন্ত্রীদেরই ছবি থাকবে।
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি সপ্তাহে টিকাকরণ হয়েছে গত আড়াই মাসের হিসেবে সব থেকে কম। দেশের ৭০ শতাংশ জেলায় প্রতি ১০০ জনের জন্য মাত্র ২০ ডোজ টিকা পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের স্বাস্থ্য দফতরও মানছে টিকার অভাবই এর কারণ। অথচ দেশের করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি যখন থেকে বিপজ্জনক অবস্থার দিকে হাঁটা শুরু করেছে তখন থেকেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তার মন্ত্রিসভা সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল নিতে শুরু করলেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অবস্থা খারাপ বলার পর অন্যান্য দেশ যখন টিকাদান কর্মসূচি পুরোদমে শুরু করে দিল তখনও কেন্দ্র মোদী ভাষণ দিয়ে চলেছেন, অতিমারীর দ্বিতীয় ঢেউ বা তৃতীয় ঢেউ কখন আছড়ে পড়ে, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করেন।
চলতি বছরের কুম্ভমেলায় যেখানে ৩০ লাখ লোক জমায়েত হয়, কিন্তু যথেষ্ট সংখ্যক লোককে টিকা দিতে ব্যর্থ হয় তখন আজকের অবস্থার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে দোষ দেওয়া ছাড়া আর অন্য রাস্তা খুঁজে পাওয়া যায় না। সরকার এই অতিমারীকে গুরুত্ব দিয়ে এর মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ার জন্যই যে আজকের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি তা বলার অপেক্ষা রাখে না।করোনা ভাইরাসজনিত রোগ ও ভয়াবহ সেই প্রমাণ পাওয়ার পরও সরকার সতর্কতা অবলম্বনের ব্যাপারে খুব ধীরে পদক্ষেপ করেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাকে মহামারী ঘোষণা করার আগেই ২০২০-র ১০ মার্চের মধ্যে দেশে কোভিড-১৯-এ সংক্রমিত হওয়ার অন্তত ৫০টি ঘটনা সরকারের সামনে এসেছিল। ৫০ জনের সংক্রমিত হওয়ার খবর পাওয়ার পরও সরকার কোনও ব্যবস্থা নেয় নি। পরবর্তী ১৪ দিনে ওই সংক্রমণ দ্বিগুণ হয়ে যায়। কিন্তু কেন্দ্র কি ব্যবস্থা নিল? প্রধানমন্ত্রীর প্রথম তৎপরতা ছিল ১৪ ঘণ্টার ‘জনতা কার্ফু’। তখনও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ ধরণের পরামর্শই দেয় নি।
মাত্র চার ঘণ্টার নোটিশে সেই লকডাউন নিয়ে কেন্দ্র মেতে উঠলে হাজার হাজার অভিবাসী শ্রমিককে খালি হাতে তাদের বাড়ির পথে হাঁটা শুরু করতে হয়। কেউ কেউ রাস্তাতেই প্রাণ হারায়, অনেকে নিজেদের শহরে ও গ্রামে ফেরে ভাইরাস বহন করে। ২০২০-র মে ও জুনেও লকডাউন বাড়ানো হয়। দেশের লাখ লাখ খেঁটে খাওয়া মানুষের কাছে ওই লকডাউনের কোনও মানে না থাকলেও তা চলতে থাকে দিনের পর দিন। কিন্তু মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য, খাবার জোগাড়ের জন্য ঘর থেকে বেরতে হয়েছে। এক বছরে দেশে এক কোটি ৬০ লাখের মতো লোকের শরীরে করোনা মিলেছে। প্রায় এক লাখ ৮৫ হাজার মানুষ মারা গিয়েছে।
এরপরও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, কোডিভ-১৯ এর বিরুদ্ধে মহাযুদ্ধে তিনি ১৮ দিনে ‘মহাভারত’ জয় করবেন। বহু লাশ গঙ্গা দিয়ে ভেসে চলেছে, দেশের মানুষ হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ছাড়া আর কোনও কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। সেকারণেই বাধ্য হয়ে দেশের ১১৬ জন প্রাক্তন আমলা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে খোলা চিঠি লিখে জানিয়েছেন, অবিলম্বে প্রত্যেক দেশবাসীর জন্য বিনামূল্যে টিকার ব্যবস্থা করুক কেন্দ্র। ওই খোলা চিঠিতে তাঁরা শহর ও গ্রামাঞ্চলে আরটি-পিসিআর পরীক্ষার হার আরও বাড়ানোর দাবিও তুলেছেন।
তাঁরা এও বলেছেন প্রতিদিন অসংখ্য মৃত্যু, স্বজনহারাদের হাহাকার বা চিকিৎসার জন্য করুণ আর্তিতে তাঁরা যত না বিচলিত, তার থেকে ঢের বেশি বিচলিত সরকারের গা-ছাড়া ভাব দেখে। তাদের অভিযোগ, করোনা সংক্রমণের প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ের মাঝখানে সময় পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু তখন আগাম কোনও পরিকল্পনা করা হয়নি। যে দেশ পৃথিবীর সর্ববৃহৎ প্রতিষেধক উৎপাদনকারী, সে দেশেই টিকার এই আকাল।
শুধু প্রাক্তন আমলারাই নন, সার্ভিস ডক্টরস ফোরাম-ও বিনামূল্যে দেশবাসীকে প্রতিষেধক দেওয়ার দাবিতে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছে। অন্যদিকে দিল্লি হাই কোর্ট নির্দেশ করেছে, ঘাটতি মেটাতে বিশ্বের যেখান থেকে হোক ‘ব্ল্যাক ফাঙ্গাস’ চিকিৎসার ওষুধ নিয়ে আসার ব্যবস্থা করুক সরকার। করোনার সংক্রমণের পাশাপাশি ‘ব্ল্যাক ফাঙ্গাস’-এও সংক্রমণের সংখ্যা বাড়ছে বিভিন্ন রাজ্যে। মূলত কোভিড থেকে মুক্তি পাওয়া রোগীদের মধ্যে এই সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে। একেই কোভিড নিয়ে হিমশিম অবস্থা দেশের, তার মধ্যে নতুন এই ছত্রাকের সংক্রমণ এবং তাতে মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগকে বহু গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
দুদিন আগে তিনি বাংলা ছাড়াও বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী, বাম শাসিত কেরল, কংগ্রেস শাসিত ছত্তীসগড়, রাজস্থান এবং শিবসেনা-কংগ্রেস-এনসিপি শাসিত মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দের ডেকে বৈঠকে বসেছিলেন। অথচ তিনি কাউকে কোনও কথা বলতে না দিয়ে নিজেই বলে গেলেন। এদিকে রাজ্যগুলির দরকার ভ্যাকসিন, প্রয়োজনীয় অর্থ। সেসব এড়িয়ে গিয়ে তিনি একাই বলে যান। অন্য মুখ্যমন্ত্রীরা কিছু না বললেও সাংবাদিক ডেকে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী একের পর এক প্রশ্নে মোদিকে বিঁধেছেন। তিনি কেন্দ্রের ভ্যাকসিন নীতিরও সমালোচনা করেন। ভ্যাকসিন নেওয়ার সময়সীমা বদল নিয়ে বলেন, বারবার দুই ভ্যাকসিনের মধ্যে সময়সীমা পাল্টানো হচ্ছে। সেই সঙ্গে এও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ফর্মুলা মানলে, দেশে ভ্যাকসিন দিতে ১০ বছর লাগবে।
প্রধানমন্ত্রী করোনা রুখতে কি পদক্ষেপ করেছেন? ভাষণ দিয়ে তিনি ১৮ দিনে ‘মহাভারত’ জয় করবেন? ওকে দেশের মানুষ
রাস্তায় নামিয়ে এনে কুকুরকে দিয়ে খাইয়ে দেবে।
করোনা কালে প্রধানমন্ত্রী টিকাকরণের সার্টিফিকিটে তাঁর নিজের ছবি লাগানোর দায়িত্ব অতি সযত্নে পালন করবেন
তথ্য সমৃদ্ধ বিশ্লেষণ।